অঘ্রানের অনুভূতিমালা: অবদমিত আকাঙ্ক্ষার আগুন

যে দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য কবি বিনয় মজুমদার বাংলা কবিতার ভূবনে অমর হয়ে থাকবেন তার একটি  ‘ফিরে এসো, চাকা’; অপরটি ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’। দুটি কাব্যগ্রন্থ মেজাজে ও প্রকরণে একেবারে আলাদা। নিজের উদ্ভাবিত কাব্যতত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিনয় ছয়টি দীর্ঘ কবিতার এই অভূতপূর্ব গ্রন্থটি লিখেন। আশ্চর্য যে রচনার প্রায় আট বছর পরে কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।  প্রথমে লিখেছিলেন সাতটি কবিতা, পরে এক ও দুই সংখ্যক কবিতা জুড়ে দিয়ে করেন ছয়টি। সে ছিল বাংলা কাব্যপ্রকরণে ও বিষয়ে এক অভিনব কবিতাপ্রবাহ। সেকালের কোন প্রকাশকই এই নতুন কবিতার মর্ম বুঝতে পারেননি, তারা তা ছাপতেও চাননি।  সমকালীন কবি-সম্পাদকেরা এদের মর্ম কিছুটা বুঝেছিলেন, ফলশ্রুতি তারা এর বিভিন্ন অংশ বিনয়ের কাছ থেকে নিয়ে যান এবং স্ব স্ব পত্রিকায় ছাপেন। প্রথম কবিতাটি ছাপা হয় গৌরাঙ্গ ভৌমিক সম্পাদিত ‘অনুভব’ পত্রিকায়, দ্বিতীয় কবিতা মুদ্রিত হয় নির্মাল্য আচার্য সম্পাদিত ‘এক্ষণ’ পত্রিকায়। চতুর্থ ও পঞ্চম কবিতা ছাপেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় আর ষষ্ঠ কবিতাটি ছাপতে নিয়ে যান ‘দৈনিক কবিতা’র সম্পাদক বিমল রায়চৌধুরী । কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত এর একটি আলোচনা লিখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি তা রাখেননি। পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায় কথা দিয়েছিলেন বইটি তিনি ছেপে বের করবেন, তিনিও তাঁর কথা রাখেননি। কিছুটা প্রশংসা আর বাকী পুরোটাই অবহেলার মাঝে এই অভূতপূর্ব কবিতামালা ব্যাপ্তি ছড়াচ্ছিল।

দর্শন ও বিজ্ঞান, বিশেষ করে গণিত নিয়ে তার গবেষণা ও চিন্তা— যা বিশ্বজগৎ সম্পর্কে তাঁর ভাবনাকে শিলিভূত করে নিয়ে আসে কবিতাবিশ্ব সম্পর্কে নিজস্ব ধ্যান-ধারণায়, সে সকল ধ্যাণ-ধারণাকে কাব্যিক অবয়ব দিতে ১৯৬৬ সালের অঘ্রানে তিনি লিখে ফেলেন এই গ্রন্থ। অঘ্রানে লিখেন বলেই নাম দেন ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’। অঘ্রানকে বেছে নেন, কেননা তা ‘জননের প্রকৃষ্ট সময়’।  আর অনুভূতিমালা বললেও এতে অনুভবের চেয়ে চিন্তা ও উপলব্ধির সমাবেশই বেশি; অবশ্য সেসব চিন্তা ও উপলব্ধি বিশ্বজগৎকে অনুভবের মধ্য দিয়েই নির্মিত। অমরেন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘কবিতা-পরিচয়’ পত্রিকায় তিনি সম্পাদকের উপুর্যপরি অনুরোধে ‘কাব্যরস’ এবং ‘অবয়ব ও অনুভূতি’ নামে দুটো প্রবন্ধ লিখেন। এই প্রবন্ধদুটিতে বিনয় যে কাব্যতত্ত্বের কথা লিখেছেন সেসব কাব্যতত্ত্ব দিয়েই লিখেন ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’। বস্তুতঃ কবিতা নিয়ে সুগভীর চিন্তাকে কাব্যিক রূপদান করাই এ গ্রন্থে তাঁর মূল প্রণোদনা ও অবসেসন হয়ে দাঁড়ায়। এর সমস্যা হলো কবিতাটি কোথাও কোথাও গদ্যের হুবহুরূপ, কোথাও গদ্যের চেয়েও নীরস। তবে বেশিরভাগটাই বিনয়ের অসামান্য কবিপ্রতিভার স্পর্শে যাদুকরী, আর সেখানেই এ গ্রন্থের সাফল্য, অমরত্ব অর্জন। দীর্ঘ কবিতার একটি প্রধান সমস্যা হল যে তা হেলে পড়ে, বিনয়ের এ কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়, কিন্তু সে হয়তো গ্রন্থটির তিরিশ বা চল্লিশ ভাগ, বাকী সত্তর বা ষাটভাগই তো অশ্রুতপূর্ব, অভূতপূর্ব কবিতা।

