মঈনুস সুলতানের গল্প: দত্তবাবুর কাজকর্মের গাছ পাথর

ফৌজদারখোলা এস্টেটের বাতিখানার সিঁড়িতে বসে আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকেন শ্রী ভবতোষ দত্ত। বুকে কবরেজি মালিশ লেপার ফলে তার হাঁপানির টান কমে আসছে। কিন্তু বাতব্যাধিতে কাহিল শরীরখানা টেনে উঠে দাঁড়াতে তাঁর ইচ্ছা হয় না। দারুণ রকমের দুশ্চিন্তায় পড়লে হালফিল হাঁপানির টান বাড়ে। এস্টেটের কাছারি বাংলোর পেছনে চাপালিশ গাছের ছায়ায় টালির ছানি দেয়া বাতিখানা। তার বড় কামরায় শেল্ফে রাখা আছে হরেক কিসিমের হ্যাজাক, পেট্রোমেক্স ও হ্যারিক্যান লন্ঠন মিলিয়ে দুই-শ তেরোটি কেরোসিনের ল্যাম্প। এ ছাড়া আছে ছাপ্পান্নটির মতো মোমদান ও বিজলিবাতির ছোটখাট একটি ডায়নোমা। ডায়নোমা চালিয়ে ঝলমলে বিজলিবাতির বন্দোবস্ত হয় ফৌজদারবাড়িতে কেবলমাত্র পুণ্যাহের দিন, আশুরার আগের রাতে দিঘির পাড়ে লাঠিখেলা ও হিন্দু প্রজাদের জন্য দুর্গাপূজার সময় যাত্রাগানের রাতে। টাংকিতে পেট্রোল ভরে ডায়নোমা চালানোর কারিকুরি কেবল মাত্র দত্তবাবুর জানা আছে, তাই সেরেস্তার কর্মচারীরা তাঁকে বিজলিবাবু ডাকে। এতে দত্ত মহাশয় বিশেষ কিছু মনে করেন না। ফৌজদারবাড়িতে গড়পড়তা রাতে দরকার পড়ে সত্তরটি লণ্ঠন ও হ্যাজাক বাতির। এগুলোর জন্য অজস্র চিমনি ধুয়েমুছে হামেহাল তাইয়ার রাখতে হয়। এস্টেটের যৌথ মালিক বড় ও ছোট সাহেবদের কুঠি ছাড়াও তাদের বিবিদের মহলে মাগরেবের আজানের আগে সরবরাহ করতে পছন্দ-মাফিক লন্ঠন। জাবেদা খাতায় লিখে হিসাব রাখতে হয়, কোন কুঠি বা মহলে পাঠানো হয়েছে কয়টি হ্যাজাক বা পেট্রোমেক্স । দত্তবাবু কাজকর্মের কোন গাছ পাথর নেই।

বেলা তেমন হয়নি, রোদ কেবলমাত্র তাতিয়ে উঠছে। দত্তবাবু পত্রিকাগুলো না পৌঁছানোর বিষয় নিয়ে একটু চিন্তিত হন। গতকাল কলকাত্তা থেকে স্টেটসম্যান কিংবা দৈনিক আজাদ এসে ফৌজদারখোলা বাজারে পৌঁছেনি। সচরাচর তিনি সন্ধ্যার পর পর কুঠি ও মহলগুলোতে বাতি পৌঁছে দেয়ার কাজ তদারক করে অতঃপর বাজারের দিকে আস্তে-ধীরে রওয়ানা হন। হরেক রকমের কাজ-বাজ সেরে রাত সাড়ে-নয়টার নাগাদ বাজারের মধ্যিখানে এস্টেটের তোলা তোলার দফতরে বসেন। রাতের মেইল ট্রেনটি ইশটিশানে পৌঁছায় দশটার দিকে। কলকাত্তা থেকে স্টেটসম্যান ও আজাদ পত্রিকা প্রভৃতি স্টিমারে গোয়ালন্দ হয়ে ট্রেন যোগে এসে ফৌজদারহাটের মফস্বলে পৌঁছায় দুই দিন পর। বাজারের দফতরে বসে সাড়ে দশটা নাগাদ পেট্রোমেক্সের আলোয় দত্তবাবু পত্রিকা দুটি পাঠ করেন, গুরুত্বপূর্ণ নিউজগুলোর খুঁটিনাটি পকেটবুকে নোট নেন- পরদিন সন্ধ্যায় পুরানো কুঠিতে গিয়ে তা বড়সাহেবকে রিপোর্ট করার জন্য। গেল বছর- চৈত্রসংক্রান্তি