নাজনীন খলিলের মুক্তগদ্য: সব যাত্রা পূর্বনির্ধারিত নয় ও এই ঘর ভুলানো সুরে

সব যাত্রা পূর্বনির্ধারিত নয়

রাত নেমে এলে গাছেরাও হিংস্র হয়ে উঠে। পাতাগুলো ছড়াতে থাকে বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড।

আমার যে কী হয়! রাত নামলেই ইচ্ছে করে কোন ঝোপালো গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে সারারাত পাতার বাঁশি বাজাই। যেমন বাজাতাম শৈশবের অলস-উদাস দুপুরগুলোতে। বাজাই আর পান করি সোনালি জ্যোৎস্নার অমিয়দ্রাক্ষারস।

আমার কোন আপত্তি নেই রাতভর পাতার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে ফুসফুস ভরে নিতে। সারাদিন কত মানুষের ছড়িয়ে দেওয়া বিষ ঢুকে যায় শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর শরীর সেই বিষগুলো নিতে নিতে হয়ে গেছে নীলকণ্ঠ পাখি। কণ্ঠনালীতে জমে আছে কালকূটের ভরা থলে।

হয় না। রাতগুলো থাকে লৌহদরোজা‎র নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বন্দি, দূরে থাকে গাছ। পাতার বাঁশি। পাহাড় সমান অনতিক্রম্য বাধা অতি ক্ষুদ্র এক ইচ্ছেপূরণের পথেও!

পুনর্জন্ম-বিশ্বাসী হলে আমি চাইতাম খোঁপায় বুনোফুল গোঁজা এক পাহাড়ি আদিবাসী রমণীর জীবন। হ্যাঁ জন্মে জন্মে আমি এক নারীই  থাকতে চাই। কিন্তু সেই নারী এই নিগড়-বন্দি সমাজের কেউ না। জীবন হবে মুক্তবিহঙ্গের মতো, প্রজাপতির মতো স্বচ্ছন্দ বিহারের। যেখানে নারীরা অবগুণ্ঠনের আড়ালে লুকোয় না, তাদের নারীত্ব বিব্রত নয় লোভী-চোখের নগ্ন-চাহনিতে। উৎসবের রাতে মহুয়ার নেশায় ঘোরমাতাল হয়। নাচে তার পুরুষের হাতে হাতে ধরে, পায়ের তালে তালে তাল মিলিয়ে। ঝোরার জলে পা ডুবিয়ে বঁড়শিতে মাছ ধরে। চুলে মহুয়ার ফুল গুঁজে ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ি ঝর্ণার মতো বন্ধনহীন।

জীবন তো হবেই এমন সহজ আর অনাবিল

 নিরিবিলি রাতে পাতার বাঁশি বাজানোর সুযোগহীন জীবন আমার চাই না। এমন নয় যে এই বাঁশির সুরে তৈরি হয় কোন মোহনীয় আবেশ, বরং খানিকটা বিকট অথবা উদ্ভট মনে হয় কখনো কখনো। কিন্তু বাজাতে পারলে প্রাণের অফুরান স্পন্দনের শব্দ বেজে উঠে ঠিকই।

এই ইচ্ছেপূরণের ব্যর্থতাকে আমূল গ্রাস করে ফেলে  সীমাহীন বিষাদের নীলঢেউ। আর সারারাত সেই উথালপাথাল ঢেউয়ের নাগরদোলায় দুলতে থাকে পৃথিবী। 

ঘুম আসেনা। ঘুমপাড়ানি মাসীপিসী কেবলই পালিয়ে বেড়ায়। ছড়াগানের ছন্দে ছন্দে ঘুমে ঢুলু ঢুলু সেই চোখ দু’টোই যে ফেলে এসেছি সহস্র আলোকবর্ষ দূরের শৈশবে…, কেন যে বারবার ভুলে যাই! সেই মায়াভরা শিশুকাল আর ফিরবে না তবু হাতছানি দেবে। পিছু ডাকবে। আরো অনিদ্রায় অনিদ্রায় ভরে দেবে ব্যাকুল রাতগুলো।

খুব চড়ামূল্যে কিনে নিতে হয় নিজস্ব নির্জনতাটুকু। আর এই মহামূল্য নির্জনতার ভেতরেই ঢুকে পড়ে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল। নিজের সাথে কথা বলতে গেলেই শুরু হয়ে যায় চাওয়া-পাওয়া যোগবিয়োগের অংক। জীবনতো কখনো শুরু হয় না কোন অংকের সূত্রে। তবে কেন এত হিসেবের মারপ্যাঁচ উঠে আসে! কেন যে খুব সামান্য সময়ের জন্য হলেও মনটাকে স্মৃতিশূন্য কিংবা একেবারে অনুভুতিশূন্য করে ফেলা যায় না! কেন যে!