এ সকল কবিতা নির্মাণের পটভূমি ব্যাখ্যা করে বিনয় মজুমদার লিখেছেন, “এ-অবধি আমি কোনদিন নিসর্গবর্ণনামূলক কবিতা লিখিনি। অধিকাংশই ঘটনার বিবৃতি লিখেছি। অতঃপর আমায় কলকাতার শহরতলীতে থাকতে হয় যাকে প্রায় গ্রাম বলা যায়। চারিদিকে নানা গাছপালা লতাপাতা ছিলো, ছোটবড় পুকুর ছিলো। ভাবলাম প্রকৃতির বর্ণনা লেখার চেষ্টা করা যাক। এক মাসের ভিতরে খুব দীর্ঘ ছটি কবিতা লিখলাম।”  তাঁর এ কবিতার ভেতরে ঠাঁসবুনুনির মত নিসর্গ আছে, কাছের নিসর্গ যেমন আছে তেমনি আছে কল্পনার নিসর্গ। পাঁচ সংখ্যক কবিতায় তিনি যে সমুদ্র মোহানার কথা লিখেন তা তার বাড়ির আশেপাশে কোথাও নেই। তবে ডায়মণ্ড হারবারে তিনি নিশ্চয়ই সমুদ্র ও মোহানা দেখেছেন। এই প্রকৃতি তাঁর চাক্ষুষ অবলোকনের বাইরে নয়। তবে সাদামাটা নিসর্গের বর্ণনা কখনোই তাঁর কাব্যদর্শনের অর্ন্তভূক্ত ছিল না। তিনি এই নিসর্গবর্ণনাকে আশ্রয় করে বা বলা যায়, রূপকায়িত করে, তার কাব্যতত্ত্ব ও বিশ্বদর্শনকে হাজির করেন।

বিনয় মজুমদার সারাজীবন নিঃসঙ্গ ছিলেন, এই নিঃসঙ্গতা তাঁর নিজেরই নির্বাচিত, কেউ তাকে তা বেছে নিতে বলে নি। ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি বলেছেন “এই বিশ্বসংসারে আমার একাকীত্বের কথা কবিতা ছ’টির উপজীব্য”। এই একাকীত্ব নারীসঙ্গহীন। নারীসঙ্গবর্জিত একাকীত্ব জন্ম দেয় অবদমনের, এই কবিতাগুলো সেই অবদমনের সারাৎসার। লিখেছেন এমন পঙক্তি ‘প্রায় সবই একা-একা যৌনাঙ্গই ক’রে দেয়, ক’রে দিয়ে থাকে-’; তাই তার সিদ্ধান্ত ‘যে কোন কাহিনী তাই শুধুমাত্র যৌনাঙ্গের আত্মকাহিনী’। অনত্র বিনয় লিখেন ‘রমন না করে কোন রমনী ও পুরুষের বন্ধুত্বভাব কখনো টেকে না’, লিখেন ‘তেলের খনির নিচে ভালোবাসাবাসি’র কথা। ফুল, পাহাড়, মোহানা বা নক্ষত্র— প্রকৃতির কোন অনুষঙ্গই (সকলি নারীর প্রতীক ) তার প্রবল যৌনঅভীপ্সার হাত থেকে মুক্তি পায় না। কী প্রবল সম্ভোগের কবিতা এসব বোঝা যায় যখন তিনি লিখেন ‘এই তো ভিতরে ঢুকি, তোমার ভিতরে ঢুকি, সাগর পিছনে ফেলে/এবং মোহানা তুমি এত বেশী ফাঁক হয়ে এত বেশী পাশে সরে গেলে’। বিনয় শুরু থেকেই এমনি কামনাতাড়িত কবিতা লিখেছেন, প্রথমে যা ছিল কবিতা, পরে তা তার ‘ভুট্টা সিরিজে’ এসে একবারে রগরগে যৌনতায় পর্যবসিত হয়েছে, হারিয়ে গেছে কবিতা।   বস্তুতঃ রূপকের আঁড়াল সরে গেলে অনেক পংক্তিনিচয়কে প্রবল যৌনতাড়িত বলেই মনে হয়। শারীরিক অবদমন তাঁর অধিবিদ্যক চেতনার সাথে মিলে এসকল পঙক্তির আগুন ঝরিয়েছে।

বিনয়ের কবিতা নির্মাণের চক্রটি এরূপ বলে মনে হয় :

চিন্তা ⇒ বস্তুশরীর  ⇒ চিন্তা।

কবির চিন্তা বস্তুশরীরে পরিবর্তন আনে, ফলে বস্তুও চিন্তা করতে পারে; ফুল পারে, পাহাড় পারে। বিনয়ের মতে যার শরীর আছে সেই চিন্তা করতে পারে, তার মতে শরীর ও মন সমার্থক। এ কারণেই সম্ভব হয় ফুলের সাথে, পাহাড়ের সাথে কবির অন্তরঙ্গ কথোপথন। তিনি লিখেন ‘বাইরের থেকে কোনো নতুন রকম চিন্তা ক্রমাগত ঢুকিয়ে-ঢুকিয়ে/তার মানে শরীরের নিয়ম এমনভাবে ধরে-বেঁধে পাল্টানো যায়’। উদাহরণ:

‘এ-সকল হলো চিন্তা, ঝর্নার জলের চিন্তা এইভাবে বাড়ে

চিন্তাগুলি এইভাবে খেলা করে, খেলা করে ঝর্নার আপনার মনে।’

