দ্য অ্যাপল কার্ট (পর্ব-১)


জর্জ বার্নার্ড শ
অনুবাদ ও ভূমিকা: কামাল রাহমান

[ভূমিকা: রাজনৈতিক প্রহসনমূলক এ নাটকটি জর্জ বার্নার্ড শ রচনা করেন ১৯২৮এ। ঐ বছরই এটার প্রথম অভিনয় হয় পোলিশ ভাষায়, ওয়ারশতে। এর পরের বছর ব্রিটেনে। হাস্যরস ও সূক্ষ্ম-কৌতুকসম্মৃদ্ধ ব্যঙ্গাত্মক এই নাটকটি উদ্ভট কয়েকটি রাজনৈতিক চরিত্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। কয়েকটা বেশ বড় আকারের একক-কথন রয়েছে, অভিনয়ের জন্য যা সত্যিই কঠিন। পঠনের জন্য বরং অনেক বেশি উপযোগী ও সুখপাঠ্য।

ঐ সময়ের ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ও বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ কলোনির সঙ্গে যে বিভেদমূলক রাজনৈতিক আচরণ করা হত, সে-সবের শ্লেষাত্মক উল্লেখ রয়েছে নাটকটিতে। আশ্চর্য হওয়ার মত যে রাজনীতিবিদদের চরিত্র সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে এই একশো বছরে। জনগনকে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠাই এদের সব কিছুর পেছনে কাজ করে। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, তবে ওটা এত কম যে চোখে পড়ে না। বিশুদ্ধ গণতন্ত্র যে একটা ধাপ্পা, অথবা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র বলেই যে কিছু নেই, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন জেবিএস। সবকিছুরই দুটো দিক রয়েছে এবং একটা সমতাকরণের জন্য গণতন্ত্রের অন্য দিকটাও থাকতে হয়। ব্রিটেনের রাজতন্ত্র হচ্ছে গণতন্ত্রের বিপক্ষে রক্ষা-কবচ। গণতন্ত্রকে যেমন লালন করে এটা, তেমনি রক্ষা করে। আবার গণতন্ত্রের গ্রাস হতে জনগনকে রক্ষাও করে।

নাটকটির মূল বক্তব্য যদিও গণতন্ত্রের কিছুটা বিপক্ষে যায়, কিন্তু অনেকেই এটা স্বীকার করেন যে বার্নার্ড শ’র দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুমাত্র ভুল ছিল না। গণতন্ত্রের এই ত্রুটি এখনো রয়েছে। এটার সংশোধনের উদ্যোগ গণতন্ত্রীরা গ্রহণ করে না। রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সহাবস্থান ব্রিটেনে এক ধরনের সমতা রক্ষা করে চলেছে। রাজার ক্ষমতা সীমিত রাখা হলেও গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী কখনো স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে পারে না, রাজা রাশ টেনে ধরেন সেখানে। হরতালের নামে চরম অরাজকতা ও রাষ্ট্রের ক্ষতি সাধন করতে পারে না বিরোধী পক্ষ। আমেরিকায় যেমন প্রেসিডেন্টকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তেমনি তাকে সরানোর পথও রয়েছে। অগ্রসর দেশগুলো এভাবে কিছুটা সমতা রক্ষা করে চলে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজতন্ত্র অথবা প্রেসিডেন্সিয়াল গণতন্ত্র কোনোটা না থাকায় তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রীরা প্রকৃতপক্ষে স্বৈরশাসকের চেয়েও বেশি স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে পারে। গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে এই স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার বিপক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেয়া না হলে প্রকৃত গণতন্ত্র কোনোদিনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, অথবা এর সম্ভাবনা খুব কম। বার্নার্ড রাজনৈতিক দিক থেকে যেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করেছেন, তেমনি সমাজের অগ্রসরমানতার বিপক্ষে ধর্মীয় কুসংস্কার ও বাধার বিষয়েও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত করেছেন, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজের এসব ধর্মীয় জঞ্জাল মানুষকে অগ্রসর হতে দেয় না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বরং ধর্মীয় এসব প্রতারণাকে পুঁজি করে নিজেদের সামন্ত-রাজ্য টিকিয়ে রেখেছে। সমাজের প্রভু হয়ে এরা বাস করতে চায় আজীবনের জন্য, বংশ-পরম্পরা! সাধারণ জনগণকে অন্ধত্বের মধ্যে রেখে এই সব নেতৃবৃন্দ নিজেদের সন্তানদের পাঠায় ব্রিটেনে উচ্চশিক্ষা নেয়ার জন্য, অথচ দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য দরিদ্র জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ করে। ব্রিটেনের ধনিক শ্রেণি বাংলাদেশে মাদ্রাসা গড়ার জন্য ‘মুক্ত হস্তে’ অনুদান পাঠায়। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষা অথবা সাহিত্যের জন্য, ‘নাউজুবিল্লাহ’।

নাটকটির শুরু রাজা ম্যাগনাসের দুই সচীবের অপ্রয়োজনীয় ও অতি সাধারণ কথাবার্তা দিয়ে। কিছুক্ষণ পর মঞ্চে আসে সমাজতন্ত্রী দলের নেতা বোনার্জেস, মন্ত্রী পরিষদে যোগ দেয়ার পর রাজ-প্রাসাদে প্রথম প্রবেশ তার। কিছুটা যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে এলেও খুব সহজে বশীভূত করেন তাকে রাজা ম্যাগনাস। রাজকন্যা এসে বৈঠক থেকে উঠিয়ে নিয়ে যায় তাঁকে। মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে চরম বিশৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্যহীন পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে, যা প্রায় বাস্তব-সম্মত। প্রধানমন্ত্রী প্রোটিয়াস রাজার ক্ষমতা খর্ব করার জন্য একটা চরমপত্র নিয়ে আসে। এটায় স্বাক্ষর না করলে মন্ত্রী পরিষদ পদত্যাগ করবে এবং জনগনের কাছে রাজার জারি-জুরি সব প্রকাশ করে দেবে বলে হুমকি দেয়। কৌশলে রাজা জয়ী হন এই যুদ্ধে, বিপরীতে তিনিই সিংহাসন ছেড়ে সাধারণের কাতারে এসে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অভিমত প্রকাশ করেন। পুরোপুরি ধরাশায়ী হয়ে প্রোটিয়াস চরমপত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন। শেষ অধিবেশনের আগে আমেরিকান দূত আসে ভয়ঙ্কর এক উদ্দেশ্য নিয়ে। আমেরিকার স্বাধীনতা দলিল বাতিল করে যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার প্রস্তাব দেয় সে। রাজার মানসিক চাপ কমানোর জন্য তাঁর মিস্ট্রেস অরিন্থিয়ার সঙ্গে কিছু সময় কাটানোর ঘনিষ্ঠ দৃশ্য আছে। চাতুরি করে রাজাকে বেকায়দায় ফেলার প্রয়াস দেখানো হয়েছে এখানে।

