নাভিদ চৌধুরীর ভ্রমণগদ্য-৬: বাবলা ফুল বা বেদুইনের গল্প

সন্ধ্যা নামছে ধীরে। আমি আকাশের লালিমা বিলীন হতে দেখছি দুরন্তে। জর্দানের রাজধানী আম্মান হতে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে কারাক প্রদেশের এক অপূর্ব সুন্দর ওয়াদিতে আমি আর বন্ধু দানিয়েল (দানি) এসেছি ক্যাম্পিং করতে। আমাদের পরিকল্পনা হলো শুক্রবার, শনিবার ট্রেকিং করা, তাঁবুতে থাকা, গান শোনা আর গল্প করে কাটানো যতক্ষণ জেগে থাকা যায়। আরবীতে মরুভূমির মাঝে বয়ে চলা ছোট পানির ধারাকে ওয়াদি বলে। রুক্ষ মরুভূমির মাঝে ওয়াদিগুলো যেন পটে আঁকা ছবি। আমরা আজ এসেছি ওয়াদি আল হাম্মাদে। হাম্মাদ বয়ে চলেছে দুটো গভীর দুর্গম পাহাড়ের মাঝের গিরিখাত দিয়ে। ওয়াদির দুদিকে বাবলা গাছের ঝোপ। বাবলা গাছের চিরল পাতা উটের খুব পছন্দ। বাবলার ঝোপে হলুদ ফুল ফুটে আছে। মনে হচ্ছে সন্ধ্যার আলো আঁধারে কেউ সোনালি দীপ জ্বালিয়ে রেখেছে।

আমাদের পাহাড়ের ওপর হতে নিচে নামতে বেশ কষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে অবাক লাগার কথা হলো মরু বা পাহাড়ে মাথার চাঁদি ফাটানো গরম হলেও ওয়াদি বেশ ঠাণ্ডা। পানির কুলকুল করে বয়ে যাবার শব্দ, পাহাড় হতে ঝুঁকে থাকা লাল, কমলা আর বেগুনী ফুল, ঘাস ফড়িং আর ছোট ছোট মুনিয়া পাখির দুরন্তপনা, পানিতে ভেসে থাকা সবুজ শ্যাওলার ভেসে বেড়ানো, আমি যেন এক স্বপ্ন দেখছি। দানি একমনে তাঁবু টানছে। আমি কয়েকটা ছোট পাথর কুড়িয়ে পানির কাছে বসে সেগুলোকে ছুড়তে থাকি, মনে হয় আমি যেন এক পথহারা নাবিক, যে প্রবালদ্বীপে উপল কুড়িয়ে যায় ঘরে ফেরার তাড়া না থাকায়। আবেশে আমার চোখ মুদে আসে, আমি পা ছড়িয়ে বসি রুপালি অগভীর স্রোতের মাঝে।
‘সালাম,’ আচমকা এক গভীর কণ্ঠ শুনে আমি চমকে উঠে তাকালাম। প্রথম কিছুই বোঝা গেল না হালকা অন্ধকারে।এবার আমি উঠে দাঁড়িয়ে ভালোভাবে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। লম্বা, ঋজু, বলিষ্ঠ, সুপুরুষ এক বেদুইন আমার দিকে নরম চোখে আগ্ৰহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, সালাম। এবার সে হেসে বলল, কাইফা হালুক (কেমন আছেন)? এবার উত্তর দেবার আগে আমি ভালো করে তাকালাম। চোখে ঘন সুরমা লাগানো, লম্বা কোঁকড়ানো চুল ঘাড়ের ওপর ছড়িয়ে পড়া, তরুন বেদুইন আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। আমি শংকিত স্বরে বলি, আলহামদুলিল্লাহ।

‘আনা আবদুল মজিদ।’

আনা নাভিদ আহমদ। আমি বলি।

আহলান ওয়া সাহলান, ইয়া আহমদ। ( স্বাগতম, আহমদ)।

আহলান বীক (সুস্বাগতম)। মজিদ আবার বলে।

মেজিদ একনাগাড়ে জোরে অনেক কথা বলে চলে। আমার খুবই সীমিত আরবী ভাষাজ্ঞান দিয়ে আমি কিছুই বুঝতে পারি না। দানি দৌড়ে আসে আর মজিদকে বকাঝকা করে, চলে যেতে বলে। আমি বারবার দানিকে বলতে চেষ্টা করি যে আমার মজিদের কথা শুনতে ভালো লাগছে। মজিদ হাত নেড়ে কিছু বলার চেষ্টা করে। আমি দানিকে জিজ্ঞেস করি মজিদ কী বলতে চাইছে।

মজিদ আমাদের ওর সাথে রাতের খাবার খেতে বলছে।

তুমি কী বললে?

আমি বললাম প্রশ্নই ওঠে না। এই নো্ংরা অসভ্য বেদুইনের খাবার আমরা খেতে পারি নাকি? দানি প্রচন্ড অবজ্ঞা নিয়ে বলল। মজিদ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যার আলো-আঁধারে আমি মজিদের চোখে অদ্ভুত আকুতি দেখতে পাই। আমাদের চোখাচোখি হয় দানির অগোচরে।
আমি খাবো।

মানে? তুমি ওর খাবার খেতে চাও? দানি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়। আমি উত্তর না দিয়ে মজিদকে কাছে ডাকি। মজিদের খুশি যেন আর ধরে না। মজিদ দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে দুই গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলে, আহলান হাবিবি। আমার হাতে ওর হাত জড়িয়ে আমায় পাহাড়ের ওপরে টেনে নিয়ে চলে।

দানি বলে, তোমার মত পাগল আমি আর একটি দেখিনি। এত কষ্ট করে এই অসভ্য বেদুইনের সাথে সময় নষ্ট করার কী দরকার?