বস্তুতে প্রাণারোপ করা বহুকাল ধরেই সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায়, চলে আসছে। এটি কাব্যিক অবমুক্তির একটা পথ, এতে কবির জগৎ সম্প্রসারিত হয়। তরুণ বন্দোপাধ্যায়কে লেখা এক চিঠিতে ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ থেকে বেশ কিছু পঙক্তির উদাহরণ টেনে এর মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বলেন “শরীরই অন্তর আর অন্তরই শরীর – এই কথা সত্য হলে সমস্ত কিছুই ভাবতে পারে। যার শরীর আছে সে-ই ভাবতে পারে। পাথরের শরীর আছে, পাথরই তো একটা শরীরমাত্র—তাহলে পাথরও ভাবতে পারে।” প্রাণহীন জড়বস্তু ভাবতে পারে – এটা কাব্যিক সত্য হলেও, বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। বিনয় নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও কেন এই বিভ্রান্তিতে পাঠককে জড়াতে চান, তা বোধগম্য নয়। জীব-জড় নির্বিশেষে তিনি এক অনুভবের পৃথিবী গড়ে তুলতে চান তাতে নিঃসন্দেহে এক কাব্যিক পৃথিবী গড়ে ওঠে। পাথর, ঝর্নাজল, পাহাড় – সকলে ভাবতে পারে – এই আবিস্কার বিজ্ঞান সমর্থিত নয়, কিন্তু তাতের কবির ক্ষতি নেই, সে পেয়ে গেছে এমন এক পৃথিবীর সন্ধান, যা অগ্রবর্তীরা পান নি।

এ কাব্যগ্রন্থ নির্মাণের প্রক্রিয়াটি এরূপ :

অবলোকন ⇒ দার্শনিক অভিজ্ঞান ⇒কাব্যরূপ।

তৃতীয় কবিতায় বকুল ফুলকে বলেছেন একশত ভাগ খাঁটি দর্শন। অর্থাৎ গভীরভাবে ফুলকে (বা নারীকে) অবলোকনের ভিতর দিয়ে দার্শনিক অভিজ্ঞান জড়ো হয়, যা দিয়ে জগৎ ও জগতের নিয়মকে বোঝা যায়। কবির কাজ ঐ দার্শনিক অভিজ্ঞানকে কাব্যিকরূপে প্রকাশ করা, যেন তা সকলের অভিজ্ঞানে পরিণত হয়।

সাধারণ মানুষের সাথে প্রতিভাবান মানুষের একটি প্রধান পার্থক্য হল— সাধারণ মানুষেরা যখন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ঘরে বেড়ান ( a rolling stone gathers no moss) প্রতিভাবান তখন কোন একটি সুনির্দ্দিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রচুর সময় ব্যয় করেন। বিনয় প্রতিভাবান, তিনি গভীরভাবে নিসর্গকে অবলোকন করেন, দীর্ঘ সময় ধরেই অবলোকন করেন, ফলে সত্য তার কাছে ধরা দেয়, যেমন দিয়েছিল ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের কাছে; তখন কবিও নির্বানলাভ করেন আর যেহেতু কাব্যলক্ষীর বরে শব্দবন্ধরূপের উপর কবির সহজাত দক্ষতা জন্ম নিয়েছে, তাই তিনি সেই সত্য উপলব্ধিকে কবিতায় রূপ দেন। দ্বিতীয় কবিতায় এই অবলোকন প্রক্রিয়ার কথা  লিখেছেন ‘কাছ থেকে দেখি বলে এতটা নিকট থেকে দেখি বলে এত-/এত ফুল দেখা যায়, আলাদা আলাদা ভাবে কোষ মনে হয়’।

বিনয় মজুমদার বিশ্বাস করতেন কবিতায় সাধারণীকৃত সত্যে উপনীত হবার প্রয়োজন আছে। এও বিশ্বাস করতেন কবির কাজ বিশেষ অভিজ্ঞতাকে সাধারন অভিজ্ঞতায় পরিণত করা; কুয়োর জলকে সমুদ্রে মিশিয়ে দেবার অনিবার্যতার কথাই তিনি বলেন। তার চিন্তার প্যাটার্ণটি এরূপ:

ব্যক্তির বিশেষ অভিজ্ঞতা ⇒ সাধারণীকৃত সত্য⇒সর্বসাধারণের অভিজ্ঞতা।

এখানে ব্যাক্তি হলেন শিল্পী বা কবি। এই প্যাটার্ণটি সঠিক। এছাড়া কোন সৃষ্টিই উৎকর্ষতা অর্জন করে না বা অমরত্ব পায় না। কবির রচনাটি আর কবির নিজস্ব সম্পদ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সর্বপাঠকের নিজ নিজ সম্পদ ও অভিজ্ঞতা। তাঁর কবিতায় বিশ্বজগতের সত্য ও সৌন্দর্য নবরূপে আবিস্কৃত হয়। তবে কবিতাগুলো পাঠ করতে গিয়ে মনে হয় বিনয় শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তিনি আমাদের বিশ্ববীক্ষা দিতে  চান।

তার দর্শন যে ভাববাদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি লিখেন ‘মানসনেত্রের দেখা দৃশ্যই এ-বাস্তবের দৃশ্যাবলী হয়’, অর্থাৎ ‘আমারি চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ’। অনত্র লিখেন ‘মানসনেত্রের এক বিশ্ব আছে, মানসের বিশ্বও বাস্তব’।

ছয়টি কবিতার প্রত্যেকটির মাঝে চেতনাগত মিল থাকলেও তারা প্রত্যেকে আলাদা। প্রতিটি কবিতাই শুরু হয়েছে চমৎকারভাবে, বিনয়ের কবিপ্রতিভার নিদর্শন হয়ে।

১. সেতু চুপে শুয়ে আছে, সেতু শুয়ে আছে তার ছায়ার উপরে।
ছায়া কেঁপে কেঁপে ওঠে থেকে থেকে জয়ী-হওয়া সেতুর বাতাসে।

২. ক্রিসেনথেমাম ফুল—ফুলে ফুলে একাকার ভোরের কেয়ারি;
একটি নিটোল গোল পরিধিতে প’ড়ে আছে শীতের রোদ্দুরে

