কামাল রাহমানের গল্প: ডাউকি

মাঝবয়সে পৌঁছে ছয়ফুলের জীবনে একটু একটু করে সোনালি রং ধরতে শুরু করে। অগ্রহায়ণের শালি ধানের মতো বিচিত্র রঙের ছটা ছড়ায় ওটা। সেই সঙ্গে ওর মনে হতে থাকে যে ধীরে ধীরে কিছু একটা যেন খোয়া যেতে শুরু করেছে ওর জীবন থেকে। প্রথম দিকে ওসব ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল সে। ওতে লাভ হয়নি কোনো। সহসাই সে বুঝতে পারে যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে কিছু করা যায় না। অতঃপর আরো বেশি করে ঢুকে যায় সে নিজের গহিন ভিতরে। কল্পনার মিহি কুয়াশায় গুটিগুটি পায়ে ওগুলো তখন নুয়ে আসে ভোরের বহুবর্ণিল আলোয়।

মাসমাইনে বেতনের হাতে-গোণা সামান্য কটা টাকায় সোহাগি বউ ও স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলে নিয়ে দক্ষিণখানের দু’কামরার একটা বাসায় ভাড়া থেকেও ভোরের সূর্য-ওঠা, ও লাল-নীল-গোলাপি-ধূসর-সাদায় মেশানো রঙিন আকাশ, ও রাতের স্তব্ধতা ভেঙ্গে ধীরে ধীরে জেগে-ওঠা প্রাণের কোলাহল দেখার বাল্যকালের অভ্যাস টিকিয়ে রাখতে পারে সে। বাসার পুবে ধানক্ষেত। তারপর হিলহিলে বাতাস দেয়া সবুজ বিল। নিশিপদ্ম, শ্বেতপদ্ম, সাদা ও গোলাপি শাপলা, ভাঁটফুল, ও আরো অনেক জলজ ফুল ফোটে সেখানে। পানকৌড়ি, ডাহুক, কাঁদাখোচা, বক, এ রকম অনেক পাখি উড়ে বেড়ায়। গ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও দুধের সাধ ঘোলে মিটে যায় অনেকটা ভালোভাবে। বিলের ওপাশে অন্য গ্রাম। বিলের ধারে নরম কাদামাটিতে লগি পুঁতে বেঁধে রাখা ডিঙ্গি নৌকা বেয়ে অচিন কন্যার গোধূলি রঙমাখা স্বপ্ন দেখে ভাটিয়ালি গাইতে গাইতে দিব্যি চলে যাওয়া যায় ওখানে। বর্ষার টইটম্বুর বিলে ছিপ ফেলে মাছ ধরা যায়। পৃথিবীর সব জমি তখনো কারো না কারো হয়ে ওঠেনি। অথবা সব জলমহাল ইজারায় নতুন সামন্তপ্রভুদের দখলে চলে যায়নি। আকাশের দিকে চোখ রেখে পোয়াতি কালো গাভীটাও গলা ছেড়ে গাইতে পারে দুএকটা একপদী হাম্বা! বিলের ওপাশে গ্রামের সবুজ সীমানার উপর চুমো দেয় স্ফটিকের মতো ঝকঝকে নীল আকাশের ঠোঁট জুড়ে থাকা তীব্র তুমুল আসমানি গোঁফ। গাছের উচ্চতা ছাড়িয়ে ইটসুরকির ঘরবাড়ি সবুজ আকাশরেখা ভেঙ্গে ফেলেনি তখনো। সূর্য ওঠে গাঢ় সবুজের উপর চুনির মতো লাল হয়ে। প্রায় সারা বছর সূর্যোদয় দেখা হয় ছয়ফুলের। যদি কোনো বাদলা দিনে ঘর ছেড়ে বেরোতে না পারে সারাদিন মন ভারি হয়ে থাকে ওর। ঘরে বসে জানালা দিয়ে বৃষ্টিভেজা হলুদ কদমফুলের সাদা লাবণ্য দেখে কবি গোবিন্দের চোখে। অথবা কোনো শীতের রাতের শেষ প্রহরে সোহাগির আঁচল খুলে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভোরের আকাশ না দেখার ব্যথা ভুলিয়ে রাখে অন্য এক মধুছন্দা হাওয়া। শরীর ভেসে থাকে ঝিলের জলে পানকৌড়ির মতো ফিনফিনে হালকা পাখায়। এতো কম চাওয়ার একটা জীবনে সামান্য এই প্রায় কেউ-না-চাওয়া বিষয়গুলো কেন এলোমেলো করে পরানের ছোট্ট বাসাটা তা বুঝতে ব্যর্থ হয় ছয়ফুল।

