নাভিদ চৌধুরীর ভ্রমণগদ্য-৪: দুটি বৃত্ত, দুই বন্দি

জবা খুব মনোযোগ দিয়ে ঝাড়ু দিচ্ছে। আমি কাছে একটি সিঁড়ির ওপর বসে চা খাচ্ছি। হঠাৎ করেই জবার ওপর চোখ পড়ে। লেবাননে এক লাখের ওপর বাংলাদেশি শ্রমিক আছেন। এর সি়ংহভাগই মহিলা, যারা গৃহকর্মী হিসেবে ঘরে কাজ করেন। এর বাইরে কিছু কাজ করছেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। অন্যান্য দেশ থেকে শিল্প কারখানার জন্য শ্রমিক নেয়া হলেও বাংলাদেশ থেকে মূলত নারী গৃহকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেয়া শুরু হয়। জবা তাদেরই একজন। কাজ করার সুবাদে আমার চলার পথে এদের মাঝে অনেককেই দেখার সুযোগ হয়। তবে কথা বলা হয় না কারণ কাজের ফাঁকে কারোরই কথা বলার অনুমতি নেই। আমি আজকে জবার সাথে কথা বলতে চাইছি, তাই সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।

বৈরুত আমার খুব প্রিয় শহর। একদিকে ভূমধ্যসাগরের নীল পানি আর অপরদিকে সবুজে ছাওয়া পাহাড়-ঘেরা বৈরুত ৫০-৬০ দশকে প্রাচ্যের প্যারিস নামে বিখ্যাত ছিল। আমি থাকি সাগরের পাড়ে হামরাতে। বৈরুত লেবাননে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীর পরিচয়ের ওপর চার ভাগে বিভক্ত। সুন্নি, শিয়া, খৃষ্টান ও দ্রুজ। বাইরে থেকে তা বোঝা বেশ কঠিন, খুব সূক্ষ্মভাবে দেখার চেষ্টা করলে একটু বোঝা যায়। বিদেশি হয়ে আরবী ভালোভাবে না জানা থাকলে লেবাননের অথবা গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জাতিগোষ্ঠীর সংঘাত বোঝা কঠিন। এই সংঘাত আর অবিশ্বাসই লেবাননের দীর্ঘ ১৫ বছরের গৃহযুদ্ধের কারণ। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত চলা এই প্রাণঘাতী যুদ্ধ বৈরুতের ভীষণ ক্ষতি করেছে। বহু নিরপরাধ মানুষ মারা গেছে, বসতভিটা হারিয়ে পথে বসেছেন অনেকে, অনেকেই লেবানন ছেড়ে হয়েছেন উদ্বাস্ত। এই যুদ্ধে এক সময় সিরিয়া ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো জড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধে বৈরুতের অপূর্ব অটোমান স্থাপত্যের অসম্ভব ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে পুরনো বৈরুতের। পুরনো বৈরুতের ঝালর দেয়া বারান্দা-ঘেরা বাড়ি, ঝুলবারান্দার বেলি, মাধবী আর গোলাপের লতা আর ঘোরানো কালো লোহার সিড়ি আমার অসম্ভব প্রিয়। ১৯৯০ সালে যুদ্ধের অবসানের পর বৈরুতকে আবার নতুন করে নির্মাণের কাজ শুরু হয় যা এখনো চলছে। ধীরে ধীরে বৈরুত আবার তার পুরনো সৌন্দর্য ফিরে পাচ্ছে।
বর্তমান লেবাননের বিশেষত্ব হলো তার আশ্চর্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। আবার তার উল্টোপিঠে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব। এই বৈপরীত্য লেবাননেই সম্ভব বলে আমার মনে হয়েছে। সাগর তীরে আমি প্রতিদিন রাতে হাঁটি। রাতের বৈরুতের মোহময়ী রূপ, আমার লেবানীজ বন্ধুদের ভালবাসা আর একদিকে সবুজ পাহাড়ে জংলিফুলে ঢাকা ছোট ছোট গ্ৰাম, বৈরুত এক সেলুলয়েডে চলমান স্বপ্ন যেন।