মূলত গণতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে সংঘাত দেখানো হলেও ধনিক শ্রেণি কর্তৃক দরিদ্রদের শোষণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রাজার সদিচ্ছার প্রকাশ পেয়েছে এখানে। গণতন্ত্রে নির্বাচনের জন্য ধনিদের দ্বারস্থ হতে হয় রাজনৈতিক নেতাদের, কিন্তু রাজা সেখানে স্বাধীন, ফলে অনেকটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন। সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য নাটকটি। গণতন্ত্রের বিপক্ষে রাজতন্ত্রেরই জয় দেখানো হয়েছে। একজন কট্টর গণতন্ত্রী হয়েও বার্নার্ড শ কেন এটা করেছিলেন তারও ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। ব্রিটিশ জাতি কেন রাজতন্ত্রের এত ভক্ত নাটকটা পড়ার পর কিছুটা বোঝা যায়। রাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি করে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটা কোথায় তা দেখানো হয়েছে। গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র, কোনোটাই সাধারণ মানুষের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি, এক্ষেত্রে ধনীদের হাত থেকে সাধারণ মানুষদের রক্ষা করার জন্য রাজার সদিচ্ছা, যদি সেটা থাকে, খুব গুরুত্ব বহন করে। রাজার গুণে রাজ্য– এ আপ্তবাক্যটা চিরকালীন। এমনকি বর্তমান বিশ্বেও, যে পদ্ধতিতেই দেশ শাসিত হোক না কেন, একজন যোগ্য দেশ-নেতার উপর নির্ভর করে ঐ দেশের ভাগ্য, সাধারণ জনগনের উপর নয়। একজন যোগ্য নেতা যে-কোনো জাতির জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনে। গণতন্ত্রের বিপক্ষে দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় নাটকটি প্রায় বর্জন করা হয়েছিল কোনো কোনো জায়গায়। কিন্তু পরে সর্বত্রই বিপুল প্রতিষ্ঠা পায়। যারা পিগমেলিয়ন পড়েছেন, বার্নার্ড শ’র অসাধারণ রচনা শৈলীর পরিচয় পাবেন এ নাটকটিতেও। বাংলাদেশেও একজন রাষ্ট্রপতির অনেক প্রেম ও একজন প্রধানমন্ত্রীর অপ্রকাশ্য প্রেম রয়েছে। অথচ এসব নিয়ে নাটক করার সাহস এখনো হয়ে ওঠে নি আমাদের, বার্নার্ড শ’র এ নাটক ঐ ঘাটতি কিছুটা পূরণ করবে আশা করি। অনুবাদের সময় বার্নার্ড শ’র উচ্চাঙ্গের ভাষাটি কিছুটা তরল করা হয়েছে। মঞ্চায়নের প্রয়োজনে আরো সহজ ও সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে। নাটকটির পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ দেয়া হল, অভিনয়ের জন্য হয়তো দুঃসাধ্য। এর প্রয়োজনীয় অংশগুলো যোগ্য সম্পাদনার মাধ্যমে অভিনয়ের জন্য গ্রহণ করা যেতে পারে।]