৩. সকল বকুল ফুল শীতকালে ফোটে, ফোটে শীতাতুর রাতে
যদিও বছরভর, আষাঢ়ে-আশ্বিনে, চৈত্রে বকুলের নাম শোনা যায়,

৪. বিশাল দুপুরবেলা চারিদিকে ফুটে আছে, ফুটে আছে আকাশে আকাশে।
সব-কিছু – এ-পাহাড়, গাছপালা, আালোছায়া, পরিষ্কার প্রকাশ্যে এসেছে,

৫. কেমন মোহানা, চুপে মোহানারই মতো হয়ে চারিপাশে এলিয়ে রয়েছে
প্রতিদিনকার সব স্বাভাবিক শাদামাটা পরিবেশ ব্যাপার জীবন।

৬. যদি কাছাকাছি থাকি তবে আর অকারণে উদয়ের ভাবনায় কখনো পড়ি না
থাকে না এমন ভিড়ে খুঁজে খুঁজে সপ্তুর্ষকে বার ক’রে আনবার বিরাট ঝামেলা।

এ সকল দ্যুতিময় পঙক্তির মাঝে যাঁর কবিতা বিনয়কে প্রভাবিত করেছিল সেই কবি জীবনানন্দ দাশের প্রভাব দুর্ণিরীক্ষ নয়। জীবনানন্দের মতোই সমাহিত, লঘুকণ্ঠ বিনয়ের কবিতা, জগতের সত্য উচ্চারনের জন্য যা প্রস্তুত।

চতুর্থ কবিতায় তিনি পাহাড়ের সাথে কথোপথনে রত। পঞ্চম কবিতায় সমুদ্রের মোহানার সাথে আলাপচারিতা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় কবিতায় অবিরল কথা বলে গেছেন ফুলদের সাথে। ষষ্ট কবিতায় কথা বলেছেন সপ্তর্ষমণ্ডলীর নক্ষত্রদের সাথে। এর একটি কারণ বিনয় বিশ্বাস করতেন, সিনেমায় আমরা যেমন আজকাল দেখি, জড়বস্তু ও উদ্ভিদের চিন্তা করার ও কথা বলার ক্ষমতা আছে। তৃতীয় কবিতার ‘বকুলফুল’, চতুর্থ কবিতার ‘পাহাড়’, পঞ্চম কবিতার ‘মোহানা’ আর ষষ্ঠ কবিতার ‘নক্ষত্র’ সেই অর্থে সমার্থক যে বিনয় এদেরকে তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে রাখেন আর এই কেন্দ্র ঘিরেই নির্মাণ করেন তাঁর কাব্যভূবন। একটি কবিতার ভিতরে বারংবার একই প্রতীক ব্যবহার করে তিনি একটি আবেশ বা ঘোরের সৃষ্টি করেন, পাঠককেও নিয়ে যান ঐ ঘোরের ভিতর। একই প্রতীক বারংবার ব্যবহার করে অনেকটা রাবারের মত টেনে লম্বা করে ফেলেন কবিতাকে। এটা একধরনের ক্যাটালগিং, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে এ কবিতার রচনাকাল (১৯৬৬), বাংলা কবিতায় দীর্ঘ পয়ারে এই ঘোর সৃষ্টি নতুন নয়, নতুন এর বিষয় ও প্রকাশরীতি।

তিনি বলেছেন এ কবিতাসকল ‘নারীভূমিকা বর্জিত’। কিন্তু এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নারীর প্রতি অবদমিত কামনা ও যৌন অভিলাষ। এ গ্রন্থ প্রেমবর্জিত নয়, কামনাবর্জিত তো নয়ই। তবে এই প্রেম হাজার বছরের বাংলা কবিতার আমি-তুমি জাতীয় প্রেম নয়, এলিয়ে পড়া কাব্যস্রোত নয়। এ কবিতায় প্রোথিত কামনাও প্রত্যক্ষ রগরগে কোন বিষয় নয়। বিনয়ের পৃথিবী প্রতীক ও রূপকের পৃথিবী। রূপকের আঁড়ালে তিনি ঢেকে রাখেন প্রেম, প্রেমিকা ও প্রত্যঙ্গকে। প্রকৃতির এক বিশাল ক্যানভাসে, প্রেক্ষাপটে তিনি কামনার রমনীকে উপস্থাপিত করেন। এখানে অবলোকনের যে ক্ষমতা বিনয় অর্জন করেন তা প্রায় ঈশ্বরিক। তবে তাঁর প্রফেটিক চেতনার আঁড়ালে থাকে নগন্যের অতৃপ্ত আকাঙ্খাই।

১. ‘শুনি বকুলের খ্যাতি, বকুলের প্রিয়তার সকল কাহিনী
তবু খুব অন্তরঙ্গ মহলেই শুধুমাত্র আলোচিত হয়
তাও ঢাকাঢাকি করে এ-সব নরম আর গোপন বিষয়
বকুল ফুলের ওই গোলাকার ফাঁকটিতে কোমর অবধি
ঢুকে গিয়ে শেষমেষ বেরোতে না-পেরে তুমি আটকে গিয়েছো!’

