পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

প্রথম অ্যাবিউজ

আমার আব্বার আসল চক্ষু দুইটা থাকলেও, ওই দুইচক্ষুর ভেতর ছিল আরও শত-সহস্র চোখ। যেসব চোখের দৃষ্টি আমাদের ভাইবোনের উপর সার্চলাইটের মতো সদা ঘুরাঘুরি করত। ফলত আব্বার নজর এড়িয়ে যে কোনোকিছুই করা আমাদের জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। আমরা রেললাইনের স্লিপারের উপর কয়টা লাফ দিলাম, কয়টা বোল্ডার তুলে নিয়ে এদিকসেদিক ছুঁড়ে মারলাম, রেলইঞ্জিনের চাক্কার তলায় দশপয়সা ফেলে দিয়ে কী কী অঘটন ঘটালাম— সবই আব্বার নখদর্পনে ছিল। আব্বাকে আমার মাঝেসাঝেই গুণিন মনে হতো। নইলে আমাদের ভাইবোনের লুকানো সব দুষ্টামি আব্বা কীকরে দেখে ফেলত? তারপর বাসায় ফিরে গরুপেটা করত আমাদের দুইজনকেই।

আমাদের একটা প্রিয়খেলা ছিল, রেলইঞ্জিনের তলায় দশপয়সা রেখে দিয়ে পরবর্তীতে ওই পয়সার হালত দেখা। ইঞ্জিনের লোহার ভারী চাকা চলে যাওয়ার পরে দশপয়সার আদল মুছে গিয়ে থেবড়ানো এলম্যুনিয়ামের ম্লান চেহারা দেখে আমাদের কেন এত আনন্দ হতো কে জানে? তবে এই খেলাটায় যথেষ্ঠই রিস্ক ছিল। কারণ পয়সাটা কায়দা করে রেললাইনের পাতের একেবারে মাঝখানে রাখতে হতো। আর রাখতে হতো ঠিক ইঞ্জিন আসার আগে আগে। টাইম ধরে কাজটা করতে না পারলে দূর্ঘটনার চান্স ছিল ১০০%। এই পয়সা থেতলানোর জন্য আমি আর প্রদীপ মার খেয়ে প্রায়ই বেহুশ হয়ে যেতাম। আব্বা কিছুতেই এইসব বখাটেপনা সহ্য করতে পারত না।

আব্বার কড়াশাসন ছিল একেবারে কারফিউ জারি রাখার মতো। আমার বেলায় একটু বেশিই ছিল সে শাসন । আব্বা আমাকে কোনো ছেলের সাথেই মিশতে দিত না। এমনকী কথা বলতেও দিত না। আব্বা শাসনের প্রক্রিয়াটাও ভারি অদ্ভুত ছিল। আব্বা আমাকে কথা বলে কোনো বিষয়ে বারণ করত না, কিন্তু আমি ঠিকই বুঝে যেতাম আব্বার অপছন্দকে। এইটা যে কেমনে বুঝতাম,  আজ আমি বিস্ময় নিয়েই ভাবি।

আম্মা ও আব্বার মেলামেশার নির্বাচন আমাদেরকেও মেনে চলতে হতো। পূর্বেই বলেছি দুই-একটা পরিবারের সাথে আব্বা-আম্মার মেলামেশা ছিল। একজন ছিলেন আব্বার কলিগ ইসলাম সাহেব। তাঁর পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক যাতায়াত ছিল। আর এই যাতায়াত শুরু হয়েছিল ইসলাম সাহেবের স্ত্রী অত্যন্ত ভদ্র, মিশুক ও আমুদে প্রকৃতির ছিলেন বলে। ওই খালাম্মার রান্না অত্যন্ত সুস্বাদু ছিল। আমাদের বাসায় প্রায়ই নানান কিছুই উনি রান্না করে পাঠিয়ে দিতেন। মানকচু দিয়ে মুরগীর মাংসের অত্যন্ত সুস্বাদু একটা ডিশ উনি রান্না করতেন। আর পোয়ামাছের ভুনা। এরকম আরও কিছু অপ্রচলিত খাবার উনি আমাদের খাওয়াতেন। উনাদের ছিল দুই ছেলে। ছোটজন সরকারি অগ্রগামী বালক বিদ্যালয়ে পড়ত। ওর নাম ছিল শামীম। শামীম আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম, একই সংগে ক্লাস ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। আর ও ছিল ছোটখাটো গড়নের, ফলে আমরা একই ক্লাসে পড়লেও উচ্চতায় ও ছিল আমার কাঁধ বরাবর। শামীমকে এতটাই ছোট বালক দেখাত যে, আমি ওর সাথে অবাধে মিশতাম। ওকে আমার অন্যান্য মেয়েবন্ধুদের মতোই মনে হতো। শামীমের বাবা-মা অত্যন্ত ভদ্র ছিলেন বলে শামীমের সাথে মেশার ব্যাপারে আব্বার শাসন খানিকটা শিথিল ছিল। শামীম আমাদের বাসায় প্রায়ই আসত। আমিও যেতাম। ওর ছিল মিষ্টি চেহারা। ইংলিশ-প্যান্ট পরতো বলে ওকে আরও অল্পবয়সী দেখাত। যেন ও থ্রি বা ফোর ক্লাসের ছাত্র।

