নাভিদ চৌধুরীর ভ্রমণগদ্য-১: মরুদ্যানে কথোপকথন

আমি ধীরে ধীরে ওয়াদি শেতার পাশ ঘেঁষে হাঁটছি। গলু (আমার গাধা, নাম আমারই দেয়া) আনমনে হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। আমরা মানে আমি আর আমার বন্ধু হামজা আজকে ওয়াদি শেতার পাশের জঙ্গলে হাঁটতে এসেছি। আমরা বলি ছড়া আর আরবীতে ওয়াদি। শেতা আম্মান থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরে এক পাহাড়ি অগভীর গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলেছে। সামনেরই এক মরুদ্যানে এর পরিসমাপ্তি।

আমি ক্লান্ত হলে গলুর পিঠে চড়ে এগোনোর পরিকল্পনা। শেতা বয়ে চলেছে কুলকুল করে। চারিদিক নিস্তব্ধ। ছোট ছোট ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে। বাতাসে কেমন সোঁদা গন্ধ। ঘিয়ে রঙের ফুলের রেণু এলোমেলো উড়ছে। গলুর রাখাল আমার হাতে দড়িটা ধরিয়ে দিয়ে হামজার সাথে সিগারেট ফুঁকতে হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেল। আমি ঠিক বুঝতে পারার আগেই গলু আমাকে টেনে জঙ্গলের গভীরে নিয়ে চলল।

আমি আর গলু । আর কোথাও কেউ নেই। আমরা হাঁটছি। চারিদিকে জলপাই গাছের জমাট সারি, ঝুপসি ডুমুর গাছের ঝোপ আর নতুন কনের লজ্জারাঙা কমলা ফুলের বেদানার গাছ। অজস্র লাল হলুদ নীল বেগুনী জংলী ফুল ফুটে আছে সবদিক আলো করে। গলু পানি খাচ্ছে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করে। আমি আমার পিঠের ঝোলা থেকে একটা কমলা বের করে গলুর দিকে এগিয়ে দেই। কেমন মায়াবী চোখে গলু আমায় দেখে। তারপর কমলাটা বড় আয়েশ করে চিবিয়ে চিবিয়ে খায়। আমি হাঁটতে থাকি। গলু আমার পেছনে হাঁটছে। আমি জুতো খুলে শেতার শীতল পানিকে স্পর্শ করি। কেমন একটা মাতাল আবেশ আমায় ঘিরে ফেলে। আমি চলতে থাকি। ভীষণ গরম আজকে। গরম এড়াতে গলু ছায়া দিয়ে হাঁটে। আমিও পাশে পাশে হাঁটি।

হঠাৎ করেই দেখি পানির মাঝে ব্যাঙাচি ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা নীলকালো ডোরাকাটা পাখি আধপাকা জামরুলের মতো একটা ফলে ঠোকর দিচ্ছে। আমি বসে পড়ি একটা আধপোড়া গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে। আঙ্গুরের লতা আর অজানা গুল্ম গুঁড়িটাকে ঢাকার চেষ্টা করছে। আমি কমলা খেতে থাকি আনমনে গুনগুন গান করতে করতে। গলু আমায় দেখে। কেমন অবাক হয়ে। ক্লান্ত চোখে। কোনো অভিযোগ নেই, কিছু চাওয়া-পাওয়া ছাড়া। গলু আমাকে দেখতে থাকে অপলক। আমি এবার একটা আপেলে কামড় দেই। গলু দেখে। আমি খেয়ে চলি।

কখন-যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতে পারিনি। চোখ খুলে দেখি গলু আনমনে আমার ফেলে দেয়া ফলের টুকরোগুলো খাচ্ছে। গলুর লোম-ওঠা হাড় বের করা শরীর আমার তেলতেলে শরীরকে যেন ধিক্কার দেয়। আমি বাকি ফলগুলো সব মাটিতে ঢেলে দেই। গলু খায়। আমি দেখি। গলুর কান দোলে, যেন আমায় প্রশ্ন করে কেন অন্যের ব্যথা বুঝতে আমার, আমাদের এত দেরি হয়। কেন আমি এতই আত্মমগ্ন। আমি হতে আমরা কেন হই না। কবে হবো। আদৌ কি হবো।

গলুর খাওয়া শেষ হয়। নিজেকে আমার গাধা বলারও সাহস আজ হারিয়ে ফেলেছি। দূর হতে হামজার গলা শোনা যায়। গলু আমার খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। আমায় সামনে এগোতে বলে।

আমি আর আমার বন্ধু গলু এক নিঃস্বার্থ পৃথিবীর খোঁজে চলতে শুরু করি। শেতা বয়ে চলে।

 

নাভিদ চৌধুরী
একজন উন্নয়ন কর্মী। বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। কাজের সূত্রে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র জনপদে তার যাবার, বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এই হঠাৎ দেখার গল্পগুলো, আচমকা ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, অতর্কিতে খোলা জানালা দিয়ে দেখা ক্ষণিকের সাথীর অনুভূতিগুলো তার লেখনীতে ধরা দিয়েছে। তার লেখায় ফুটে ওঠা মানবিকতা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা জাতির বিভেদ উপেক্ষা করে মানুষ‌ই মানুষের কাছে আসে, ভালবাসে। গল্পগুলো এই শ্বাশত মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।
Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।