নাভিদ চৌধুরীর ভ্রমণগদ্য-৩: শ্যাওলার নিশ্চিত যাত্রা

বসফরাসের নীল জল চাঁদের আলোয় ঝকমক করছে। আমি এক কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে ওপারের আলো ঝলমলে ইস্তাম্বুলের মোহময়ী রূপ দেখছি। তুরস্কে আমার যৌবনের এক বড় সময় কেটেছে। ইস্তাম্বুল সেই তুরস্কের সুন্দরতম শহর। আমি বারবার তাই ইস্তাম্বুলেই ফিরে আসি। শরণার্থী বিষয়ক একটি কর্মশালায় যোগদান করতে এবার আসা। সারাদিন কাজের শেষে আমি সাগর তীরে এসে বসেছি। আমার স্ত্রী তুলির টেলিফোনে আমার আবেশ কেটে যায়। আমি মোবাইল পকেটে রাখার জন্যে নিচু হতেই কে যেন বলে, ‘ ভাই কি বাংলাদেশি?’ আমি চমকে তাকিয়ে দেখলাম পঁচিশ/ছাব্বিশ বছরের হালকা পাতলা গড়নের এক যুবক ফলের ঠেলাগাড়ি নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
জী, আমি বাংলাদেশি। আমি হেসে বললাম।
কোথায় বাড়ি?
সিলেট। আপনার। আমি জিজ্ঞেস করলাম।
কিশোরগঞ্জ।
কী নাম আপনার?
বজলুর রহমান। আমারে সবাই বজলু ডাকে। যুবক বলে হালকা হেসে।
আমার নাম নাভিদ আহমদ। আমারে সবাই দীপ ডাকে।
স্যার, কেমন আসেন?
ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি?
আমিও ভালো। আপনি আমারে তুমি কইরা বলেন। বজলু আমার পাশে বসতে বসতে বলল।
বলব যদি আপনি আমাকে স্যার না বলেন। ঠিক আছে?
বজলু খুব লজ্জা পায় যেন। বলে ‘আপনি কি খুব ব্যস্ত? আমি বুঝতে পারলাম বজলু দেশের মানুষ পেয়ে কথা বলতে চাইছে। না, একটুও ব্যস্ত না। আমি বললাম। রাত নটা বাজে। কাল খুব সকাল হতেই আমার কাজ। কিন্তু বজলুর সরলতা, আর আগ্ৰহের উষ্ণতা আমাকে ভীষণ স্পর্শ করে। আমি নিজেও ওর গল্প শুনতে চাই।
আরেক কাপ চা খাইবেন? রাতের খাওন হইসে?
আমি খাবো দোনের কাবাব। তুমি?
আমিও ওইটাই।
আমি অনেক কষ্টে বজলুকে টাকা দেয়া থেকে বিরত রেখে দুটো কাবাব নিয়ে এলাম। এসে দেখি বজলু চা নিয়ে গুছিয়ে বসেছে। আমায় বজলু চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে কাবাবের প্যাকেট খোলে।
তারপর বজলু তোমার কাহিনী কী? ইস্তাম্বুলে কিভাবে আসলে?
লম্বা কাহিনী ভাই। তিন বছর আগে দালাল ধইরা আসসিলাম ইটালি যামু বইলা। তুরস্কে আইসা বর্ডারে ধরা খাইলাম। পুলিশ ইস্তাম্বুল আইনা ছাইড়া দিল। সেই থাইকাই এইখানে আসি। কী করবাম। ফলটল বিক্রি করি। কয়েকবার চেষ্টা করসি বর্ডার ক্রস করনের। পারি নাই। টেকা পয়সা সব গেসে। এখন ভয় করে। বজলু একনাগাড়ে কথা বলে থামে।
কীসের ভয়? আমি বলি।
ধরা পড়ার ভয়। সারা জীবন এইখানে আটকা পড়ার ভয়। দেশে না ফিরতে পারার ভয়। বজলু বলে। আপনার তো এই রকম কোনো ভয় নাই, তাই না ভাই?
না, নাই। বলার পরই বুঝতে পারি আমি মিথ্যা বললাম। আমারও ভয় আছে কত। জীবনে অসফল হবার ভয়। অর্থকষ্টে পড়ার ভয়। জীবনের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার ভয়।
তো তুমি এখন কী করবে? আমি বজলুকে জিগ্যেস করলাম।
কী আর করবাম। অপেক্ষা করবাম। বজলু বলে। আর আপনি? আপনি কী করবেন? ইস্তাম্বুলে থাইকা যাইবেন?
আমি বজলুকে বললাম যে আমি এক সপ্তাহের মতো ইস্তাম্বুলে আছি। তারপর আম্মানে যেতে হবে পরিবারের কাছে।
আমাদের কথা এগোয়। বসফরাসের নীল জলে শ্যাওলা ভেসে যায় অনিশ্চিত পথে। রাত গভীর হয়।
আজ বজলু বলেছে রাত দশটার পরে আসতে। ততক্ষণে কাজ গুছিয়ে কথা বলার সুবিধা হবে। আমি এক প্লেট বোরেক ( পনিরের পুর দেয়া সুস্বাদু তুর্কি রোল) আর চা নিয়ে বজলুর অপেক্ষা করছি। বজলু এসে বসেছে, আমাদের গল্প শুরু হয়। ইস্তাম্বুলের অনিশ্চিত জীবন, অবৈধপথে আসা বাংলাদেশি ও নানা দেশের শরণার্থীর সাথে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, পুলিশের তাড়া আর ধরা পড়লে নির্যাতন, দেশ হতে বারবার টাকা পাঠানোর তাগিদ, দালালচক্রের টাকা দেবার অসহনীয় চাপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন আইনের পরিবর্তন আর সেজন্য কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা উচিত তা নিয়ে বজলুর দ্বিধা ও শংকা, তুরস্কের সীমান্ত পুলিশ অথবা গ্রিস বা বুলগেরিয়ার সীমান্ত বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয়, সব মিলিয়ে বজলু এক জটিল সমস্যার মাঝে আছে। বজলুর জন্য সামনে এগোনো ভীষণ কঠিন আর পেছনে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। ইউরোপের ঝিকিমিকি আলোর হাতছানি যে এভাবে কত বজলুকে পথে বসিয়েছে তা হয়তো গুণে শেষ করা যাবে না। আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আছি অথচ আমাদের ভাবনাগুলো, জীবনের জটীলতা, চাওয়া পাওয়া কত ভিন্ন। আবার অন্যভাবে দেখতে গেলে সেগুলো প্রায় একই রকম। আমরা দুজনেই সচ্ছল সুখী জীবন চাই। পরিবারের সবাইকে ভালো রাখতে চাই। আমাদের দুজনের জীবনই কি কিছুটা শ্যাওলার মতো? দুজনই ভাসছি, দুজনই ছুটছি। সুখের মরীচিকার সন্ধানে।

অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর আমার মনে হলো বজলু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি বললাম, তোমাকে কেউ কি কখনও বলেছে যে তুমি একজন ভীষণ সাহসী মানুষ। আমার তোমার মতো সাহস নেই। আমি একজন ভীতু মানুষ। তোমার মতো জীবন বাজি রেখে আমি কখনো কিছু করিনি। ‘

বজলু একটু চা খায়, আমি অবাক হয়ে বাংলাদেশের এক অজানা গ্ৰামের অকুতোভয় তরুণকে দেখি। ইস্তাম্বুলের রাতের উজ্জ্বল আলোয় এরকম কত বজলুর স্বপ্ন যে হারিয়ে যায় প্রতিদিন, তা কি আমরা কখনো জানতে চাই?

কাল ইস্তাম্বুলে আমার শেষ দিন। আমি আর বজলু রাতের খাবার খাবার জন্য ফাতিহর কাছেই সাগর পাড়ে এসেছি। খাবারের পর সাগরের নোনা বাতাসে লম্বা শ্বাস নিয়ে বজলু ধরা গলায় হঠাৎ বলে, কতদিন মায়েরে জড়ায়ে ধরি না। কবে যে মায়েরে ধরতে পারমু তাও জানিনা।

আমি চুপ করে বজলুর কষ্ট বোঝার চেষ্টা করি। ‘আপনার কত মজা ভাই। যখন ইচ্ছা দেশে যাইতে পারেন। মারে দেখতে পারেন।’ এবার আমার বুক ভেঙে কান্না আসে। আমার বলতে ইচ্ছে করে, না বজলু, আমিও আমার মাকে বহুদিন দেখি না। আমার কাজ, আমার অর্থলিপ্সা, আমার নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার নেশায়, শুধুমাত্র নিজের ছোট পরিবারকে সচ্ছল রাখার লোভে আমি আমার মা থেকে কত দূরে। আমি লোভের কারণে আমার মা হতে দূরে, বজলু অভাবের তাড়নায় তার মা হতে। হয়তো বজলুর কোনো উপায় ছিল না, কিন্তু আমি জানি আমার ছিল। মানুষ হিসেবে আমি বজলুর কাছে ভীষণভাবে হেরে যাই। আমার তথাকথিত শিক্ষা কিশোরগঞ্জের এক সহজ সরল তরুণের অসহায়ত্ব ও সাহসের কাছে নিদারুণভাবে হার মানে।

মারমারা সাগরের নীল পানিতে আমি আমার মায়ের ছবি যেন ভাসতে দেখি। বহুদিন পর আমি কাঁদি। আমি কাঁদতে থাকি নির্লজ্জের মতো। বজলু আমার পিঠে খুব সঙ্কোচের সাথে হাত রাখে। ইস্তাম্বুলের রাতের নোনা বাতাসে ঢাকা শহরের আর কিশোরগঞ্জের গ্ৰামের দুই মায়ের দুই ছেলে তাদের ভালোবাসা, বেদনা আর মমতা ছড়িয়ে দিতে থাকে একই সাথে, পাশাপাশি বসে, দুই ভাই হয়ে।

আমি আম্মানে ফেরার জন্য প্লেনে বসে আছি। গতকাল আমি আর বজলু আমাদের মায়েদের ছবি মোবাইল দিয়ে দুজন দুজনকে পাঠিয়েছি। আমার বুকের ভেতর আজকে দুজন মা। আমার একটুও ভয় করছে না। কারণ আমার নতুন মা আর ভাইকে আমি আমার সাথে, আমার বুকের ভেতর নিয়ে চলেছি।

ইস্তাম্বুল, মে, ২০১৮

 

নাভিদ চৌধুরী
একজন উন্নয়ন কর্মী। বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। কাজের সূত্রে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র জনপদে তার যাবার, বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এই হঠাৎ দেখার গল্পগুলো, আচমকা ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, অতর্কিতে খোলা জানালা দিয়ে দেখা ক্ষণিকের সাথীর অনুভূতিগুলো তার লেখনীতে ধরা দিয়েছে। তার লেখায় ফুটে ওঠা মানবিকতা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা জাতির বিভেদ উপেক্ষা করে মানুষ‌ই মানুষের কাছে আসে, ভালবাসে। গল্পগুলো এই শ্বাশত মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।