২. ‘জমি থেকে উঠে এসে ফুলগুলি ফোটে শুধু ঠোঁটের নিকটে।’

৩. ‘মনে হয় কমে গেছে গালের লালিমা, তার মৃদু লাল রঙ
কোরক গিয়েছে ভিজে, সকল কোরক ভেজা প্রচুর শিশিরে’

৪. ‘বহু রস ঝরে গেছে খেজুরের গাছে ওই হাঁড়িটিতে, বহু
রস শুষে ভিজে গেছে হাঁড়ির দেয়ালগুলি, মানকচু, পাতা
দোলা বন্ধ করে রেখে চুপচাপ কিছু বেশী দুষ্টু হয়ে গেছে।’

৫. ‘এই চেহারাটি আমি স্বভাবত সবচেয়ে বেশি ভালবাসি
এ-সকল পাপড়িকে অতিশয় সাবধানে নাড়াচাড়া করি,
এখন এই তো এই বকুলবাগানে একা অঘ্রানের রাতে
নাড়াচাড়া করে দেখি, অতি সাবধানে টানি, ধীরে-ধীরে টানি’

৬. ‘বলি, ও বকুল, তুমি বোঝো নাকি কুঁড়িগুলি খুব বেশি ছোটো,
আরো ঢের বড়ো-বড়ো নরম-নরম গোল হবার কথা না?
তোমাতে আসার আগে এ-সকল কুড়ি ঘুরে আসার কথা তো?
এ-সকল কুঁড়ি নেড়ে টিপে-টিপে সুখ পেয়ে-পাবার পরে না?’

৭. ‘এতে সে পাহাড় বেশ আপত্তিই করেছিলো, বলেছিলো খুব মাঝে-মাঝে
মাসে দুই-তিন বার বড়ো জোর চারবার এ-সব করতে দিতে পারে
তবে তার বেশি নয়, দিনের বেলাতে নয়, দিনে ভালো এ-সব লাগে না।’

অর্থাৎ যৌনমিলন রাতেই ভাল এবং কিছু দিনের ব্যবধানেই ভাল। রূপকের পর্দাটি দ্রতই সরে যায় আর  বিনয়ের এসকল পংক্তিকে তখন রগরগে যৌনতা বলে, অবদমনের চূড়ান্তরূপ বলে মনে হয়। এ-সকল চরণে ব্যবহৃত বিশেষ্য ও ক্রিয়াপদগুলো লক্ষ্য করলে এটা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরকম উদাহরণ আরো অসংখ্য আছে। বৃক্ষে যে প্রাণ আছে তা বিজ্ঞানের সত্য। বিনয় একধাপ এগিয়ে বৃক্ষের চিন্তা করার সক্ষমতা সৃষ্টি করেন, আর বৃক্ষকে বানিয়ে তোলেন মানবী।

কাব্যিক উলম্ফন এ গ্রন্থের একটি প্রধান বৈশিষ্ট। যে বিশাল ক্যানভাসে কবি তার বিষয়কে উপস্থাপন করেন, যে বিরাটের কথা তিনি বলতে চান, উলম্ফন ব্যতীত তা বলা অসম্ভব। এটিও অঘ্রানের অনুভূতিমালার একটি নতুনতর সূচনা। কবি পেয়ে যান ঐশ্বরিক চোখ। ৬ সংখ্যক কবিতায় তিনি যেভাবে সপ্তর্ষীমণ্ডলের তারাদের – অরুন্ধতী, অঙ্গিরা, অত্রি, মরিচী ও ক্রতুকে নিয়ে বাক্যরচনা করেন তাতে এই সত্য প্রমাণিত হয়। কবি উড়ে উড়ে নক্ষত্রপ্রদেশে চলে যান, তা জীবনানন্দও গিয়েছেন, তবে তিনি নিজেকে বিনয়ের মত মহালোকে ঈশ্বরীয় বিপুলতায় উপস্থাপন করেন নি। বিনয় নক্ষত্রদের সাথে এমনভাবে খেলা করেন যেন তার খেলার সাথী, ভালবাসার সখী; একেকটি তারাকে তিনি মুঠোয় চেপে ধরেন। বিপরীতভাবে বলা যায় তারাদের

আঁড়ালে তিনি সখীদের কথাই বলেছেন । আবার তিনি যখন লিখেন ‘পাহাড়ের চূড়াগুলি চেপে-চেপে ভেঙে দিতে চেষ্টা করি’ চেষ্টা করে যাই/ কিছুকাল একা-একা এইসব খেলা করি, উড়ে উড়ে করি মনে হয়’ তখন ঐ অতিমানবিক কল্পনার বা রূপান্তরে অবদমিত আকাঙ্খার কথাই মনে হয়। কখনো সারস, কখনো মেঘ, কখনো বাজপাখি হয়ে তিনি উড়ে যান, এছাড়া পূর্ণ অবলোকন সম্ভব নয়। ‘বাজপাখি হয়ে আমি সমতলে নেমে গিয়ে যত কথা বলি’ বা ’যখন সারস হয়ে ফুলের কেয়ারিটির উপরে উড়েছি’ তার transformation  কেননা ‘মানে বুঝে নিতে হলে তাই ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে নিতে হয়’।

ফুল চিরন্তন নারীর প্রতীক। ‘বকুলের আকারের মতো এক নারী আছে – শঙ্খমালা আছে’ তার অকপট স্বীকারোক্তি। তিনি লিখেন ‘তুমি কি ভেবেছো আমি এই মেয়েটির দেহে – শরীরের ফাঁকে/ ফুটে থাকা ফুল শুধু’। এখানে প্রতীক আর বস্তু এক হয়ে যায় । এ কবিতায় ফুলদের উপস্থিতি কেবল সরব আর প্রাচুর্যপূর্ণ নয়, বেশ রোমান্টিক ও কামনাজড়িত বলেও প্রতিভাত হয়। তিনি লিখেন, ‘মানসসুন্দরীগুলি এ-প্রকারে সুখ পায়, ব্যাথা পেতে পারে’। তিন সংখ্যক কবিতাটি তিনি লিখেছেন বকুল ফুলের প্রতীকে। দুই সংখ্যক কবিতা ভরে আছে ক্রিসেনথামামে। অসংখ্য উদাহরণ টানা যায় এর স্বপক্ষে।