আমরা আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে আছি মজিদ ‘গালায়েত বান্দোরা’ তৈরি করছে। আরবীতে টমেটোকে বান্দোরা বলা হয়া। ভেড়ার মাংস আর টমেটো দিয়ে তৈরি গালায়েত খুব সুস্বাদু হয়।

দানি মুখ গোমড়া করে দূরে পাথরের ওপর বসে আছে। আমার খুব অনুশোচনা হচ্ছে মজিদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য। কারণ আমি এর মধ্যে ওর থাকার কুঁড়েঘর দেখে এসেছি। ছোট ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর, ঠাণ্ডা মাটির মেঝে, জানালা দিয়ে দিনের বেলা মরুভূমির গরম আর রাতে শীতল বাতাস ঢোকে। চরম দারিদ্রের ছাপ সবদিক ছড়ানো। ঘরের বাইরে ভেড়া থাকার ঘেরা দেয়া জায়গা থেকে বোটকা গন্ধ ঘরে ঢুকছে। ঘরে একটা ছেড়া নোংরা পাতলা গদি আর কিছু পুরনো কাপড়। বাইরে এসে দেখি মজিদ আগুনের ওপর একটা ছোট কড়াইতে গালায়েত রান্না করছে। পরিমাণ খুব বেশি নয় কিন্তু মজিদের আনন্দ যেন ধরে না। মজিদ একমনে টমেটো আর মাংস নেড়ে যাচ্ছে আর আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। খাবার তৈরি করে মজিদ গুছিয়ে ছোট বাটিতে বেড়ে দেয় আর আমাদের দুজনকে দুটো করে খুবজ ( আরবী হাতেবানানো রুটি) দেয়। খুবই সাধারণ খাবার কিন্তু মজিদ এতো আদর আর মমতা দিয়ে আপ্যায়ন করে যে আমার মন ছুঁয়ে যায়। এক অচেনা বিদেশির জন্য এই গরীব বেদুইনের ভালবাসা আমাকে অসম্ভব স্পর্শ করে।

শুকরান, হাবিবি, খাবার খুবই মজা হয়েছে। আমি বলি।

আফওয়ান। মজিদ বলে। আর সেই থেকেই মজিদ আরবী রীতি অনুসারে মাংসের ছোট টুকরা আমার মুখে ওর কালো অপরিষ্কার আঙুল দিয়ে দিতে থাকে। আমি বারবার নিষেধ করার পরও শোনে না। দানি মজিদকে প্রচণ্ড বকা দিতে থাকে। আমি হঠাৎ লক্ষ্য করলাম মজিদ প্রায় কিছুই খায়নি, আমিই সব খেয়েছি। এত মমতায় আমাকে বহুদিন কেউ খেতে বলেনি।

প্রচণ্ড ঝড়ে সবকিছু তছনছ হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির ছাট ঘরে ঢুকছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমি আর দানি তাঁবুর ভেতরে ভীষণ ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছি। মজিদের ঘর থেকে বেরিয়ে ফেরার সময় বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। হঠাৎ তাঁবু উড়ে যায়। আমি ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেই হঠাৎ মজিদকে দেখতে পাই। মজিদ আমাকে জড়িয়ে ধরে ওর কুঁড়েঘরের দিকে নিয়ে চলে। প্রচণ্ড বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই।

ভোরের আলো ফোটার পর জেগে দেখি আমি মেঝেতে শুয়ে আছি। আমার আর দানির গায়ে মজিদের মোটা শতচ্ছিন্ন কম্বল। মজিদ ভাঙা দরজার সামনে ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে ঘুমিয়ে আছে। আমার জন্য, আমাদের জন্য এই বেদুইনের মমতা আমায় ভীষণ ছুঁয়ে যায়। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, মমতা আর শ্রদ্ধা যে কত গভীর হলে মজিদ যা করেছে তা করা যায় আমি যেন আজ তা সামান্য বুঝতে পারি। আমার শিক্ষা আমাকে যেন মজিদের স্তরে ওঠাতে পারেনি।

আমি ভোরের আলোয় একা খালি পায়ে ওয়াদির নীল স্রোত ছুঁয়ে হাটছি।
হঠাৎ কে যেন পেছন হতে বলে, সাব্বা আর খায়ের ( শুভ সকাল)।
সাব্বা আর নুর। আমি বললাম। মজিদ স্মিত হেসে আমার হাত ধরে। বলে, ইয়াল্লা, হাবিবি ( চল, প্রিয়)।

সকালের বাবলা ফুলকে আমার আজ বেশি উজ্জ্বল মনে হয়। পৃথিবীকে পেছনে ফেলে আমি হেঁটে চলি পরম নির্ভরতায়, এক অচেনা বেদুইনকে সাথে নিয়ে। আলো ফোটার বাবলা ফুল আমায় ডাকে।

অক্টোবর, ২০১৯, কারাক, জর্ডান

 

নাভিদ চৌধুরী
একজন উন্নয়ন কর্মী। বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। কাজের সূত্রে বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিচিত্র জনপদে  যেয়ে বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। এই হঠাৎ দেখার গল্পগুলো, আচমকা ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, অতর্কিতে খোলা জানালা দিয়ে দেখা ক্ষণিকের সাথীর অনুভূতিগুলো তার লেখনীতে ধরা দিয়েছে। তার লেখায় ফুটে ওঠা মানবিকতা, ভালোবাসা আর সহমর্মিতা পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র বা জাতির বিভেদ উপেক্ষা করে মানুষ‌ই মানুষের কাছে আসে, ভালবাসে। গল্পগুলো এই শ্বাশত মানবিকতার প্রতিচ্ছবি।
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।