নাহার তৃণার গল্প: গন্তব্য অচিনপুর

চারপাশের শুনশান নীরবতা মেখে দুপুরটা গুটি গুটি পায়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে। পরিস্হিতি স্বাভাবিক থাকলে এসময় এখানে ভালো সংখ্যক ছন্নছাড়া লোকজনের দেখা মিলতো। আজকাল অনেক কিছু বদলে গেছে। করোনা নামের এক ভাইরাসের চোখ রাঙানিতে মানুষের হালুয়া টাইট অবস্হা। তারপরও হম্বি তম্বির শেষ নাই। অনেকক্ষণ সে এখানে ঘাড় গোঁজ করে বসে আছে। একবার মাথা তুলে চারপাশটা দেখে নেয় মতি। কথা মতো এখনও কেউ এসে পৌঁছায়নি। মতি সবার আগে পূর্বনির্ধারিত জায়গায় পৌঁছে অন্যদের জন্য অপেক্ষা করছে। দিনকাল মোটেও সুবিধার না। যে কোনো সময় দলের যে কেউ ধরা পড়তে পারে। কতদিন আর পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো যায়! ডিসেম্বরের মধ্যেই নাকি ওদের বিষয়ে কিছু একটা হেস্তনেস্ত করা হবে। এই খবর এখন বাতাসে উড়ছে। আর সে কারণেই আজ ওরা বৈঠক ডেকেছে। ওরা কেউ-ই ধরা পড়তে ইচ্ছুক নয়। পরিস্হিতি মোকাবেলায় কি করা দরকার, সেসব নিয়ে আজকের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু এখনও কারো দেখা নাই। সময়জ্ঞান বিষয়ে সচেতন থাকাটা যে জরুরি এটা সবাই বুঝে না। এ বিষয়ে মতি বরাবরই খুব যত্নবান। আজ পর্যন্ত কোথাও পৌঁছাতে সে দেরি করেছে এমন বদনাম তার শত্রুও দিতে পারবে না। সরলা অবশ্য এ নিয়ে কম ঝামেলা পাকাতো না। কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে মতির ব্যস্ততা দেখলে নানা কাজের বায়না এনে হাজির করতো। তাড়ার অজুহাতে মতি নিস্তার পাওয়ার চেষ্টা করা মাত্রই চোখ-মুখ খিঁচিয়ে শুরু করতো বাক্যবাণ। সরলার হুল ফোটানো শব্দ বাণে ধরাশায়ী হওয়ার আগেই মতি তড়িঘড়ি পালিয়ে বাঁচতো…।

এই প্রায় নিস্তরঙ্গ মুহূর্তে সরলার মুখটা মনে পড়ায় মতির বুকের ভেতরটা কেমন একটা করে। সরলা বিষয়ক স্মৃতির ঝাঁপি খোলার আয়োজনের মুখে ওমর এসে উপস্হিত। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে দৌড়ে এসেছে। হাঁপাচ্ছে রীতিমত। বুকের খাঁচাটা ওঠা-নামা করছে তীব্রভাবে। মতি উঠে এসে ওমরের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। ছেলেটার হাঁপের টান আছে, ছুটোছুটিতে কাবু হয় চট করে। মতি দরদ মাখানো গলায় বলে— খামোখাই ছুটে ছুটে এলে। আমি ছাড়া কেউ আসেনি এখনও। বসো, খানিক জিরিয়ে নাও। একটু পানি খেলে ভালো লাগতো। বলে পানির খোঁজে ইতিউতি তাকায়।