১।‘হেসে ফেললেই এই ঠোঁট-দুটি এত বেশি ফাঁক হয়ে যায়!
গোলটুকু এত বেশি ফাঁক হয়ে যায় কেন বকুল, বকুল,’

২।‘হতবাক ফুল তার মুখ দিয়ে টেনে নেওয়া নিঃশ্বাসের সাথে
নিজের ভিতরে টানে আমাকেই সে নিজের মাঝে পুরে নেয়।’

৩।‘বন্ধ্যা বলে বকুলের রূপ এত আঁটোসাঁটো, ঢলঢলে নয়।’

৪।‘কুসুম, কুসুম, তুমি কোন মায়া জানো বলো, এ কেমন মায়া।’

৫।‘দু-পাতার ফাঁকে থাকা একটি বকুল ফুল হাতের মুঠোয়
চেপে ধরে চুপচাপ- চুপি-চুপি চাপ দিয়ে চলেছি এখন।’

অবশেষে এই সিদ্ধন্তে আসেন ‘এইসব ফুল শুধু ব্যবহৃত হয়’। কোথাও কোথাও জীবনানন্দ এসে হাজির হন তার প্রতীক পৃথিবী সহ। বস্তুতঃ এ কবিতা রূপকাশ্রয়ী ও প্রতীকধর্মী এক দীর্ঘ বর্ণনাত্বক কবিতা – যাতে উপমা, চিত্রকল্প বা অন্যান্য কাব্যিক উপাদান তুলনামুলকভাবে কম। কাব্যিক পরিমিতির বাইরে গিয়ে বিনয় মজুমদার  এসকল কবিতা লিখেছেন। ভাবলে অবাক লাগে মাত্র একমাসে তিনি কয়েকশত  পঙক্তি লিখে ফেলেছিলেন, তাতে বোঝা যায় তিনি একটি কাব্যিক ঘোরের ভেতর ছিলেন, তার ভিতর কবিতার একটি বিস্ময়কর বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তাঁর শিল্পের মুখ খুলে গিয়েছিল। তাই কখনো তা কিছুটা প্রলাপের মতও শোনায়। এভাবে অতিকথনেভরা বিবরণধর্মী গদ্য কবিতার এক প্যাটার্ণ বিনয় তৈরি করেছেন এ গ্রন্থে; তবে অতীতের বিবরণধর্মী কবিতার চেয়ে এর আদল একবারেই আলাদা, কেননা এই বিবরণ চিন্তাপ্রসূত, বস্তুর আড়ালে যে নির্বস্তুর অবস্থান তার, বাহ্যিক দৃশ্য বা সৌন্দর্যের বয়ান নয়, রূপকের আড়ালে অন্য কাহিনী বা সত্যকে তুলে  ধরেন কবি। আজ থেকে চল্লিশ বছরেরও অধিক আগে নির্মিত ঐ ঘোরলাগা প্রতিভাপূর্ণ, কখনো যা প্রলাপের মত মনে হয়, কবিতারাজি আজ বিস্ময়পূর্ণ বলে মনে হয়।

ইংরেজীতে একটা কথা আছে “Our greatest truths are also the simplest” বিনয়ের কবিতা পড়লে তা পুনরায় অনুধাবন করা যায়। বিশ্বপ্রকৃতির সাধারণ সত্যগুলো তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে। এসব সত্য আমরা ঠিকই জানি, কিন্তু অনুধাবন করিনা। বিনয় যখন তা লিখেন আমরা তখন চমকে উঠি। পৃথিবীর সকল জলই যে পরস্পরের হাত ধরাধরি করে আছে বিনয় আমাদের তা জানান।

১।‘সকল গাছের ছায়া দেখা যায় ঠিক তার আপনার নিচেই রয়েছে’

২।‘চিরকাল সংজ্ঞা থেকে আমাদের সব জ্ঞান যাত্রা শুরু করে।’

৩।‘সকল ভাষাতে, দ্যাখো, সকল শব্দই মোটে পাঁচটি শ্রেণিতে
ভাগ হয়ে প’ড়ে থাকে, তার কম কিংবা বেশি শ্রেণি অসম্ভব
কারণ একক আছে – স্থান, কাল আর ভর – শুধু এই তিন
মূল এককেরা আছে’

৪।‘স্থান, কাল, পাত্র নয় আমরা সকলে শুধু বিকশনপ্রিয়’

৫।‘অভিধানে যতগুলি শব্দ আছে সে-সকল আসলে জীবিত’

বারংবার তত্ত্ব এসে যায় বিনয়ের কবিতায়। এখানে তাঁর অবলোকন, বিজ্ঞানচেতনা, দর্শন ও কাব্যবোধ মিলে-মিশে যায়। তত্ত্বের ভারে নুয়ে পড়েছে বিনয়ের কবিতা, এর পরিমানও বিপুল। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন কাব্যতত্ত্ব নিয়েই লেখা এ কবিতা। এসকল তত্ত্বের ভিতর কখনো কখনো চিরকালীন সত্যও প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি যখন লিখেন

‘হে কেশর, হে পরাগ, আমাদের চারিপার্শ্বে পরিকীর্ণ এই
বাস্তবের মতো হয়ে, বাস্তব বিশ্বের মতো হয়ে আমাদের
মানসনেত্রের এক বিশ্ব আছে, মানসের বিশ্বও বাস্তব।’

