নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২১

সকাল বেলা দাদীর প্রশান্ত হাতের স্পর্শে ঘুম ভাঙ্গে নিধির।
গুটুর গুটুর গল্প করছে মোমেনার মা, আর দাদির চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, তার শাড়ি বদলানো শেষ। পাশের টেবিলে তার সকালের নাস্তা, চায়ের কাপ, লাল প্লাষ্টিকের ওষুধের বাক্স।
-‘পুরুষ মানুষ যদি আঁচলের তলে না রাখতে পারলা, তাইলে আর জীবন কি? মনে করছিলাম বীণা’র মতন শিক্ষিত মাইয়া এইসব ভালো জানে, কোথায় কি?’
দাদী নিধির পিঠ হাতায় আর বলে। -‘যা চাইবা ঠিকঠাক চাইতে হবে’।
ঘুম ভাঙ্গা গায়ে দাদীর আদর খুব ভালো লাগে নিধির। একটু চা খেতে চাইলে দাদী তাকে এই সময় না করবে না সে জানে। কিন্তু উঠে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসতে আলসেমী লাগে। দাদী কাৎ হয়ে তাকে সুড়সুড়ি দেয়¬- ‘ওঠ, যাও মুখ ধুইয়া আসো। চা দিবোনে, খাজুর গুড়ের চা বানাইছে’।
খেজুরের গুড়ের উল্লেখ দাদীকে মুন্সীগঞ্জে নিজের অঞ্চলে ফেরত নিয়ে যায়। আত্মীয় পরিজন এলে, বা কেউ মুন্সীগঞ্জ বা ঢাকা গেলে খেজুরের গুড় তারা পায় বটে, আর তা দিয়ে পিঠে পায়েস, চা ইত্যাদিও হয় কিন্তু এ গুড় সে গুড় না। তাদের শৈশবে গাছে গাছে ঝুলন্ত হাড়ি থেকে যে রস নামতো, বাড়ির উঠোনে আখার আগুনে জ্বাল দিয়ে যে গুড় তৈরী হতো, চারিদিক উজার করা সে মাদক গন্ধ। এখানে উজান দেশে কোথায় সে স্বাদ!
দাদী শুধু হায় আফসোস করে একটা জীবন কাটিয়ে দিলো!- নিধির মা আর বাবা দাদীকে নিয়ে কথা বললে এমন কিছু কথা সবসময় বলাবলি করতো।
-‘আম্মা’, বাবার থমথমে ডাক শুনে ভয়ে নিধির আত্মা কেঁপে ওঠে।
চিঠি সরানোর শাস্তি হিসেবে চড় থাপ্পড় খাওয়ার জন্য মনে মনে তৈরী হয়। কিন্তু তবু সে চিঠিগুলি দেবে না। সে এখন বর্ণমালা শিখে গেছে। এগুলি পড়তে আর মাত্র কিছুদিনের অপেক্ষা এই যা।
কিন্তু বাবা সেসবের ধারে কাছে যায় না।
দাদীর বিছানার ধারে ধপ করে বসে পড়ে। নিস্পন্দ হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ।
আবেদা সকাল থেকে বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে, তাকে রান্নাঘরের বারান্দায় শুইয়ে রাখা হয়েছে।
-‘আম্মা, আপনে তো বিছনায় পরা, জানবেন বলে মনে হয় না, তবু জিজ্ঞাসা করি, আবেদার এই ঘটনা কে ঘটাইল?’
দাদীর হতবিহ্ববল মুখের দিকে তাকিয়ে বাবা আরো জোরে জোরে কথা বলতে থাকে।
দাদীর ফর্সা ত্বক আরো লালচে দেখায়। ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুখে আঁচল গুজে দেয়।
-‘আম্মা, আজমত ভাইরে বলেন এই মেয়েটারে বিয়ে করতে, এ এখন কোথায় যাবে?’- বাবার মুখ আরো গম্ভীর।
আজমত চাচা এই সময় কামলা কিষাণ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সেদিন বাড়ি ছিল কি কারণে? ভাই বাড়ি ছিল বলে কি? দাদীর কান্নার শব্দ বাইরে শুনতে পাওয়ার কথা না, তবু চাচা মাথা ঝুঁকিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছিল।
বাঁ হাতের চড় ডান গাল বরাবর পড়ার আগে বাবা মাথা ঝটকা দিলে নাকের ওপর পড়লো।
আজমত চাচা রেগে গেলে তোতলায়, নিধি ঘরের কোনায় দাঁড়িয়ে দেখলো।
বাবার নাক বেয়ে রক্ত ঝরা দেখে নিজেই চিৎকার শুরু করলো- ‘এই পানি আন’।
হাতের গামছা দিয়ে চেপে ধরতে গেলে বাবা আবারো ঝটকা মেরে সরে গেল।

