স্টিফেন বাটলার লীককের গল্প: একটি ম্যাচের কাঠি

ভাষান্তর: নাহার তৃণা

স্টিফেন বাটলার লীকক কানাডীয় সাহিত্য জগতের সর্বকালের সফল হাস্যরসাত্মক লেখক। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বহুপ্রজ প্রতিভার অধিকারী স্টিফেন বাটলার বিশেষভাবে সমাদৃত একটি নাম। একাধারে শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুবক্তা, প্রবন্ধকার, লেখক স্টিফেন বাটলার লীককের জন্ম দক্ষিণ ইংল্যাণ্ডের হ্যাম্পশায়ারের ছোট্ট গ্রাম সোয়ানমোরে, ১৮৬৯ এর ৩০ ডিসেম্বর। বাবা পিটার লীকক, এবং মা এ্যাগনেস এমার এগারো সন্তানের মধ্যে স্টিফেন ছিলেন তৃতীয়। তাঁর পরিবার নানা স্হানে প্রচুর ভ্রমণ করে এবং শেষমেশ ১৮৭৬ সালে কানাডার অন্টারিওর সাটন গ্রামে স্হায়ী বসতি গড়ে। স্টিফেন তখন সাত বছরের বালক। তাঁদের প্রবাসী জীবনের প্রথম পর্যায়টা ছিল কঠিন এবং শ্রমসাধ্য। স্টিফেন বাটলার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আধুনিক ও ধ্রুপদী ভাষাসাহিত্যে কৃতিত্বের সাথে ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন ১৮৯১ সালে। পরবর্তী আট বছর তিনি আপার কানাডা কলেজে অধ্যাপনা করেন। পিএইচডি ডিগ্রী লাভের জন্য তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং ১৯০৩ সালে আরাধ্য ডিগ্রীটি লাভ করেন। পরে তিনি শিকাগো থেকে মন্ট্রিলে চলে যান এবং ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি এবং পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রধান হিসেবে দীর্ঘদিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকেন। স্টিফেন বাটলার লীকক ব্যঙ্গ ও কৌতুকের মাধ্যমে মানবচরিত্রের মৃদু সমালোচনার পাশাপাশি সমাজের নানান অসঙ্গতি নিয়ে সরস লেখায় ব্যাপক পারদর্শীতা দেখান। ‘দ্য স্টিফেন লীকক মেমোরিয়াল মেডেল ফর হিউমার” তাঁর সম্মানে উৎসর্গিত একটি সম্মানজনক খেতাব হিসেবে বিবেচিত। তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই “এলিমেন্টস অব পলিটিক্যাল সায়েন্স”। তিনি ত্রিশটিরও বেশি গ্রন্থের রচয়িতা। “ননসেন্স নভেলস(১৯১১)”, “সানশাইন স্কেচস অফ দ্য লিটল টাউন (১৯১২)”, “আরক্যাডিয়ান অ্যাডভেঞ্চারস উইদ দ্য আইডল রিচ”, “মুন বিমস ফ্রম দ্য লার্জার লুনাসি”, “দ্য গার্ডেন অফ ফলি”, “হিউমার ইটস্ থিওরী এণ্ড টেকনিক” ইত্যাদি রচনাগুলো বহুল প্রচারিত। স্টিফেন বাটলার লীকক ১৯৪৪ সালের ২৮ মার্চ মৃত্যু বরণ করেন।

আপনার হয়তো মনে হতে পারে রাস্তায় যে কারো কাছ থেকে দুম করে একটা ম্যাচের কাঠি ধার চেয়ে আনা কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু যারা এ কাজটা সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা আপনার সে ভুলটা নিশ্চিতভাবে ভাঙিয়ে দেবেন। আমি হলফ করে বলতে পারি, আমার গত সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা শুনলে আপনার মত বদলে যাবে।

গত সন্ধ্যায় রাস্তার এক কোণে সিগারেট হাতে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ম্যাচের কাঠি না থাকায় সিগারেটে যে একটা সুখটান দেবো তাও সম্ভব হচ্ছিল না। হুট করে তো আর সবার কাছে কিছু চাওয়া যায় না। তাই চাওয়া যায় এমন একজনের অপেক্ষায় ততক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম যতক্ষণ না সেরকম একজনের দেখা মিলে। আমার অপেক্ষা সাঙ্গ করে সাদামাটা এক ভদ্রলোককে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। তাকে দেখে আশানুরূপ মনে হওয়াতে এগিয়ে গিয়ে বললাম,

“এই যে ভাই শুনছেন, আপনার কাছে কী একটা ম্যাচের কাঠি হবে?”