পরিত্যাক্ত এই পার্কটায় ঢোকার মুখে দশাসই শরীরের একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ দাঁড়িয়ে। ওটা লাগোয়া একটা কল আছে। বহুদিন তাতে পানি নাই, জং পড়ে গেছে কলের মুখে। পথের হাভাতে তৃষ্ণার্তদের নিয়ে এই শহরের খুব একটা মাথা ব্যথা নাই। তারা ক্ষুদা-তৃষ্ণায় মরলে কার কি যায় আসে! ভবঘুরে মানুষেরাই পাত্তা পায় না, তো ওদের মতো সারমেয়দের নিয়ে ভাবতে কারো বয়ে গেছে। এখন তো আবার তাদের নামে অলিখিত হুলিয়া জারি হয়েছে। প্রতি বছর বিশেষ করে ভাদ্র-আশ্বিনে নামকাওয়াস্তে বেওয়ারিশ সারমেয় ধড়-পাকড় চলে। কিন্তু এবার যেন বেশিই হচ্ছে। এ বছরটাই অভিশপ্ত। এর আগে বেওয়ারিশ সারমেয়দের নিয়ে দেশজুড়ে এত হই-হট্টগোল চোখে পড়েনি। কিছু মানুষের খেয়ে কোনো কাজ নাই, ব্যানার নিয়ে পথ ঘিরে দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু ব্যানারে আশ মিটছে না। মাতব্বর গোছের কেউ কেউ সিটি করপোরেশনের উদ্দেশ্যে রাগী রাগী গলায় দাবী জানাচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যে শহর থেকে পথের কাঁটাগুলোকে না সরালে নতুন বছরে নাকি বড় আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে। কোথাও কোথাও অবশ্য ওদের পক্ষ নিয়ে পথে নেমেছে গুটি কয়েকজন মানুষ। ফেসবুক নামের এক আজব দুনিয়া আছে, সেখানেও নাকি মানুষ তাদের নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে হিট ইস্যু খেলায় মেতেছে।

ঢাকা শহরে যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন সারমেয়ের সংখ্যা বেশি। হবে নাই বা কেন। খাওয়া না পেয়ে গ্রাম থেকে জালে-পালে সব হাভাতের দল শহরে এসে ভিড় করছে। যেন শহরে ওদের জন্য কেউ ভাতের হাঁড়ি নিয়ে বসে আছে! শহর জুড়ে বেশুমার পয়দাও নেহায়েত কম হচ্ছে না। খোদ রাজধানী শহরে মতির জন্ম। সে নিজেও এত সারমেয় আগে দেখেনি শহর জুড়ে। কিন্তু কথা হলো বাঁচার অধিকার তো সবারই আছে। ইতর প্রাণী বলে ওদের সাথে যা খুশি করা হবে নাকি! মানুষগুলো বড়ই স্বার্থপর। কাজ ফুরালে পিঠ দেখাতে ওস্তাদ। মতি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই সত্যিটা হাড়ে হাড়ে জানে। বহুদিন আগে এক বাড়িতে সে কিছুদিন পাহারার কাজ করেছিল। বাড়ি পাহারার জন্য একজন দারওয়ান অবশ্য ছিল। কিন্তু সে লোক মালিকপক্ষের অগোচরে কাজে খুব ফাঁকি দিতো। মতিকে পাহারায় বসিয়ে ব্যাটা নিজে মোবাইলে মগ্ন থাকতো আর সুযোগ পেলে ঠেসে ঘুমিয়ে নিতো। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে মাঝে মধ্যে রাতে পাঁচিল টপকে কোথাও একটা চলে যেত। ভোরের আগে আগে ফিরে এসে মতির উপর ব্যাপক চোটপাট করতো— কি রে কাজে ফাঁকিবাজি করোস নাই তো? বলে মতির পেটে কষে একটা লাথি মারতো। যখন তখন লাথি মারাটা ব্যাটার কাছে একটা মজার খেলা ছিল। দু’বেলা বরাদ্দ খাবারের মায়াতে মতি খুব ট্যাঁ ফো করতো না। তার খুব ইচ্ছা হতো দেয় কষে এক কামড়! একদিন রাতে সেই ব্যাটা দারওয়ান খুব আদর করে তাকে খেতে দিলো। খাওয়াটা বেশ মজাদার ছিল। খাওয়ার কিছু পর মতির আর কিছুই মনে ছিল না। ঘুমের অতলে তলিয়ে গিয়েছিল। সকালে অনেক মানুষের হইচইয়ের ভেতর ঘুম ভেঙে দেখে বিরাট কাহিনি হয়ে গেছে। রাতে বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। গাড়ি বারান্দায় থাকা গাড়িসহ সোনার গহনা, দামী যা পেয়েছে সবই তুলে নিয়ে গেছে ডাকাত দল। দারওয়ানটাকে মারধোর করে একটা চেয়ারে পিছমোড়া করে বেঁধে রেখে গেছে। মতি মোটেও বোকা নয়। এই পুরো ঘটনার সাথে যে দারওয়ানটাও জড়িত সেটা বুঝতে তার দেরি হয়নি। ব্যাপারটা জানান দিতে স্বভাব সুলভ ঘেউ করে উঠেছিল। বিনিময়ে জুটেছিল বেমক্কা জোড়ালো এক লাথি! রাগে অভিমানে মতি ও বাড়ি ছেড়ে পথে নেমেছিল। সেই থেকে সে পথে পথে ঘুরে ফেরা বেওয়ারিশ একজন।

