নাজনীন খলিলের ত্রিমাত্রিক মুক্তগদ্য

পিঞ্জরের পাখি

পাখি পেয়েছিল একটি পরিপাটি খাঁচা; উপহার। খাঁজকাটা শিকলসমেত। পরিমিত দানাপানি।

কী করে এড়াবে দুরন্ত আকাশের দুর্বার আহ্বান? উড্ডয়নের প্রবলনেশায় পালক খসে গেল; শিকল পেরোনো গেলনা।

মানুষ ভালবাসে পাখি । একাত্ম অনুভবে লীন হতে চায়।ভালবাসে! ঈর্ষাও কি? তারা কেবলই চেয়েছে তাদেরও থাকুক পতত্রীর মতো নীলাকাশে স্বচ্ছন্দ-সন্তরণের দুইটা ডানা।তীব্র ভালবাসার ভেতরে থাকে দ্বেষণা এবং প্রচণ্ড দখলদারিত্ব নেশা।চায় ভালবাসাকে বন্ধী করতে হাতের মুঠোয়।

“আমারি চাঁদ আমার থাকুক
কেউ যেন না দেখে তাকে”

বিহঙ্গ কি চায়?
সে চেয়েছে প্রগাঢ় পাইনের ঘনঘোর বন, বেগুনি জারুল, গোলাপি শিরিষ,ঘাসের হলুদ-সাদা ফুল, দানা খুঁটে তোলা খোলা মাঠ, বটপাকুড়ের ফল, ছোট ঘাসফুলের সাথে মিতালি-সখ্যতা।

“পাখি পাঁকা পেঁপে খায়”
পেঁপে খায়।খায় মৌসুমী ফল। উড়ে উড়ে,ঘুরে ঘুরে। পোকামাকড়।

খাঁচার ভেতরে তুমি তাকে দেবে ভিজে-ছোলা, লাল মরিচমাখা ভাত।
সে ছোলা চায়না, ভাত চায়না। চায় মুক্ত আকাশ আর সবুজপাতার আড়ালের আপন-নিবাস। সারাদিন উড়ে উড়ে মুখে তুলে আনে খড়কুটো-লতাগুল্ম। নিজের বাসা নিজেই বানায়।
চায়না সোনারপিঞ্জরের নির্বাসন। তার পাখসাটে সারাক্ষণ বাজে আর্তনাদের শব্দ।

শূন্য-নীলিমার পাখি।
সবুজপাতার পাখি । বৃক্ষশাখার পাখি ।
ঘাসফুলের সাথে কথাবলা পাখি ।
পাখি হতে চাওয়া মানুষ, অসফল আক্রোশে পাখিটাকেই খাঁচায় পুরতে চায় অসীম আগ্রহ ও যত্নে।
খাঁচার যত্নে কবে ভুলেছে মুক্তবাতাসের বিহঙ্গ?

“একদিন পাখী উড়ে যাবে যে আকাশে ফিরবে না সেতো আর……………………………….”
ঠোকরে ঠোকরে একদিন ঠিকই ভেঙ্গে দেবে সোনালি-শিকল। আকাশ ও বৃক্ষের পাখি কি করে শিকলের হবে?

পড়ে থাকবে শূন্য পিঞ্জর , দানাপানির শূন্য বাটি, খসে পড়া ছিন্ন পালকগুলো,
মানুষের শেখানো বুলি আর ডানা ঝাপটানো শব্দের রেশ।

 

আকাশ জুড়ে শুনিনু

চাঁদ উপুড় ঢেলে দিল মায়াবী জ্যোৎস্নার অঝোর ধারা। প্রবলসমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সবুজ চাঁদনীর লহর খেলে যায় নুনপোড়া ক্ষত ভিজিয়ে দিয়ে। তাই হোক। সমস্ত নুন সাগরের নুনে মিশে ঝরে যাক।

