আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

জর্জিয়া

বস্তিতে এবছর সাতজন মেয়ে। সবার বড় মেরী। সে মৃগী রোগী। নোংরা জঞ্জালের মধ্যে পড়ে শরীর মোচড়াচ্ছে বারবার আর মুখ দিয়ে পাগলা কুকুরের মত ফেনা উগরাচ্ছে। চোখদুটো দেখাচ্ছে যেন বুনো। বার্থা নামে একটা মেয়ের সাথে ক’ বছর আগে তার জুতো নিয়ে একটা ঝামেলা হয়েছিল। সে মেরীকে শাপ-শাপান্ত করেছিল। মেরী নিগ্রো মেয়ে। আব্রাহামের কথায় শিশুবেলা থেকেই তার দুঃখ-কষ্টের শুরু। কিন্তু কেউ সে কথায় কান দেয় নি। ছোটবেলা থেকেই তার এই মৃগরোগ। অসহ্য যন্ত্রণাশেষে যখন সে সুস্থ হল ততক্ষণে শরীর তার একবারেই অবসন্ন হয়ে পড়েছে। উদ্ভ্রান্ত চোখদুটো। বোঝার উপর শাঁকের আঁটির মত তাকে শাস্তি পেতে হবে; যেটুকু কাজ সে করতে পারে নি, সেটুকু তাকে করে শেষ করতে হবে। সুস্থ হবার পর তাকে এই নষ্ট সময়ের কাজ করে পুষিয়ে দিতে হবে। কারো উপর মালিকের মেজাজ বিগড়ে গেলে তার ঝাল যে কারো উপর গিয়ে পড়তে পারে। তার জন্য অন্য কেউ এমন শাস্তিভোগ করুক তা মেরী চায় না। সে পা টেনে টেনে চলতে শুরু করল এই আশায় যে, কেউ হয়ত তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে।

দুধঘরে মার্গারেট ও রাইদার সাথে কাজ করে মেরী। র‍্যান্ডেল কেনার আগে তাদের বনিবনাই হত না। সম্পর্ক এতটাই খারাপ ছিল যে, তাঁত বোনার কাজ শিঁকেয় তুলে খামারে তারা সারাক্ষণ ঝগড়াঝাটি করত। সময়-অসময়ে মার্গারেট গলা দিয়ে এক অদ্ভূত ভীতিকর ঘড়ঘড় আওয়াজ করত, কখনও বা কোন জন্তু-জানোয়ারের মত ডেকে উঠত। সবচেয়ে দুঃসহ লাগত যখন সে ক্যাচক্যাচ আওয়াজ তুলত আর করত অশ্রাব্য গালিগালাজ। মালিক পরিদর্শনে এলে সে হাত দিয়ে মুখ চেপে রাখত যেন প্রভু এসব শুনতে না পায়। শরীর-স্বাস্থ্যের দিকে রাইদার কোন নজরই ছিল না। মেরীর অদ্ভূতুড়ে কাণ্ডকারখানার কোন তোয়াক্কাও সে করত না। গা দিয়ে বেরুত তীব্র দুর্গন্ধ।

লাকি আর টিটানিয়া কখনও কিছুই বলে না। কথা বলতে ইচ্ছে করে না লাকির; আর টিটানিয়ার জিব কেটে ফেলে দিয়েছিল তার আগের মালিক। এলিসের অধীনে তারা হেঁশেলে কাজ করে। এলিস চায় সারা দিন ঘ্যানঘ্যান না করে তারা যেন শুধু তার কথাই শোনে।

সেবারের বসন্তে দুটো মেয়ে আত্মহত্যা করে। এটা অবশ্য খুব অস্বাভাবিক ঘটনা নয় এখানে। তাই মনে রাখার মত বিষয়ও নয়। এখানে এসব এতই তুচ্ছ ব্যাপার যে, পরের শীত আসতে আসতে সবাই তাদের ভুলে যাবে।

বাকী শুধু ন্যাগ আর কোরা। তুলার খামারে তারা সারা বছর কাজ করে।

দিনশেষে কোরা টলতে টলতে হাঁটছিল। ন্যাট তাকে সাহায্য করছিল। সে কোরাকে হবে নিয়ে এলো। ছেলেরা সারবাঁধা কুঁড়ের পাশ দিয়ে তাদের এভাবে ধীরে ধীরে চলা দেখছিল বটে; কিন্তু কেউ কিছু বলল না। তারা মনে করে এসবই কোরার পাগলামী। তাই কেউ সেসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। কেউ অবশ্য তাকে গালমন্দও করে না। সিজারের পাশ দিয়ে চলে গেল তারা। সে তখন একটা কারখানার পাশে কয়েকজন ছেলের সাথে ছুরি দিয়ে কাঠে নকশা করছিল। কোরা শ্লেট দিয়ে নিজের মুখটা একটু আড়াল করল। এটা সে করে যেদিন থেকে সিজার তাকে পালিয়ে যাবার কথা বলেছে।

জকির জন্মদিনের সপ্তাহ দুই পরের ঘটনা। তখনও কোরা সেরে ওঠে নি। চোখে চাবুকের আঘাতে তার একটা চোখ ফুলে আছে। এতটাই ফুলে আছে যে, সে চোখ মেলতেই পারছে না। তার কপালের দু’দিকের রগে স্থায়ী ক্ষত হয়েছে।

চোখের ফোলা সেরে গেলেও চোখের যে জায়গায় চাবুকের হাতলের ছোট্ট টুকরো গিয়ে আঘাত করেছিল সেখানে রয়েছে ইংরেজি এক্স অক্ষরের মত একটা ক্ষত। অনেক দিন ধরেই চোখ দিয়ে পানি পড়ে। সে রাতের আনন্দোৎসবে এটাই তার নিট প্রাপ্তি! তারচেয়ে আরও নৃশংস অভিজ্ঞতা হয় পরদিন যখন কনেলি তাকে অজানা কারণে নির্দয়ভাবে বেদম চাবকায়।

