নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-১২

সেদিনের মত গানের আসর ভাঙ্গে।

আবেদার স্বামী মজনু রিক্সা নিয়ে দণ্ডায়মান। তমালিকা আড়মোড়া ভেঙ্গে রিক্সায় ওঠে, অনুপ তৃপ্তির ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে। ধরে যাওয়া বৃষ্টির কণা হাতে নিয়ে বারান্দা থেকে বিদায় জানায় নিধি আর তার মা, বাবা। ওরা চলে গেলে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নামে। নিধির বাবা ঘরে গিয়ে বালিশে বুক চেপে সন্ধ্যা নামার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে।

মেঘ সরে গিয়ে আকাশে ছোট তারা মিট মিট করে। পাট গুদামের চাতালে নিধিকে কোলে নিয়ে দোল খাওয়ায় আবেদা। চেয়ারে বসে নিধির মা’র ইচ্ছে করে ওদের সঙ্গে গিয়ে হাসে। কিন্তু সে ওঠে না, অদূরে পাওয়ার হাউসের সাইরেন বেজে ওঠে। সন্ধ্যা ছ’টার শিফটের ডিউটি শেষ হলো। এখনি ক্যানালের পানির কল কল শব্দ ছাপিয়ে লোকজনের বাড়ি ফিরবে। পুরুষেরা ঘরে ফিরবে, তাদের অপেক্ষারত স্ত্রী সন্তানেরা উচ্ছসিত হয়ে উঠবে। নিধির মা সুখী পরিবারের ছবিগুলো কল্পনা করতে চায়। কিন্তু অনেকক্ষণ কোন চলাচলের শব্দ আসে না, আবেদার হাসিটা বড় তীক্ষ্ণ হয়ে কানে বাজে। সন্ধ্যাবেলা গা ছম ছমে কালো ছাতার মত ঘিরে ধরে চারপাশ। নিধির মা’র ভয় করে, দৌড়ে গিয়ে আবেদার কাছ থেকে নিধিকে কেড়ে ঘরে ঢুকে খিল লাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে তবুও ওঠে না। বসে থাকে স্থবির, ঝিম ধরা, যেন সে একটা জং ধরা পেরেক, কেউ অনিচ্ছায় তাকে আস্ত গাছের তক্তার সঙ্গে মেরে দিয়ে গেছে।

…  …
আস্তে ধীরে আরো নিমন্ত্রণ পেতে শুরু করলো নিধির বাবা। বিয়ের দাওয়াত, জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠানাদি। বিজয় দিবসে সরকারী উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের মাঠে বড় প্যাণ্ডেল বেঁধে মঞ্চ সাজানো হলো। অনুপ তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছিল। গান গাইবে এমন কথা ছিল না। গান গাওয়ার মানুষেরও অভাব নেই। অফিসারদের বউ বাচ্চা , কিন্তু সবই একরকম শৌখিন, এমেচার। জেলা প্রশাসক হাসিমুখে বসে থাকার ক্লান্তিতে চোখ বুঝে আছেন। প্যান্ডেলের সামিয়ানার বাইরে রোদ পড়ে এলে নিধিরাও উঠবে উঠবে করছে। এমন সময় কেউ মাইকে নিধির বাবার নাম ঘোষণা করে দিলো আর হতবিহব্বল তাকে টানতে টানতে মঞ্চে উঠিয়ে দিলো।

প্রথমে একটু আড়ষ্ট হলেও নিধির বাবা হারমোনিয়ামে হাত ছুঁইয়ে সচ্ছন্দ হয়ে গেল।
‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে’র সুরে ডিসি সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। এত মাধুর্যমন্ডিত পুরুষকণ্ঠ এখানকার অনুষ্ঠানে শোনা যায় না। কাজেই একগানে পার পেয়ে যাওয়া হয় না। বরং বেশ হৈ হৈ পরে যায়। ওয়ান মোর ওয়ান মোর করে তাকে সাত আটটা গান গাইতে হয়। শুরুর দিকে সরকারী অফিসারের মিসেসরা তাদেরকে যে তাচ্ছিল্য নিয়ে দেখেছিল তা এক লহমায় উবে গেল (জাতে উঠে গেল নিধিরা)।
পরের সপ্তায় তাদের নিমন্ত্রণ শিক্ষা অফিসারের বাসায়। আবারো গান। খাওয়া শেষে নিজের ডাইনিং টেবিল গোছাতে গোছাতে শিক্ষা অফিসারের মিসেস নিধির মা’কে ঠাট্টা করে- ‘ঢাকা শহর থেকে এই ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুরে কি মন বসে ভাবী? তবে ভাইয়ের যে গানের গলা, আপনাকে নিশ্চয়ই সারাদিন গান শোনায়!’
নিধির মা প্রত্যুত্তরে হাসি উপহার দেয়, তার সর্ব সমস্যা হজম হওয়ার হাসি।
শিক্ষা অফিসারের মিসেস খানিক পরেই তবু মুখ মলিন করে বলা ক্ষান্ত দিতে পারে না- ‘ভাবী, আপনাদের মেয়েটার সমস্যার কথা শুনলাম…আপনেরও না কি হার্টের অসুখ’।
এইবার নিধির মায়ের জ্বলুনি হয়, চামড়ার ভেতরে, পারলে সেসব ফুস্কুরির মত বেরিয়ে পড়ে। পরক্ষণেই মন খারাপ হয় আর সব রাগ গিয়ে পড়ে নিধির বাবার ওপর। কেন অনুপদের বলতে গেল এসব কথা?