হতাশ্বাসের নীল হুতাশনে চারপাশ পুড়িয়ে ফেলার আগেই নিজের জন্য তৈরি করে ফেলতে হয় একটি চাবুক। যেন নোনাধরা দেয়ালে খুঁজতে নাহয় কোন হারিয়ে যাওয়া প্রতিচ্ছবি। কেবল নাম হয়ে বেঁচে থাকা কোন মুখের আদল। বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া আর্তনাদগুলো বুমেরাং হয়ে বারবারই তো ফিরে এসেছে।আর বাতাসের মীড়ে মীড়ে তৈরি করেছে হাহাকারের নবতর শব্দাবলী। কতোবার……………………………………………………

দূরাগত জাহাজের ভেঁপু বেজে ওঠার আগেই কেন যে এক অর্থহীন ডুবসাঁতারে মাঝসমুদ্রে পৌঁছে যাওয়া ! সেই তো সৈকতেই ফিরে আসতে হয়। কোন মানে হয়না । অথবা এ এক প্রতিযোগিতা নিজের ছায়ার সাথে। ছায়াকে অতিক্রম করে যাবার বোকা দুঃসাহসিকতার এক আবেগ তাড়িত লোভ। শেষপর্যন্ত ভেংচি কেটে ছায়াটাই এগিয়ে যায়। যা স্বতঃসিদ্ধ। স্বাভাবিক। ছায়াকে অতিক্রম করা যায় না। অনুসরণ করা যায় মাত্র। ছায়াটাও সত্যি। আপন অস্তিত্বের মতোই।আমরা ভুলে থাকি । আমরাই……………………………………

এইযে সমুদ্র আর আকাশের মাঝখানের ফাঁকের হিসেবটা, দূরত্বের উদাহরণ হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে –এ এক মিথ্যে উদাহরণ। আকাশ আর সমুদ্রের মতো পরস্পরের এত কাছাকাছি, পরস্পরের এত আপন আর কিছুর তুলনা চলে না। সারাক্ষণ মুখোমুখি তাকিয়ে থাকা। আর কে পারে এমন! সময়ের পরিক্রমা শেষ হয়ে গেলে আকাশ তার সূর্য আর চাঁদকে পরম নিশ্চিন্তে রেখে দেয় সাগরের নিরাপদ কোলে। সাগর যেমন তার সব জলকণা তুলে রাখে আকাশের মেঘের ভেলায়। সবকিছু এভাবেই। সব। সব। অথচ আমরা দেখছি অন্যরকম। দেখছি দূরত্ব। খুঁজছি বিরহ। তাদের অন্তহীন মিলনের গান সহজে ধরা দেয় না আমাদের কানে।

জলের সিঁড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে মাছ। আবার ভাসছে কানকোর ঝাপটায় নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের স্বভাবগত প্রয়োজনীয়তায়। জলই তো মাছের একমাত্র বিচরণক্ষেত্র। কখনো সমতলে, কখনো অতলে। আবার জলের বিলাসও মাছই তো।
কোন কোন গ্রন্থিবন্ধন এমনি—-জল আর মাছের মতো । আকাশ আর সমুদ্রের মতো। এমনি কাছে অথবা দূরে।

“আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে——- তোমারি নাম———-”

কার নাম? কার?

সে শুধু সমুদ্রের।

এক প্রচণ্ড ঝড় উঠলো। ধুলোর। যেখানে যা কিছু ছিল স্থির, সব ছিটকে সরে গেল এখান থেকে ওখানে। লণ্ডভণ্ড।