বৃদ্ধ র‍্যান্ডেল এই খামারে প্রথম যাদের নিয়োগ করেছিলেন, কনেলি তাদেরই একজন। জেমসের অধীনেও সে নিয়োগ বলবৎ আছে। কোরার যখন নিতান্ত কম বয়স তখন থেকেই সে ওভারসিয়ারের সাদা ঘাসের হ্যাটের নীচে তার কোঁকড়ানো আইরিশ লাল চুল বেরিয়ে থাকতে দেখে আসছে; ঠিক যেন পাদরিদের মত। তখন একটা কালো ছাতা মাথায় দিয়ে টহল দিয়ে বেড়াত সে। এখন তার রোদেপোড়া চামড়ার সাথে সেঁটে থাকে ছোট্ট একটা সাদা ব্লাউজের মত জামা। চুল সব পেকে সাদা হয়ে গেছে। ভুঁড়িটাও মাজার বেল্ট ছাপিয়ে বদখদ ঝুলে থাকে। গাঁয়ের এবড়ো-থেবড়ো পথে একটা তুলোর গাঁট মাথায় নিয়ে যাবার সময় সেটা উল্টে পড়ে যাবার অপরাধে এই লোকটাই একদা কোরার নানী আর মাকে বেধড়ক পিটিয়েছিল। একটা বুনো ষাঁড়ের মতই কনেলি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখন নিতান্ত জরুরি না হলে সে জোরে হাটতেই চায় না। এখন সে নয়-লেজ-বিড়াল ঝোঁপের পাশ দিয়ে যাবার সময়ই কেবল একটু জোরে হাটে। আর বাচ্চাদের সাথে আড্ডা দেবার সময়ই তাকে উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায়।

র‍্যান্ডেল ভাইদের এমন আকস্মিক পরিদর্শনে কনেলি খুশি নয়। পয়লা কারণ, এর ফলে হালের রক্ষিতা গ্লোরিয়ার সাথে কনেলির ফূর্তিতে ব্যাঘাত ঘটেছে। যে তাকে ডাকতে গিয়েছিল তাকে আচ্ছামত ধমক দিয়ে কনেলি বিছানা ছেড়ে উঠে আসে। দুসরা কারণ, মাইকেলের ব্যাপরটা। মাইকেল খুন হবার কথাটা সে জেমসকে জানায় নি। যদিও কাজে এমন অবহেলা সে প্রায়শই করে থাকে। এমন যে ঘটবে তা সে কল্পনাও করে নি। কিন্তু টেরেন্সের চাপাচাপিতেই আচমকা মাইকেল খুন হয়।

এর সাথে চেস্টারের ঘোলাটে ব্যাপারটা আর কোরার অপ্রতাশিত ভূমিকা কনেলিকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। যে ‘পাপ’ হয়েছে পরের দিন সকালেই কনেলি তার একটা ‘বিহিত’ করার কথা ভেবে নিল। চেস্টার আর কোরার পিঠের জমাট রক্ত সে লংকা-পানি দিয়ে ধুয়ে দেবে! চিকিৎসার এমন অভিজ্ঞতা চেস্টারের এই প্রথম হলেও কোরার গত ছ’মাসে তা দ্বিতীয় দফা। পরের দু’দিন কনেলি তাদের দু’জনকেই যথেচ্ছ চাবকায়! দাসদের কথায় জানা যায়, এত লোকের সামনে তার ভাই টেরেন্স যেভাবে জেমসের লোকদের, বিশেষ করে চেস্টার আর কোরাকে চাবকিয়েছে তাতে জেমস একবারে হতভম্ব। সম্পত্তি নিয়ে এক ভাইয়ের ক্রোধের ধকল অন্য ভাইকে সইতে হচ্ছে। চেস্টার কোরার সাথে একটা কথাও বলল না।

ন্যাগ কোরাকে ধরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বস্তিতে নিয়ে এলো। ঝুপড়িতে ঢুকেই কোরা অচেতন হয়ে যায়। এরপর গাঁয়ের লোকজনের সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ নেই। “তোর জন্যি রাতের কিছু খাবার জোগাড় করতি পারি কিনা দেখি গে,” বলে ন্যাগ বেরিয়ে গেল।

কোরার মতই ন্যাগও বস্তির দলাদলির শিকার। অনেক বছর ধরেই সে কনেলির প্রিয়পাত্রী ছিল। রাতে কনেলির বিছানার সঙ্গী ছিল সে। মিটমিটে চাউনি আর থলথলে পাঁছাওয়ালা উদ্ধত নিগার মেয়ে ন্যাগের প্রতি ওভারসিয়রের নজর পড়েছিল আগেই। অনেক বাজে কাজ থেকে অবশ্য তাকে রেহাই দেয় কনেলি। ঝাড়ঝুড় দেয়া, জিনিসপত্র সাজিয়েগুছিয়ে রাখার মত কাজ কেবল তাকেই করতে হত না। তার মা সাদাদের হাতে অহর্নিশ অপদস্ত হত। সইতে হত সীমাহীন অত্যাচার। মেয়ে ন্যাগকে সাথে নিয়ে সাদাদের অযাচার যৌনলিপ্সার শিকারও হতে হয় মাকে। নিজের মেয়ের উপর সাদা প্রভূর বিকৃত যৌন লালসা মেটানোর সকল আয়োজন তাকেই করতে বাধ্য করা হত।

র‍্যান্ডেল খামারের উত্তর ও দক্ষিণ ভাগের মধ্যে নিয়ত দাস অদলবদল করা হয়। গোমড়ামুখো, নিয়ম-শৃঙ্খলাহীন, অবাধ্য, বদমাশ দাসদের জন্য ছিল এসব শাস্তির ব্যবস্থা। ন্যাগের কথাই ধরা যাক। সাদাদের ঔরষে তার পেটে যে সব জারজ দো-আশঁলার জন্ম হয়েছে তাদের মুখের আদল দেখেই চেনা যায়। তাদের কারো কারো মাথায় কনেলির মতই কোঁকড়ানো আইরিশ লাল চুল সূর্যের আলোয় চিকচিক করে।

এক সকালে কনেলি ঘোষণা করল, সে আর ন্যাগকে তার বিছানাসঙ্গী করবে না। এ দিনটার জন্যই শত্রুরা অপেক্ষায় ছিল। খামারের কাজ শেষ করে ফিরে সে জানতে পারে তার যা যা আছে সবই বস্তিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন থেকে সেখানেই তাকে থাকতে হবে। মহল্লায় তার আগের দাপটও শেষ হয়ে গেল। তার পতনে বস্তির লোকেরা এতই মজা পেল যা বলে শেষ করা যাবে না। নিজেকে শক্ত করে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করল ন্যাগ। এখানে নিজের মত করে নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে তাকে।

ন্যাগ কখনও কোরার মায়ের আপনজন নয়। কিন্তু এখন বিপদের সময় কোরার পাশে দাঁড়াতে তার কোন অসুবিধা হল না। সেই আনন্দোৎসবের দিনে কোরা রক্তাক্ত হবার পর থেকে মেরীর সাথে সেও কোরার সব রকম সেবা শুশ্রূষা করে আসছে, খাবারের জোগাড় করছে। তাকে দোলনায় বসিয়ে দোলানো, ঘুমপাড়ানী গান গেয়ে মনে ফূর্তি রাখার চেষ্টা করছে তারা। লভিও মাঝে মধ্যে আসে বটে; কিন্তু এ মহল্লায় তার এত বদনাম যে মেরী ও ন্যাগের উপস্থিতিতে আসতে সে ভয় পায়।

মেঝেয় শুয়ে কোরা কাৎরাচ্ছে। দু’ সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। এখনও তার মাথায় আঘাত পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণা। তার মধ্যেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে সে খামারে কাজ করতে এসেছে। কষ্ট হলেও সে সার ধরেই কাজ করে। কিন্তু মাঝেমধ্যে সূর্যটা ডুবে না গেলে সে ঠিকমত দাঁড়াতে পারে না।

মেরী এলো। একটা ভিজে ন্যাকড়া কোরার চোখের উপর আলতো ধরে রাখল। মাতৃস্নেহ অটুট রয়েছে তার; যদিও তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনজনই মারা গেছে হাঁটতে শেখার আগেই; বাকি দুটো র‍্যান্ডেল বাড়ির আশপাশ থেকে ঘাসপাতা কুড়িয়ে আনা বা কলসি ভরে পানি আনার মত বয়সেই বিক্রি হয়ে কোথায় চালান হয়ে গেছে সে জানে না। বনেদি আশান্তি গোত্রের মেয়ে মেরী। তার দুই স্বামীও তাই ছিল। মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কোরা মুখটা সরিয়ে নিল।

ঝুপড়ির দেয়ালগুলো যেন তাকে চেপে ধরেছে। মাঁচার উপর থাকে রাইদা। একেবারে অগোছালো। সেখান থেকে ভেসে আসে গা বমি করা দুর্গন্ধ। কোরার হাতের গিরেগুলোয় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় মেরী। “কী জানি, আরও কী আছে কপালে?! মেরী তাকে শান্ত করতে বলে, “তোর শরিল ভাল না, কাল যকনি সাহেব আসবেনে তুই চুপচাপ শুয়ে থাকবি, নাইলি উটে কোনোঠানে চলে যেসানে।”

টেরেন্স সাহেবের আসার খবরে সবাই ভয়ে ভয়ে আছে। কোরার মনটাও যেন বড্ড খালি খালি লাগছে। জেমস র‍্যান্ডেল এখন বিছানাগত। নিউ অরলিয়েন্সে একটা ব্যবসায়িক আলোচনা করছিলেন লিভারপুল থেকে আসা একদল বণিকের সাথে। এই দোজকেও তাদের আসার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার পথে গাড়িতেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেই থেকে কেউ তার সাক্ষাৎ পায় নি। তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার বাসার স্টাফদের মাধ্যমে গুজব রটেছে, যতদিন জেমস সুস্থ না হচ্ছেন, ততদিন তার ভাই টেরেন্স এ খামারও দেখাশোনা করবেন। সকালেই তিনি খামার পরিদর্শনে আসবেন। তিনি সরেজমিন দেখতে চান, দক্ষিণে তার খামারের মত উত্তরের এ খামারও কীভাবে ঠিকমত চালানো যায়।

সবার মনে ভয়, এবার এখানে রক্ত ঝরবে।

হাতটা সরিয়ে নিল মেরী। কোরার কেন জানি মনে হল, যে দেয়াল তাকে চেপে ধরেছিল, এখন সেটা সরে গেল। সবাই ঘুমাচ্ছে। সেও ঘুমিয়ে পড়ে। রাতে আবার কোরার ঘুম ভেঙে যায়। একটা গোল করে রাখা ছেঁড়াফাটা কম্বলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে সে। রগের ফোলা ক্ষতের উপর হাত বুলিয়ে দেখল সেখান থেকে রস গলছে। সে ভাল করেই জানে, কেন সে চেস্টারকে বাঁচাতে গিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল তাকে। সে কথা ভাবলে এখন গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।

কোরা পাশ ফিরে শোয়। অস্থির মনটাকে শান্ত করতে বাইরে ম্যাপেল পাতার মর্মর ধ্বনি শুনতে কান পাতে। গভীর অন্ধকারে জলা পেরিয়ে তাকে মুক্তির খোঁজে যেতে হবে দূর উত্তরের কোন স্বাধীন দেশে। সে কি পারবে? কোরা ভাবতে চেষ্টা করে।

মা কিন্তু পেরেছিল।

এখানে আসার পর নানী আজারি কোনদিন র‍্যান্ডেল ভূমির বাইরে যায় নি। পালিয়ে যাওয়ার আগে কোনদিনই এই খামারের বাইরে কোথাও যায় নি মা মেবেলও। পালিয়ে যাবার কথা মা ঘূর্ণাক্ষরেও কাউকে বুঝতে দেয় নি। অন্তত তদন্তে কেউ বলে নি যে, সে তার পালিয়ে যাবার কথা শুনেছিল বা জানত। কেউ অনুমানও করতে পারে নি। এখানে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। চারদিকে চর গিজগিজ করছে। একবার কিছু জানাজানি হলে সবচেয়ে আপন লোকও ফাঁসিয়ে দেবে। তারপর তার পরিণতি হবে ক্যাট-ও’-নাইন টেইল-এ পচে মরা।