-‘এর দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে,’ দাদু সচরাচর দাদীর ঘরে ঢোকে না (তাদের দাম্পত্যে কখন যে শোবার ঘর ভিন্ন হয়ে গেছে)। এর মধ্যে কখন ঘরে এসেছে, কেউ টের পায়নি।
– ‘আবেদা’র অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার নাই। আমিই সিদ্ধান্ত নিলাম। তোমার আম্মার দেখভালের জন্যও একজন মানুষ দরকার’।
দাদুর ভারী গম্ভীর গলার স্বর সেদিন সবাইকে মুহূর্তের মধ্যে চুপ করিয়ে দিয়েছিল। বাবা যে কথায় কথায় দাদুর সঙ্গে তর্ক করে, সেদিন একদম নির্বাক হয়ে গেল।

নিস্তব্ধ কয়েক মিনিট কাটিয়ে দাদু বাইরে বেরিয়ে গেলে দাদী এবার ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে। নিজে নড়া চড়া করতে না পারলেও দাদী’র দুঃখটা সেদিন সবার সামনে নগ্ন হয়ে ঘুরে ফিরে বেড়ালো।


রেলষ্টেশন নিধিকে অন্যরকম অনুভূতি দেয়, ঘর ছাড়ার, ঘরে ফেরার মাঝখানের দোটানা, অস্তিত্বের বিপরীতমুখী হয়ে থাকা কেমন যেন ভালোও লাগে তার- এই বোধ বড় হয়ে বুঝেছে সে। কত শত অনুভবের অর্থ যে শুধু বড় হওয়ার পরে বোধগম্য হয়!
ভোমরাদহ ছাড়তে খারাপ ভালো দুটোই লেগেছিল নিধির। ভালো লাগছিল কারণ এখন থেকে আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার তাকে নিয়ে ব্যথাতুর চেহারা দেখতে হবে না। গ্রামের মানুষ খুব ঘটনা মনে রাখে, অনায়াসে রসালো মুখরোচক বানিয়ে বলে কয়ে তৃপ্তি নিয়ে ঘুমাতে যায়। নিধির মা’কে তারা সুযোগ পেলেই পোড়া অবস্থায় (শরীরের দৃশ্যমান অংশ) সামনে হাজির করে ফেলে। নিধি মনে মনে নিজের চোখদুটো লিচু চটকানো করে দেয়, কেউ কিছুই বোঝে না। এখানে নিধিকে কেউ উপেক্ষা করে না, একপাশে ফেলে রাখে না। কিন্তু সে তো এত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকতে চায় না।
শুধু দাদী রাতারাতি বদলে গিয়েছিল। পরের দু’রাত্রি ঘুমাতে গেলে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রসঙ্গ তুলে নিধির মা’র আসল ঘটনা জানতে চায়নি। তাতে নিধির আগুনের উত্তাপ দেখা একটু কমে।