পরের বার বাবা গান গাওয়ার নিমন্ত্রণ পেলে নিধি’র মা সঙ্গে যায় না, সারা সন্ধ্যা টেবিলে বসে চিঠি লেখে, নিধি একদিকে, টেবিলের অন্য দিকে মা। ঘূণপোকা ডেকে যাওয়া নৈঃশব্দ ঘরের ভেতরে।
-‘কাকে চিঠি লেখো, মা?’
-‘তোমার বাবাকে’।
-‘বাবা তো আমাদের সঙ্গে আছে’।
-‘ আজকে দিবো না, যখন তোমার বাবা আবার দূরে যাবে তখন দিবো’।
নিধি তখন এঁকে ফেলা পাখির পাখনায় উড়াল আনতে পেন্সিলে দাগ দিচ্ছে।

-‘ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর কি মা?’- কিছু সময় পার হলে নিধির অবশ্যম্ভাবী প্রশ্ন।
জবাব দিতে মা তখন চেয়ারে পা তুলে জমিয়ে বসে। কানের পাশে গুছিয়ে রাখা তার চুল ফ্যানের হাওয়ায় ওড়ে। শাদা দাঁত বৃষ্টির মত হাসি ঝরিয়ে সুড়ুৎ করে মুখগহব্বরে ঢুকে পড়ে আবার,
-‘মানে হলো ঘোর গ্রাম, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না, বাস গাড়ি এইসব চলে না। কিন্তু ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর আসলে মানুষের কল্পনার অপছন্দের জায়গা। মানুষ যেখানে যাইতে একদম ভালোবাসে না, নিজেদের যা যা পাইতে ইচ্ছা করে তেমন সব জিনিষ পাওয়া যায় না তো তাই সবাই বলে ‘ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর’।
-‘আমরা কি ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুরে থাকি?’
-‘দূর বোকা, আমরা তো এখানে সব পাই’।
-‘তাহলে ঢাকা কি তোমার জন্য ধ্যাদ্ধারা গোবিন্দপুর মা?’
মেয়ের (লেখা শিখতে এই বুদ্ধি কেন কাজে লাগায় না তার মেয়েটা?) মা উদাস হয়ে যায়। অন্যরকম গলায় বলে-‘এখানে দেখো আমরা মানুষ পাই, ভালোবাসা পাই। আমার নিধি সোনা আছে। আমার আর কি লাগে’?
তারপর নিধিকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় নিয়ে হুটোপুটি খাওয়া আর গড়াগড়ি যাওয়া খেলা শুরু করে দেয় মা।

অনুষ্ঠান শেষে অনেক রাত্রে বাসায় ফিরে বাবা রাগ করেছিল। মা ও গলা তুলেছিল। পরে তারা কি ঠিক করেছে নিধি জানে না, কিন্তু বিকেলবেলা একসঙ্গে বেড়ানোর রুটিন চালু হলো।

দুপুরের পর মায়ের সঙ্গে ভাতঘুম দিয়ে উঠলে, বিকেলে বাবা ফিরলে সেজেগুজে বাইরে বের হওয়া, সিনেমা দেখতে যাওয়া। মোটরসাইকেলের পেছনে বসে। শীত বেড়ে গেলে নিধির মাথায় উলের টুপি, মায়ের গায়ে শাল। বাবার মাথায় কালো হেলমেট। নিধির চুল ঠিক করে টুপিটা টেনে বসিয়ে দেয় আবেদা। লাল ব্লাউজ ফুড়ে তার কালো চকচকে ত্বকে- তিতির পাখির বাচ্চার মত পেলবতা। খিলখিলিয়ে হাসতে পারে আবেদা, নিঃশব্দ নিধি আর প্রায় শব্দহীন মা’র হাসির পাশে দ্রুতগামী পাখির ঝাঁকের মত সোচ্চার! আর পারে খাটতে! পাটের আড়তে পুরুষদের পাশাপাশি গায়ে খাটা ওর জন্য ডালভাত। নিধিদেরকে অন্য কারো রিক্সায় উঠতে দিতে নারাজ সে। বিকেলে ওদের তৈরী হওয়া শুরু হলে সুরুৎ করে এক দৌড় লাগায় বড় রাস্তার দিকে। ওর স্বামী মজনুও জানে সময়টা। রিক্সার টুংটাং জলপ্রপাতের ধারার মত বেজে যায় পাটগুদামের আঙ্গিনায়।
আবেদা তখন আবার ঝটপট নিধির মায়ের শাড়ির কুচি ঠিক করছে।
-‘আপা, আমাগের গ্রামে এক চেয়ারমেনের বৌ এই রখম শাড়ি পিন্দিছিল’।
-‘তুমি গ্রামে যাও না আবেদা’?
-‘এ মা, আমি তো গেরামেরই মেয়া, আবার ওটি যামু ক্যান? মোর শইলের গোন্দে গেরাম আছে আপা…’ খিল খিলিয়ে হাসতে হাসতে শাড়ির কুচি ছেড়ে দিয়ে ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়ে আবেদা, -‘আমি তা নিজের সঙ্গে নিয়া ঘুরি, তার জইন্য তো গেরামে যাওয়া লাগে না’।
-‘তুমি তাইলে ঢাকা যাইতে চাও’?- নিধি বিছানার উপর লাফিয়ে লাফিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।
-‘হায় হায় সোনামনি, তোমাক বলি নাই? ঢাকায় তো মালিবাগের এক বাসায় ছয় বচ্ছর কাজ করিছি। শইল্লের গোন্দ পেরায় ছাড়ি চলি জাচ্ছিল আমাক। বাসনা সাবান দিয়া গোসল করছি তো। সেয়ান হইলাম শেষে ঐ মালিক খালাম্মাই আমার মাকে কয়া বিয়া ঠিক কইরল। সেই ছেলেক আমার পছন্দ হয় নাই। মনে ধইরল মজনুক, ওয় হইল ওই বাড়ির আরেক বুয়ার ছোড ভাই। হামাগের সাগাই পাতানি সোমানে সোমান। বুয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আরেক বুয়ার সোম্মন্দ। ক্যাংকা মজা না!’ – আবেদা নিজের হাসিতে ঘুঙ্গুর বাজাতে পারে।
-‘তোমার ঢাকা যাইতে ইচ্ছা করে না’?
-‘একদম না, এইখানের মত বাতাস নাই ঢাকাত। ছয় বচ্ছর মুই পানি খায়া শান্তি পাই নাই। এইখানের পানিত গোসলের মজাই আলেদা। ঢাকা যাওয়ার কুনো হাউস নাই মোর’।
আবেদা তার গ্রামের নদীতে মাছ ধরার গল্প শোনায়।
-‘বাহ, গ্রামে ফিরবা না কারণ গ্রাম থেকে আসছ, ঢাকা যাবা না কারণ ঢাকা তোমার আপন লাগে না…তোমার তো দেখি ডবল সমস্যা আবেদা!’

নিধির মায়ের কথায় কয়েক মুহূর্ত থম ধরে থাকে আবেদা, কি বোঝে না বোঝে তা তার মুখ দেখে ঠাহর করা যায় না।

গুদামের পাহারাদার ক’দিন ধরে লাপাত্তা থাকায় মজনুকে চাকরী দিয়েছিল নিধির বাবা। দিনে রিক্সা চালানো, আর রাতে পাটগুদামের বারান্দায় ঘুম জাগরণে পার করে পাহারা দেয়া। একটা বেঞ্চি পাতা, তাতে হাতল আছে। নিধির মা ওকে রোয়া ওঠা একটা কম্বল দিয়েছে। আবেদা’র শরীরের ওম থেকে সেগুলো মহার্ঘ কিছু না, কিন্তু আবেদাই তাকে স্বপ্ন দেখায়, নিজের রিক্সার মালিক বনে যাবার স্বপ্ন। যেসব স্বপ্ন পৃথিবীময় অভাবতাড়িত মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়, নতুন কিছু শুরু করার তাগাদা দেয়।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস- ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ- ‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।