*** ***  *** *** ***  *** *** ***  ***

[রাজ-প্রাসাদের ভেতর বড় একটা অফিস, দু’ধারে দুটো মুখোমুখি টেবিল। আগন্তুকের জন্য একটা করে চেয়ার, মাঝখানে ফাঁকা। দূরের দেয়ালে একটা দরোজা, ঘড়িতে সময় দেখানো এগারোটার একটু বেশি, গ্রীষ্ম-সকালের উজ্জ্বল আলো।
সেমপ্রোনিয়াস–  সুদর্শন, এখনো উপস্থাপনযোগ্য তরুণ। টেবিলে বসার সময় ওর ডানদিক দেখা যাবে। বসতে বসতে রাজার চিঠি খুলবে।
প্যামফিলিয়াস– মধ্যবয়স, অন্য টেবিলে নুয়ে বসার সময় বা-দিকটা দেখা যাবে ওর। বগলে ভাঁজ করা একগাদা সকালের পত্রিকা, যার একটা পড়তে থাকবে।
নীরবে কাটবে কিছু সময়। পত্রিকায় চোখ রেখেই সেমপ্রোনিয়াস বলবে ‘তারপর, প্যামফিলিয়াস?’
[পত্রিকাগুলো রাখতে রাখতে মুহূর্তের জন্য সেমপ্রোনিয়াসের দিকে তাকাবে প্যামফিলিয়াস।]
প্যাম: তোমার বাবা কি করতেন, সেমপ্রোনিয়াস?
সেম: এ্যাঁ (চমকে উঠে)?
প্যাম: তোমার বাবা, কী করতেন?
সেম: আমার বাবা!
প্যাম: হ্যাঁ, হ্যাঁ,  তিনি কি ছিলেন?
সেম: ও হ্যাঁ, তিনি ছিলেন একজন ধর্মাধ্যক্ষ, বলতে পার খ্রীস্টীয় পুরোহিত গোছের কিছু একটা।
প্যাম: তাঁর ধর্ম বিষয়ে বোঝাতে চাই নি আমি, তাঁর পেশা সম্পর্কে জানতে চেয়েছি, তাঁর রাজনীতি।
সেম: পেশায় একজন ধর্মাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি, রাজনীতিতে একজন ধর্মাধ্যক্ষ, এবং ধর্মেও তাই। প্রচণ্ড আবেগতাড়িত, আমৃত্যু সংগ্রামী, আপাদমস্তক– ধর্মাধ্যক্ষ।
প্যাম: তুমি কি আসলেই বোঝাতে চাইছ যে একজন পুরোহিত ছিলেন তিনি?
সেম: মোটেও না, এক ধরনের উপস্থাপক ছিলেন তিনি। সমারোহপূর্ণ অনুষ্ঠান, অথবা ঐতিহাসিক শোভাযাত্রা প্রদর্শন করতেন। সম্রাটের শোভাযাত্রা, সামরিক সংগীত উপস্থাপনা, নাগরিক সংবর্ধনা, এসব আরকি। গত দুটো রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন তিনি। ঐ সূত্র ধরেই এ চাকরিটা পেয়েছি। রাজকীয় সদস্যের সবাই তাঁকে চেনে, সাধারণত পর্দার আড়ালে থাকতেন তিনি।
প্যাম: পর্দার আড়ালে! তিনি কি বিশ্বাস করতেন যে ওসব খাঁটি?
সেম: হ্যাঁ, সকল মনে-প্রাণে।
প্যাম: নিজেই কি ওসব উৎপাদন করতেন?
সেম: অবশ্যই, তুমি কি মনে কর না, যে রুটি-প্রস্তুতকারী খ্রীস্টের পবিত্র ভোজ তৈরি করে সে নিজে তা বিশ্বাস করে না?
প্যাম: ওরকম ভাবি নি।
সেম: থিয়েটার ও ফিল্ম-স্টুডিও থেকে প্রচুর উপার্জন করতে পারতেন তিনি, অথচ ওসবের ধারে কাছেও যেতেন না। কারণ, যা তুলে ধরে ওরা প্রকৃতপক্ষে তা ঘটে নি কখনো। শেক্সপীয়রের অষ্টম হেনরিতে রানি এলিজাবেথের খ্রীস্টীয়করণের বিষয়টাতে অংশ নিতে আপত্তি করতেন না, কারণ ওটা আসলেই ঘটেছিল। রোম্যান্টিক কোনো কিছুতে থাকতেন না, বিপুল প্রলোভন সত্ত্বেও।
প্যাম: কখনো জানতে চেয়েছিলে কি, বিষয়গুলোকে কেন এরকম ভাবেন তিনি?
সেম: প্রিয় প্যামফিলিয়াস– কোনো কিছু নিয়েই ভাবতেন না তিনি, ভাবনা বিষয়টাই বুঝতেন না তিনি। তাঁর ছিল দৃষ্টি, সত্যি অর্থেই সামগ্রিক দৃষ্টি। সীমিত, অদ্ভূত এক ধরনের কল্পনা প্রবণতা। যা দেখেন নি তার কল্পনা তিনি করতে পারতেন না।
প্যাম: তুমি কি বোঝাতে চাইছ যে সবকিছু বাইরে থেকে পেতে হত তাঁকে, সামান্য কোনো সৃষ্টিও তাঁর নিজের ছিল না?
সেম: হ্যাঁ, তাই। কোনো কিছু অনুভব করতেন না তিনি কখনোই, যদি না শৈশবে তাঁর বাবা-মা তা না করে দিতেন, বড় হয়ে ওঠার পর স্ত্রী অথবা ছেলেমেয়েরা তা না করে দিত, কোনো কিছুই জানতেন না যদি স্কুলে তা শেখানো না হত। নিজেকে আনন্দ দিতে পারতেন না কখনো, স্বপ্রণোদিত বিষয়টা ছিল ওর কাছে অজানা!
প্যাম: তিনি কি বেঁচে আছেন?
সেম: উঁহুঁ, বাষট্টি সনে মারা গেছেন, নির্জনতায়।
প্যাম: নির্জনতায়, মানে?
সেম: মুহূর্তের জন্যও একা থাকতে পারতেন না তিনি, তাঁর কাছে ওটাই ছিল মৃত্যু!
প্যাম: আচ্ছা, বল বল, মনে হয় তাঁর ভেতর কিছু একটা ছিল!
সেম: মোটেও না, বন্ধুদের সঙ্গে কখনো কথা বলতেন না তিনি, তাস খেলতেন ওদের সঙ্গে, অথচ ভাবের আদান প্রদান করতেন না কখনো।
প্যাম: অদ্ভূত এক চিড়িয়া ছিলেন নিশ্চয়?
সেম: না, উল্লেখ করার মতো অতটা চিড়িয়া না, তাঁর মত শত শত লোক ছিল ঐ জগতে।
প্যাম: নির্জনে মৃত্যু না কি যেন বললে, তিনি কি কারারুদ্ধ হয়েছিলেন?
সেম: না, স্কটল্যান্ডের উত্তরে এক ডুবো-পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে তাঁর ইয়ট ডুবে যায়, কোনো রকমে সাঁতরে এক নির্জন দ্বীপে উঠে যান, সঙ্গীরা সব মারা যায়, তিন সপ্তাহ পর্যন্ত তাঁর কোনো খোঁজ ছিল না, যখন উদ্ধার করা হয় তাঁকে, তখন বিষাদগ্রস্থ এক উন্মাদে পরিণত হয়েছেন তিনি, কারণ তাস খেলার কোনো সঙ্গী ছিল না ঐ দ্বীপে, আর ছিল না কোনো চার্চ। অসহায় বুড়ো খোকা, কখনোই সুস্থ হয়ে ওঠেন নি আর!
প্যাম: প্রিয় সেমপ্রোনিয়াস, নির্জন দ্বীপে কেউ কখনো একা হয় না। ছোট থাকতে মা আমাকে টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে আবৃত্তি করাতেন:

সর্বদা মোদের রক্ষা কর
সর্বভূতে বিরাজমান হে ঈশ্বর,
যেখানে নেই কোনো প্রাণের চিহ্ন
সেখানেও রয়েছে করুণা তোমার
হে ঈশ্বর!