পরদিন, কী কারণে জানি অস্থির হয়ে বড়সাহেব গিয়েছিলেন ফতেপুর সিক্রিতে সেলিম চিস্তির মাজারে মানত দিতে। ফেরার পথে কলকাত্তায় থেমে, দিন কয়েকের বিরতিতে গোরা ডাক্তার দেখিয়ে হাইপাওয়ারের চশমা নিয়ে বাড়ি ফিরেন। তারপর থেকে বড়সাহেব আর নিজে পত্রিকা-টত্রিকা পড়েন না, তবে দত্তবাবুকে দায়িত্ব দিয়েছেন দেশে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটলে, তাঁকে অবশ্যই তা ওয়াকিবহাল করার জন্য।

বাতিখানার সিঁড়ি থেকে উঠে দত্তবাবু সংলগ্ন দোচালা কোয়ার্টারের কামরায় ঢুকেন। তাঁর বাতগ্রস্ত শরীরের গাঁটে গাঁটে জানান দিচ্ছে তীব্র ব্যথা। তিনি টেবিলে সরপোষে ঢাকনা দেয়া জলখাবারের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবেন। মাথায় ঘোমটা দেয়া দাসীটি ফিরে এসে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বলে,‘ বাবু, তোমার জন্য সর্ষেতেলে রসুন ভেঁজে এনেছি। তেল এখনো গরম আছে, মালিশ করো বাবু।’ দত্তবাবু তেলের বাটির দিকে তাকিয়ে তাঁর কোর্তার পকেটে খুলিবিলি করেন। দাসীটি দরোজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। ঘোমটা খুলে কাঁধে পড়ে যাওয়ায় নারীটির সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে সিঁদুর। দত্তবাবু পকেট থেকে একটি এক আনি বের করে তার হাতে দিয়ে তাকে বেরিয়ে যেতে ইশারা দেন।

দরোজা বন্ধ করে বুক ও হাঁটুর গিঁটে রসুন মেশানো গরম তেল মালিশ করে, কাচা কোর্তা গায়ে গলিয়ে, ধুতির খুঁটটি পকেটে পুরে, লাঠি হাতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কী ভেবে তিনি আবার শেল্ফে রাখা কয়েকটি বইপত্র ও পুরানো পত্রিকাদির অগোছালো স্তূপ থেকে বের করে আনেন পঞ্জিকা। তার পৃষ্টা উল্টিয়ে তিনি দেরাজ থেকে টেনে বের করেন গুরুদেব বাচষ্পতি মহাশয়ের করা তাঁর কুষ্ঠি। হাতের আঁক গুনে দত্তবাবু কীসের যেন হিসাব-নিকাস করেন। গ্রহ-নক্ষত্র ও রাশিচক্রের অবস্থান গুনে-বেছে গুরুদেব তাঁর মৃত্যুর আগাম দিনক্ষণ জানিয়েছেন। আজ থেকে এক বছর সাত মাস তিন দিন পর, মাঘি পূর্ণিমার আগের রাতে- সূর্যদেবতা সিংহরাশির কাছাকাছি আসার লগ্নে তাঁর প্রাণবায়ু বহির্গত হবে। তাঁর অন্তরের বাসনা- চব্বিশ পরগনার জন্ম-গ্রামে তিনি যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন। দত্তবাবু এস্টেট থেকে মাসে তেরো টাকা বেতন পান। খানি-খোরাকির পুরোটা আসে এস্টেটের বারোয়ারি রসুইখানা থেকে। পূজায় ধুতি-পাঞ্জাবী ও পাম্পশুর জন্য খাজাঞ্চীখানায় বরাদ্দ আছে। তাঁর খাইখরচা তেমন নেই। দত্তবাবুর পিসতুতো বিধবা বোন ও জ্যাঠামশাইয়ের ছেলেরা এখনো গ্রামে বাস করছে। মানিঅর্ডার করে এদের প্রতিমাসে