বেঁচে থাকার কোন মানেই হয় না জীবনে কিছু পাগলামি না থাকলে। এই এখন যেমন একশ তিন ডিগ্রী জ্বর নিয়ে কুয়াশা ভেজা ব্যালকনিতে বসে হি হি করে কাঁপছি। মনে হচ্ছে এর চাইতে আনন্দদায়ক আর কিছু ঘটেনি এই জীবনে। এমনকি এখন যদি আকাশভাঙ্গা জ্যোৎস্না নেমে এসে প্লাবিত করে দিতে চায়, তাকে বলবো- এখন নয়, এখন এই জ্বরতপ্ত অন্ধকার নির্জনতাই আমার প্রিয়। আলো চাইনা!

যাপিত জীবন আর স্বপ্নের মাঝখানে এক রেললাইন ফাঁক। আজীবন পাশাপাশি তবু কেউ কাউকে ছোঁয়না; কেবলই সমান্তরে ছুটে চলা আকাশ আর সমুদ্রের মতো।

দৃশ্যত: আমার কোথাও যাবার ছিল না।

তবু চোরাটানে আবার এসে দাঁড়াই ইস্টিশনে। টিকেট কাউন্টারের জানালায় হাত বাড়িয়ে এক অচেনা গন্তব্যের টিকিট কিনে ফেলি।

সব যাত্রাইতো আর পূর্বনির্ধারিত নয়।

 

এই ঘর ভুলানো সুরে

আমার কখনো পুরোটা পথ যাওয়া হয় না।

মাঝরাস্তার গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে বারবার ফিরে আসি।

চলতে চলতে চাঁদের প্রাসাদ দেখে থমকে গেলাম। হাট করে খোলা ছিল জ্যোৎস্না উঠোন। দুইদিকে দুই সিঁড়ি। একটা নেমে গেছে পাতালের পথে, অন্যটা সোজা আকাশের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে দুই হাত। যেন ধরে ফেলবে… ছুঁয়ে ফেলবে আরেকটুখানি এগিয়ে গেলেই, এবং পাতালের সিঁড়িটা নেমে গেছে এক অনন্ত নির্জনতার পথে।

কোনদিকে যাবো? উত্তরণের সিঁড়ি যদি ভেঙ্গে পড়ে মাঝপথে অথবা পাতালের সিঁড়ি গভীর গহন এক অনন্ত-গহ্বরে ঠেলে দেয় যেখান থেকে আর ফেরা যায় না! এইসব ভাবতে ভাবতেই বন্ধ হয়ে গেল সামনের দরোজা। সিঁড়ি নেই। দরোজাও নেই। নেই আর কোন গন্তব্য।

এটাই যখন স্বভাব হয়ে গেল বারে বারে সঠিক পথের দ্বিধাগ্রস্থতা; নিজেকে পথের মাঝেই ছড়িয়ে দিলাম। পথ যেখানে নিয়ে যাবে, সেখানেই থেমে যাবো নাহয়।

রোজ ভোররাতে আকাশ থেকে নীল নীল যে ফুলগুলো ঝরে পড়ে, তার কোন নাম অথবা গন্ধ জানি না আমি।