ঐ সূর্য-ওঠা দেখার অভ্যেসটা পেয়েছে ছয়ফুল ওর বাবার কাছ থেকে। ছোট থাকতে মনে হতো ভোরের ঘুমটা সত্যি অসাধারণ, আরামের। কিন্তু ওর বাবার জন্য উপভোগ করা হয়ে উঠত না ওটা। খুব ভোরে উঠে হাঁটতে হাঁটতে বিলপারের ক্ষেতজমিন দেখতে যেত ওর বাবা। সঙ্গে নিত ওকেও। মেঠো রাস্তার পাশে হঠাৎ দাঁড়িয়ে সে বলত কোনোদিন, দেখ ছফু, আকাশটা কী সুন্দর! ভোরের আকাশের ঐ সৌন্দর্য ছিল সত্যি অসাধারণ। সুনসান আকাশে কখনো হুস করে উড়ে যেত দু-একটা জলচর পাখি। ওগুলোর অবিকল ছবি আঁকা রয়েছে ওর মনের ভেতর। কোনো কোনো দিন ওর বাবাও তন্ময় হয়ে যেত ভোরের আকাশে। চারদিক ফর্সা হয়ে সূর্য উঁকি দিলেও বরাবরের মতো মসজিদের দিকে পা বাড়াত না সেদিন। ছয়ফুল হয়তো বলত, নমাজ কাযা হয় বাজান। তখন টনক নড়ত ওর। হ বাজান, বলেও ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত অনেকক্ষণ। আবার কোনো কোনো দিন ছয়ফুলেরই ইচ্ছে হতো না মসজিদে যেতে। বাবা তাড়া দিলেও বিলের পাখিদের দিকে তাকিয়ে থাকত সে অপলক চোখে। ওকে ছাড়াই চলে যেত ওর বাবা মসজিদের কালো মাটিতে পাতা বাদামি হোগলার চাটাইয়ে কপাল ঠোকার জন্য। বিলের ধারের ঐসব স্মৃতি মনে রেখে দক্ষিণখানে বাসা ভাড়া নিয়েছিল ছয়ফুল। তখনো ভাগাড়ের মাছি হয়ে ওঠেনি এদেশের মানুষ। অফিস ছুটির দিনে খুব ভোরে বেরোতো বড়শি নিয়ে। বিলের ধার থেকে কেঁচো তুলে টোপ গেঁথে মাছ ধরে নিয়ে আসত খালুই ভর্তি করে। তাজা মাছের ঐ স্বাদ আর কখনোই পাবে না ছয়ফুলের ছেলেরা। মাছেদের ছোট্ট জলজ সংসারে আগুন লেগেছে অনেক আগে। মুক্ত জলের আশ্রয়ে নয়, মাছেরা এখন ইহজাগতিক খেলাধুলা করে খাঁচার বদ্ধ জলে। কলে কারখানায় বানানো খাবার খেয়ে বেড়ে ওঠে মানুষের ভাতের থালায় যাবে বলে।