আসার সময় অঝোরে কাঁদলো দাদী, সুতীর ব্লাউজের হাতা প্রায় ভিজে গেল। নিধি দাদীর গায়ের গন্ধটা বুক ভরে শ্বাস টেনে নিয়ে নিলো যাতে অনেকদিন তার সঙ্গে থাকে। একটা কাঠের বাক্স থেকে কালো কায়তনে সোনার লকেট নিধির গলায় বেঁধে দিলো।
-‘একটু কান্দস না ক্যান সোনা। এই গেরামে কি আর আসবি রে বুবু? তর বাপে আসতে চায় না, ফুপু আসে না। একবার যাইতে পারলে আর কেউ আসে না’-দাদীর বুকে মুখ চেপেও নিধির তবু শুকনো চোখ।
আজমত কাকা আরো দু’জন লোক সঙ্গে নিয়ে সারা গ্রামের কৌতুহলী চোখের সামনে দিয়ে নিধির আর বাবার স্যুটকেস ব্যাগ,পরটা আর মাংস ভুনা ভর্তি টিফিন ক্যারিয়ার আর মুখে বস্তা বেঁধে সেলাই করা ঝাঁকাবোঝাই লিচু ট্রেন ষ্টেশনে এনে তোলে। বাবা লিচু দেখে বিরক্ত হয়। পার্বতীপুর জাংশনে ট্রেন বদলাতে হবে, এত এত বোঝা!
ওয়েটিং রুমের সামনে একটা বুড়োটে কাঠগোলাপ গাছ, পাশ দিয়ে একটাই প্রবেশ আর নির্গমনের পথ। চলটা ওঠা প্লাটফর্মের ওপাশে রেললাইনের ধার ঘেষে বস্তিবাড়ি, সেগুলো পার হলে রাস্তা, সেখান থেকে কিছু দূর গেলে নদী থাকলে ভালো হতো, কিন্তু ভোমরাদহ রেল ষ্টেশনের আশপাশ জলাশয়বিহীন। একচোখ অন্ধ বাদামওয়ালা, চায়ের টংয়ে হাটুর ওপরে লুঙ্গি গুটিয়ে বসা লোকটা, যত্রতত্র ফেলে রাখা ময়লা, আধময়লা কোট গায়ে ষ্টেশন মাষ্টার, ষ্টেশনের লাল টালির ছাদ সবকিছু একটানে দেখে নেয় নিধি। ভোমরাদহ মোটের ওপর খারাপ ছিল না। দাদুর বাবা বেছে চিনতে ভালো জায়গাই নির্বাচন করেছিল, মনে মনে বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে নিধি।
আজমত কাকা ফ্লাস্কে পানি ভরে আনতে গেছে। বাবা তখনো রাগী মুখ-‘একেতো ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর, তায় সঙ্গে যাবার কেউ নাই, বোঝার ওপর শাকের আঁটি লেচুর টুকরি’।
বাবার এত রাগ কার ওপরে? ভোমরাদহ ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর? নিধির হাসি পেয়ে যায়।
-বাবা, ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর হলো সেই জায়গা সেখানে মানুষ যেতে পছন্দ করে না।
-‘আমিও এখানে আসতে পছন্দ করিনা। আর কে বলেছে তোমাকে এইসব?’
বাবা রেগে আছে!
কে বলেছে? নাহ, নিধি বলবে না।

বাবা জানলা দিয়ে মুখ বের করে আজমত কাকাকে কি যেন বলছে। আজমত কাকাকে দেখতে আজকে বাবার চেয়ে কম বয়সী লাগছে। রেলষ্টেশনে দাঁড়িয়ে তার হাসি বরং অভিজাত দেখায়। নিধির পাশে এসে বসে তাকে মাথায় আদর করে, আজমত চাচার নাকের চামড়া তির তির করে কাঁপতে শুরু করে, চোখের পাতায় ঝড় ঝাপ্টা শুরু হবার আগেই বিস্কুটের প্যাকেট নিধির দিকে এগিয়ে ট্রেন থেকে নেমে যায় চাচা।
প্যাকেটটা ব্যাগে রাখতে গিয়ে সন্তর্পণে ভেতরের পকেট হাতায় নিধি। চিঠিগুলি ঠিকমত আছে! হঠাৎ করে তার শ্বাস-প্রশ্বাস একটু দ্রুততালের হয়, বাবা বা আজমত কাকা কেউ দেখতে পায়নি।
ব্যাগ একপাশে রেখে জানলায় মুখ দিয়ে সে ভালোমানুষের মেয়ে হয়ে বসে রইলো। ট্রেন ভোমরাদহ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আজমত চাচা কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল না, নিধির ভেতরটা খালি খালি লেগে কেমন হু হু করে উঠলো।
সামনের সীটে তখন গ্যাদা বাচ্চাসহ একটা বৌ, ছেলেকে ইলেক্ট্রিকের খাম্বার তারে বসা কাক দেখাচ্ছে, শিশুটি তার তর্জনী উঁচিয়ে আধো স্বরে বলতে থাকে- ক্কা ক্কা ক্কা। আর বাবাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যমনস্ক দেখে নিধির সেইদিন মনে হয়েছিল ট্রেনের চেইন টেনে (চেইন টানলে ট্রেন থামে তা ভোমরা দহ আসার দিন আবেদাকে দাদু বলেছিল, নিধি জ্বরের ঘোরে শুনেছে) আবার ভোমরাদহ ফিরে যায়।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।