একবার শামীমের ঘরে একটা ক্যালেণ্ডার দেখে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। আমার ওই ক্যালেন্ডারটাই চাই। কারণ ওতে সুবর্ণা মোস্তফার চাররঙা দারুণ সুন্দর এক ছবি ছিল। আমি ছিলাম আফজাল আর সুবর্ণার অন্ধ-ভক্ত। এই জুটির নাটক টিভিতে দেখাবে শুনলেই  আমি আম্মাকে নিয়ে শামীমদের বাসায় চলে যেতাম। আমাদের বাসায় টিভি ছিল না। টিভি আসে নাই। এসেছিল বহু পরে, যখন আমরা ভাইবোন আমাদের কাঁচা-বয়স অতিক্রান্ত করেছি। বেপথু হবার সমস্ত সম্ভাবনা আমাদের উচ্চশিক্ষা রোধ করে দিয়েছে। আব্বা তখন রঙিন সনিটিভি কিনেছিল।

শামীমের সাথে আমি মারামারিও কম করি নাই। আমিই হাত চালাতাম, বেচারা আমাকে কোনোদিনই মারে নাই। আমি কিল ও খামচি যুগপৎ ওকে দিতাম। ও মার খেয়ে মন খারাপ করে বাসায় চলে যেত। পরদিন আমি দেখতাম, ছোটকার টেবিলে কে যেন বেলিফুলের গুচ্ছ রেখে গিয়েছে। আমি জানতাম, এসব শামীমেরই কাজ। ও ছাড়া বাসায় ফুল দিয়ে যাবার মতো সাহস আর কোনো ছেলের ছিল না।

শামীম যা যা করত, আমিও তাই তাই করতে চাইতাম। কিন্তু ও যখন আমাকে জিজ্ঞেস করত, বৃত্তি পরীক্ষার জন্য আমি কী কী রচনা পড়েছি, আমি কিছুতেই মুখ খুলতাম না। শামীমের সাথে আমার বন্ধুতা থাকলেও হয়তো পড়াশুনা নিয়ে গোপন-ইর্ষা ছিল। আমি বলতাম না, ও ও আমাকে কিছুই বলত না।

শামীমের টবে বেলি ফুটতে দেখে আমিও কেঁদেকেটে বেলিরচারা লাগিয়েছিলাম। এবং শামীমই তা এনে দিয়েছিল।

শামীম ওর ছোটকালের ছবি থেকে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি করিয়ে আমাকে দিয়েছিল। সেইসাথে ও যে মেয়েটিকে পছন্দ করত, তার ছবিও। মেয়েটি ওর চাচাতো বোন ছিল। নামটা এতদিনে আমি ভুলে গিয়েছি। খুব সম্ভবত মেয়েটির নাম ছিল— হ্যাপি। হ্যাপিকে ও একটা ‘বৃশ্চিকের’ লকেটওয়ালা গলার চেইন উপহার দিয়েছিল। আমার জন্ম নভেম্বরে, আমি বৃশ্চিক রাশির জাতিকা। এসবের কোনো কারণ আমি জানিনা, কেন কেউ তার পছন্দের মেয়েকে আমার রাশির প্রতীকচিহ্নের লকেট উপহার দেয়?  এখন ভাবি, ওই বয়সে ও কত বুদ্ধিমান ছিল? নিজের আর হ্যাপির ছবি আলাদা করে প্রিন্ট করিয়ে নিয়েছিল। একবার আমাকে  শামীম একটা হলুদ কাগজ পকেট থেকে বের করে দেখালো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ওতে ‘পাপড়ি’ লেখা।  ধ্বস্তাধ্বস্তি করে কাগজটা শামীমের হাতে নিয়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম— আমার ডিকশনারীর মোটা কভারের ছেঁড়া অংশ, যাতে আমিই কালিকলম দিয়ে আমার নাম লিখে রেখেছিলাম। কোন ফাঁকে ও সেটা হাতিয়ে নিয়েছিল কে জানে?