তখন আমাদের মুগ্ধ হতে হয়। যেসব বন্ধুত্ব আমরা চিরকাল টিকে যাবে বলে ভাবি একসময় সেসব ভেঙ্গে যায়। বিনয়ের ভাষায় ‘কে কোথায় যেন চলে যায়’।

তবে যেখানে তিনি তার কাব্যতত্ত্ব বিধৃত করেছেন, তার বেশিরভাগ স্থানেই কবিতা নিরস ও বিবৃতিধর্মী হয়ে পড়েছে। যেমন:

১।‘দেহসঞ্চালন হলো ভাবসঞ্চালনমাত্র, অন্য কিছু নয়।’

২।‘সেইখানে পরিণতি পাবার পদ্ধতিটি তো সর্বদা বাস্তব
এবং তাহলে যদি বাস্তব পদ্ধটিকে জেনে ফেলা যায়
পাপড়ি ও পাপড়ির ঘ্রাণের ওপাশে গিয়ে নরম গভীরে
নেমে গিয়ে যদি জানি, লিখে ফেলি তবে সেটা, সংজ্ঞা অনুসারে
প্রমাণ – তথাকথিত বিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক, সঠিক প্রমাণ।’

‘পাপড়ি ও পাপড়ির ঘ্রাণের ওপাশে গিয়ে নরম গভীরে/নেমে গিয়ে’ চমৎকার কাব্যিক, কিন্তু এ হচ্ছে কবির অভিজ্ঞান, বিজ্ঞানের নয়— বিনয় যাকে বলেছেন ‘তথাকথিত বিজ্ঞান’। মনে পড়ে আমেরিকার প্রকৃতিবিদ জন বারোজের কথা, যিনি অবলোকনের মাধ্যমে পাখিদের জীবনাচারকে সাহিত্যের উপজীব্য করেছেন, কিন্তু বৈজ্ঞানিক সত্য হচ্ছে গবেষণালব্ধ ফলের সারাৎসার এবং অবলোকনসঞ্জাত সত্যের সাথে তা নাও মিলতে পারে।

বিনয় যখন তত্ত্বকথা বলেন তা প্রায়শঃই পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে ওঠে, বা পুনরাবুত্তির মধ্য দিয়ে তিনি তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা করেন। একটি উদাহরণ দিই:

‘যেমন পাহাড়টিকে আমি বলি, প্রায়ই বলি, প্রায়শই নানা কথা বলি,
বাড়িটিকে বলে থাকি, তাতে খুব কাজ হয়, বেশ কিছু সুবিধাও হয়।
কারণ বলার কথা আসলে দূরের- ওই সবচেয়ে দূরের চূড়াকে।
কখনোই কারো সঙ্গে আমি কোনোদিন কোনো- কোনো তর্ক-বিতর্ক করি না;
পাহাড়ের সঙ্গে নয়, বাড়িটির সঙ্গে নয়, এই চূড়া কিংবা ওই দূর
চূড়ার সঙ্গেও নয়-কারো সঙ্গে তর্ক নয়, যে যা বলে তা-ই মন দিয়ে শুনি
আমার মতটি আমি একেবারে ব’লে দিই, ব’লে আর কথাই বলি না,’

তৃতীয় পঙক্তি ‘কারণ বলার কথা আসলে দূরের- ওই সবচেয়ে দূরের চূড়াকে’ ছাড়া বাকী উদাহরণটুকু পুনরাবৃত্তিমূলক নিরস গদ্য বৈ কিছু নয়। ‘আমার মতটি আমি একেবারে ব’লে দিই, ব’লে আর কথাই বলি না’ অর্থাৎ কবি নিজেও মত বদলাতে রাজী নন। তিনি তার কাব্যবিশ্বাসে অটল। একই কবিতার অনত্র তিনি বলেছেন ‘কোনো রকমের উপদেশ দিই না তো, কারণ নিয়ম বলে দেয়/ উপদেশ দিয়ে কোনো লাভ নেই’। মজার ব্যাপার হল, এই কাব্যগ্রন্থ উপদেশে ভরা।

সকল জ্ঞান যে একটি মূলসূত্রে বাঁধা, বিজ্ঞানের সত্যের সাথে কবিতার সত্যের বা দর্শনের সত্যের কোন দূরত্ব নেই তা বিনয় বিশ্বস করতেন। ‘ব্যাকরণ আসলে তো পদার্থবিদ্যার বই, প্রাকৃতিক সব’। তিনি লিখেন, ‘তাদের সকল জ্ঞান একসঙ্গে ধরে নিলে, ডানহাতে ধরে নিলে দেখি/ কেবল একটি মাত্র দণ্ড বলে মনে হয়, সব জ্ঞান মিলে দণ্ড হয়।’ রিপুকেন্দ্রিক ভাবনাজগতে শরীরবৃত্তীয় ধারণায় সৃষ্টিশীলতার প্রতীকও দণ্ড, যে দণ্ড কখনো শিশ্ম, কখনো কলম, কখনো বা লাঙ্গল। একই কবিতার অনত্র লিখেন, আমাদের জ্ঞানদণ্ডে এক প্রান্ত শুদ্ধতম গণিত নামক শাস্ত্র আর/ অন্য প্রান্ত আমাদের সকলের পরিচিত কবিতা ও কাব্য – কাব্যগুলি’। এখানে দণ্ড হচ্ছে জ্ঞানের continuum যার একপ্রান্তে গণিত, অন্যপ্রান্তে কবিতা; দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, বিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞানদণ্ডের মাঝেই রয়েছে।