তিনি পাঁচ টাকা করে পাঠান। ফৌজদারহাট পোস্টাফিসে তাঁর আছে একশ সতেরো টাকার মতো সঞ্চয়। দাহ প্রভৃতিতে চন্দন কাঠ ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মে ব্রাহ্মণভোজনসহ তিনি ব্যয় করতে চান চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ টাকার মতো। হাতে বছর খানেক সময় থাকতে অবসর নিয়ে জন্মভিটায় ফিরে গেলে, ক্রিয়াকর্মে খাইখরচের টাকা আলাদা করে রেখে, বাদবাকি সঞ্চয় দিয়ে তিনি কোন ক্রমে শেষের মাস কয়েকের খরচ চালিয়ে নিতে পারবেন। মৃত্যুর আগে এ টাকা জেঠতুতো ভাইয়ের হাতে দিয়ে গেলে সে ঠিক মতো ব্যয় করবে কী? তার পানদোষ আছে। তাকে বিশ্বাস করাটা কী বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক? দত্তবাবুর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- এস্টেট থেকে বিদায় নিয়ে চব্বিশ পরগনায় ফিরে যাওয়া। এক পর্যায়ে অবসর গ্রহণের বিষয়টি তিনি এস্টেটের ম্যানেজার বানার্জিবাবু ও বড়সাহেবকে জানিয়েছিলেন। বানার্জিবাবু মৃদু হেসে ‘পরে দেখা যাবে’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। বড়সাহেবও শুনে তাজ্জব হয়ে কিছুক্ষণ মৌন থেকেছেন। তারপর বিষণ্ণ স্বরে সওয়াল করেছেন,‘দত্তজা, তুমি অবসর নিলে, আমার মৃত্যুর পর গোরে চেরাগ দেবে কে?’ এ দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে, তিনি আর তাঁদেরকে গুরুদেবের ভবিষ্যৎবাণীর কথা গুছিয়ে বলতে পারেননি।

হঠাৎ করে তাঁর মনে পড়ে আজ সোমবার। সপ্তাহের ওই দিন তিনি এস্টেটের ঘড়িগুলোতে দম দেয়ার কাজ দুপুরের দিকে সেরে রাখেন। তো ভারবাহী জন্তুর মতো কাঁধে রাজ্যের দুশ্চিন্তার বোঝা নিয়ে দত্তবাবু লাঠি ঠুকে ঠুকে পুরানা-কুঠির দিকে অগ্রসর হন। অবসর নিয়ে জন্মভিটায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি তিনি মন থেকে সরাতে পারেন না। এস্টেটের চাকুরীতে ইস্তেফা দিলে বাতি-বরদার বশারত মোহাম্মদ হয়তো লন্ঠনগুলোর হেফাজত করতে পারবে। কিন্তু ঝামেলা দেখা দেবে বিজলিবাতির ডায়নোমাটি চালানো নিয়ে। আর ফৌজদারবাড়ির ঘড়িগুলোতে সময় মতো দম দেয়ার ব্যাপারেও সমস্যা দেখা দেবে। তাঁর হিসাব মতে, ফৌজদারবাড়িতে দেয়ালঘড়ি ও নানা রকমের টাইমপিসের সংখ্যা সতেরোটির মতো। বছর দুয়েক ধরে তিনি ম্যানেজার বানার্জিবাবুর সাথে দেন-দরবার করছেন ঘড়ি-বরদার বলে স্বতন্ত্র একটি পদ সৃষ্টির জন্য। এ কাজে এস্টেট আলাদা কর্মচারী রাখলে, তিনি অবসরে যাওয়ার আগে তাকে ঘড়ির দম দেয়া এবং প্রয়োজন মতো মেরামতির কিছু কাজ শিখিয়ে দিয়ে যেতে পারতেন। বাতি-বরদার বশারত মোহাম্মদকে দিয়ে দিয়ে হয়তো কাচারি বাংলো ও মহলগুলোর কিছু কিছু