আমাদের পাশের বাসায় থাকত সরকারচাচা। সরকারচাচার ছেলে কাজল একদিন ছাতিমগাছের পাতা কেটে কেটে ‘পাপড়ি’ লিখে আমার হাতে দিয়েছিল। ছাতিমের অদ্ভুত সুন্দর সবুজপাতা দিয়ে আমার নাম লেখাতে আমার ভারি আনন্দ হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, ছাতিম গাছের সমস্ত সবুজ আমার হাতের তালুতে কেউ ঢেলে দিয়েছে।

একদিন আব্বা-আম্মা কোথায় যেন বেড়াতে গিয়েছিল। শামীম এসেছিল আমার সাথে খেলতে। ওর সাথে আরও দুইচারজন বালক-কিশোর। আমরা আমাদের ফুলবাগানের সান-বাধানো-পথে খেলছিলাম। আমি তখনও ওড়না পরা শুরু করি নাই। আমরা খেলছিলাম কানামাছি ভোঁ ভোঁ। আমার চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল। কিশোরদের কে একজন আমার বুকের উপর আলতো করে হাত বুলিয়ে সরে গিয়েছিল। আমি চোখের বাঁধন খুলে রাগে-দুঃখে কেঁদে ফেলেছিলাম। তর্জনি উঁচিয়ে বলেছিলাম—

এক্ষুনি চলে যা সব কুত্তারবাচ্চা।

আমাকে হঠাৎ কাঁদতে দেখে শামীম বিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল— কী হইছে?

আমি কাঁদতে কাঁদতে ওকে বলেছিলাম—

এক্ষুণি চলে যা আমাদের বাসা থেকে।

অন্য ছেলেদের সাথে শামীমও মুখ কালো করে চলে গিয়েছিল।

পরদিন এসে আমাকে বলেছিল—

আমি জানি কী হইছে। তুই ক্যান কাঁদছিস তাও আমি জানি।

আমি রাগে ঝাঁঝিয়ে উঠে বলেছিলাম—

তুই অসভ্যদের আমাদের বাসায় নিয়া আসছিস ক্যান? তুই কি জানিস না আমি ওদের সাথে মিশি না। আব্বা বাসায় থাকলে এইগুলারে ঢুকাইতে পারতি?

শামীম আস্তে করে আমাকে বলেছিল—

স্যরি পাপড়ি।

একদিন আমি আমাদের ফুলবাগানে হেঁটে হেঁটে গান গাইছিলাম। শামীম এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার গান শুনছিল।

আমি ওকে দেখতেই বলেছিল—

তুই ওই গান গাইতেছিলি ক্যান?

আমি লজ্জিত হয়ে বললাম—

কোন গান?

কবরীর গানটা।

আমি রাগে জ্বলে উঠে বললাম—

বাজে কথা বলবি না, আমি মোটেও অই গান গাই নাই।

তখন ‘সুজনসখী’ সিনেমার মারমার কাটকাট অবস্থা।

কবরীর লিপে বেশ একটা শরীরিগান ছিল—

গুন গুন গান গাহিয়া নীল ভোমরা যায়/ সেই গানের তালে ফুলের বনে/ ফুলের মধু উছলায়…

যদিও এ গানের সঠিক অর্থ আমরা জানতাম না, কিন্তু কবরীর অঙ্গভঙ্গি দেখে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম— এটা একটা অশ্লীল গান। এবং আমি এই গানটা কিছুতেই গাইছিলাম না। গাইছিলাম হয়তো— গীতিময় এই দিন চিরদিন বুঝি আর রলোনা

কিন্তু শামীম ইচ্ছে করেই আমাকে বোল্ড করার জন্য ওই গানের কথা বলেছিল। আমি রেগে জ্যামিতিবক্সের কম্পাসের সুচালো কাঁটা দিয়ে ওকে মেরেছিলাম। বেচারা মন খারাপ করে আমাদের বাসা থেকে চলে গিয়েছিল। কম্পাসের কাঁটার আঘাত পেয়ে সে বহুদিন আমাদের বাসায় আসে নাই।

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।