ল্যাম্পপোস্টের গায়ে লেপটে থাকা মৃত প্রজাপতির চোখে তখনো সরব হয়ে ছিল এক বিস্মিততীব্র জিজ্ঞাসা–আলোর কাছাকাছি গেলেই পুড়তে হবে কেন! কিছুক্ষণের ভেতরই মৃতমাংস সন্ধানী পিঁপড়ারা ভিড় করবে এখানে ।আত্মাহুতি দেবে আরো কিছু ক্ষুদ্রকায় প্রাণ। প্রখর তাপে পতঙ্গ পুড়ে। পুড়ে খাদ্যসন্ধানী পিপীলিকা এবং যে তীব্রতাপ পুড়ায় পতঙ্গ, সেই খরদহন কখনো কখনো মানুষের নরম হাতগুলোতে ছড়িয়ে দেয় ফোসকার দাগ। আজীবনের।

এই যে মানুষ, পতঙ্গ অথবা পিঁপড়া যারা সন্ধান করে আলো অথবা মাংসের তাদের পরিণতিগুলো, একই সুতোয় বাঁধা। অবসান।

তার চাইতে এই প্রখর উত্তাপের উৎস থেকে দূরেই থাক ক্ষীণজীবী কীট-পতঙ্গ এবং সমস্ত কোমলতাগুলো। আগুনের কাছাকাছি থাকুক কেবল অগ্নি-প্রতিরোধক ধাতব কাঠিন্য। ‘

 

সারভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট

শন শন দমকা হাওয়ায় ইতিউতি উড়ে যাচ্ছে শুকনো জীর্ণ ডালপালা, পাতা, খড়কুটো।
বাতাসের দুর্নিবার আলোড়নে শূন্যে উঠে যাওয়া ঝরা পাতাগুলো পাখি নয়–এই কথাটা কখনো ভুলে যায় আত্মমগ্নতার গভীরে ডুবে যাওয়া কিছু মানুষ। ধুসর বর্ণের বিচ্ছিন্ন ঘূর্ণিতে তারা ভোগতে থাকে উড়ে যাওয়া ডানাবিভ্রমে। অহেতুক।

ঝড় থেমে গেলে এসব ঝরে পড়া ছাইপাশ আবার নেমে আসবে মাটির মাধ্যাকর্ষণের টানে। জায়গা হবে ডাস্টবিনে। মিউনিসিপালিটির আবর্জনার গাড়িতে ।

প্রবলবর্ষণের তোড়ে ছাদ উপচে পড়া অবিরাম জলধারাও তো মাঝে মাঝে ঝর্ণার বিভ্রম তৈরি করে ফেলে এক নিমেষে। পাহাড়, ঝর্ণা এবং নদী পিয়াসী মানুষের কাছে এও এক তৃপ্তিদায়ক সান্ত্বনা। উঠোনে মিছেমিছি তৈরি হওয়া এক নদীতে মানুষ ভাসিয়ে দেয় না না রঙের কাগজের নৌকা আর কপোলকল্পনায় ভাবে ‘ সপ্তডিঙ্গা মধুকর দিয়েছি ভাসায়ে’।

 

নাজনীন খলিল

জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯৫৭ সালে, বাংলাদেশের সিলেটে।
পড়াশুনা সিলেটেই, সরকারী মহিলা কলেজ এবং মুরারীচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ(এমসি কলেজ) থেকে স্নাতক।
লেখালেখির শুরু ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে। তখন থেকেই রেডিও বাংলাদেশ সিলেটের একজন নিয়মিত কথক, গ্রন্থক এবং উপস্থাপক। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি সম্পাদনারও কাজ শুরু। সাহিত্য-সংস্কৃতি মাসিক ‘ সমীকরণের’ নির্বাহী-সম্পাদক হিসেবে ১৯৮০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সিলেট থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনধারা নামে একটি পত্রিকার প্রকাশক এবং সম্পাদক ছিলেন। লেখালেখির বিষয়বস্তু মূলতঃ কবিতা এবং কথিকা।

প্রকাশিত কবিতার বই:পাথরের সাঁকো; বিষাদের প্রখর বেলুনগুলো; ভুল দরোজা এবং পুরনো অসুখ; একাত্তর দেখবো বলে(ব্রেইল,যৌথ);গুপ্তপধানুকী অথবা মাংসবিক্রেতা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।