ঘড়ির দম দেয়ানো যেতে পারে। কিন্তু পুরানা-কুঠির গ্র্যান্ডফাদার ক্লক, বড়বিবির মঞ্জিলের কাককু ক্লক, ছোটসাহেবের কুঠি-সংলগ্ন হান্টিংলজের স্কাইস্ক্যাপার্স ক্লক, ছোটবিবির মহলের ব্যালেরিনা ক্লক ইত্যাদির দম তিনি নিজ হাতে দেন। এ ঘড়িগুলো খুবই দামি এবং এগুলোর কলকব্জা অত্যন্ত নাজুক। বাতি-বরদার বশারত মোহাম্মাদ আদতে মাথামোটা প্রকৃতির। তার হাতে এগুলোর ভার ছেড়ে দেয়া যায় না।

হরেক কিসিমের দেয়াল ঘড়িগুলোর হেফাজতের বিষয় আশয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে তিনি পুরানো কুঠির চকমিলান সিঁড়ি বেয়ে উঠে যান বারান্দায়। উচ্চতায় সাড়ে ছয় ফুটি প্রকাণ্ড গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটি রাখা আছে কুঠির দোতালায় বড়সাহেবের দফতরে। দত্তবাবু ঘুরানো সিঁড়ি বেয়ে দফতরের হল-কক্ষে ঢুকে দেখেন, দপ্তরি অসাদ মুন্সি কুটিচৌকিতে বসে ঝিমাচ্ছে। তাঁর পদশব্দ শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে বলে,‘বিজলি বাবু, সালাম।’ দফতরখানার মস্ত বড় হল-কামরাটি সুনসান হয়ে আছে। তার ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল একটি টানা পাঙ্খা। দেওয়াল জোড়া সেগুনকাঠের ভারী আলমিরাগুলোতে রাখা আছে এস্টেটের জরুরি দলিল দস্তাবেজ। দেয়ালগিরিতে সিমেন্ট দিয়ে স্থায়ীভাবে আটকানো লোহার সিন্দুকে আছে পাঁচ প্রজন্ম আগে- এ পরিবারের আদি এক স্বনামধন্য পূর্বপুরুষের শাহী দরবার থেকে ফৌজদারি লাভের ফরমান। এক সময় দপ্তরখানাটি নায়েব, সেরেস্তাদার ও মোসাহেবে সকালবেলা গমগম করতো। আশপাশের তিন পরগনার কোন গ্রামে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা দিলে, হাতির দাঁতের কারুকাজ করা কুরছিখানায় বসে, গ্রামের মোড়ল মাতব্বরদের এখানে ডেকে এনে বড়সাহেব বিচার বাদখাস্তও করতেন। আড়াই বছরের মতো হয়ে গেলো, বড়সাহেব এস্টেটের সক্রিয় পরিচালনা থেকে অবসর নিয়েছেন। ছোটসাহেবের হাতে ম্যানেজমেন্টের ভার তুলে দেয়ার পর থেকে পুরানা-কুঠির এ দফতরখানার ব্যবহারও কমে এসেছে। তবে এখনো দূর থেকে ছোটসাহেবের এস্টেট পরিচালনার বিষয়ে বড়সাহেব অপ্রত্যক্ষভাবে নজরদারি করেন। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে রুটিন করে একবার দফতরে এসে বসেন। ম্যানেজার বানার্জিবাবু এসে তখন তাঁকে সেলাম দিয়ে যান। মাঝেসাজে খাজাঞ্চী সিদ্দিকিসাহেবও এসে বড়সাহেবকে এস্টেটের আমদানি বা বড় আকারের খায়খর্চার বিষয়ে অবহিত করেন।