ওমর ছেলেটার জন্য একটু পানির ব্যবস্হা করা দরকার। কিন্তু সুবিধা মতো কিছুই নাই আশেপাশে। রাস্তার ওপাশে গুটি কয়েক দোকান খোলা দেখতে পায় মতি। কিন্তু ওদিকটায় যাওয়ার সাহস পায় না। এখন ওদের দেখলেই লোকজন ক্ষেপে যায় দারুণ। অবশ্য পুরোপুরি দোষও দেয়া যায় না। ওদের কেউ কেউ আসলেই খুব বজ্জাতি করে কোনো কোনো লোকালয়ে। আর ভাদ্র মাস এলো ওদের কারো কারো মাথা পুরো বিগড়ে যায়। কতিপয় সারমেয়ের যন্ত্রণায় বাচ্চাদের খেলাধুলোও নাকি কোথাও কোথাও বন্ধ হবার অবস্হা। মতি আজ পর্যন্ত কারো যন্ত্রণার কারণ হয়নি এটা সে হলফ করে বলতে পারে। কিন্তু সে ভব্যতা জানে বলে তো আর ওর পুরো জ্ঞাতিগুষ্টি সেরকমটা নয়। বজ্জাতের সংখ্যাই বরং বেশি। সে তো মানুষের মধ্যেও আছে। কিন্তু তাই বলে তার শাস্তি হিসেবে ওদের মেরে ফেলা হবে! গদামঘরের মতো দমবন্ধ করা এক জেলখানায় আটকে রাখবে! না ওরা কিছুতেই ধরা দেবে না।