“একটা ম্যাচের কাঠি?” ভদ্রলোক বললেন, “কেন নয়।” তারপর তিনি তার ওভারকোটের বোতাম খুলে ওয়েস্টকোটের পকেটে হাত রাখলেন।

“একখানা ম্যাচের কাঠি আমার কাছে আছে বটে। আমি নিশ্চিত সেটা নীচের পকেটেই আছে। দাঁড়ান ভাই, একটু অপেক্ষা করেন, হাতের জিনিসগুলো ফুটপাতে নামিয়ে রেখে খুঁজে দিচ্ছি। ওটা হয়ত উপরের পকেটে রেখেছি।”

লোকটাকে অতিব্যস্ত হয়ে উঠতে দেখে আমি বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, “আহা, এত ঝামেলার দরকার নেই বাদ দেন, ব্যাপারটা এমন গুরুতর কিছু না।”

“না না ঝামেলার কিস্যু নেই, আমি এক মিনিটের মধ্যেই বের করে দিচ্ছি দাঁড়ান। এখানেই কোথাও একটা ম্যাচের কাঠি রেখেছিলাম, স্পষ্ট মনে আছে।”

ভদ্রলোক দু’হাতে সমানে পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে বলে চললেন,” আসলে জানেন, আমি সাধারণত যেটায় রাখি এটা সেই ওয়েস্টকোট নয়…”

খেয়াল করলাম, ম্যাচের কাঠির খোঁজে তিনি ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে উঠছেন। আপত্তি জানালাম আমি- “ঠিকাছে, ক্ষ্যান্ত দেন ভাই এবার। এটা যদি সেই ওয়েস্টকোট না হয় তাহলে এত ব্যস্ত হয়েও তো লাভ নেই, বাদ দেন তারচে”।

“দাঁড়ান, একটু দাঁড়ান।” তিনি বলে উঠলেন” আমি ওই ছাতার কাঠিটা এখানেই কোথাও রেখেছি। আমার মনে হয় ওটা আমার ঘড়ির সাথে আছে। নাহ্, কাঠিটা ওখানেও নেই। অপেক্ষা করেন, আমি বরং কোটের ভেতর খুঁজে দেখছি। হতচ্ছাড়া দর্জি যদি এতগুলো পকেট তৈরি না করে একটাই পকেট বানাতো, তাহলে এভাবে পকেট হাতড়ানোর হ্যাপায় পড়া লাগতো না, জিনিস খোঁজা সহজ হতো।”

এবার যেন তার ব্যতিব্যস্ততার মাত্রা ছাড়ালো, তিনি তার হাতের ছড়িটা ছুঁড়ে ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে পকেট হাতড়ানোয় মগ্ন হলেন।

“এটা নির্ঘাত আমার পাজির পা ঝাড়া ছোটো ছেলের কাজ” হিসহিস করে উঠলেন তিনি, “সে আমার পকেটগুলো নিয়ে ইচ্ছামত বদমাইশি করে, খোদার কসম, আজকে বাড়ি ফিরে যদি উচিত শিক্ষা না দেই গাধার বাচ্চাটাকে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, এটা আমার প্যান্টের পেছনের পকেটেই আছে। আপনি দয়া করে কিছু সময়ের জন্য আমার ওভারকোটটা ধরে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্ত না…”

“না, না” এবার আমি তীব্রভাবে বাধা দিলাম, “এত ঝক্কির কাজ নেই, দিয়াশালাইটা না পেলেও চলবে, ব্যাপার না। আপনার ওভারকোট খোলার কোন প্রয়োজন নেই। আর ওভাবে বরফের উপর চিঠিপত্তর, জিনিস ছুঁড়ে ফেলারও দরকার দেখছি না। টানাটানি করে কোটের পকেটশুদ্ধ ছিঁড়ে ফেলবেন দেখছি! ওভারকোট আর পার্সেলগুলোকেও ওরকম পায়ে দলবেন না দয়া করে। আপনার ছোটো ছেলের নামে কসম খেতে দেখে এখন আমার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে, মরতে কেন যে ম্যাচের কাঠি চাইতে গিয়েছিলাম! আর আপনার অদ্ভুতুড়ে ঘ্যানঘ্যানানিটাও এবার বন্ধ করেন। দয়া করে উন্মত্তের মতো নিজের কাপড় ছেঁড়া থেকে এবার ক্ষ্যান্ত হোন দেখি।”

হঠাৎই লোকটা ব্যাপক আহ্লাদে ঘোঁতঘোঁত করতে করতে কোটের ভেতর থেকে হাতটা বের করে বাড়িয়ে ধরলেন।

“পেয়েছি!! অবশেষে পেয়েছি।” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। এই যে দেখেন, বলে খুঁজে পাওয়া জিনিসটা তিনি আলোর নীচে মেলে ধরলেন।

একটা দাঁত খিলাল!

চোখের সামনে এতক্ষণ সময় খচরের নমুনাটা দেখে রাগে গোটা শরীর রি রি করে উঠলো। ঘটনার আকস্মিকতায় আমার ভেতর কি জানি একটা ঘটে গেল। গুষ্টিকিলাই ম্যাচের কাঠির! বলতে বলতে, আমি লোকটিকে ট্রলিগাড়ির চাকার নীচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ঝেড়ে একটা দৌড় দিলাম।

মূল গল্প: Borrowing a Match by Stephen Leacock

 

নাহার তৃণা

ন্ম ২ আগস্ট ঢাকায়। বর্তমানে আমেরিকার ইলিনয়ে বসবাস। ২০০৮ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে লিখছেন গল্প, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। একইবছর অন্বয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘এক ডজন ভিনদেশী গল্প’। নাহার তৃণার প্রকাশিত বই দুটি এখন বইয়ের হাট প্রকাশনায় অ্যামাজন কিন্ডেলেও পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।