চতুর্থ কবিতায় বিনয় পাহাড়ের ভিতর তার দুটি বাড়ির কথা আমাদের জানান। একটি বাড়ি পাহাড় চূড়োয়, যে-টি আসলে তার সামাজিক ও প্রকাশিত সত্ত্বা, অন্য বাড়িটির অবস্থান পাহাড়ের নিচে যাকে বলা যায় তার লুক্কায়িত সত্ত্বা। দ্বিতীয় বাড়িটি সম্পর্কে তিনি বলেন

‘ও-বাড়ি সাধারণত খালি, ফাঁকা পড়ে থাকে; কদাচিৎ মাঝে-মাঝে যাই
বেড়াতে-সেড়াতে, যাই রুচিবদলের জন্য, উপরের বাড়ি ফেলে রেখে
নেমে গিয়ে বাস করি, না-হলে বছরভর ও-বাড়িতে তালা মারা থাকে’

দ্বিতীয় বাড়িটিকে পরকীয়া সম্পর্ক ও বলা যায়। এই দুটি বাড়ি আর পাহাড়-চূড়া নিয়ে এরপর তিনি দীর্ঘ পঙক্তিবিন্যাস নির্মাণ করেন যা প্রথমত এলামেলো বলে মনে হলেও তাদের ভিতর বিনয়ের দার্শনিক অভিজ্ঞান টের পাওয়া যায়। তবে পুনরুক্তিমূলক বলে নিরস ও নিরেট মনে হয়। তবে এই যে সাদামাটা প্রকৃতির রূপককে আশ্রয় করে দার্শনিক অভিজ্ঞান বা উপলব্ধিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়া এ-কাজ তো বিনয়ই প্রথম করে দেখালেন। তরুণ কবিদের মাঝে কেন তিনি এত বেশী প্রভাববিস্তারী, কেন এত মৌলিক – তা এসব কারণেই। অনেকগুলো কাব্যিক পাটার্ণের মুখ তিনি খুলে দিয়েছেন। অতঃপর সম্ভব ঐ একই আদলে দিস্তা দিস্তা কাব্যনির্মাণ। ৪ সংখ্যক কবিতায় ১৯ থেকে ২৪তম পঙক্তি জ্যামিতির সমকোন, সুক্ষ্মকোন, স্থুলকোন, লম্বে ভরা। সেখানে ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি কাজ করে বাড়িটি যখন পাহাড়ের ভিতর লম্বালম্বিভাবে ঢুকে যায়।

‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ নিয়ে তিনি যে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তার প্রমাণ দীর্ঘদিন গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য কোন প্রকাশক না পেয়ে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদকে অনুরোধ করেন এই গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করার জন্য। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ রাজী না হওয়ায় তিনি ডাকযোগে এর পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে পাঠিয়ে দেন। এর লাইব্রেরির বাংলা বিভাগে আজো তা সংরক্ষিত আছে। এর একটি চমৎকার আলোচনা লিখে দিয়েছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যিনি বিনয়কে, বিনয়ের কবিতাকে ভালবাসতেন। শক্তির ঐ আলোচনা আলোড়ন তুলেছিল।

একসময়কার তুখোড় ছাত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ফার্স্টক্লাস, সুন্দরী, প্রতিভাবান গায়ত্রী চক্রবর্তীর প্রতি অনুচ্চারিত সুগভীর ভালোবাসা, কখনোই বিয়ে না করা, সারাজীবন কবিতার জন্য উৎসর্গীত, এলোমেলো জীবন যাপন ইত্যাদি তাঁর জীবনকে করে তুলেছিল কিংবদন্তীর মতো। বিনয়ের কবিতাকে প্রবাদপ্রতীম করে তুলতে এই ছন্নছাড়া, কাব্যউৎসর্গীত জীবনযাপনও একটা ভূমিকা রেখেছে। কবিতার জন্য, প্রেমের জন্য তার আত্মত্যাগ সত্যিই মহান; স্বচ্ছল, স্বাভাবিক জীবন-যাপনের যে প্রলোভন তিনি এড়িয়ে দারিদ্রকে বরণ করে নিলেন তার অপরচুনিটি কস্টও বড় বেশ। তবে এ সবের ফলে লাভ হয়েছে বাংলা কবিতার। কত তুখোড় ছাত্র, সফল প্রকৌশলী, সুখী সংসারী মানুষ কালের চক্রে হারিয়ে গেছেন, টিকে আছেন বাংলা কবিতার প্রবাদপুরুষ বিনয় মজুমদার।

 

কামরুল হাসান 

জন্ম ২২ ডিসেম্বর, ১৯৬১, শরীয়তপুরে। তিনি মূলত কবি। অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও ভ্রমণ গদ্যকার হিসেবেও খ্যাত। আছে নানা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।

ভারতের বিশ্বখ্যাত খড়গপুর আইআইটি থেকে এ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ সমাপ্ত করেন। এছাড়াও স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন যুক্তরাজ্যের ব্রাডফোর্ড ও এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কামরুল হাসান শিক্ষকতা করছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে। কামরুল হাসান  দু’হাতে লেখেন। এপর্যন্ত ১৪ টি কাব্যগ্রন্থ, ১ টি ছোটগল্প, ১টি প্রবন্ধ, ৪টি ভ্রমণ গ্রন্থ, ২ টি অনুবাদ কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সমীর রায় চৌধুরী ও তুষার গায়েনের সাথে পোস্টমর্ডান বাংলা পোয়েট্রি ২০০৩ সম্পাদনা করেছেন।

[email protected]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।