ওমর এখন কিছুটা ধাতস্হ। মতিকে ছুটে আসার কারণটা এবার সে আস্তে ধীরে বলতে পারে। শখ করে ছুটেনি সে, জান বাঁচাতে ছুটতে হয়েছিল। এখানে আসবার জন্য ওরা পাঁচজনে দল বেঁধে রওনা দিয়েছিল। দুলুটার ছুকছুকানি যে একটু বেশি সে তো জানোই। ওর কাছে খবর ছিল দেবদারু গাছওয়ালা বাড়িটায় আজ ব্যাপক খাওয়া দাওয়ার আয়োজন হবে। সন্ধ্যায় হয়ত কোনো অনুষ্ঠান আছে। বড় বড় ডেকচি এসেছে ভ্যানে চড়ে গতকাল রাতে। দুলু নিজের চোখে দেখেছে। তাই তার ইচ্ছা ওই দিকটা ঘুরে তারপর তারা বৈঠকের জন্য পার্কের দিকে চলে আসবে। ভাগ্য ভালো হলে, ভালোমন্দ খাবার কিছু জুটেও যেতে পারে। ভুলু যেতে চায়নি। ওমরও ভুলুর কথায় সায় দিয়েছিল। কিন্তু বাকি তিনজনের অতিরিক্ত উৎসাহের কাছে সেটা ধোপে টিকেনি। তারপর আর কি, দল বেঁধে পাঁচ-পাঁচটা সারমেয়কে আর্বিভূত হতে দেখে অনুষ্ঠান বাড়ির কেউ ই যে জামাই আদরে আপ্যায়ন জানাবে না সেটা তো ভুলু আর সে জানতোই। জলন্ত চ্যালাকাঠ, লোহার রড যে যা হাতের কাছে পেয়েছে তাই নিয়ে ওদের এমন ধাওয়া করতে পারে এতটা অবশ্য ভাবেনি। জান বাজি রেখে দৌড়েছে ওমর। পেছনে ওদের কেউ ধরা পড়েছে সেটা বুঝেছে। কাঁউকাঁউ করুণ চিৎকার কানে এসেছিল। কিন্তু ফিরে তাকানোর সাহস পায়নি। স্বার্থপরের মতো টানা দৌড়ে এখানে পৌঁছেছে। আমাদের দেখেই মানুষগুলোর মাথায় কেমন খুন চেপে গিয়েছিল। এক নাগাড়ে পুরোটা বলে ওমর চুপ করে যায়।

মতি বলার মতো কথা খুঁজে পায় না। বিষন্ন চোখে ওমরের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেয়। বিকেলটা এখন পেকে উঠেছে। কমলাপাকা রোদে পার্কের এই অংশটা ছেয়ে আছে। এরকম অপার্থিব সুন্দর পরিবেশে দুটো বেওয়ারিশ কুকুর কুৎসিতভাবে দৃশ্যের ছন্দপতন ঘটিয়ে মুখোমুখি চুপচাপ বসে থাকে।

দুজন কতক্ষণ ওভাবে বসেছিল জানা নাই, গমগমে একটা গলা শুনে চমক ভাঙে। ওদের থেকে হাত দুয়েক দূরে এতক্ষণ কেউ বসেছিল এটা চোখেই পড়েনি দুজনের কারো! উস্কোখুস্কো চুল দাড়ি, আর রঙবে রঙের তাপ্পিমারা পোশাকের ওরকম একজনকে চোখেই পড়লো না ব্যাপারটা কেমন আজগুবি মনে হয় মতির। ‘অতি লোভে শুধু তাঁতি না, কুকুরও মরে!’ গমগমে গলায় লোকটা আবারও বলে ওঠে। মতি কিংবা ওমরের কিছুই ঠাহর হয় না কি বলতে চাচ্ছে লোকটা। ওদের হাবভাব বুঝে গিয়ে অদ্ভুত পোশাকের লোকটা কিছুটা কাছ ঘেঁষে আসে। ওমরের পিঠে আলতো একটা হাত রেখে প্রশ্ন করে একটু পানি খাবি রে ব্যাটা? ওমর কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জোব্বার পকেট থেকে পানির বোতল বের করে ওর মুখের সামনে ধরে। হাঁ কর। বাধ্য ছেলের মতো ওমর হাঁ করে বেশ অনেকটা পানি খায়। মতিও বাদ যায় না। ঠাণ্ডা পানি খেয়ে দুজনের বেশ আরাম লাগে।