দত্তবাবু গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটিতে চাবি দিতে দিতে দেয়ালে ঝুলানো ফৌজদারবাড়ির তিন প্রজন্মের প্রয়াত তিন পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্রে ধারণ করা প্রতিকৃতিগুলোর দিকে তাকান। তাঁর বুক থেকে বেরিয়ে আসে একটি দীর্ঘশ্বাস। আজ থেকে এক বছর সাত মাস তিন দিন পর নশ্বর দেহ থেকে আত্মা পরলোকে পাড়ি দিলে পৃথিবীতে স্মৃতি হিসাবে তাঁর কোন ফটোগ্রাফস্ও থাকবে না। হলকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সময় দফতরি আসদ মুন্সি দুয়ারের পাশে স্ট্যান্ডে রাখা হাতি দাঁতে ঝাড়ন বুলাতে বুলাতে হাত তুলে তাকে আবার সালাম জানায়।

দত্তবাবু এসে পড়েন দোতালার খোলা ছাদে। ওখানে মেঝেতে পাতা নকশী করা শীতলপাটির উপর রাখা আছে জালি বেতে তৈরী কয়েকখানা সোফা। সোফাগুলো আকারে অত্যন্ত ভারী এবং এগুলোর বৃত্তাকার হাতলকে দেখায় গরুরগাড়ির চাকার মতো। মাথা উপর স্ট্যান্ডে আটকানো ছত্রির ঝালর খোলা হাওয়ায় দুলছে। তাতে শীতল পাটির উপর নড়াচড়া করে ছায়ার রেখাচিত্র। পিতলের চকচকে জলভরা ফুলদানিতে তাজা ফুল রাখতে গিয়ে তাঁর সাড়া পেয়ে বাগিচার মালী ঘাড় বাঁকিয়ে বলে,‘নমস্কার আজ্ঞা.. বিজলি বাবু।’ পিঞ্জিরা খুলে দেয়াতে বড় সাহেবের পোষা কাকাতুয়া দুটি বেরিয়ে এসে সাইড টেবিলে তিরলের উপর রাখা কাটা পেঁপে খুঁটে খাচ্ছে। ভোরবিহানে বাতিগুলোর তদারকিতে বেরোবার আগে দত্তবাবু কেরোসিন তেল কেনার রসিদ কাছারি বাংলোতে জমা দিতে গিয়ে শুনতে পান যে, আজ দুপুরের দিকে জেলার স্কুল ইন্সপেক্টর বড়সাহেবের সাথে দেখা করতে আসছেন। ম্যানেজার বানার্জিবাবু এস্টেটের এক পুরানো কর্মচারী সেরেস্তাদার কৃষ্ণপদ হালদারকে দায়িত্ব দিয়েছেন, স্কুল ইন্সপেক্টারকে ফৌজদারবাড়ির সদর দেউড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে খোশ আমদেদ জানানোর। তারপর সেরেস্তাদারবাবুর তত্ত্বাবধানে ইন্সপেক্টার পুরানা-কুঠিতে আসবেন বড়সাহেবের সাথে মোলাকাত করতে। একজন ভৃত্য ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে এক্যুরিয়মের কাচ। ভেতরে ভাসা জলজ গুল্মের সবুজাভ বাতাবরণে ঘাই মেরে মেরে খেলছে দুটি লোহিত রঙের গোল্ডফিস। প্রস্তুতিমূলক তৎপরতা থেকে আন্দাজ করেন, বড়সাহেব আজ খোলা ছাদে বসে স্কুল ইন্সপেক্টারের সঙ্গে বাতচিত করবেন। দত্তবাবু অবগত যে, রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহণের গোল্ডেন জুবিলি উপলক্ষে বড়সাহেব স্থাপন করেছিলেন অষ্টমমান অব্দি পড়াশুনা করা যায় এ রকমের একটি স্কুল। তিনি চাচ্ছেন, সরকারি মদদে এটিকে হাইস্কুল বানানো, যাতে এ আত্রাফের কুলীন বংশের ছেলেরা এন্ট্রান্স এখান থেকে পাশ দিতে পারে। এ বাবদে স্কুল ইন্সপেক্টারের সাপোর্ট পওয়া খুবই জরুরি। জুবিলি স্কুলের বিষয়টি ভাবতে গিয়ে তাঁর ভেতরে একটি অপূর্ণ বাসনা হাহাকার তুলে। তাঁর ছেলে-সন্তানটি বেঁচে থাকলে এতদিনে সে এনট্রান্স পাশ করে ফেলতে পারতো। তাকে নিজের জীবদ্দশায় তিনি এস্টেটের কর্মচারী হিসাবে চাকুরিতে ঢুকিয়ে দিতে পারতেন।