শুধু দেখি ফুলঝুরির মতো ঝরে পড়ছে থোকা থোকা আলোকরেনু। কোনদিন আমার হাতের মুঠোয় ধরতে পারিনি তার একটি কণাও। জানা হয়নি কেমন তাদের ঘ্রাণ অথবা উষ্ণতা। শুধু দূর থেকে দেখা সেই আলোর ঝলক ধরে রাখি চোখের স্মৃতিতে, আর নয়নমণিতে সোচ্চার রাখি সেই বর্ণানুভব স্তবপাঠের মতো; হয়তো কোন একদিন ধরা দেবে সুগন্ধময় উত্তাপের সাথে।নিজেকেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে দেই আকাশ এবং সমুদ্রের সীমাহীন নীলে। কেউ কেউ হয়ত খুঁজবে এই নীলসমর্পনের পিছনে কোন এক অজানা রহস্যময়তা, ধিক্কার অথবা করতালির সুযোগ। তবে আমিও কখনো কোন সুযোগ রাখি না রহস্যসন্ধানী টিকটিকিদের জন্য।

একবার এক খাঁচা বিক্রেতা আমাকে বলেছিল- খাঁচা, পাখির থেকে বেশী মূল্যবান একজন গৃহস্থের কাছে, পাখি যখন তখন ডানা ঝাপটায়, হৈচৈ করেপালিয়ে যেতে পারে সুযোগ পেলেই। খাঁচা চিরকাল স্থির গৃহস্থ বারান্দার শোভা। আবার নতুন কোন পাখি পোষা যায়। পুরোনো খাঁচা। নতুন পাখি। নতুন বুলি।

সন্ধানে আছে, কিন্তু এখনো দেখা পাইনি কোন পাখি বিক্রেতার, যার কাছে জেনে নিতে পারি তার নিজস্ব হিসাবনিকাশ অবশ্য খাঁচা অথবা পাখিওয়ালা দুজনেই বলবে  নিজেদের মতো করেই। এটাই নিয়ম।

পথ।

দু’সারি গাছের মাঝখানে ক্রমশ: ছোট হয়ে আসা ছায়ামগ্ন একটা টানেলের ছবি, যা মিশে যাচ্ছে অনন্তের সাথে। দূরপাল্লার বাসে যেতে যেতে কতবার দেখি এই দৃশ্য আর হারিয়ে যাই অনন্ত-বিভোরতার ভিতরে।

পথিক।

একতারা হাতে গৈরিক বেশ একজন ক্লান্ত মলিন মানুষ। শ্রান্ত পায়ে হাঁটছে তবু একতারায় বাজিয়ে যাচ্ছে ঘর পালানো ছন্নছাড়া নেশার সুর।

মানুষ নিজেই তো বাঁধে ঘর, আর সেই ঘর থেকে পালিয়ে বেড়ায় অজানা পথেপ্রান্তরে। চারদেয়ালের আচ্ছাদনের ভিতরেও মনের গোপন কুঠরিতে লুকিয়ে রাখে এক বিবাগী বাউলের ছবি। দিগ্বলয়ের অন্যপ্রান্ত থেকে যখনতখন ছুটে আসে যাদুকরী এক ঢাকের বাদ্য। সেই দূরাগত শব্দের টানে টানে ছুটে বেড়ায় দূর থেকে দূরান্তে।

ঘরের নয়, মানুষ হতে চেয়েছে আকাশের মুক্তবিহঙ্গের মতো। ভেবেছে একদিন কোন জাদুমন্ত্রে তারও গজিয়ে যাবে দুইটা ডানা আর উড়ে বেড়াবে আকাশের অসীম নীলিমায়।

পাখি হতে না পেরেই কি মানুষ বিবাগী হয়ে গেল!আকাশের না হতে পেরে পথের! ঘর ভুলানো সুরের পথিক।

 

নাজনীন খলিল

জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে, বাংলাদেশের সিলেটে।
পড়াশুনা সিলেটেই, সরকারী মহিলা কলেজ এবং মুরারীচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ(এমসি কলেজ) থেকে স্নাতক।
লেখালেখির শুরু ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে। তখন থেকেই রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপক। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনারও কাজ শুরু। সাহিত্য-সংস্কৃতি মাসিক ‘ সমীকরণের’ নির্বাহী-সম্পাদক হিসেবে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনধারা নামে একটি পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক ছিলেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলতঃ কবিতা এবং কথিকা।

প্রকাশিত কবিতার বই:পাথরের সাঁকো; বিষাদের প্রখর বেলুনগুলো; ভুল দরোজা এবং পুরনো অসুখ; একাত্তর দেখবো বলে(ব্রেইল,যৌথ);গুপ্তপধানুকী অথবা মাংসবিক্রেতা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।