প্রকৃতির নিয়মের ভেতর কোনো কিছু নেই আর। খালি পায়ে হেঁটে অভ্যস্ত ছয়ফুলকে রাস্তার অকরুণ কাঁকরের মতো খুঁচিয়ে যায় সবকিছু। শহরের প্রায় সব শিশু ওর আহত চোখের সামনে বেড়ে উঠছে হয় কংক্রিটের খাঁচায় নয়ত নর্দমার ওপর গড়ে ওঠা বস্তিতে। ছয়ফুল বোঝে না যে মুক্তজীবন ছেড়ে মানুষেরা কেন বেছে নিয়েছে খাঁচার এই কয়েদি জীবন! চোখের সামনে এসব দ্যাখে আর ভাবে। আস্তাবল বানানোর জন্য যে ঘোড়াটা বন থেকে কাঠ বয়ে আনে সে যেমন জানে না নিজের জন্য বন্দিশালার উপকরণ নিয়ে চলেছে সে তেমনি মানুষগুলোরও মনে হয় ঐ দশা হয়েছে। দেখতে দেখতে বাড়িঘর উঠে ভরে যায় পুবদিকের পুরো বিল। সূর্য ওঠা দেখার জন্য যত সকালেই এখন উঠুক না কেন সে হেঁটে একটু খোলা জায়গা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। চারদিকের কোথাও একটু খোলা আকাশ নেই, দিগন্ত নেই যেখানে সেদিন দেখা যায় ভোরের পুবাকাশ। কোনো কোনো দিন ঐ লাল সূর্য দেখার আশায় হেঁটে এতদূর চলে আসে সে যে সূর্য গাছের মাথা ছাড়িয়ে উপরে উঠে যায়। তখন সূর্য ওঠা আর দেখা হয় না ওর। মসজিদে যাওয়া দূরে থাক নাস্তা না খেয়ে দৌড়ে অফিসের বাস ধরতে হয়।

রাজউকের চাকরি সূত্রে বাড্ডায় পাওয়া তিন কাঠার একটা প্লটে বাড়ি বানানোর জন্য গৃহনির্মাণ ঋণের মার্জিন জোগাড় করতে যেয়ে গ্রামের ভিটেবাড়ি ছাড়া পৈতৃক জায়গাজমির প্রায় সবটাই বিক্রি করে দেয় ছয়ফুল। কাকের মাংস কাকে না খেলেও রাজউকের মানুষ মানুষের মাংস খায়। স্টাফদের জন্য জমি বরাদ্দ দেয়ার দপ্তরের লোকজনদের খুশি করে পুব-দক্ষিণ কোনার একটা প্লট ব্যবস্থা করে ছয়ফুল মিয়া। ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে সে যেন সূর্যের মুখ অন্তত দেখতে পায়।

ওটা ছয়ফুলের কল্পনা। ওর একতলা দালান ওঠার আগেই চারদিকে চারতলা দালান উঠে আলো নয় শুধু, নিঃশ্বাসও বন্ধ করে দেয় ওর। গায়ে গা লাগানো দালান। কংক্রিটের বস্তি হুড়মুড়িয়ে উঠে ঢেকে দেয় চারদিকের খোলা আকাশ। সূর্যোদয় দেখা দূরে থাক, হাঁটার জন্য বা নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য একটু ফাঁকা জায়গাও অবশিষ্ট থাকে না। কয়েক ঘণ্টা হেঁটেও যদি ভোরের আকাশ দেখার মতো খোলা একটা জায়গা পেত ঢাকা শহরে তাহলে নিশ্চয় যেত সে সেখানে। শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে ছাদের উপর বসে থাকে সে। পঁচা কমলার রং থেকে বদলে ক্রমশ ধূসর হতে থাকে পূরবীর আকাশ। প্রতিদিন এই দৃশ্যে হাঁপিয়ে ওঠে সে। বিমর্ষ হয়ে থাকে সারাদিন। হপ্তা শেষে এক ছুটির দিন খুব সকালে দক্ষিণখানের পুরানো বাসাটা নগরজঞ্জালের ভেতর থেকে খুঁজে বের করে সে। এক নিমেষ দাঁড়ানোর মতো এক টুকরো মাটির খোঁজ করে সে। সবুজ ঘাসে ঢাকা এক চিলতে মাটি কোথাও নেই! পুরো এলাকাটা তখন এক দুর্গন্ধ ডাস্টবিন হয়ে উঠেছে। মানুষের কোলাহল, রিক্সা, স্কুটার ও টেম্পোর ইঞ্জিনের কর্কশ চিৎকারে একটু নিরিবিলি ও ফাঁকা জায়গা নেই কোথাও। শ্যাওলা-ধরা একটা দেয়ালের উপর দিয়ে সাদা-কালো ডোরাকাটা একটা বিষণ্ন বেড়াল হেঁটে যেতে দেখে সে। এক বুক পানি ছিল ওখানে। মাছ ধরার ছিপের ফাৎনার দিকে তাকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারত সে সেখানে। মাছের ঘাই তোলা ও কচ্ছপের ভুরভুরি ওঠানো খুঁজে সে এখন পঁচা বাসি আবর্জনার ভেতর! প্রতি বর্ষায় ওখানে ডাহুক নিষিক্ত করেছে ডাহুকীর ডিম। জলের বনে পাখা দুলিয়ে মিথুনে মেতেছে পানকৌড়ি। ঘন জলজ উদ্ভিদের জন্য মানুষের প্রায় অগম্য ছিল ঐ জায়গাটা। নির্বিঘ্নে ডিমে তা দিতে পারত পাখিগুলো। এখন একটা আধমরা অভুক্ত বেড়াল, সামান্য একটা কেডি বেড়াল লেজ তুলে হিসি করে ওখানে! পাখিদের ঐ প্রজাতিটাই তো নিঃশেষ হয়ে গেছে মানুষের ছাড়িয়ে যাওয়া অপরিমিত সংখ্যার অরণ্যে। মনে মনে ভাবে ছয়ফুল, সে কি কিছু দেখে এখন? লেজে লেজ জুড়ে জোড়া-ফড়িঙের উড়ে যাওয়া, অথবা অকারণে বেড়ে ওঠা মেড্ডা গাছের পুষ্ট ফলে বানানো গ্রামীণ শিশুদের লাটিম খেলা! নাকি শোনে কিছু? সাদা বকের পাখসাট, অথবা মাছ-শিকারি চিলের চিহিহি, বৃষ্টির টাপুর-টুপুর, অথবা কিছুই না। সবই ভুল। ভ্রান্তি জন্ম দেয়া নিদারুণ এক দিবাস্বপ্ন!