সেম: কৌতুকের আসল দিকটা এবার পেয়েছ তুমি, ওসব নির্জন গাছপালা, ঝোপ-জঙ্গল, যাকে তোমরা বল প্রকৃতি, তাঁর কাছে সেসবের উপস্থিতি ছিল না। প্রকৃতি হচ্ছে নগ্নতা, যা তাঁকে শুধু ক্রুদ্ধ করে তুলত, খোলা ময়দানে একটা ঘোড়া কখনো দেখার বিষয় না, ওটার উপর থাকতে হবে একটা চমৎকার গদি ও একজন সুদর্শন আরোহী। পুরুষ ও নারী সম্পর্কেও তাঁর ব্যাখ্যা একই রকম, সুন্দর পোশাক ও প্রসাধন ছাড়া, পরচুলা ছাড়া, ও খেতাব না নেয়া পর্যন্ত তাঁর কাছে কারো কোনো মূল্য নেই। যাজকদের পবিত্রতা হচ্ছে তাদের পরিচ্ছদের সৌন্দর্য। নারীর ভালোবাসার প্রকাশ অলঙ্কার ও দীর্ঘ বহির্বাসের ঔজ্জ্বল্যে। গ্রামের স্নিগ্ধতা গাছপালা আর পাহাড়চূড়োর মধ্যে নয়। শীতের বিকেলে কুড়ে-ঘর হতে ভেসে আসা নীলাভ ধূসর ধোয়ায়ও কোনো সৌন্দর্য নেই। অথচ মন্দির, প্রাসাদ, অট্টালিকা, তোরণ, থামওয়ালা বারান্দাসহ গ্রামের সাজানো ঘরবাড়িতে তিনি দেখতে পেতেন সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি। ভেবে দেখ একটা নির্জন দ্বীপ তাহলে কেমন ভয়াবহ ছিল তাঁর কাছে! একটা শূণ্যতা, একটা জায়গা, যেখানে তিনি হয়ে গেছিলেন বোবা ও কালা, অন্ধ এবং একা! হয়তো একটা ময়ূরীও যদি পেখম মেলে নেচে বেড়াত এমনটা হতেন না তিনি, পাখিদের মধ্যে ছিল শুধু চিল, আর চিলেরা তো বর্ণাঢ্য কিছু না। আমাদের রাজন হয়তো সেখানে ত্রিশ বছর কাটিয়ে দিতে পারতেন, অন্য কিছু না, কেবল তাঁর ভাবনাগুলো নিয়ে। তুমি হয়তো টিকে যেতে একটা মাছ ধরার ছিপ, একটা গল্ফ খেলার বল আর লাঠি পেলে। চিত্র-প্রদর্শনীর একজন মুগ্ধ দর্শকের মতো আমি হৃষ্টচিত্তে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের রঙখেলা, ঋতুবদল আর নিরন্তর জীবনের বহমানতার চমক দেখে দেখে একজন সুখি মানুষের মত কাটিয়ে দিতে পারতাম একটা জীবন। পাহাড়ি হ্রদের দৃশ্য দেখে কেউ কি বিষণ্ন হতে পারে? চোখের সামনে সব কিছু রেখেও বাবা পাগল হয়ে গেছিলেন, শূন্যতায়! ওরা বলে যেখানে কোনো কিছুই নেই, রাজা সেখানে তাঁর অধিকার হারায়। বাবা জানতেন, যেখানে কিছু নেই, সেখানে একজন মানুষ তার বেঁচে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলে, এবং মরে যায়।
প্যাম: আর একটু যোগ করতে দাও আমাকে, এই প্রাসাদে, দুপুর বারোটার মধ্যেও যখন রাজার চিঠিগুলো পঠনের জন্য প্রস্তুত হয় না, তখন একজন সচীব চাকরি হারায়।
সেম: (চকিতে কাজে মন দিয়ে) হ্যাঁ, শয়তান চাবুক মারুক তোমার ঘাড়ে। কাজ শেষ করার আগে কথা বলায় লাগিয়ে দিলে কেন আমাকে? কিছু তো করার নেই তোমার, শুধু তাঁর জন্য পত্রিকা পড়ার ভান করা ছাড়া। আর যখন বল ‘‘উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছুই নেই আজকের সকালে, মহারাজ’’ তখন যা কিছু তিনি বলেন ‘‘স্বর্গলোকে ধন্যবাদ’’। কিন্তু যদি তাঁর কোনো কাকিমার রাজ-প্রাসাদে নিমন্ত্রণে যোগ দিতে চাওয়ার লাইনটা ভুল করে না পড়ি, অথবা প্রিয়তমা ওরিন্থিয়ার দাগ দেয়া ছোট্ট একটা লাইন ‘‘ব্যক্তিগত এবং একান্ত গোপনীয়: কেবল মাননীয় প্রাপকই খুলতে পারেন’’– ব্যস, এর পরেরটা শোনা আর আমার হবে না। ছয়টা প্রেমপত্র এসেছিল গতকাল তাঁর কাছে। যখন বললাম, তিনি শুধু বললেন ‘‘রানির কাছে পাঠিয়ে দাও ওগুলো’’। তিনি মনে করেন যে তাঁকে আনন্দ দেয় ওগুলো। আমার বিশ্বাস আমাকে যেমন পীড়া দেয় ওসব, তেমনি তাঁকেও অস্বস্তিতে ফেলে ।
প্যাম: ওরিন্থিয়ার চিঠিগুলো কি রানির কাছে পাঠানো হয়?
সেম: নাহ্, রাজার বলে কথা! আমিই পড়তে পারি না এমনকি! সবকিছু পড়ার জন্যই নির্দেশ রয়েছে, কিন্তু ওগুলো খুব যত্ন  করে খুলতে ভুলে যাই, এবং এজন্য কখনোই তিরস্কৃত হই না।
প্যাম: (চিন্তাক্লিষ্ট হয়ে) আমি মনে করি . . .
সেম: ওহো, চুপ কর প্যামফিলিয়াস, যদি এভাবে কথা বলতেই থাক তাহলে কখনোই কাজ শুরু করতে পারব না।
প্যাম: বলতে চাইছিলাম, যে আমি মনে করি–
সেম: ওরিন্থিয়া সম্পর্কে তো? বাদ দাও। বুড়ো মানুষ, চাকরিটা খোয়াবে, অন্তত এ ব্যপারটা নিয়ে মাথা ঘামিও না, থাম এবার।
প্যাম: ওরিন্থিয়া ব্যথা পাওয়ার আগেই কেঁদ না, ছোকড়া। আমি বলতে চাইছিলাম, আমার মনে হয় তুমি জান যে ঐ কুঁদুনে ষাঁড় বোনার্জেসকে বাণিজ্য বোর্ডের সভাপতি করা হয়েছে। সে আজ এখানে আসছে তার মনের কোনা থেকে রাজাকে সামান্য কিছু উপহার দিতে, যাকে সে বলে মনের কথাটি, এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে মনের কথাটি জানাতে।
সেম: দুর্ভিক্ষ নিয়ে রাজার কি আসে যায়? প্রতি দু’মাসে একবার ওটা আসছে, চাতুর্য দিয়ে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি!