খোলা ছাদের ছত্রীতলে বসার পরিসরটি পেরিয়ে, অতঃপর পাম্পসু খুলে রেখে তিনি ঢুকেন পুরানা-কুঠির কুতুবখানা বা লাইব্রেরি ঘরে। বিনম্র আদাবের জবাবে বড়সাহেব মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে তাঁর উপস্থিতিকে আমলে আনেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তিনি স্কুল ইন্সপেক্টারের সাথে মোলাকাত করার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছেন আরাম কেদারায়। ঘিয়ে রঙের শেরওয়ানির সাথে যোদপুরি পায়জামা পরায় তাঁকে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সিনিওর নেতাদের মতো দেখায়। আরাম কেদারার পাশেই রাখা হাতির দাঁতের কোঁকড়া লাঠিটি। স্ট্যান্ডের উপর বিশাল একটি রেডিওগ্রাম থেকে বেরুচ্ছে ধ্রুপদী কেতার সুরেলা আওয়াজ। তিনি বিভোর হয়ে শুনছেন, অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে ব্রডকাস্ট করা ওস্তাদ আব্দুল করিম খাঁর খেয়াল।

বড়সাহেবের সংগীতজনিত তন্ময়তা না ভেঙ্গে, গালিচার উপর পা টিপে টিপে দত্তবাবু ফায়ারপ্লেসের উপর রাখা ঘড়িটির কাছে আসেন। পাশে কাঠের দোলনায় তুলতুলে কম্বলের নিচে শুয়ে পোষা কালো কোঁদা বাঘের বাচ্চা ‘কালবৈশাখি’। তাঁর সাড়া পেয়ে লাঙ্গুর নাড়িয়ে শিশু-শার্দূলটি জুল জুল করে তাকায়। দত্তবাবু কালবৈশাখির নেত্রপাতকে আমলে না এনে কাজে হাত লাগান। ঘড়িটির কাঠের মহর্ঘ কেইসে খোদাই করে তৈরী করা হয়েছে বিলাতের টেমস নদীর তীরের পার্লামেন্ট ভবনের আকৃতি। ওয়েস্টমিনিস্টার ক্লক বলে পরিচিত এ ঘড়িটিতে এলার্মের ব্যবস্থা আছে, আরো আছে দিনক্ষণ, মাস ও সন সম্বলিত ক্যালেন্ডার। এটির কারিকুরি বেশ জটিল, তাই একটু সময় নিয়ে দত্তবাবু দম দেন, চাবি ঘুরিয়ে তারিখও বদলান।

কাজ সারা হতেই দেখেন, অল ইন্ডিয়া রেডিওতে খেয়াল গান শেষ হয়ে কিছু একটার এনাউন্সমেন্ট চলছে। বড়সাহেব বিরক্ত হয়ে হাত বাড়িয়ে রেডিওর নভ চেপে তা বন্ধ করে দেন। দত্তবাবু হাত জোড় করে আবার আদাবের ভঙ্গি করলে তিনি কাজের কথায় আসেন,‘স্কুল ইন্সপেক্টার আসছে, শুনেছো দত্তজা?’ ‘জ্বি আজ্ঞা’ বলে জবাব দিলে বড়সাহেব আবার বলেন,‘ আজিব আদমি এ ইন্সপেক্টার, বোম্বাইয়ের পার্সি, এ লোক আগুনের পূজা করে, কিন্তু মাছমাংস কিছু খায় না, শরাবও তার নাপছন্দ। তবে মিষ্টি -মোহনভোগ এসব খেতে ভালোবাসে।’ দত্তবাবু বড়সাহেবকে আশ্বস্ত করে বলেন,‘ বানার্জিবাবু সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন.. আজ্ঞা। ময়রা মনমোহনকে এত্তেলা দিয়ে এনেছেন। ইন্সপেক্টারের মেহমানদারির আয়োজনে খামতি কিছু হবে না.. আজ্ঞা।’

