নাজনীন খলিলের পাঁচটি কবিতা

অপরিচিত

আবার দুইজন মুখোমুখি;
তাদের মাঝখানে
অপরিচয়ের প্রগাঢ় ছায়া
ঝালরের মতো দুলে থাকে।
আকস্মিক স্মৃতির ঝাপটায়
তৈরি দৃশ্যপট
সে কেবল একটা দেজাভ্যু।

শুধু একটা কথাই সত্যি বলে মনে হয়;
স্পর্শের ভাঁজে ছিল তীব্র আগুন।

 

নীলকন্ঠ বেহালাবাদক

ডানা ঝটপটানোর শব্দ উঠলে বোঝা যায়
বুকের মাঝখান থেকে কিছু একটা উড়ে চলে গেলো।

নিশুতি-রাতের ভায়োলিন বাঁধা থাকে কৃষ্ণতরঙ্গের ছড়ে
বাতাসের মীড়ে অব্যক্ত ব্যথার কম্পন বেজে ওঠে।
যখন হাওয়ার লহর থেকে কুড়িয়ে নিই
টুকরো-টুকরো সুরের নির্যাস
তীব্র ব্যথার নীলে দুটো হাত শিরশির করে ওঠে।

আমিই তো নীলকণ্ঠ!
আমিই তো সেই বেহালাবাদক!

 

বৃক্ষের মতো

ছায়া-বাঁকানো পথটা চলতে চলতে
কোথাও না কোথাও হুটহাট ঢুকে পড়বে
কোন অচেনা গলিতে।

ক্রমশ: সাহসী হয়ে উঠা মুমূর্ষু গাছ
আনকোরা কুঁড়ি ও পল্লবের জেগে ওঠা;
এসব দেখলে —
স্বপ্ন দেখার সাহস ফিরে আসে। ত্রাস কেটে যায়।

গ্লেসিয়ারে অনিচ্ছুক ঢুকে পড়া
মত্ত তুষার-ঝটিকার হাড়ভেদী হিমের কীলক
মৃত্যুভয়ে কেঁপে ওঠা; মনে থাকে না।

কোন না কোন একদিন
রোদের চোখের ভেতর থেকে
আমিও উপড়ে ফেলবো তার ছায়া। আমি।

 

কেমন আছো তুমি

কেমন আছো সম্রাজ্ঞী?
কেমন চলছে তোমার রাজ্যপাট?

সব ক্ষয়দাগ, ক্ষতচিহ্ন ঢেকে দিতে
হাসির থেকে গাঢ়তম মেইকওভার নেই কোন।
কিন্তু–
মুখোশের মাঝেই কী আছে তেমন নিগূঢ় কোন রহস্যময়তা?
তীক্ষচোখ দৃষ্টিতে চেনা যায় সবই।

কেউ কেউ
খুব চড়াদামে কোঁচড় ভরা হিম কিনে আনার পর
অগ্নিপিপাসু করতল মেলে রাখে উত্তাপের পাশে
বেখেয়ালে পুড়ে গেলে, এন্টিসেপটিকে ঢাকা হাত পিছনে লুকায়।
পাতাঝরা ঋতুকালে পাখি উড়ে যায়
আমাদেরও যেন সব জেগে ওঠে তীব্র বিষাদ-বিরহ।
ভুলে থাকি
বাউলের মতো বেভুল বিবাগী এক মন নিয়েও
আমরা বিহঙ্গ নই; একটি ক্ষীণকায় চড়ুইও না।

মেঘ উড়ছে, পিছু পিছু পাতা উড়ে যায়
মেঘ ও তার বাড়ির মাঝখানে এক হিমনীল দীর্ঘশ্বাস ঝুলে থাকে।

 

অগ্নিমুখো ড্রাগন

একটা ধুসর জামার ভেতরে রাত
তার ইনসমনিয়াক দৈত্য পোষে রাখে।
আমি রাখতে চেয়েছি ঘুম
আর
স্বপ্নের ঠিকাদারি।

ক্লান্তদেহ, নিমীলিত চোখ
তবু
করোটির ভেতর হৈ চৈ কোলাহল, কথার মিছিল।
নীরবতা–
অনায়াস দ্রুততায় বাচাল স্মৃতির অর্গল খুলে ফেলে।
কর্নিয়ার ভেতর বুদবুদ-ফোটা দৃশ্যের রঙধনু।
জ্যোৎস্নার প্লাবনে কোন রাতে ভাঁটফুল ফুটেছিল
সোনালী ঢেউয়ের স্রোতে ভেসে গিয়েছিল
সব দ্বিধার আড়াল।

বাক্যের কারাভাঁয়
ভেসে চলে আসে অনুচ্চারের গল্পগুলোও
সেইসব গোপন গভীর ;যা কাউকে বলা হয়নি।
বিস্মরণের প্রচ্ছন্ন-গুহায় শায়িত
সারিসারি পাথরচাপা লাশ পুনর্বার জেগে ওঠে।
ঘুমের চৌকাঠ পোড়াতে
একটা অগ্নিমুখো ড্রাগন ছুটে আসে।

———-

নাজনীন খলিল

জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে, বাংলাদেশের সিলেটে।
পড়াশুনা সিলেটেই, সরকারী মহিলা কলেজ এবং মুরারীচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ(এমসি কলেজ) থেকে স্নাতক।
লেখালেখির শুরু ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে। তখন থেকেই রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপক। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনারও কাজ শুরু। সাহিত্য-সংস্কৃতি মাসিক ‘ সমীকরণের’ নির্বাহী-সম্পাদক হিসেবে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনধারা নামে একটি পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক ছিলেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলতঃ কবিতা এবং কথিকা।

প্রকাশিত কবিতার বই:পাথরের সাঁকো; বিষাদের প্রখর বেলুনগুলো; ভুল দরোজা এবং পুরনো অসুখ; একাত্তর দেখবো বলে(ব্রেইল,যৌথ);গুপ্তপধানুকী অথবা মাংসবিক্রেতা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।