কোরা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, সে তার মায়ের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মুহূর্তমাত্র। এমন সময় র‍্যান্ডেল ঘন্টা বাজিয়ে প্রহরীদের ডেকে পাঠানো হল। ঘন্টা খানেকের মধ্যে শিকারীদল নেট ক্যাচাম কুকুরপাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলায়। দাস পাকড়াওয়ের জন্য কয়েক পুরুষ ধরে প্রজনন ঘটিয়ে এই বিশেষ জাতের শিকারী কুকুর উদ্ভাবন করা হয়েছে। দেশের সব এলাকার নিগারদের গায়ের গন্ধ সনাক্ত করতে ওস্তাদ এরা। এদের গলায় যে চামড়ার বেল্ট লাগানো থাকে তা আকাশে ছুঁড়ে দিলে এরা এমন ভয়ংকর ডাক জুড়ে পাড়া মাথায় করে যে তখন সবার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়। ঘরের বাইরে কেউ থাকলে ভয়ে ছুটে গিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। খামারে এ জাতের কুকুর প্রথম আনার পর কেনা গোলামরা তুলো তোলা শেষ করে দলবেঁধে তাদের দেখতে জমায়েত হয়েছিল। কিন্তু যেই না কুকুরগুলো ভয়ংকর শব্দে ঘেঁউ ঘেঁউ শুরু করল অমনি সবাই জান বাঁচাতে দৌঁড়ে পালাল।

কয়েক শ’ মাইল ব্যাপী এই শিকারী কুকুর আমদানির খবর জানিয়ে দেয়া হল। জলা-জঙ্গলে চিরুণি অভিযান চালিয়ে পলাতক দাস ধরে বা তথ্য যুগিয়ে যে সব নিগ্রো জীবিকা নির্বাহ করে তাদের দোসর বানানো হল এদের। কিন্তু প্রহরীরা প্রায়ই ভুল তথ্য পেতে লাগল। আশপাশের সকল খামার কুকুর দিয়ে তল্লাসি করা হল। একজন গোলামও রেহাই পেল না। কিন্তু কুকুরগুলো কিছুই উদ্ধার করতে পারল না। মনিবরাও হতাশ হল। র‍্যান্ডেল যাদুটোনাকারীদের কাজে বহাল রাখা হল যাতে কোন আফ্রিকান রক্তবাহী পক্ষাঘাতগ্রস্ত না হওয়া পর্যন্ত পালাতে না পারে। যাদুটোনাকারী মেয়েরা তাদের অনেক কিছুই গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখে। পরে টাকা পয়সা নিয়ে খচ্চরের পিঠে চড়ে পালিয়ে যায়। এদের নিয়ে একবার এক দারুণ তর্কবিতর্ক হয় এখানে। পালিয়ে যেতে ধান্ধাবাজ বা কালোদের উপর এই যাদুটোনা বিদ্যা প্রয়োগ করে লাভ কি হচ্ছে? এভাবে সপ্তাহ খানেক কেটে গেল। যেসব গোলাম পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে তাদের পাকড়াও করতে জলাজঙ্গলের ময়লা সাফ করা হল। তাদের ধারণা, লুকিয়ে থাকার জন্য নিশ্চয় এটাই সেরা জায়গা।

মেবেলের আচরণে সন্দেহজনক কোন লক্ষণই ছিল না। র‍্যান্ডেল প্লান্টেশন থেকে এ পর্যন্ত কেউ পালিয়ে যায় নি। যারা পালিয়ে যায়, অচিরেই ধরা পড়ে তারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধুরাই ধরিয়ে দেয়। তারা তখন ভাগ্যকে দোষে। ধরা পড়ে আরও বড় দাসত্বের ফাঁদে আটকা পড়ে। ধরা পড়ে ফিরে আসার পর অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়, শিকার হয় অসহ্য শারীরিক নির্যাতনের। তাদের করুণ মৃত্যুর দৃশ্য অন্যদের দেখতে হয়, সইতে হয়।

পালিয়ে যাওয়া দাস ধরার জন্য কুখ্যাত রিজবে সপ্তাহখানেক আগে এই খামারে এসেছিল। কুচকানো কানে হার পরা পাঁচজন কুখ্যাত ভয়ংকর চেহারার ইন্ডিয়ান স্কাউট নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল সে। সাড়ে ছ’ ফুট লম্বা রিজবের মুখটা চৌকো আর ঘাড়ে-গর্দানে তেমনি মোটা ও ভারী। একটা শান্ত পরিবেশ রক্ষার আপাত ধারণা দেয়ার চেষ্টা ছিল বটে; কিন্তু কথা শুরু করল বজ্রপাতের মত ভয়ংকর গর্জনে আর তাতে চতুর্দিকে আঁছড়ে পড়ল আতঙ্ক।

আধা ঘন্টামত সে বক্তৃতা ঝাড়ল। তারপর একটা ছোট নোটবুক খুলে নোট নিল। গভীর মনোযোগে শুনছিল এমন একজনের বক্তব্য সে শুনে নোট নিল যেন খুব গুরুত্ব দিয়ে। তার ব্যর্থতার জন্য ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে, বৃদ্ধ র‍্যান্ডেলের মৃত্যুর অল্প কিছু দিন আগে ছাড়া, পরের দু’ বছর সে আর এখানে আসে নি। ইন্ডিয়ান এই লোকটা চলে যাবার পর রইল একজন তরুণ ঘোড়সওয়ার। লম্বা কালো চুল আর পরণে তারই মত কানে হারের মত দুল। রিজবে তখন আছে খুব কাছাকাছি এক খামারে। দুটো পালিয়ে যাওয়া দাস সে চামড়া দিয়ে বেঁধে এনেছে পলাতক ধরায় তার কীর্তির প্রমাণক হিসেবে। জর্জিয়ার আইনে চোরাপথে সীমান্ত পার হওয়া গুরুতর অপরাধ। পলাতক দাস ধরে আনার অর্থ হচ্ছে মালিকের সম্পদ পুনরুদ্ধার হওয়া।