পরদিন সকালে এগারোটা বাজে। আমি জানি জবা এবার নাস্তা খেতে বসবে। কাল দেখেছি জবা সবার থেকে আলাদা খুব জড়োসড়ো হয়ে একটা কোনায় বসে বিস্কুট আর চা খায়। জবার ভীরু চোখের চাহনি, ক্লান্ত চেহারা আমাকে খুব ওর সাথে কথা বলতে আগ্ৰহী করছে। তাছাড়া আমি জবাকে মোবাইলে বাংলায় কথা বলতে শুনেছি। আমি আজ এখানে এসেছি অভিবাসী শ্রমিক বিশেষ করে নারী শ্রমিক যারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচারের ঝুঁকিতে আছেন তাদের নিয়ে জাতিসংঘ আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে। লেবানন সরকার অত্যন্ত আধুনিক ও সুসজ্জিত সম্মেলন কেন্দ্রে তা আয়োজন করেছে। আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, তার সাথে নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময় করার সুযোগও হয়েছে।‌ জবা এই কেন্দ্রের সামনের উঠান পরিষ্কার করার কাজ করে। অন্যভাবে বললে যাদের নিয়ে সভা হচ্ছে জবা তাদেরই প্রতিভু। আজ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন। গতকাল প্রথম দিন জবা ব্যস্ত থাকায় শুধু নাম জানার সুযোগ হয়েছে। জবার বাড়ি কুমিল্লায় আর আমার সিলেট। এর পর আর কথা এগোয়নি।

আমি এক কাপ কফি নিয়ে জবার কাছে সিড়ির ওপর বসি। কেমন আছেন জানতে চাইলে জবা বলে ভালো। কত দিন লেবাননে আছেন জানতে চাইলে জবা জানায় পাঁচ বছর। কিভাবে এলেন, আমি বলি।

দুলাল দালাল সব ঠিক করসে। জবা বলে। তাই? কেমনে সব করলো? আমারে বলবেন? আমি বলি, সে যেমনে কইসিলো আর যেমনে পরে আপনি লেবাননে আইলেন, আমারে একটু খুইলা বলবেন?

জবা এবার একনাগাড়ে বহু কথা বলে। বলে কীভাবে দালাল তার এক ভাইয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করে, প্রচুর খরচ করতে বাধ্য করে, তারপর বেতন নিয়ে মিথ্যাচার, লেবাননে কাজের চাপ, গাদাগাদি করে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় থাকার ব্যবস্থা, আরবী না জানায় চলাচলে সমস্যা, নিজে রান্না করে খাবার সমস্যা, ঘরে বাইরে যৌন ও অন্যান্য হয়রানির ঝুঁকি, অসুস্থ হলে কোনো স্বাস্থ্যসেবার অভাব সব মিলিয়ে জবা এক জটিল কঠিন অবস্থায় পড়েছে। আমার কাছে কয়েকবার মনে হয় জবা মনে হয় কেঁদে ফেলবে। কিন্তু ও কাঁদে না। কেমন নিশ্চল, শীতল স্বরে সব বলে যায়। আমি অবাক হয়ে শুনি।

আমি এবার জবাকে জিজ্ঞেস করলাম, যে দালানের সামনে ও কাজ করে তার ভেতরে আজ কী হচ্ছে ও জানতে চায় কি না। জবা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। আমি জবাকে যতটুকু সম্ভব বুঝিয়ে বলি খুব আগ্রহ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে। বলি যে এই সভা জবাদের জন্য, ওদের বেতন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য অধিকার আদায়ের জন্য।

এগুলা কইরা কিসুই হইবো না। জবা খুব বিজ্ঞের মতো বলে। দুলাল দালালরে কেউ কিছু করবার পারে না।’ আমারে মাসিক বেতন নিয়া যা বলসিলো তা থাইকা অনেক কম দেয়। কী করুম?’
আপনি চুক্তি পড়েন নাই?

আমরা কি অত বুঝি? আমাদের কি অত লেখাপড়া আছে? আরবী ইংরেজিতে লেখা আমি কেমনে বুঝুম?