(বোনার্জেসের প্রবেশ, মাথায় রুশি পিক-ক্যাপ, বয়স ৫০, প্রকাণ্ড গড়ন, উদ্ধত ও নিশ্চিত ভঙ্গিমা)।

বোনা: এই যে, রাজার সঙ্গে আমার একটা এপয়েন্টমেন্ট আছে, পৌনে-বারোটায়, আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে?
সেম: (খুশিখুশি ও ভদ্রজনোচিতভাবে) সুপ্রভাত, মনে হয় আপনিই মি. বোনার্জেস?
বোনা: (সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সামান্য পিছু হটে) ওহো, সুপ্রভাত আপনাকে। ওরা বলে যে ভদ্রতা হচ্ছে রাজার সময়নিষ্ঠা–
সেম: অন্যভাবে বলা যায়, মি. বোনার্জেস, সময়ানুবর্তীতা হচ্ছে রাজার শিষ্টাচার; এ বিষয়ে রাজা ম্যাগনাস একজন আদর্শ। আপনার উপস্থিতি রাজার কাছে ঘোষণা করা যায় নি, এক্ষুণি দেখছি (দ্রুত বেরিয়ে যাবে)।
প্যাম: দয়া করে বসুন, মি. বোনার্জেস।
বোনা: (প্যামের টেবিলের সামনে বসতে বসতে) প্রাসাদে অনেক তরুণ ভুঁইফোড় আছে মনে হয় মি. . .
প্যাম: আমার নাম প্যামফিলিয়াস।
বোনা: ও তাই, আপনার সম্পর্কে শুনেছি, রাজার ব্যক্তিগত সচিবদের একজন আপনি।
প্যাম: জ্বী, তা আমাদের তরুণ ভুঁইফোড়েরা আবার কি করেছে মি. বোনার্জেস?
বোনা: শুনুন তাহলে– ওদের একজনকে বললাম, রাজার কাছে জানান যে আমি এখানে, এমনভাবে সে তাকাল যেন আমি একটা হাতি! পাশেরজনের সঙ্গে ফিসফিস করে চলে গেল। তারপর ও-বেটা এসে আমার নাম জানতে চায়, আমি বললাম ‘‘তর্ক কর না হে ছোকড়া, আমি যেমন জানি আমি কে, তুমিও সেভাবেই জান, যাও, রাজাকে বল গিয়ে যে আমি এখানে’’ নিজের কানে একটা টোকা মেরে সেই যে উধাও হল! শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে এখানে ঢুকে পড়েছি।
প্যাম: তরুণ কুলাঙ্গার! যাকগে, আমার সঙ্গী, মি. সেমপ্রোনিয়াস আপনার জন্য এ কাজটা ঠিকভাবেই করবে।
বোনা: ও, ওর নাম সেমপ্রোনিয়াস? শুনেছি ওর সম্পর্কে।
প্যাম: মনে হয় আমাদের সবার সম্পর্কেই জানেন আপনি, প্রাসাদের ‘অতিপারদর্শী’ একজন হয়ে ওঠবেন নিশ্চয়, যেহেতু এখন ক্যাবিনেট মিনিস্টারও। কথা প্রসঙ্গে বলি, এই সুযোগে অভিনন্দন জানাতে পারি কি আপনাকে? না, আপনার যোগ দেয়া উপলক্ষে ক্যাবিনেটকেই অভিনন্দন জানাব!
সেম: (ফেরত এসে) রাজা আসছেন।

(টেবিলের কাছে যাবে সেম, আগন্তুকের চেয়ারটা হাতে করে সামনে নিয়ে আসবে, রাজার আদেশের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকবে। প্যাম উঠে দাঁড়াবে, বসে থেকেই দরোজার দিকে ফিরে তাকাবে বোনার্জেস।
রাজা ম্যাগনাস, লম্বা, পড়ুয়া-মতো দেখতে, বয়স ৪৫, অমায়িক অভিব্যক্তি। প্রবেশ করবেন, কক্ষের মাঝামাঝি দ্রুত হেঁটে আসবেন বোনার্জেসের কাছাকাছি, করমর্দনের জন্য আন্তরিকভাবে হাত বাড়াবেন।)

ম্যাগ: এই ক্ষুদ্র প্রাসাদে আপনাকে স্বাগতম, মি. বোনার্জেস। বসবেন কি?
বোনা: বসেই আছি।
ম্যাগ: সত্যিই মি. বোনার্জেস, লক্ষ্য করি নি, মাপ করবেন, অভ্যাসের দোষ।

(ইঙ্গিতে বোঝাবেন যে বোনার্জেসের ডানদিকে বসতে চান, ওখানে চেয়ারটা দেবে সেম।)

ম্যাগ: বসার অনুমতি দেবেন কি আমাকে, মি. বোনার্জেস?
বোনা: ওহো বসুন, জনাব বসুন। নিজের বাড়িতেই আছেন আপনি, আনুষ্ঠানিকতা আমার কাছে কোনো বরফ গলায় না।
ম্যাগ: (কৃতজ্ঞতার সঙ্গে) ধন্যবাদ আপনাকে।

(রাজা বসবেন, প্যাম বসবে, সেম তার টেবিলে ফিরে যাবে এবং বসবে।)