দাসধরা লোকটা জানাল, পালানোর জন্য কালোরা রাজ্যের দক্ষিণ এলাকায় নতুন একটা গোপন পথ (আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড) চালু করেছে বলে শোনা যাচ্ছে বটে; কিন্তু শুনতে যাই মনে হোক, আদতে তা অসম্ভব। তার এ কথা সিনিয়র র‍্যান্ডেল তেমন আমলে নিলেন না। রিজবে তার মেজবানকে আশ্বস্ত করে জানালো, যারা পলাতকদের সহায়তা করবে, তাদের সে খুঁজে বের করবেই। গায়ে দাগা দিয়ে কিংবা স্থানীয় রেওয়াজ মত সব ব্যবস্থা নেয়া হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ পালানোর সাহস না পায়। এ কথা বলে, আরও একবার ক্ষমাটমা চেয়ে সঙ্গীদের নিয়ে রিজবে অন্য কোথাও যাবার জন্য গোয়ো পথে রওনা হল। সব গর্ত গেঁড়ে ছেঁকে পলাতক দাসদের ধরে সাদা মালিকের কাছে ঠিকঠাক পৌঁছে, হিসেব মিলিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তাদের কাজের যেন কোন কূলকিনারা নেই!

তার দুঃসাহসী অভিযাত্রার জন্য মেবেল সব গুছিয়ে ফেলেছে। একটা চাপাতি। আগুন জ্বালাবার একটা চকমকি পাথর, কিছু খড়কুঁটো। চুরি করা এক জোড়া যুঁৎসই জুতো। বিগত কয়েক সপ্তায় তার ছোট্ট জমিটুকু নজরকাড়া সবজিতে ভরে ছিল। আলো নেভার আগে সে প্রত্যেকটি শালগম আর রাঙা আলু তুলে পোটলা বাঁধল। যদিও গোপনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে এ ধরনের ভারী পোটলা নেয়া বোকামো। পরদিন সকালে সবাই দেখল ফালির সর্বত্র গর্ত আর পড়ে আছে সবজির কেটে ফেলা জঞ্জাল। পরে কোরা সেখানে নতুন করে সবজি লাগায়। এর মালিকানা এখন তার।

এখন চাঁদের মৃদু আলোয়, চঞ্চল মনে কোরা তার সবজির ক্ষেতের দিকে নজর দিল। চারদিকে ঘাস, গোবরে পোঁকা, পশুপাখির চলাচলের বদখদ পায়ের দাগ। গত উৎসবের পর থেকে সে জমিটুকুর যত্ন নিতে পারে নি।

পরদিন টেরেন্সের খামার পরিদর্শন শেষ হল সাদামাটা ভাবেই, কেবল একটা ছোট দুর্ঘটনা ছাড়া। কনেলি তাকে দেখাচ্ছিল তার ভাইয়ের খামার কীভাবে চলছে সেসব। কয়েক বছর আগে টেরেন্সের এ খামার দেখার পর এটাই তার প্রথম প্রকৃত খামার পরিদর্শন। অভাবিতপূর্ব ভদ্র আচরণ করলেন তিনি। অভ্যস্ত বিরূপ মন্তব্য তিনি একদমই করলেন না। গত বছরের জের ধরে তিনি খোঁজখবর নিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে লেখা খতিয়ান মিলিয়ে দেখলেন। মুহুরির খারাপ হাতের লেখা ছাড়া সার্বিক বিবেচনায় তিনি তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন। দাস কিংবা তাদের গ্রাম পরিদর্শন করলেন না।

ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে তারা উভয় খামারের তুলো উৎপাদেনের তুলনামূলক বিচার করছিলেন। তুলো ক্ষেতের মাঝ দিয়ে যখন তারা যাচ্ছিলেন তখন আশপাশের গোলামরা তাদের কাজের গতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। আতর ধরে ধরে ক’সপ্তাহ ধরে ঘাস নিড়ানির কাজ চলছে। শীষগুলো কোরার কাঁধ বরাবর লম্বা হয়েছে। হিল্লোলিত বাতাসে দুলতে দুলতে রোজ বেড়ে উঠছে পাতাসমেত ডালগুলো। পরের মাসে তুলোর গুটিগুলো সাদা বলে পরিণত হবে। গাছগুলো যদি এতটা লম্বা হত যাতে এই সাদা লোকগুলোর চলাচলের সময় সে নিজেকে আড়াল করতে পারত, কোরা ভাবছে। তাকে অতিক্রম করে যখন তারা যাচ্ছিলেন, কোরা তাদের পিঠের দিকটা দেখতে পেল। এমন সময় টেরেন্স ফিরে তাকালেন। তারপর মাথাটা নড করে তার দিকে চাবুকটা কষে তিনি চলে গেলেন।

দু’দিন পর জেমস মারা যান। তার কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছে, ডাক্তার জানান।

বহুকাল যাবৎ এই খামারে যারা আছে তারা বাবা এবং ছেলের অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের তুলনা না করে পারল না। খামার মালিকদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ র্যান্ডেলের আলাদা মর্যাদা ছিল। পশ্চিম থেকে ঘোড়ায় চেপে এই আর্দ্র জলাদেশ জর্জিয়ায় প্রথম খামার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন যারা দেখেছিলেন তাদের নেতৃত্বে ছিল এই র‍্যান্ডেল পরিবার। পরে যারা এখানে খামার প্রতিষ্ঠা করেন তারা জানেন, র‍্যান্ডেল পরিবারই এখানে ধানের বদলে তুলোচাষের গুরু। এখানে তুলোচাষের লাভজনক বাণিজ্যের তিনিই ছিলেন পথিকৃৎ। ছোট ছোট অনেক খামারি দেনায় হাবুডুবু খাচ্ছিল। তারা এসে র‍্যান্ডেলের পরামর্শ চাইল। তিনি অবাধে তাদের পরামর্শ দেন এবং সব রকম সহযোগিতা করেন। তারই বদান্যতায় খুব দ্রুত এখানে তুলোচাষ ছড়িয়ে পড়ে।

বৃদ্ধ র‍্যান্ডেলের অন্তেষ্ট্যিক্রিয়ায় অংশ নিতে দাসদের ছুটি দেয়া হল। তারা নতশিরে দাঁড়িয়ে রইল। শ্বেতাঙ্গ নারীপুরুষ তাদের প্রিয় পিতার প্রতি যথোচিত সম্মান প্রদর্শন করলেন। গৃহভৃত্যরা শবাধারের কাফনের কোণা ধরে মাতম শুরু করল। প্রথমে এগুলো বেমানান মনে হলেও পরে সকলে তা যথোচিত হয়েছে বলেই মেনে নেয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই বৃষ্টি নামল। প্রচণ্ড দাবদাহের পর এই বৃষ্টি এলো যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদ রূপে। দীর্ঘ খরার পর চাষের জন্য দরকার ছিল এমন মুষলধারে বৃষ্টি।

জেমসের মৃত্যুর পর তার সন্তানেরা সামাজিক সম্পর্ক ও সম্মান দুটোই হারায়। দলিল-দস্তাবেজে দেখা যায়, বহু লোকই জেমসের ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল। অনেকের সাথে দেখাসাক্ষাতও হত। কিন্তু তার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিল খুবই কম। ব্যবসার সকল হিসাবপত্র ছিল টনটনে। ব্যবসার ক্ষেত্রে টেরেন্সের ভাই কোন রকম মানবিক আবেগকে প্রশ্রয় দেন নি। তাই জেমসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিতি ছিল হতাশাজনকভাবে কম। সেদিনও তুলোর খামারে দাসদের রোজকার মত কাজ করতে হয়েছিল। অনুষ্ঠানের জন্য ফসল তোলায় কোন ছাড় পায় নি কেউ। এসবই নাকি তার উইলে লেখা ছিল। টেরেন্স তেমনটাই জানান। তাদের বিশাল খামারের নিরিবিলি এক কোণায় পিতামাতার কাছাকাছি তাকে কবর দেয়া হল। প্লেটো এবং ডেমনেস্থেনিসের মত তার মহান পিতা তার শিয়রে শায়িত আছেন। তিনি ছিলেন এই এলাকায় সাদা-কালো নির্বিশেষে সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্ব।

ভাইয়ের মৃত্যুর পর তুলোব্যবসায়ীদের সাথে তার পক্ষে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করতে টেরেন্স নিউ অরলিয়েন্স সফরে যান। সময়টা তখন খুব অনুকূল না হলেও র‍্যান্ডেল ভাইদের দুই অংশের নেতৃত্বের পক্ষে টেরেন্সের কথা বলা সহজ হল। খামারের উত্তর ভাগের কর্মপরিবেশ সব সময়ই ছিল অনেক ভাল। যে কোন শ্বেতাঙ্গের মত জেমসও খুব রূঢ় ও নিষ্ঠুর হলেও ব্যবসা পরিচালনায় তার ছোট ভাইয়ের তুলনায় তিনি অনেক বেশি আপসী ও কৌশলী ছিলেন। তাই, দক্ষিণ ভাগের চিত্র ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণহীন।

বিগ এন্টনী এর সুযোগ নিতে চাইলেন। এমন নয় যে, বিগ এন্টনী গ্রামে সবচেয়ে চতুর লোক; কিন্তু সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে, সুযোগ গ্রহণে তার জুড়ি নেই।

ব্লেক কাণ্ডের পর এটাই প্রথম পলায়ন চেষ্টা। ধরা পড়ার আগে কোন ঝামেলা ছাড়াই ছাব্বিশ মাইল অতিক্রম করেন তিনি। যখন ধরা পড়েন তখন তিনি এক মাঁচায় ঝিমুচ্ছিলেন। পুলিশ তাকে ধরে তারই এক ভাইয়ের নিজ হাতে তৈরি করা এক লোহার খাঁচায় পুরে এখানে ফিরিয়ে আনে। “এই পাখির খাঁচায় চড়ে যাবি, খাঁচাই তোর আসল ঠিকানা” বলে পুলিশ তাকে নিয়ে রওনা হয়। খাঁচার সামনে বড় করে ভেতরের বন্দী মানুষটার নাম লেখার ব্যবস্থা ছিল। তবে কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামায় নি। ফিরে যাবার সময় পুলিশ খাঁচাটা সাথেই নিয়ে যায়।

বিচারের নাটক সাজিয়ে কাউকে শাস্তি দেয়াই শ্বেতাঙ্গ দস্তুর। তেমনি বিচারের নাটক সাজিয়ে যেদিন বিগ এন্টনীকে শাস্তি দেয়া হয় ঠিক সেদিনই সিজার হবে আসে। দরজা খুলে মেরী তাকে ভেতরে ঢুকতে দেয়। সে হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এখানে খুব কম লোকই আসে। যা আসে তা মেয়েরা। পুরুষ মানুষ দৈবাৎ। কেবল কোন খারাপ খবর নিয়ে আসেন কোন কর্তাব্যক্তি। কোরা কাউকেই এই যুবক সম্পর্কে কিছুই বলে নি।

তখন মেয়েরা সবাই ঘুমোচ্ছে, নয়ত গান শুনছে। কোরা তার মেরামতি জিনিসগুলো মেঝেয় রেখে সিজারকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

বৃদ্ধ র‍্যান্ডেল তার ছেলেমেয়ে এবং নাতিপুতিদের শিক্ষার জন্য একটা স্কুল খুলেছিলেন। তার ছেলেদের ততদিনে লেখাপড়া শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটা খুব কাজে লাগে নি। সামান্য কিছু অ্যাসাইনমেন্ট আর টুকিটাকি পাঠদানের কাজ সেখানে হলেও বেশির ভাগ সময়ই তা পড়ে থাকে। সিজার আর কোরাকে সেদিকে হেঁটে যেতে দেখে লভি। সিজারের হাসি-তামাশায় কোরা মাথা ঝাঁকাচ্ছিল।

পড়ে থাকা স্কুলঘর থেকে আসছে বোঁটকা দুর্গন্ধ। সেখানে এখন নানা ছোট প্রাণীর বসবাস। অনেক আগেই টেবিল-চেয়ার সব সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ঘরময় ছড়িয়ে আছে শুকনো পাতা আর মাকড়সার জাল। যখন একসাথে থাকত এখানেই কি ফ্রান্সিস একবার তাকে নিয়ে এসেছিল? সেদিনের ঘটনা মনে পড়ল তার। সিজার দেখে ফেলেছিল সেদিনের ঘটনা। সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে কোরাকে নিষ্ঠুরভাবে চাবুক মারার সে দৃশ্য। সারা শরীর দিয়ে দরদরিয়ে রক্ত ঝরছিল।