আমি এবার খুব উৎসাহ নিয়ে জবাকে তার লেবাননে আসার আগে কী কী করা প্রয়োজন ছিল, আসার পর যে কোম্পানিতে কাজ করে সেখানে তার কী অধিকার, আর কোনো হয়রানি তা আর্থিক, সামাজিক বা যৌন যাই হোক না কেন, তা হলে কী করতে হবে তা বোঝানোর চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ পর আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম জবা আমার কথা শুনছে না, অথবা অন্যভাবে বললে এতে জবার কোনো আগ্রহ নেই।

ভাই আমি আমারে ভাগ্যের উপর ছাইড়া দিছি। আপনে কিছু করতে পারবেন না। কেউ কিছু করতে পারবে না। আমারে দুলাইল্লা ঠকাইসে। আমরা সবাই ঠকসি। জবা কেমন নির্বিকার গলায় বলে। আমার আবার মনে হয় জবা কাঁদবে, কিন্তু জবা কাঁদে না।
আমি কী বলব বুঝতে পারি না। হঠাৎ জবা বলে, আমি আগে সৌদিতে ছিলাম পাঁচ বছর। সেইখানেও অনেক কষ্ট হইসে। তারপরে দেশে ছিলাম। তিন বছর পর লেবাননে আসছি। জবা কথাগুলো বলে খুব সহজভাবে, যেন বারবার ঠকা, প্রতারিত হওয়া ওর ভবিতব্য।
আমি এবার বোকার মতো, একটু উত্তেজিতভাবে বলি, সৌদিতে এই ঘটনা ঘটার পর আপনি আবার লেবাননে আসলেন?

কী করুম পরিবার ঠেলায়া পাঠায় দিলো। ছোট ভাই-বোন আছে। বাবা কাজ করতে পারে না। মায়ের অসুখ। সবই কপাল। গরীব মানুষ। কী করুম? জবা বলে।
এবার আমার মনে হয়, আমার সভা নিয়ে, কাজ নিয়ে জবার কোনো আগ্রহ নেই। ও আমার কাছে, আমাদের কাছে, তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের কাছে, কোনো কিছুই আশা করে না। জবা বাড়ি ফেরার জন্য উঠে পড়ে।

আমি বৈরুতের সাগরের তীরে এসে বসি। পাড়ে আছড়ে-পড়া ঢেউ, পানির ঘূর্ণি দেখতে দেখতে আমার মনে হয় আমি ও আমার মধ্যবিত্ত সত্তা আর জবা ও জবার দারিদ্র্য, দুই ভুবনের আমরা দুজন দুটি ভিন্ন বৃত্তে বন্দী। আমার বৃত্ত শিক্ষা, আভিজাত্য আর বিত্তের, আর জবার দারিদ্র্য, হতাশা আর অশিক্ষার। আমার বৃত্ত শোষণ, দম্ভ আর প্রতারণর, জবার শোষিতের, মেনে নেয়ার আর সরলতার। আমার মধ্যবিত্ত বিবেকের কোনো অনুশোচনা নেই। জবার কোনো কিছুই আমার থেকে পাওয়ার আশা নেই। আমি জবার ভুল ধরিয়ে দিতে, ওর ওপর দোষ চাপিয়ে দিতে ব্যস্ত। জবা জানে না, বোঝে না, কী চতুর ভাবে তা আমি করছি যাতে মনে হয় দোষটা তারই। আমি জানি জবা আমার কাছে বারবার আসবে, জবা জানে আমার থেকে পালিয়ে ও কোথাও যেতে পারবে না।
আমি জবাকে আমার বৃত্তে ঢুকতে দিতে চাই না। জবা তার বৃত্ত থেকে চাইলেও বের হতে পারে না। আমরা দুজন, আমি আর জবা, দুটি মানুষ, দুটি বৃত্ত, দুই বন্দি। দূর হতে চেয়ে দেখি দুজনেই দুজনকে, অবিরল, অহর্নিশ, নিজের বৃত্তের গণ্ডিতে।

বৈরুত, লেবানন, জুন, ২০১৭

 

নাভিদ চৌধুরী
একজন উন্নয়ন কর্মী। বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। কাজের সূত্রে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র জনপদে তার যাবার, বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এই হঠাৎ দেখার গল্পগুলো, আচমকা ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, অতর্কিতে খোলা জানালা দিয়ে দেখা ক্ষণিকের সাথীর অনুভূতিগুলো তার লেখনীতে ধরা দিয়েছে। তার লেখায় ফুটে ওঠা মানবিকতা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা জাতির বিভেদ উপেক্ষা করে মানুষ‌ই মানুষের কাছে আসে, ভালবাসে। গল্পগুলো এই শ্বাশত মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।