ম্যাগ: অবশেষে আপনার দেখা পাওয়া সত্যিই আনন্দের, মি. বোনার্জেস। অনেক উৎসাহ নিয়ে আপনার প্রতিভার গড়ে ওঠাকে লক্ষ্য রাখছিলাম আমি, সেই পঁচিশ বছর আগে, নর্দাম্পটনে, আপনার প্রতিযোগিতার সময় থেকে।
বোনা: (প্রীত হয়ে এবং বিশ্বাস করে) মনে করা উচিত আমার যে লক্ষ্য রেখেছিলেন আপনি, রাজা ম্যাগনাস। বসা থেকে আপনাকে উঠিয়েছিলাম আমি একবার, না দু’বার, হ্যাঁ–?
ম্যাগ: (স্মিতহেসে) আপনার কণ্ঠ সিংহাসনকে আগের চেয়েও বেশি করে কাঁপিয়ে তুলেছে।
বোনা: (মাথা ঝাঁকিয়ে সেক্রেটারিদের দিকে ইঙ্গিত করে) ঐ দুটো এখানে বসে থাকে কেন? যা কিছু বলা হয় তার সব শোনার জন্য কি?
ম্যাগ: আমার ব্যক্তিগত সচিব দু’জন, আপনাকে বিরক্ত করছে কি ওরা?
বোনা: আহ্, তা না, ওরা বিরক্ত করবে কেন আমাকে? যদি পছন্দ করেন তো ট্রাফালগার স্কোয়ারে যেয়েও আপনার সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত আছি। অথবা বেতারেও প্রচারিত হতে দিতে পারি এটা।
ম্যাগ: আমার জনগনের জন্য ওটা একটা কাজের কাজই হত মি. বোনার্জেস, আমি দুঃখিত যে ওরকম কোনো ব্যবস্থা আমরা নেই নি।
বোনা: (ভয়ানকভাবে কাছে ঘেঁসে) হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কি ধারণা করতে পারেন যে এমন কিছু বলতে যাচ্ছি আমি যা আগে কখনো কোনো রাজাকে বলা হয় নি?
ম্যাগ: ওটা শুনতে পারলে খুব আনন্দিত হব, মি. বোনার্জেস। আমার ধারণা ছিল যে একজন রাজাকে বলা যায় সম্ভাব্য এমন সব কিছুই শুনে ফেলেছি আমি। ক্ষুদ্রতম উদারতার জন্যও কৃতার্থ হব।
বোনা: আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি যে এটা সমর্থিত নাও হতে পারে। একজন সাদাসিধা মানুষ আমি, ম্যাগনাস, অতি সাদাসিধা মানুষ।
ম্যাগ: একেবারেই তা না, আপনাকে নিশ্চিত করছি আমি–
বোনা: (রুষ্ট হয়ে) আমার ব্যক্তিগত অবয়বের প্রতি ইঙ্গিত করে বলছি না আমি।
ম্যাগ: (গম্ভীরভাবে) আমিও না। নিজেকে প্রতারিত করবেন না, মি. বোনার্জেস। একজন সরল মানুষের প্রকৃতি হতে অনেক বেশি ভিন্ন আপনি। আমার কাছে সব সময়ই একজন রহস্যময় ব্যক্তি আপনি।
বোনা: [খুব সন্তুষ্ট ও অবাক হয়ে। আনন্দের আতিশয্যে স্মিত-হাসি ফেরাতে না পেরে] ঠিক আছে, সম্ভবত কিছুটা রহস্যময় আমি। সম্ভবত আমি তাই।
ম্যাগ: [বিনীতভাবে] আমি ইচ্ছা করি, আপনার স্বচ্ছতা দেখতে পারব, মি. বোনার্জেস। অবশ্য আপনার মত চাতুর্য আমার নেই। আমি কেবল আপনাকে অনুরোধ জানাতে পারি যে দয়া করে খোলাখুলি কথা বলবেন আমার সঙ্গে।
বোনা: [এখন বুঝতে পেরেছেন যে তিনিই উপরের দিকে অবস্থান করছেন] দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বোঝাতে চান আপনি। ঠিক আছে, খোলাখুলি ব্যপার হচ্ছে যে আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে এসেছি আমি। সবার আগে বলতে চাই যে, এই দেশটা আপনাকে দিয়ে শাসিত হতে পারে না, এটা হতে হবে আপনার মন্ত্রীদেরকে দিয়ে।
ম্যাগ: তাহলে খুব খুশি হব আমি ওদের উপর, কঠিন ও ধন্যবাদ-বর্জিত একটা কাজ আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য।
বোনা: এটা তো আপনার হাতে না, মন্ত্রীদের হাতে। একজন প্রাতিষ্ঠানিক রাজা কেবল আপনি। বেলজিয়ামে এটাকে কি বলে জানেন?
ম্যাগ: রাবার স্ট্যাম্প, আমার মনে হয়, নাকি?
বোনা: জ্বী, রাজা ম্যাগনাস। রাবার স্ট্যাম্প রাজা। ওটাই আপনার প্রাপ্য– ভুলে যাবেন না এ কথাটা।
ম্যাগ: হ্যাঁ, বেশির ভাগ সময়ই আমরা তাই: আমরা দু’জনেই।
বোনা: [অপমানসূচক ভঙ্গিতে] কি বোঝাতে চাইছেন আপনি? আমাদের দু’জনেই মানে?
ম্যাগ: কাগজপত্র নিয়ে আসে ওরা আমাদের কাছে। আমরা সই করে দিই। আপনার জন্য সৌভাগ্য, ওগুলো পড়ার মত সময় আপনার নেই। কিন্তু আমার কাছে আশা করা হয় সব কিছুই যেন পড়ি আমি। সব বিষয়ে সম্মত থাকি না আমি: কিন্তু স্বাক্ষর করে দিতে হয় অবশ্যই: কিছুই করার নেই আর তাছাড়া। যেমন ধরুন, মৃত্যু পরোয়ানা: শুধুমাত্র ওদেরই মৃত্যু পরোয়ানা সই করতে হয় না, আমার মতে যাদেরকে হত্যা করাই উচিত না। আবার দেখুন, অনেকের মৃত্যু পরোয়ানাই হয়তো জারী করা যায় না, কিন্তু আমার মনে হয় মেরে ফেলা উচিত ওদেরকে।