ওর ছেলেরা বড় হয়েছে। ওরা ভাবে অবসর জীবনে মানিয়ে নিতে পারছে না ছয়ফুল মিয়া। বড় ছেলে বাবার সুবাদে রাজউকে করণিকের চাকরি পেয়েছিল। দ্বিতীয়টাও ওখানে মালামাল সরবরাহ ও ছোটখাটো কাজের ঠিকাদারী ব্যবসা করে ভালোই আছে। টাকা পয়সার ব্যবস্থা করে ওরা পশ্চিমে পাঠিয়ে দেয় ছয়ফুলকে। ফিরে এসেও হাজি ছয়ফুল মিয়ার পুবের টান আর যায় না। চিরকালীন অভ্যাসের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি আসে না ওর। শেষ পর্যন্ত মনস্থির করে পৈতৃক ভিটেয় ফিরে যাবে সে। এখনো কংক্রিটের জঞ্জালে ছেয়ে যায়নি ওখানের আকাশ। যদিও মানুষজন সব পরিবর্তিত হয়েছে অমানুষে।

অনেকদিন পর আবার বৃষ্টি নামে আগের মতো তুমুল বর্ষা মনে করিয়ে। জানালার ধারে ঐ কাঁঠালগাছটা মনে মনে খোঁজে ছয়ফুল। বারান্দায় উঠে আসা ছাগলটার জন্য কাঁঠালপাতা কেটে দেবে মনে করে ঘরের বেড়ায় গোঁজা কাস্তেটা খুঁজতে ইচ্ছে করে। খাঁজা কাঁঠালের সুঘ্রাণের জন্য নাকের ফুটো দুটো উন্মুখ হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হয় উড়োজাল নিয়ে নেমে যায় বিলের ধারে। নালায় উজিয়ে ওঠা ডিমভরা কৈ মাছ গামছায় চেপে ধরে আনে। ভেবে পায় না ছয়ফুল যে শত শত জীবনানুক্রম ধরে গড়ে ওঠা এত সব কিছু কেন এক জীবনেই শেষ হয়ে গেল!

কান পেতে ওর শুনতে ইচ্ছে করে টিনের চালে ঝরে পড়া বৃষ্টির ছন্দমুখর তুমুল পতন, শরতের আকাশ থেকে হঠাৎ ঝরে পড়া সরসর শব্দ জাগানো এক পশলা বৃষ্টি অথবা আষাঢ়ের গমগম, গুরুগুরু মেঘের বজ্রগম্ভীর ধ্বনি। হায়, সবই যে অনুচ্চারিত অনেক দীর্ঘশ্বাস! ঘরে আর টিকতে না পেরে ছাতা মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে আকাশভাঙ্গা ঐ ঝড়বৃষ্টির ভেতর। দুটো টেম্পো বদলে পৌঁছে যায় ওর হারিয়ে যাওয়া দক্ষিণখানে। যেখানে পাকুড় গাছ ছিল একটা সেখানে পাঁচতলা বিশাল দালান। ঐ গাছের ডাল ঝুলে থাকত বিলের জলে। ওদের ডিঙ্গি নৌকোটা বেঁধে রাখা যেত গাছের ডালে। বাড়ি ফিরতে দেরি করায় একদিন বৃষ্টিতে ভিজে খোঁজ করতে আসে সোহাগি। সুনসান বিলে ওর ভেজা শরীর দেখে দুলে উঠেছিল ছয়ফুলের দৃষ্টি। কেঁপে উঠেছিল শরীর। নৌকোর আড়ালে জলকেলিতে মেতে উঠেছিল দুজনে। তুমুল ভালোবাসা সেরে বিলের জলে সাঁতরিয়ে স্নান করে ঘরে ফিরেছিল ওরা। কল্পনা করা যায় আজ সেসব! অথচ কদিন আগেরই বা কথা?

এই সব দরদালানের ভেতর খামারের মুরগির মতো বেড়ে উঠছে তিন পুরুষ। একই ছাদের নিচে ঘুমোয় তিন প্রজন্মের নরনারী। ঘটায় বংশবৃদ্ধি। আর ভাবতে পারে না ছয়ফুল। সবার বিপক্ষে যেয়ে গ্রামের পথে যাত্রা করে সে একদিন। বাড়িতে পৌঁছে দেখে পুরোনো ভিটেটা টিকে আছে তখনো। ভাইপোরা অন্তত হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়নি সব কিছু। ওদের ধারণা হয় যে বেড়াতে এসেছে ছোট চাচা। খুব যত্ন-আত্তি করে প্রথমদিন। পরে যখন জানতে পারে যে বাড়িঘর মেরামত করে এখানেই থেকে যাবে তখন মুখ কালো হয়ে যায় ওদের। বড় ভাইপোটি মনে মনে ধরে রেখেছে যে ঘরটা এবারের বর্ষায়ই ভেঙ্গে পড়বে। তারপর চাচাকে বলে ঐ ভিটায় একটা কাজিপেয়ারা বাগান করবে। ছয়ফুলের পরিবারের কারো গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাড়িটা এমনিতেই একদিন ওদের হয়ে যাবে।

স্মৃতিভারাতুর হয়ে এখন আর দক্ষিণখান যায় না ছয়ফুল। ওখানের ইট-কাঠ-টিনের বস্তি ও বাড্ডার কংক্রিটের জঞ্জালের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য খুঁজে পায় না সে। ওখানের রাস্তাগুলো, গলিগুলো কেঁচোর মতো প্যাঁচানো ও কদাকার। এখানেরগুলো কিছুটা হলেও সোজা। সামান্য বৃষ্টি এলেও ওখানের রাস্তাগুলো নর্দমা। আর এখানেরগুলো বেশি বৃষ্টিতে। একই রকম মানুষ, ঝগড়াটে, হিংসুক, ঊর্দ্ধমুখী, সময়ে কখনো কেবলামুখি! ছয়ফুল মিয়ার জীবনের নিহিতার্থ যে পশ্চিমে নয়, পুবে, তা বোঝার চেষ্টা কখনো করেনি কেউ। কিছুটা বুঝতে পেরেছিল সোহাগি। কিন্তু ‘মানুষটার কি মাথা খারাপ হইছে’ এ রকম সোজা-সাপটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অতিরিক্ত কিছু আর করার নেই ওর। সোহাগির জীবনও মাটির উনুনে তাতানো হাড়িতে ভাঁপা-চিতই-পুলি-পিঠের গন্ধে ভরা, কোলে চড়ানো ছাগশিশুর তুলতুলে কোমল স্পর্শমাখা, গাছের শাখায় বাঁধা দোলনায় চড়া, গাব তেঁতুলের নিবিড় ছায়ার শীতল সুখ পাওয়া, এ রকম কত শত কিছু!

