গল্প: কয়েদি


কামাল রাহমান

ওখানে পৌঁছে, যা হয়ে এসেছে সব সময় আমার, একটা শব্দের ভেতর আটকে যাই। তোরণ অথবা ফটক শব্দটা ঐ কারাগারের দরোজার জন্য অনেক ভারী ও বেমানান মনে হতে থাকে, ওটার বিশালত্ব ও ভাবগম্ভীরতার জন্য দরোজা শব্দটাকেও হালকা মনে হয়। বড় বড় পাথরের চাঁইয়ে গাঁথা এক জোড়া স্তম্ভের উপর পুরানো খিলানটা কি দিয়ে বানানো হয়েছিল অনুমান করা যায় না এখন, বিশাল কালো ইস্পাতের পাতের উপর পিতলের হরফে লেখা ‘উইল্টশায়ার কারাগার’, নিচে লেখা, ১৯১১ সনে স্থাপিত। ঐ বছর আমার এক পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ থেকে অতিথি হয়ে এসেছিলেন এখানে, আমাদের পরিবার-বৃক্ষে ওঁর নাম আছে, ইতিহাসটা নেই, পরে জেনেছি গবেষণা করে। ক্ষণিকের জন্য বিষয়টা আবেগ বয়ে আনে, কিছুটা আপ্লুত হই, খুব সামান্য সময়ের জন্য অবশ্য। ঐ তোরণ বা দরোজা বা ফটক পেরোনোর পর আমাকে অভ্যর্থনা জানায় কারাগারের প্রধান কর্মকর্তা, করমর্দন করে ও জিজ্ঞেস করে কেমন আছি, একটু অবাক হই, পরিদর্শনে আসি নি তো, সাধারণ এক কয়েদি আমি!

হয়তো আমার বয়স, সাতষট্টি পেরিয়েছি গেলো মাসে, ও সামান্য খ্যাতি, দেশের সব-সেরা সাহিত্য পুরষ্কার সহ এ ক্ষেত্রে দেয়া প্রায় সব কটা পুরষ্কার, অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পুরষ্কার, এসব, কারা-কর্তৃপক্ষের কাছে এতটুকু অনুগ্রহ দেখানো কর্তব্য মনে হয়েছে।

এমন এক অপরাধে কারাগারে পাঠানো হয়েছে আমাকে, যে-সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই আমার। রাইটার্স ব্লকে পড়েছি জীবনের অনেক সময়, অনেকভাবে কাটিয়েছি সে-সব, কিন্তু এবার ইচ্ছে হয়েছে, হোক না, দুএকটা প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখি, লিখেছি তো অনেক!

ব্যবস্থাটা করে দেয় আমার সঙ্গিনী, শুধু সঙ্গিনী বললে খুব সামান্য বলা হয়, সচরাচর হয় না এমন, পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে আছি এক সঙ্গে! আমাদের বিয়ের গোল্ডেন জুবিলি তিন বছর পর, ঐ সময় পর্যন্ত দুজনেই বেঁচে থাকবো নিশ্চয়! বলি

মনে আছে প্রথম শিশির?
হ্যাঁ।
একসঙ্গে ঘাসের উপর, গাছের খোঁদলে, ঝরনায়, বালুচরে…
তুমি একটা বাঁদর।
হ্যাঁ, বাদুড়।
একটা শিম্পাঞ্জি।
ওরাং ওটাং।
একটা ভাল্লুক।
ভল্লুক।
উল্লুক।
উল্লু।
একটা কুকুর তুমি।
তোমার পোষা।
না, পা-চাটা।
ঝগড়া করতে চাই না।
কোনোদিন করো নি সেটা। আসলে কি করতে চাও তুমি?
সত্যিই, ছবি আঁকতে চাই।
আঁকো।
ডাইমেনশিয়া দূরে রাখার ভালো পদ্ধতি একটা!
এখন কি আবার নতুন কোনো ডাইমেনশন খুঁজছো?
বলতে পারো।

সোয়ানসীর এক লেগুনে, অপূর্ব সৌন্দর্যভরা নিসর্গের ভেতর আটকে পড়ি, আটলান্টিকের তীরে অস্থায়ী আবাস খুঁজি, নিরিবিলি এক পর্বতের ঢালে একটা হলিডে কটেজ পেয়ে যাই মন মতো। আমাকে গুছিয়ে বসিয়ে অক্সফোর্ডে ফিরে যায় লিন। ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে সামার সেশনে ক্লাশ শুরু হয়েছে, ছাত্র কিলিয়ে কাঁঠাল পাকাবে কিছুদিন। মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেই। রং তুলি ইজেল নিয়ে কাজে নেমে পড়ি। আনন্দ-সাগরে মন ভেসে যায়, ভাবতে ইচ্ছে করে, ছবি আঁকাটাই চালিয়ে যাই, কেন যে ছেড়ে দিয়েছিলাম মাঝ পথে! এক কিশোরী মডেল পেয়ে যাই, যদিও ভালো নজরানা দিতে হয় ওর মাকে। মেয়েটার বয়স তেরো হলেও দেখায় লিনের ষোলো বছর বয়সের মতো, পরিপূর্ণ শরীর। শুরুতে বেশ সহায়তাও করে। অনেক স্কেচ নেই ওর বিভিন্ন ভঙ্গির। খুঁজে খুঁজে একটা পুরানো খামারবাড়িও পেয়ে যাই, খড়ের রোল থেকে শুরু করে ঘাসের চৌকো ব্লক, সবই আছে। স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে মন, নগ্ন হতে ও শরীরের বিভিন্ন ভঙ্গি আনতে দ্বিধা করে না মেয়েটা, কিশোরী লিনকেই যেন ফিরে পাই আবার! ভারতীয় ঋষিদের ঐ কথাটা মনে পড়ে: ফুলের সৌরভের মতো কামহীন ভালোবাসা ! শরীরের সব শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু মন ফুরোয় না। প্রায় পুরো গ্রীষ্মটাই ছবি এঁকে কাটিয়ে দেই। জীবন যেনো ফিরে পাই আবার নতুন করে।

সুন্দরভাবে শেষ হতে পারতো বিষয়টা।

এক রূপালি সকালে দরোজায় দেখি সাদা-কালো উর্দি পড়া এক-যুগল পুলিশ। সব জানায়। মেয়েটার মা আদালতে মামলা ঠুকেছে, মেয়ের শ্লীলতাহানির অভিযোগ, বিশাল ক্ষতিপূরণ দাবী করেছে। বুঝতে পারি প্রথমটা ছল, দ্বিতীয়টা কারণ। বেশ ভদ্র আচরণ করে পুলিশ। মদ্যপান করে গাড়ি চালানো, অপ্রাপ্তবয়স্কদের শ্লীলতাহানি, এ ধরনের অপরাধের জন্য সরাসরি কারাগারে পাঠাতে হয় ওদের আইনে। প্রাপ্তবয়স্ক কারো সঙ্গে প্রকাশ্যে যা-খুশি করলেও তেমন ক্ষতি নেই, কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক, ওরে বাপ!

বেচারা পুলিশ! কাঁচুমাচু হয়ে, কারাগারে পৌঁছে দিয়ে, অনুপায় হয়ে কাজটা করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে, বিদেয় জানায়।

ভেতরে ঢুকে ভালোই লাগে, প্রথমে যে অনুভূতি হয় আমার, তা হলো, আরো আগে কেন আসি নি! হয়তো ভালো একটা কিছু লেখা হয়ে উঠতো এ নিয়ে, বাংলা ভাষায় অসাধারণ একটা উপন্যাস আছে, এক কয়েদিকে নিয়ে, জাগরী, অবশ্য খুব কম জনেই পড়েছে এটা, কিন্তু লর্ড ফুচিকের ফাঁসির মঞ্চ থেকে পড়েছে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ।

হপ্তাখানেকের মধ্যেই কারা-জীবনকে ভালোবেসে ফেলি। কত বিচিত্র মানুষের সমাবেশ এখানে, এবং প্রায় সবাইকে মনে হয় অনেক মেধাবী, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য, ও অসাধারণ প্রাণবন্ত!

বয়স ও অন্যান্য কারণে বেশ আলো-হাওয়া-দেয়া একটা রুম পেয়ে যাই, নিরিবিলি। পরিকল্পনা করি, কারাগারের সময়টাতে ছবি আঁকি না কেন? কারা-কর্তৃপক্ষের অনুমতি চাইলে দেরি করে না, রং তুলি ক্যানভাস সব আনিয়ে নেই।

যে স্কেচগুলো করেছি গত মাসগুলোয়, তার সবই বাজেয়াপ্ত করেছে, মামলার জন্য নাকি ওগুলো জরুরী। মনে মনে ভাবি, ব্ল্যাকমেইলই যদি করতে চাও, তাহলে আদালতে যাওয়ার দরকার কি, আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেই তো কিছু অর্থ বাগিয়ে নিতে পারো। এসব ঝেড়ে ফেলি মন থেকে, আমার দিক থেকে তো কোনো অন্যায় করি নি, যা খুশি করুক আইন আদালত।

স্মৃতি থেকে আবার আঁকতে শুরু করি ঐ সব ছবি। মেয়েটার চেহারা মনে করতে চেষ্টা করি, ওর মায়ের মনে যাই থাক, ও তো কোনো দোষ করে নি, কিন্তু কিছুতেই পারি না, সব ছবিই যেন অন্য কারো হয়ে যায়, একই রকম!

পৃথিবীর সব দেশেই আইন খুব ধীরে চলে, ছবিতে ভরে যায় ঘর। কারা-রক্ষক একদিন এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন ছবিগুলো। বেশ প্রশংসা করেন। জিজ্ঞেস করেন:

কার ছবি?
খুব ভালো প্রশ্ন, আমি জানি না, সত্যিই জানি না।
দেখে মনে হয় সব একজনেরই!
হ্যাঁ, কিন্তু ভঙ্গিগুলো ভিন্ন।
ছবিটা তো দেখি হৃদয়ে গেথে আছে আপনার, অথচ চেনেন না, অবাক কাণ্ড তো!
সত্যিই অবাক!
ঠিক আছে, ভালো থাকবেন, বিদায়।
বিদায়।

পরদিন এ ছবিগুলোও সব নিয়ে যায় কারা-কর্তৃপক্ষ, এমন কি ছবি আঁকার সব সরঞ্জামও। বিষয়টা বুঝতে পারি না। খুব মন খারাপ হয়, অন্যায় তো কিছু করি নি, এমনিতেই বিনা দোষে হাজতবাস, মেনে নিয়েছি, এ জীবনটাকেও যাপনযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার ছবি আঁকায় হাত দেবে কেন?

পরের হপ্তায় মামলার রায় বেরিয়ে যায়, আমিই নাকি প্রমাণ করেছি যে অপরাধটা সত্যিই করা হয়েছে, কারাগারে বসে যে ছবিগুলো এঁকেছি, সবই ঐ মেয়েটার!

অর্থদণ্ড তো বটেই, কারাবাসও রয়েছে সেই সঙ্গে! কারাগারের প্রতি মুহূর্ত এখন মনে হয় কারাগারেই আছি। আপীল করার জন্য আমার উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করি।

ছবি এঁকে তো কোনো দোষ করি নি!
না ছবি আঁকায় দোষ হয় নি। দোষ হয়েছে মেয়েটার শ্লীলতাহানি করে।
কীভাবে ওটা করেছি আমি?
আদালতে বলেছে মেয়েটা, আপনিও শুনেছেন।
ওসব তো বানিয়ে বলানো হয়েছে ওকে দিয়ে, ওখানে কোনো সত্য নেই। তাছাড়া, পৃথিবীর এত বড় বড় শিল্পীরা নগ্ন নারীর অসংখ্য ছবি এঁকেছে, ওগুলো কি পোশাক পরিয়ে?
ওরা ছিল প্রাপ্তবয়স্ক।
আপনি নিশ্চিত?
না, কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে তো কোনো অভিযোগ আসে নি।
কল্পনা থেকেও কি ছবি আঁকতে পারে না একজন শিল্পী? অনেক দেব-দেবীর নগ্ন ছবি আঁকা হয়েছে, ওদের কি নগ্ন অবস্থায় দেখেছেন ঐ সব শিল্পীরা?
দেখুন, আমি তো আপনার পক্ষে লড়ছি, কিন্তু আমাকে তো আইনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আইনের চোখে এটা অপরাধ।
আইনের চোখে, ভালোই বলেছেন।
হ্যাঁ, সব কিছুই আইনের চোখে দেখতে হয় আমাদের।
আইনের চোখ! কি বোঝাতে চাইছেন?
আপনিও বোঝেন ওসব।
বিচারকের আসনের উপর নিক্তি হাতে যে দেবীর ছবি রয়েছে, তাঁর চোখে, মানে তো এই?
হ্যাঁ, তাঁর চোখে সবাই সমান।
তা বটে, কিন্তু তাঁর চোখ যে বাঁধা!
এর অর্থ কি দাঁড়ায়?
আপনি আইনজ্ঞ, আপনিই ভালো বোঝেন।

কথা আর বাড়াতে ইচ্ছে হয় না। কারাবাস মেনে নেই, কোনো অপরাধ না করেও। মনে পড়ে হেসের কথা, একই রকম একটা অবস্থা হয়েছিল হেসে মহাশয়েরও, সত্তর বছর বয়সে জেলে যেতে হয়েছিল এক কিশোরীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে, তার অনেক আগে থেকেই নোবেল লরিয়েট হয়েছিলেন তিনি, মনকে প্রবোধ দেই, তিনিও ছবি আঁকতেন জেলে বসে! তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অবশ্য প্রমান করা যায় নি, অপরাধ করেছিলেন কিনা তিনি, আইন তা জানে না। আমার বেলায় অবশ্য আইনের চোখ ছিল, খোলা!

 

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *