পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

উষ্ণ বয়সী ব্ল্যাকবোর্ড 

সুদীর্ঘ ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখি ছিমছাম এক বাংলো। অত্যন্ত মনোরম আর্কিটেক্টচারে একতলা বিল্ডিং। বাংলোতে ঢোকার মুখে ফুলের বাগান । নানা প্রজাতির ফুলের সমারোহ। একটা ঝুমকোজবা গাছে ঝেঁকে লাল লাল ফুল ধরে আছে। গাছের ডাল ঝুমকোর ভারে মাটির দিকে অবনত। নানান জাতের পাতাবাহার আর দুই-তিনটা কাঁঠালিচাঁপার গাছ। সিজন ফ্লাওয়ারের বেডে নির্মল পুস্পিত হাসি। টিলার উপর থেকে নিচে তাকালে আমার পায়ের তালু শিরশির করে হৃতকম্পন দ্রুত হয়ে ওঠে! আমি অবশ্য তখন জানিনা যে, এটাকেই ‘হাইট ফোবিয়া’ বলে। টিলার নিচে চলাচল রত মানুষগুলিকে পুতুল নাচের পুতুলদের মতো মনে হয়। যেন কেউ অদৃশ্য থেকে সুতা নাড়িয়ে নাড়িয়ে তাদের এদিক থেকে সেদিকে নিয়ে যাচ্ছে। যেদিকেই তাকাই সবুজ সমুদ্দুরের ঢেউ। সমুদ্দুরের ঢেউ গিয়ে আকাশের নীলের কাছে মাথা পেতে দিয়েছে। আর এক ভ্যাবলাকান্ত বালিকা চোখমুখে রাজ্যির বিস্ময় নিয়ে সবুজ-নীলের সম্মিলন দেখছে।

খাওয়াদাওয়া অন্তে বিউটি আপা আমাকে কোণের একটা ঘরে নিয়ে গেল। এটাই আপাতত আমার থাকার ঘর। আমি বিউটিআপার সাথে শেয়ার করে থাকব।ঘরে আসবাব বলতে ঢাউস আকারের কারুকাজময় এক পালঙ্ক। একটা আলনা। কাঠের আলমিরা। টু সিটার বেতের সোফা। আর নিচু একটা শোকেস সুদৃশ্য ঢাকনিতে ঢাকা। শোকেসের উপর একটা অফ হোয়াইট রঙের বড়সড় রেডিও। বিউটিআপার একটা লুকানো অভ্যাস আছে, বামহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি চুষে খাওয়া। বিউটিআপা অবশ্য এ কাজটা সবার সামনে করে না। আশেপাশে যখন কেউ থাকে না, তখন সে মনের সুখে নিজের আঙুল চুষে চলে। বিউটিআপা এটা কেবল আমার সামনেই করে, আঙুল চুষতে চুষতে এমন তৃপ্তির শব্দ তোলে যেন সে চকলেট খেয়ে চলেছে।

রাতের গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে শীত ক্রমে তীব্রতর হতে থাকে। আমি ঠাণ্ডায় জমে যেতে যেতে লেপের তলায় ঢুকে পড়ি। আর বিউটিআপা রেডিওর সুইচ অন করে দেয়। কিন্তু ভলিয়্যুম এত লো যে কী বাজছে আমি শুনতেই পাইনা। আমি বলি—
বিউটিআপা, কী বাজান শুনি না নাতো।
গান বাজাই।
তাইলে আরেকটু জোরে দেন।
না, এর চাইতে জোরে দেয়া যাবে না। অন্যদের অসুবিধা হবে।
আমি বিউটিআপার কাছ থেকে আরেকটা কিছু শিখি—
উচ্চ শব্দে রেডিও বাজিয়ে কাউকে ডিসটার্ব করা যাবে না। সেই থেকে আমি নিজেও নিঃশব্দ হতে শিখেছি। অন্যকে ডিস্টার্ব না করে চলার চেষ্টা করেছি।

পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই অন্য এক দৃশ্য দেখলাম। সকালের শাদা আলোয় গাছেদের রঙ গেছে পালটে। রুপালী রঙের আভায় গাছের শাখাপত্র ঝকঝক চকচক করছে। অদূরবর্তী টিলার গাছে গাছে বানরের দল ঝুলন খেলছে! আমার পায়ের কাছ দিয়েই বড়সড় একটা গিরগিটি দৌড়ে গেলে আমি ভয়ে প্রায় আধমরা হয়ে গেলাম! হায়! হায়! এখুনি তো আমার শরীরের সমস্ত রক্ত সে শুষে নেবে। টাঙ্গাইলে থাকতে আমি এদের বহু দেখেছি। দেখেই পালিয়ে গেছি। আমরা এদের বলি ‘রক্তচোষা’। এদের কাছেপিঠে থাকলেই নাকি এরা দেহের সমস্ত রক্ত শুষে নিতে পারে! আর এই ভয়ানক জীব এখন আমার ধার দিয়ে দৌড়ে গেল! এখন তো আমার মরণ অনিবার্য!
আমি ভয়ে বারান্দায় ঢুকে পড়ি। দেখি চাচিমা একটা লালগামছাতে কী যেন বেধে দিচ্ছে। আমাকে দেখে বলে—
রাইতে ভালো ঘুমাইছিলা পাপড়ি?
আমি আলগোছে মাথা নাড়ি।
চাচিমা গামছাটা বারান্দার গ্রিলে বেধে দিতে দিতে বলে—
কাঁচা ছানা ঝরা দিলাম। নাস্তার লগে খাইবা। তুমার আম্মা আসলে ভালো অইতো। এর পরে আম্মারে সাথে নিয়া আসবা কইলাম।

অসম্ভব শাদা গায়ের রঙ আর প্রচন্ড ভারী শরীর চাচিমার। এত ভারী শরীর নিয়ে আরাম আয়েশ করেই দিন কাটায় সে। আর সহকারীদের কাজের তদারকী করে। মালি,ড্রাইভার, জল তোলার সাহায্যকারী আর রান্নার ঝি নিয়ে সদা ব্যস্ত চাচিমা।
রাজাকাক্কার এই বাংলোতে সবকিছুরই সুবিধা রয়েছে, শুধু জলের সঙ্কট তীব্র। বহু নিচে বয়ে যাওয়া ঝিরি থেকে জল তুলে আনা হয় টিনের পাত্র ভরে। সেই ভাঁড়ের জলে স্নানাহার সবই চলে।
রোজ সকালে খালিপেটে খেতে হয় কাঁচা ছানা। আটার সেদ্ধ রুটি। সঙ্গে ডিম ও আলুভাজি।
একদিন খেলাম হরিণের মাংসের শুটকি। রাজাকাক্কাই শিকার করে এনেছিল। চাচিমা কিছু মাংস শুটকি করে রেখেছিল। সেই মাংস আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন ভুনা করে আমাকে খাওয়ালো। কী যে দারুণ স্বাদ সেই মাংসের!

রাজকাক্কা আর চাচিমার রুমটা আমি দেখতেই পাইনা। এত বড় বাংলোর কোন রুমে যে তারা থাকে তাও আন্দাজ করতে পারি না। গালিব এসে খাবার টেবিলে বসে, কিন্তু আমার সাথে তার তেমন কথাবার্তা হয় না। আমিও বলি না। গালিবের যত খায়খাতির মালি আর ড্রাইভারের সঙ্গে।আর আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আমি তার রাজ্য দখল করতে এসেছি!

ভাটেরাবাজারে যখন তখন তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। হপ্তায় একদিন ড্রাইভার আর জলটানার লোকটাকে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় যা কিছু কিনে এনে রাখা হয়। ফলে শাকসব্জীমাছ তেমন খাওয়া হয় না। আর টিলার এত উপরে সব টেনে আনাও কষ্টসাধ্য কাজ হয়ে দাঁড়ায়। তবুও রক্ষে চাচিমার ছোট একটা ফ্রিজ আছে। তাতেই কিছু রসদ মজুদ রাখা যায়।

আমি আর বিউটিআপা প্রতিদিন খেয়েদেয়েই বেরিয়ে পড়ি। দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাই। বনভূমিতে সুর্যের আলো থাকতে থাকতেই ঘুরে বেড়াই। রাবার বৃক্ষের সারির ভেতর ঢুকে পড়ি কোনো কোনোদিন। গভীর জংগলে যেতে ভয় করে আমাদের। আমরা ঘুরে বেড়াই ঝিরির ধার ঘেঁষে। দেখি স্বচ্ছ জল তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছে । কই যাচ্ছে সে ঠিকানা আমাদের জানা নাই। জল স্রোতে মাছেদের ভেসে যেতে দেখি। দুই-একটা মাছ মনের ভুলে ডাঙায় লাফিয়ে উঠেই ফের জলে ভেসে যায়। পলকে চোখের আড়াল হয়ে যায়।
আমাদের বৈকালিক ভ্রমণে বিউটিআপা আয়েশ করে বৃদ্ধাঙ্গুল চুষে বেড়ায়। এখানে কেউ তাকে দেখে ফেলার নাই। বিউটিআপা আঙুল চুষে চুষে শাদা করে ফেলে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা এক ঝিরি পার হয়ে আরেক ঝিরির কাছে পৌছে যাই। জলের ঘুঙুর শুনি কান পেতে।
বিউটিআপা বলে—
দেখছ পাপড়ি ঝিরির জল কেমন পরিস্কার? আর কেমন ঘূর্ণি?
হুম দেখছি।
তুমি জঙ্গলের গন্ধ পাইতেছ? পাইবা। যখন বাসায় যাইয়া আবার আসবা তখন তুমি জঙ্গলের গন্ধ আলাদা করতে পারবা। জঙ্গলের গন্ধ বড় অদ্ভুত। একবার যে চিনতে শেখে সে তা কোনোদিন আর ভোলে না।
আমি চুপচাপ বিউটিআপার কথা শুনতে থাকি। মাফলারে আধেক ঢেকে রাখা আমার মাথা্র চুলে শীতের তাজা শিশির ক্রমাগত ঝরে পড়ে। শীতে আমি প্রায় কাঁপতে থাকি। তবুও বিউটি আপাকে বলি না যে, আমার ঠাণ্ডা লাগছে।
আমার লাইনিঙ ছাড়া কোট এই পাহাড়ি হীম আটকাতে ব্যর্থ। কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে আমি শীত তাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকি। ঠাণ্ডা হাওয়ায় উড়তে থাকে অজস্র শিশির কণা। তারা দ্রুত ঢুকে পড়তে থাকে আমার ফিনফিনে কোটের ভেতরে। জুতো-মোজা পরে থাকা সত্ত্বেও আমার পা দুটো জমে বরফ হয়ে যায়। অবশ পা নিয়ে আমি যেন আর এগোতে পারিনা। ততক্ষণে সূর্য চলে গেছে বৃক্ষের আড়ালে। আবছা অন্ধকারের ভেতর আমি আর বিউটিআপা দাঁড়িয়ে আছি।

সহসা হাওয়ার ঘ্রাণ বদলে যায়। বিউটিআপা জোরে শ্বাস টেনে বলে—
পাপড়ি বাসায় চল।
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে আমার হাত ধরে বলে—
দ্রুত বাসায় চল। বাতাসে গণ্ডারের গন্ধ পাওয়া যায়।
শুনে আমার শরীরের সমস্ত লোম জারিয়ে উঠে। কে যে আগে ছুটতে শুরু করে বুঝতে পারি না। হয়তো আমি। নাহয় বিউটিআপা। আমরা দুইজনই প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করি। টিলার সামনে এসে থেমে দাঁড়াই। ঘামে দুইজনই একেবারে নেয়ে উঠেছি। ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে আমার বুক ভেঙে কাশি শুরু হয়। কাশির গমকে আমার ছোট্ট শরীরটা নুয়ে পড়তে শুরু করে। বিউটিআপা আমাকে দুইহাতে ধরে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমার মুখের ভেজা ঘাম ওড়না দিয়ে মুছতে মুছতে বলে—
এত কাশতেছ ক্যান? এত ঠাণ্ডা কীভাবে লাগল?

আমি কাশির প্রকোপে জবাব দিতে পারিনা। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে মনে হয়, এই সিঁড়ির শেষ প্রান্তে আমি কোনোদিনই আর পৌছাতে পারব না! এই এক্ষুণি আমি টিলা থেকে গড়িয়ে পড়ে নিচে চলে যাব। তারপর আর কোনোদিন চোখ মেলে তাকাব না! আমার জীবন এই পাহাড়ের দেশে এসেই ফুরিয়ে গেল! কিন্তু আমার আর কাউকে মনে পড়ে না। শুধু আব্বার উদ্বিগ্ন মুখটা ভেসে ওঠে! (চলবে)

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।