বোনা: [ব্যাঙ্গাত্মকভাবে] এতটুকু বলতে সমর্থ হওয়া পছন্দ করবেন আপনি ‘‘মাথা কেটে ফেল ওর’’– তাই না?
ম্যাগ: কদাচিত কোনো মানুষ ওদের মাথা হারায়, কারণ এতই ক্ষুদ্র ওটা যে প্রায় হারাতেই হয় না। তারপরেও, হত্যা করা বিষয়টা নিশ্চয় মারাত্মক। নিদেনপক্ষে, যাকে হত্যা করা হয়, সাধারণত তার পক্ষে এ রকম একটা ভাবনা যথেষ্ট আত্মশ্লাঘার বিষয়। আমি মনে করি, আমাকে যদি হত্যা করার প্রশ্ন দেখা দেয়–
বোনা: [কদাকারভাবে] দিতে পারে, কোনো দিন। ওটারও আলোচনা করতে শুনেছি আমি।
ম্যাগ: ওহ্ শান্তি। রাজা চার্লসএর শিরচ্ছেদের ব্যপারটা শুনি নি আমি। আচ্ছা, আশা করি ব্যপারটা নির্ধারণ করবে একজন প্রাণবান ব্যক্তি, রাবার স্ট্যাম্প কেউ নন।
বোনা: এটা নির্ধারণ করবে আপনার স্বরাষ্ট্র সচীব, আপনার যথার্থ, নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক মন্ত্রী মহোদয়।
ম্যাগ: আরেকজন রাবার স্ট্যাম্প, হেঁ?
বোনা: বর্তমান সময়ে, সম্ভবত। কিন্তু আমি যখন স্বরাষ্ট্র সচিব, তখন নয়, স্বদেশ প্রেমের আদর্শে। বিল বোনার্জেসকে কেউ রাবার স্ট্যাম্প বানাতে পারবে না: ওটা আমার কাছ থেকে দূরে রাখুন।
ম্যাগ: অবশ্যই না। কীভাবে জনসাধারণ তাদের শাসকদের ভাবমূর্তি গঠন করে তা কি কৌতূহল সৃষ্টি করে না? পুরোনো দিনে রাজা– ঐ ক্ষুদ্র মানুষটা! দেবতার মত ছিলেন, এবং সত্যিই দেব-পুরুষ বলে ডাকা হত তাঁকে, সর্বদর্শী ও অকাট্য বলে পূজো করত। ওটা ছিল অস্বাভাবিক–
বোনা: ওটা ছিল নির্বুদ্ধিতা, স্রেফ বোকামি।
ম্যাগ: যতটুকু ধরে নিচ্ছি আমরা, আমার ধারণা, তার অর্ধেক নির্বুদ্ধিতাও ছিল না ওখানে। প্রাচীন রোমান সম্রাট-দেবতার অশেষ প্রজ্ঞা ছিল না, অসীম জ্ঞান ছিল না, অনুরূপ ক্ষমতাও ছিল না, কিন্তু কিছু বিষয় অবশ্যই ছিল তাঁর: সম্ভবত তাঁর মন্ত্রীদের যতটুকু ছিল অন্তত ততটুকু ছিল। তিনি ছিলেন জীবন্ত, মৃত না। একজন রাজা বা মন্ত্রীর কাছে মানুষেরা কি কখনো এভাবে দেখা করে, এবং তাকে টেবিল থেকে তুলে এনে ব্যবহার করে, ঠিক যেমন কেউ এক টুকরো কাঠ বা পিতল অথবা রাবারকে ব্যবহার করে। আপনার দপ্তরের স্থায়ী কর্মকর্তারা চেষ্টা করবে এভাবে আপনাকে তুলে নিতে, এবং ব্যবহার করতে। বিশবারের মধ্যে উনিশবার এ রকমটা চালিয়ে যেতে দিতে হবে ওদেরকে, কারণ সবকিছু জানতে পারেন না আপনি; যদিও বা জানতে পারেন, কোনো কিছু করতে পারেন না, এমনকি সব জায়গায়ও না। কিন্তু বিশবারের বার কি করবেন আপনি?
বোনা: বিশবারের বার ওরা দেখবে যে বিল বোনার্জেসের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়ে গেছে ওরা, কি বলেন?
ম্যাগ: যথার্থ। রাবার স্ট্যাম্প থিওরি কাজ করছে না মি. বোনার্জেস। স্বর্গীয় প্রাচীন তত্ত্বই কাজ করছে, কারণ আমাদের সবার মধ্যেই রয়েছে স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গ; এবং সবচেয়ে দুষ্ট অথবা খারাপ রাজা কিংবা মন্ত্রী, যদিও পুরোপুরি দেবতা ন’ন তিনি, কিছুটা হলেও দেবতাÑ দেবতা হওয়ার প্রচেষ্টারত অন্ততÑ যাহোক, যত কমই দেবতা হোক আর প্রচেষ্টা যত ব্যর্থই হোক, প্রত্যেক জরুরী বিষয়ে রাবার স্ট্যম্প থিওরি অচল হয়ে যায়, কারণ কোনো রাজা বা মন্ত্রী খুব কমই স্ট্যাম্পের মত ব্যবহারযোগ্য হন: তিনি একজন জীবন্ত ব্যক্তি।
বোনা: ব্যক্তি, হেঁ? আপনারা, মানে রাজারা এখনো ওরকমই বিশ্বাস করেন?
ম্যাগ: শব্দটাকে সুবিধেজনক মনে করেছি, ছোট ও পরিচিত। কিন্তু আপনি যদি ব্যক্তি ডাকটা পছন্দ না করেন তাহলে আমরা না হয় বলি যে জীবন্ত বিষয়, যেন জীবনহীন বিষয় থেকে পৃথক করা যায়।
বোনা: [বিষয়টা মোটেও পছন্দ না করে] আমি মনে করি, ব্যক্তিই বলুন বরং আমাকে, যদি কোনো কিছু বলে ডাকতেই হয়, মোটের উপর। আমি জানি অনেক ব্যাপার-স্যাপারই আছে আমার, ডাক্তার তো বলে যে কয়েক কেজি ওজন কমিয়ে ফেলা উচিত আমার; কিন্তু গোমাংসের চেয়েও বেশি সুখাদ্য কিছু আছে আমার কাছে। যদি পছন্দ করেন, ব্যক্তিই বলেন এটাকে; কেবল কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা নিয়ে নয়, আসলেই যদি বুঝতে পারেন আমাকে।
ম্যাগ: সঠিকভাবে। অতএব দেখুন, মি. বোনার্জেস, যদিও দশ মিটিটের কম সময় ধরে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছি, এরি মধ্যে একটা উচ্চমার্গের আলোচনায় টেনে এনেছেন আমাকে, যা কিনা প্রমাণ করে যে এক জোড়া রাবার স্ট্যাম্পের চেয়ে বেশি কিছু আমরা। আমার ধী-শক্তির উপরে উঠে গেছেন আপনি।
বোনা: এবং আপনিও তাই করছেন।
ম্যাগ: [বেপরোয়া সুরে] এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না…
বোনা: [কপটভাবে দাঁত বের করে] ওরা যে রকম, হেঁ?
ম্যাগ: আমার নিজের বেলায় ব্যতিক্রম ছাড়া ঐ যোগ্যতা অর্জন করা আমার জন্য নয়। সেই তুলনায়, আপনার জন্য প্রমান দিয়েছেন আপনি। অন্য কেউ এ রকম করতে সমর্থ হবে না। আমার বেলায় দেখুন, আমি একজন রাজা কারণ আমি আমার চাচার ভাইপো, এবং আমার বড় দু’ভাই মারা গেছেন। দেশের সবচেয়ে দুষ্ট লোকটিও যদি হয়ে থাকি, তবুও আমি রাজা। ধী-শক্তির জন্য এই পদ প্রাপ্ত হই নি আমি। যদি আমার জন্ম হত, যেমন আপনার হয়েছে– এই ইয়ের মধ্যে– এই ইয়ে–
বোনা: নর্দমার মধ্যে। ছাড়ুন ওটা। ক্যাপ্টেন কোরামের মূর্তির পায়ের কাছ থেকে কোনো এক পুলিশের কুড়িয়ে নেয়া। তারপর ঐ পুলিশ সাহেবের দাদিমার দত্তক হিসেবে বড় হওয়া, ঈশ্বর ঐ দাদিমার মঙ্গল করুন।
ম্যাগ: কোথায় থাকতাম আমি যদি কোনো পুলিশ ভাই কুড়িয়ে পেত আমাকে?
বোনা: আহ্! কোথায় আবার? মনে রাখবেন এটা এমন কিছু নয় যে আপনি নিজের জন্য ভাল কিছু করতে পারতেন না। বোকা ন’ন আপনি ম্যাগনাস: আপনার উদ্দেশ্যে এ কথাটা বলব আমি।
ম্যাগ: তোষামোদ করছেন আমাকে।
বোনা: একজন রাজাকে মিথ্যা তোষামোদ করা! কখনোই না। বিল বোনার্জেস অন্তত এ রকম করে না।
ম্যাগ: হ্যাঁ, হ্যাঁ। সবাই রাজাকে তোষামোদ করে। কিন্তু আপনার মত চাতুর্য থাকে না সবার, এবং … বলব কি আমি?– আপনার মত ভালো স্বভাব।
বোনা: [আত্মতুষ্টিতে প্রফুল্ল হয়ে] সম্ভবত না। তারপরও, একজন রিপাবলিক্যান আমি, আপনি জানেন।
ম্যাগ: ওটা হচ্ছে ঐ রকম, যাতে সব সময় আশ্চর্য হই আমি! প্রকৃতপক্ষে, আপনি কি মনে করেন যে একজন মানুষের ততটুকু ব্যক্তিগত ক্ষমতা থাকা উচিত যা কিনা প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্টের থাকে? উচ্চাকাঙ্খী রাজারা তাদেরকে হিংসা করে।
বোনা: ওটা কি? খেয়াল করি নি আমি।
ম্যাগ: [স্মিত হেসে] আমাকে প্রতারণা করতে পারেন না আপনি, মি. বোনার্জেস। আমি বুঝতে পারি কেন আপনি রিপাবলিক্যান। যদি ইংরেজরা আমাকে বেঁধে তুলে রাখে এবং একটা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে তাহলে আপনি ছাড়া আর কারোই প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে না।
বোনা: [প্রায় আরক্তিম হয়ে] আহ্! ওকথা বলবেন না।
ম্যাগ: আসুন আসুন! আমি যে রকম জানি আপনিও ওরকমই ভালো জানেন। ঠিক আছে, যদি এমন ঘটে তাহলে সর্বকালে এক জন রাষ্ট্রপ্রধানের যে ক্ষমতা ছিল তার থেকে কমপক্ষে দশগুণ বেশি ক্ষমতা থাকবে আপনার।
বোনা: [সম্পূর্ণ আশ্বস্ত না হয়ে] এটা কেমন করে হতে পারে? আপনি হচ্ছেন রাজা।
ম্যাগ: এবং রাজা মানে কি? একজন দেবমূর্তি, অর্থলিপ্সু শক্তিশালী একটা শ্রেণির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, একটা বলির পাঁঠা, যাকে পুতুল বানিয়ে রেখে দেশটাকে শাসন করা যায়। আর প্রেসিডেন্ট, বর্তমানকালে, জনসাধারণের পছন্দ করা একজন ব্যক্তি, যাকে তারা একজন শক্তিশালী মানুষ হিসেবে কামনা করে, যাতে তিনি ধনীদের হাত থেকে তাদেরকে রক্ষা করতে পারেন।
বোনা: ঠিক আছে, সামান্য শক্তিমান মানুষ হিসেবে আমাকে উল্লেখ করা প্রসঙ্গে বলছি, ওতে কিছু হলেও থাকতে পারে। কিন্তু সত্যিকারভাবে, ম্যাগনাস, একজন মানুষ হিসেবে বলুন তো, বর্তমানে যে অবস্থায় আছেন আপনি, তা না থেকে একজন প্রেসিডেন্ট-এর মত হতে পারতেন না কি?
ম্যাগ: কোনো ক্রমেই না। যদি পারতাম তাহলে আমাকে বিশ্বাস করতে পারতেন না আপনি; এবং আপনিই সঠিক থাকতেন। দেখুন, আমার নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা কি যথাযথ?

(চলবে)

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *