লুনা রাহনুমার দু’টি অণুগল্প

কন্যার সুখ

ইলিশ-পটলে পেট পুজো করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে মতিন।

স্বামীকে খাবার দিয়ে রাহেলা নিকটে দাঁড়িয়ে থাকে ঘরের বেড়ায় হেলান দিয়ে। স্বামীর খাওয়া দেখে আর উদাস চোখে কী জানি ভাবে। 

মতিন হুইল সাবানে হাত কচলাতে কচলাতে বলে, “বউ, তুমি খাইবা না?”

মায়াভরা এই সহজ ডাকের কোনো উত্তর দেয়না রাহেলা। ভাঙা ট্যাপের মতো নল লাগানো তার চোখ দুখানা মুছে নেয় ময়লা শাড়ির আঁচলে। শুষ্ক আকাশের দিকে চেয়ে থাকে ক্ষণেক। বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করে উঠে রাহেলার। বাপজানের কথা মনে পড়ছে খুব। 

হালের গরুটা বিক্রি করে যৌতুক দিয়েছিলো বাপজান। কতোদিন জানি না খায়া রইছে তার বাপ!

 

মনের ঘরে একটি পোকা 

খাসা রেঁধেছো তো আজ কই মাছ আর মটরশুঁটির তরকারিটা”, গরম ভাতের সাথে তেলা-কৈয়ের ঝোল মাখতে মাখতে বলে প্রবাল, “সু, আরেকটু লেবু চিপে দাও আমার ভাতের উপর।”

সুপ্রিয়া ভালো রাঁধুনি। দেশি বিদেশী সব রকমের রান্না ওর হাতে দারুণ স্বাদের হয়। আর প্রবালটাও মিলেছে একটা পেটুক। বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটা, মৌসুমের প্রথম ফলটা, তাজা সবজির আঁটি – ব্যাগে ভরে বাড়ি নিয়ে আসে। 

কাল শনিবার, দুপুরে তোহা ভাইয়ের ছেলের জন্মদিনের দাওয়াত আছে, গিফট কিনে ফেলো একটা আজ।”

বরিস জনসন লকডাউন দুই মিটার থেকে কমিয়ে এক মিটার করেছে, ব্যস পার্টি শুরু, পুলিশ ধরলে ফাইন করবে না!” 

বাড়িতে তো গেদারিং করছেনা, লিডিয়ার্ড পার্কে। তোহা ভাবীর স্পেশাল বিরিয়ানি, বোরহানি আর কী কী যেন রান্না করে নিয়ে আসবে বলছিলো। সোশ্যাল ডিস্টেন্স মেইনটেইন করে বসবো আমরা, আর বাচ্চারা একটু খেলতে পারলো একসাথে। “

সুপ্রিয়া ও তাদের বন্ধুরা ভীষণ ক্লোজ। প্রতি সপ্তাহে এর ওর বাড়ি দাওয়াত, চা পান, ওয়ান ডিস্ পার্টি, পিঠা পুলি, আর বাচ্চাদের জন্মদিন বা বড়োদের বিয়ে-বার্ষিকী তো লেগেই আছে। এখন করোনা ভাইরাসের কারণে ইংল্যান্ডে লকডাউনের চতুর্থ মাস শেষ হচ্ছে প্রায়। আচমকা এই করোনা ফরোনা এসে সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। এখন জুম আর ফেইসটাইম করে দেখা সাক্ষাৎ হয় সবার। 

প্রবালের সাথে সুপ্রিয়ার সুখের সংসার। দুটিতে মতের অমিল হয় খুব কম। তাই তারা যৌথ জীবনের সকল সিদ্ধান্ত দুজনে মুখোমুখি বসে আলাপ করে ঠিক করে সবসময়। ঘরের দেয়াল, মনের দেয়াল, আর শরীরের দেয়ালের রং নির্বাচন করে দুজনে একসাথে মিলিয়ে মিলিয়ে। 

সকালে প্রবাল অফিসে আর বাচ্চারা স্কুলে চলে যাবার পর সুপ্রিয়া বাড়িতে একা। এটা তার একার সময়, নিজের সময়। সিডিতে শ্রীকান্তের গান হালকা ভলিউমে অন করে গরম চায়ের কাপ নিয়ে জানালার পাশে বসে সুপ্রিয়া। ভাবছে, আগামীকাল পার্কে শাড়ি পরবে নাকি জিন্স পরে যাবে। এখন যদিও জুন মাস, হিসেব অনুযায়ী সামার হবার কথা কিন্তু ব্রিটিশ আবহাওয়া, কয়েকদিন থেকেই যা ঠান্ডা বাতাস বইছে! 

দোহা ভাইদের পার্টিতে কাল শ্যামলীদিও আসবে নিশ্চয়ই। শ্যামলীদি- লম্বা, শুকনো, গায়ের রং কালো, দাঁত উঁচু খুবই সাধারণ মুখের মানুষ। তবে খুব মিষ্টি করে কথা বলেন, কণ্ঠে যেন মধু মাখা। কিন্তু রূপের অভাবে বিশেষ করে না তাকালে তার দিকে কারুর চোখ পড়ে না। অথচ এই অসুন্দর মানুষটিকে নিয়েই সুপ্রিয়ার মতো দারুণ স্মার্ট, সুদর্শনার ভীষণ অস্বস্তি।

সিডিতে শ্রীকান্তের কণ্ঠে গান বাজছে, “মেঘ কালো আঁধার কালো আর কলঙ্ক যে কালো….. “, এই গানটিই তো বাজছিলো সেদিন সুপ্রিয়ার বাড়িতে, ছেলের দ্বিতীয় জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। ঘরভর্তি মেহমান, সুপ্রিয়া ছুটছিলো সবখানে, সবাইকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত। 

হঠাৎ করে চোখ পড়েছিল ঘরের দরোজায়, ঘরে ঢোকার মুখে ছোট্ট যে কর্নারটি আছে সেখানে বুকশেল্ফের পাশে মোড়াতে বসে আছেন শ্যামলীদি, আর প্রবাল হাঁটু গেড়ে বসে, মুখোমুখি, হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছে। ঘরভর্তি মানুষের আড্ডার শব্দে প্রবালের কোনো কথা শুনতে পায়নি সুপ্রিয়া। কিন্তু চোখের দৃষ্টি দেখেছে। 

প্রবালের চোখের সেই দৃষ্টি এখনো মনে আছে সুপ্রিয়ার। এতো প্রশংসা, এতো ভালোবাসা, এতো আদর আহ্লাদ, এতো সমঝোতা যে সুপ্রিয়ার সাথে, কই তার জন্য তো এমন আলো জ্বলতে দেখেনি কোনোদিন প্রবালের চোখে। লোডশেডিংয়ের ঘুটঘুটে অন্ধকারে ধপ করে জ্বলে উঠা একটি ম্যাচের কাঠির মতো তীব্র অথচ ভীষণ কোমল সেই আলো। 

বুক জ্বলে যায় সুপ্রিয়ার। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, আর এখনই দুই মিটার কমিয়ে এক মিটার করতে হলো তার! থাকতো কড়া লকডাউন আরো কয়েকটা মাস। ভীষণ মাথামোটা হ্যান্ডসম বরিস জনসন।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।