তোদের এজেন্ডাটা কি? অতি লোভের মাশুল দুলুকে দিতে হয়েছে। দুলুর আর আসা হবে না। বাকিরা এই এলো বলো। কিন্তু কি করতে চাস তোরা? এই শহরের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবি? সেটা কি সম্ভব? তারচে’ এই লোকালয় ছেড়ে এমন কোথাও চলে যাবি যেখানে তোদের কেউ উপদ্রপ মনে করবে না? কি জানিস, একটা সভ্য শহরের চারপাশে বেওয়ারিশ কুকুর ঘুরঘুর করছে দৃশ্যটা সত্যিই পীড়াদায়ক। পৃথিবীর বড় বড় সভ্য দেশগুলোর শহর ঘুরেও তুই তোর কোনো স্বজাতির দেখা পাবি না। হয় ওরা কারো পোষ্য, নয় ওদের জন্য নির্ধারিত বাসস্হানে দিব্যি থাকছে। ওসব দেশে বরং আমার মতো বেওয়ারিশ মানুষের দেখা পাওয়া সহজ, সেটা কি জানিস! আবার কোনো কোনো দেশে খাদ্য হিসেবেও তোদের খুব চাহিদা। এদেশে রেওয়াজটা এখনও অতটা চালু হয়নি। একটা সময় হবে। তখন হয়ত কদর বেড়ে যাবে তোদের। বলে খ্যা খ্যা করে হেসে ওঠে লোকটা।

দুলুর কথা ভেবে মতি আর ওমর বিলাপ করে কিছুক্ষণ। ওদের নিজস্ব ভঙ্গিতে আহাজারির দৃশ্যটা লোকটা চুপচাপ দেখে। তারপর পরম মমতায় দুজনের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। মতির কেন জানি বহু বহু বছর পর মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। চোখ বুজে সে মানুষটার হাতের মমতাটুকু বুকের ভেতর পুরে নিতে থাকে। ওমর এখনও কেঁদে যাচ্ছে। ওকে কাঁদবার সময় দেয় ওরা। মতি আরেকটু কাছ ঘেঁষে বসে ওমরের। দুলু আর ওমর এক সাথে বড় হয়েছে। কতদিনের বন্ধুত্ব— এক নিমিষে সবটা অতীত হয়ে গেল! ভস্ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মতি লোকটার দিকে মুখ তুলে তাকায়।

কে এই লোক। ওরা কি করতে চায় সেটা জেনেই বা ওর কী লাভ? লোকটা কি ওদের হয়ে সমাধানের সুন্দর কোনো পথ দেখাতে পারবে? ওই যে বললো কোথায় নাকি কোন দেশ আছে যেখানে ওদের মতো প্রাণীদের যত্নে রাখা হয়। সেই দেশ কতদূর? লোকটা কি জানে সেই দেশের পথ কোন দিকে? নিজের ভেতর আর কৌতূহল চেপে রাখা সম্ভব হয় না মতির। দুম করে বলে বসে, আসলেই আছে ওরকম কোনো দেশ, যেখানে আমাদের বাঁচবার অধিকার আছে? খুব আছে! খুব আছে! একই কথা দু’বার বলে লোকটা। যাবি সেখানে? সরাসরি মতিকে প্রশ্নটা করে লোকটা, আরো বলে— এই শহরে থাকলে বাঁচবি না তোরা— তারচে বরং চল একটা মজা করা যাক। এই শহরের, না শুধু এই শহরের না আশেপাশের যত শহর আছে, সেখানে তোদের মতো যত জন আছে সবগুলোকে সেইরকম একটা দেশে চালান করে দেই। তারপর তোরা সবাই রাজা তোদের সেই নিজের রাজত্বে! কেমন হয়? লোকটা কখন জানি উঠে দাঁড়িয়েছে। কোমরে দু’হাত রেখে প্রশ্নটা করে নীচে বসে থাকা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা মতি আর ওমরকে।

ওরা কিছু বলার আগেই প্রায় একসাথে ভুলুসহ বাকিরা এসে উপস্হিত হয়। দুলুর সত্যিই আসা হয় না। জলন্ত চ্যালাকাঠ ছুঁড়ে মানুষেরা প্রথমে তাকে আহত করে, পরে রড দিয়ে পিটিয়ে মেরেছে। ছেলেটাকে বাঁচাতে গিয়ে ভুলুর একটা চোখ গেছে। জানটা নিয়ে কোনো রকমে পালাতে পেরেছে। ভুলুর মুখে পুরো ঘটনা শুনে বন্ধু হারানোর শোক নতুন করে উথলে ওঠার পাশাপাশি কম আশ্চর্য লাগে না মতির। পার্কে বসে লোকটা কীভাবে জেনেছে সে খবর!

আলোচনা শুরুর আগে ভুলুর চোখের শুশ্রূষা হয়। সেটা করতে গিয়ে লোকটার জোব্বার পকেট থেকে কত কী যে বের হয়! ওরা চুপচাপ সবটা দেখে। আরো কিছু সময় যায় ওভাবে। নিজেরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে লোকটার দেয়া প্রস্তাবের কথাটা জানায় মতি ওদের। ভুলু পারলে তখনই রওনা দেয়। পেচুর বুদ্ধিসুদ্ধির উপর ওরা সবাই খুব ভরসা করে। কাজেই পেচুর উপর দায়িত্ব পড়ে মতামত জানানোর। লোকটা তার জোব্বার পকেট থেকে ঢাউশ একটা প্যাকেট বের করে তা থেকে বিস্কুট জাতীয় খাবার দেয় ওদের সবাই কে। সারাদিন কারো কিছু খাওয়া হয়নি। সামনে খাবার দেখে কেউ আর আপত্তি করে না। চুপচাপ সবাই পেট ভরে বিস্কুট খেয়ে নেয়। পানির বোতলও খালি হয় গোটা কয়েক। লোকটার জোব্বার ভেতর আরো কত কিছুই না জানি আছে! ওমর ভাবে। খাওয়া শেষ করে সিদ্ধান্ত নিতে নিতে ছিপছিপে সন্ধ্যাটা পার্কের ভেতর এসে দাঁড়ায়।

লোকটা দারুণ উৎফুল্ল হয়ে দুহাত উপরে তুলে ওদের সবার উদ্দেশ্যে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ওঠে, তবে আর দেরি কিসের। আমার পেছন পেছন চল সবাই—

লম্বা লম্বা পা ফেলে আজব পোশাকের লোকটা ছিপছিপে সন্ধ্যাটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে হাঁটা দেয়। তার পেছন পেছন নীরবে হেঁটে যেতে থাকে মতি আর বাকি সঙ্গিরা। ওদের সবার চোখেমুখে নিজেদের একটা দেশ পাওয়ার আশা জ্বলজ্বল করতে থাকে। যেন অন্ধকারে ফুটে থাকা জোনাক পোকা! অল্প সময়ের মধ্যে লোকটার পেছন পেছন চলমান সারমেয়ের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়। তারপর চক্রকারে সে সংখ্যা কেবল বাড়তে থাকে। বাড়তেই থাকে। মৃদু অন্ধকারে আকাশ পথে দূর থেকে ওদের চলমান লম্বা সারিটা দেখে মনে হয় সার বেঁধে কোথাও চলেছে জোনাক পোকার দল। শহরবাসীর অগোচরে অভূতপূর্ব একটা কাণ্ড ঘটে যায় এই শহরে। যদি শহরবাসীর পক্ষে ঘটনাটা জানতে পারা সম্ভব হতো, তবে তাদের মনে পড়ে যেত বহু বহু বছর আগের এক বাঁশিওয়ালার কথা, যে এক শহরের তাবত ইঁদুর ঝেটিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আর শহরটার কপালে শান্তির বদলে নেমেছিল অশেষ ভোগান্তি।

 

নাহার তৃণা

ন্ম ২ আগস্ট ঢাকায়। বর্তমানে আমেরিকার ইলিনয়ে বসবাস। ২০০৮ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে লিখছেন গল্প, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। একইবছর অন্বয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘এক ডজন ভিনদেশী গল্প’। নাহার তৃণার প্রকাশিত বই দুটি এখন বইয়ের হাট প্রকাশনায় অ্যামাজন কিন্ডেলেও পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।