জানালাটা খুলে সিজার বলল, “সেদিন আমি খুব কষ্ট পাই।”

“তারা তাই করিল,” বলল কোরা।

দু’ সপ্তাহ আগে সে নিজেকে বোকা ভেবেছিল। এই রাতে সে নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল তার অতীত দিনে যখন এক প্রাজ্ঞজন তাকে বলেছিলেন, যে গল্পের অর্থ আজ তুমি বুঝবে না, সেগুলো যে গল্প না হয়ে সত্যি হতে পারে তা হয়ত বুঝবে নিজের সেইসব অভিজ্ঞতা দিয়ে যা এড়িয়ে যাওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।

“এখন আমার সাতে আসবি? সিজার বলল। “রাত হয়ে যাচ্ছে।”

কোরা তাকে দেখতে পায় না। তিনদিন চাবুক খাওয়ার পরদিন সকালে সিজারকে সেখানে আনা হয় “নৈতিক শিক্ষা দিতে”। দাসদের জন্য কেমন পৈশাচিক শাস্তির ব্যবস্থা আছে তা সরাসরি দেখিয়ে অন্য দাসদের নৈতিক শিক্ষা দেয়াই দস্তুর। নারী-পুরুষ কোন ভেদাভেদ নেই। পালা করে প্রত্যেক দাসকে এই নরককুণ্ডে এনে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয় এবং অন্যদের তা প্রত্যক্ষ করতে বাধ্য করা হয়। তাদের মনে করিয়ে দেয়া হয় যে, তাদের জন্যও এমন ভয়ানক শাস্তির দিন অপেক্ষা করছে। তাদেরও পালা আসবে এবং কেউই এ থেকে নিস্তার পাবে না।

সিজার হতোদ্যম হল না। কোরার চোখে চোখে তাকালো না বটে কিন্তু সে বুঝতে চাইল আরও গভীর কিছু। এমন কিছু যা কিনা অনেক বড় কিছু কিন্তু যা অর্জন করা কঠিন।

“তুমি হয়ত ভাবচ, আমার মা পলায় গেচে, তাই আমিও পলাব? কিন্তুক, আমি তা করব না। তুমি আমারে দেকিচ। তোমার মাতায় এসব চিন্তা আসার পর তে’ কি কি হয়েচে, তা তো দেকিচ।”

“সে ফিরে আসলি ব্যাপারটা আরও খারাপ হবেনে।”

“একনও খারাপ, আগের মতই খারাপ হচ্চে।” এ কথা বলে কোরা চলে গেল।

বিগ এন্টনীর বিচারের ব্যবস্থা করতে কেন দেরী হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করতে হুকুম জারি করলেন টেরেন্স।

ছুতোর মিস্ত্রিরা রাতদিন কাজে ব্যস্ত। ভয় দেখানোর জন্য কাঠের যমযন্ত্রের উপর কদাকার, বীভৎস, ভয়ংকর স্থূলভারিস্তনী মৎসকন্যা ও জঙ্গলের হিংস্র্র প্রাণীর নক্সা খোদাইয়ের কাজ চলছে। লনের সামনে সবুজ ঘাসের মধ্যে এই যমযন্ত্রটা বসানো হবে। দু’ জন তাগড়া জোয়ান বিগ এন্টনীকে ধরে সেখানে হাজির করল। তাকে এই বীভৎস যমযন্ত্রে পুরে রাখা হল। কারো দিকে না তাকিয়ে পয়লা দিন সে মাটির দিকে চেয়ে রইল।

পরদিন আগমন ঘটল এক দল বিশিষ্ট ব্যক্তির। মহাত্মাগণ সুদূর আটলান্টা আর সাভানাহ থেকে গাড়ি চেপে তসরিফ এনেছেন পালাতে গিয়ে ধরাপড়া একজন কালো গোলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য উপভোগের আমন্ত্রণ পেয়ে। টেরেন্স সাহেব বিভিন্ন স্থান ভ্রমণের সময় যেসব স্থূলকায় শ্বেতাঙ্গ ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার সাথে পরিচিত হবার সৌভাগ্য লাভ করেছেন তারা, আর বিলেতি দুঁদে সাংবাদিকের এক দঙ্গল হাজির আমেরিকায় পালিয়ে যাবার চেষ্টার অপরাধে এক কৃষ্ণাঙ্গ দাসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সচিত্র বিবরণ প্রচারের সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আমন্ত্রিত হয়ে। লনে সুসজ্জিত টেবিলে কাছিম মাংস ও স্যুপ ছাড়াও নানাবিধ উপাদেয় খাদ্য ও পানীয় থরে থরে সাজানো। খুব যত্ন করে এলিস এগুলো রেঁধে পরিবেশনের ব্যবস্থা করেছেন। ক্ষুধা উদ্রেককারী খাদ্যের সৌগন্ধে চতুর্দিক আমোদিত। সবাই এলিসকে খুব তারিফ করছেন যদিও এসবের এক কণাও মুখে দেবার কোন অনুমতি তার নেই। মেহমানগণ পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে পানাহারে মত্ত। তাদের চোখের সামনেই খাঁচায় বন্দী বিগ এন্টনীর শরীর জুড়ে চলছে বেদম চাবুক কষার কাজ। দণ্ডদানের দৃশ্য উপভোগের স্বার্থে পানাহার পর্ব চলছে নিতান্ত ধীর গতিতে। আর যতক্ষণ এই খানাপিনা চলবে বিগ এন্টনীকে ততক্ষণ চাবকিয়ে চাবকিয়ে রক্তাক্ত করা হবে। এটাই দস্তুর এখানে। সাংবাদিকগণ পরম তৃপ্তিসহকারে ভোজন করছেন আর ফাঁকে ফাঁকে কাগজে ঘটনার নোট টুকে রাখছেন যাতে ভোজনের সময় আরও দীর্ঘায়িত হয়। ভোজন শেষে ডেসার্ট নিয়ে মেহমানগণ মশার কামড় থেকে নিষ্কৃতি লাভের উদ্দেশ্যে গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। তারপরও রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় বিগ এন্টনীর শরীরে চাবুক কষা চলতেই থাকল।

তৃতীয় দিবসে মধাহ্নভেজের পর খামার থেকে মজুর, ধোপানী, রাঁধুনী, আস্তাবল ও গৃহ রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী সবাইকে ছুটি দিয়ে সম্মুখের বিশাল লনে জমায়েত করা হয়েছে। মেহমানগণ উত্তম সুরাপনে মত্ত হলেন। উত্তপ্ত বৃহৎ কড়াইয়ে টকবগ করে ফুটছে তেল। সেখানে লোহার শৃঙ্খলে বেধে হাজির করা হল মৃতপ্রায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ বিগ এন্টনীকে। প্রথম দিনেই তার পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিল। এখন সেটা জোর করে তার মুখের ভেতর পুরে সেলাই করে দেয়া হল। তারপর ফুটন্ত তেলের মধ্যে ছুড়ে দেয়া হল বিগ এন্টনীকে। সকলে জয়ধ্বনি করে উঠল। মুহূর্তমাত্র শোনা গেল তার গগণবিদারী আর্তচিৎকার। সবার চোখের সামনে বিগ এন্টনীর দেহ পুড়ে অঙ্গার হচ্ছে আর সেই মৃত্যুদৃশ্য উপভোগ করছেন আমন্ত্রিত মেহমানগণ। অন্যদিকে ভয়ার্ত করুণ চোখে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে বাধ্য হল কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা। এটা তাদের শিক্ষার জন্য এক চরমপত্র। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল একজন জীবন্ত মানুষ পোড়ার গন্ধ আর সে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হল প্রকৃতি।

টেরেন্স উত্তর ও দক্ষিণ উভয় ভাগের দাসদের উদ্দেশ করে ভাষণ শুরু করলেন। তিনি বললেন, এখন উত্তর আর দক্ষিণ ভাগ বলে কিছু নেই। দুটো মিলে একটাই খামার। একই নিয়মে চলবে সব কিছু। তিনি তার ভাইয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বললেন তার ভাই এখন স্বর্গলোকে তার মহান পিতামাতার সাথে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। তিনি ভাইয়ের আত্মার শান্তি কামনা করলেন। কথা বলতে বলতে হাঁটতে শুরু করলেন দাসদের সারির মধ্য দিয়ে। দক্ষিণের প্রবীণ কারো কারো সাথে প্রশংসাসূচক এক-আধটু কথাও বলছেন। চাবুকটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে আয়েসী ভঙ্গিতে কথা বলছেন। একটা বাচ্চার দাঁত পরীক্ষা করলেন। তাকে আগে কখনও দেখেন নি। তারপর চোয়ালটা ঘুরিয়ে ভাল করে দেখে রাখলেন। মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইলেন তিনি খুশি হয়েছেন।

তিনি বললেন, তুলো এবং সূতিবস্ত্রের চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। তাই চাহিদামত জোগানও বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে উৎপাদন। তিনি তার পরিকল্পনার কথা বললেন। গত বছরের রেকর্ড দেখবেন। তারপর অচিরেই ঘোষণা করবেন কে কতটুকু বেশী কাজ করলে কতখানি উৎপাদন বাড়ে। সেভাবে তাদের কাজ করতে তৈরি থাকার আহ্বান জানালেন। খামারটাও সাজাবেন নতুন করে। যাতে আরও তুলোর লাইন বাড়ানো যায়। তিনি হাঁটছিলেন। হঠাৎ একজনের গালে কষে থাপ্পড় মারলেন। সে তার বন্ধুকে আগের দিন পুড়িয়ে মারার দৃশ্য স্মরণ করে কাঁছিল।

কোরার কাছে পৌঁছে তিনি চাবুকটা হাত বদল করলেন। তারপরই সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোরার স্তন ধরে টেনে কাছে নিলেন এক ঝটকায়। এরপর মুচড়াতে লাগলেন কোরার দুই স্তন। টেরেন্সের বক্তৃতার পর কেউ সামান্য নড়াচড়া করে নি। এমন কি মানুষ পোড়ার গন্ধে নাক ঝাড়তেও কেউ নড়ে নি। তিনি জানালেন, এবার থেকে শুধু বড়দিন আর ইস্টার পালিত হবে। অন্য সব অনুষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হল।

তিনি আরও জানালেন, আজ থেকে তিনিই ঠিক করবেন কার সাথে কার বিয়ে হবে। যাতে বিয়েটা যথার্থ হয়। তাদের বাচ্চাকাচ্চা কি হবে না হবে সেটাও তিনি ঠিক করবেন। তার নির্দেশ মতই বাচ্চা পয়দা করতে হবে। তিনি রোববারের কর্মবিরতির উপর নতুন ট্যাক্স ধার্য করার ঘোষণা দিলেন। এরপর কোরার দিকে সামান্য নড করে উন্নয়ন নিয়ে অন্য আফ্রিকানদের নসিয়ত শুরু করলেন।

কোরা কখনও মালিকের রক্ষিতা ছিল না; কিন্তু এখন বোধহয় সেটাই তিনি প্রমাণ করলেন। অথবা, তাকে হয়ত সাহেব রক্ষিতাই ভাবেন, কিন্তু এই প্রথম সে তা জানল। কোরা প্রমাদ গুনছে। চোখের সামনে সে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে খুন করতে দেখেছে। নাকে লেগে আছে মানুষপোড়ার দুর্গন্ধ। কালোদের উপর আরও নানা অত্যাচার সে দেখেছে। কিন্তু সবার সামনে এমন বেইজ্জতি আগে কখনও হয় নি। সব কিছু নিয়ে একটা কিছু দাঁড় করাতে চেষ্টা করছে সে। সাদা সব কিছুই এখন অসহ্য কোরার কাছে। এখন এক টুকরো সাদা পাথর বা সাগরের সাদা ফেনা কিংবা সাদা তুলোর প্রতিও তার তীব্র ঘৃণা জন্মালো। (চলবে)

 

আমিরুল আলম খান 

জন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।