মানুষজন লাগিয়ে ঘরটাকে বাসযোগ্য করে তোলে ছয়ফুল। ওর ছেলেরা এসে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে ওকে। কোনোভাবেই ওটা মেনে নেয় না ছয়ফুল মিয়া। মন খারাপ করে ফিরে যায় ওরা। কিশোরকালের মতো ভোরের আকাশ দেখা শুরু করে সে আবার। একটু যেন নিঃশ্বাস নিতে পারে সে এখন। জীবনের কাছে খুব বেশি কিছু তো চায়নি সে। প্রকৃতির নিবিড় একটু ছোঁয়া, হাঁটতে হাঁটতে কোথাও ঘষা লেগে পা ছড়ে গেলে দাঁতে চিবিয়ে লাগানোর জন্য একটু সবুজ দুর্বাঘাস, দাঁত মাঁজার জন্য নিমের একটা ডাল, নিশিন্দার একটা ঝোঁপ, হালকা অসুখে কাঁটানটে শাকের একটু ঝোল, এ রকম অতিতুচ্ছ, অতি সাধারণ, সামান্য বিষয়-আশয়। কারো কাছ থেকে কেড়ে নেয়া কিছু নয়। সামান্য জীবনের সামান্য চাওয়া, আরো সামান্য পাওয়া, এই তো!

পুরানো দিনের সেই সব গন্ধ সে খুঁজে বেড়ায় উদাস এক বাউলের মতো। গ্রামের পায়ে লুটিয়ে থাকা হাওরের মতো বিশাল বিল ও চারদিকের ধানক্ষেত যদিও নেই এখন তবে জলমহালের কিছুটা হলেও অবশিষ্ট আছে। পুবের আকাশে নিত্যদিনের সূর্য দেখার নেশায় পাওয়া ছয়ফুল মিয়া পূরবীর সব কটা রং নিয়ে একদিন সাইবেরিয়ার হাঁসের মতো ভেসে থাকে ওদের ঐ দড়িয়াদিঘির কালাপানি বিলের সবুজ জলে। সাদা বকের রং পাঞ্জাবি, পানকৌড়ির পাখায় জড়ানো ধূসর ও কালো রঙের লুঙ্গি, গলায় এঁটে প্যাঁচানো সূর্যের সাত রং এক ফালি গামছা নিয়ে অনিঃশেষকালের জন্য চোখ মেলে চেয়ে থাকে সে অনন্ত অসীম আকাশের দিকে। হয়তো সে জানেও না যে ভোরের আকাশের ঐ সূর্য ওর জীবনে আর অস্ত যাবে না কখনো কোনো দিন।

উল্টোরথের পেছনে ছোটা মানুষের এই দুঃসহ দিনে কালিমালিপ্ত শহর থেকে উড়ে আসা নিঃসঙ্গ এক ডাউকি চিরধূসর হয়ে যাওয়া এই বিশ্বে খুঁজে বেড়ায় ওর হারিয়ে যাওয়া গোপন প্রাণের সাথীকে। নিদাঘের এই নির্মম কালে বুঝতেও চায় না সে যে নিভরসার এই আকাশে কখনো আর কোনো ডাহুক মেলবে না তার একান্ত অলস পাখা!

 

কামাল রাহমান
জন্ম: ১১ জানুয়ারি ১৯৫৫, শেরপুর, বাংলাদেশ।
শিক্ষা: এমবিএ।
পেশা: প্রাক্তন ব্যাংকার (শেষ কর্মস্থল: অধ্যক্ষ, প্রিমিয়ার ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি, ঢাকা)।
পৈতৃকবাস: কুমিল্লা, বাংলাদেশ।
মাতৃকবাস: সিলেট, বাংলাদেশ।
বর্তমান অবস্থান: যুক্তরাজ্য।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।