বড়সাহেব আরাম কেদারা থেকে উঠে আলমিরার পাল্লা খুলে হাতে নেন একখানা উর্দু কেতাব। চশমা চোখে দিয়ে বিড়বিড়িয়ে তিনি কেতাবখানার শিরোনাম পড়েন,‘ইনসানিয়াত মওত কী দরওয়েজে মে বা মৃত্যুর দুয়ারে মানবতা।’ মৌলানা আবুল কালাম আজাদের লেখা বইটির পৃষ্ঠা উল্টিয়ে অন্যমনস্ক হালতে তাঁকে প্রশ্ন করেন,‘মৌলানা সাহেব কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তেফা দিয়ে জওরহলাল নেহরুকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। ঘটনা কী দত্তজা? রাজনীতিতে এসব কীসের আলামত?’ কাচুমাচু হয়ে হাত কচলিয়ে দত্তবাবু জবাব দেন,‘ স্টেটসম্যানে লিখেছে আজ্ঞা, মৌলানা সাহেব কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের গুরুদায়িত্ব থেকে অবসর নিয়ে ক্রিপ্স মিশনের সাথে বাতচিত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’ বড়সাহেব মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনে জানতে চান,‘স্যার রিচার্ড ক্রিস্প কী আবার হিন্দুস্থানে আসছেন?’ ‘জ্বি আজ্ঞা, তাই তো শোনা যাচ্ছে, তিনি আসলে পর মৌলানা সাহেব কংগ্রেসের তরফ থেকে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার বিষয়টা এবার ফাইনাল করতে চান।’ দত্তবাবুর জবাব শুনে বড়সাহেব বিষয়টিতে আগ্রহ হারান। তিনি চশমার ভারী কাঁচের ভেতর দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে এবার ভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করেন। বেজায় উদ্বিগ্ন স্বরে তিনি জানতে চান, ‘ দত্তজা, তুমি মৃত্যুর কথা কখনো ভাবো?’ দত্তবাবু চমকে ওঠে জবাব দেন,‘ জ্বি আজ্ঞা, ভাবি। সব সময় ভাবার অবকাশ হয় না, তবে রাতবিরাতে আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠলে মনে হয়, সংসারের বিষয়-আশয় একদিন শেষ হয়ে আসবে.. আজ্ঞা।’ তাঁকে কথার মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বড়সাহেব মন্তব্য করেন,‘জ্যোৎস্না রাতে ছাদে বসলে মনে হয়, আমারও সময় ঘনিয়ে আসছে দত্তজা, যে কোন দিন শমন আসবে, পরকালের পাথেয় সংগ্রহের কোন অবকাশও পাবো না।’ দত্তবাবু তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন,‘আপনি পুণ্যাত্মা পুরুষ, নেকবন্দ ব্যক্তি, আপনার ভাবনা কি.. আজ্ঞা?’ বড়সাহেব হাতে ধরে রাখা কেতাবটি দেখিয়ে বলেন,‘এ পুস্তকে মৌলানা মৃত্যুর কথা বয়ান করেছেন বটে, কিন্তু পরকাল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেননি।’ দত্তবাবু আলোচনাকে বিস্তারিত করার মানসে বলেন,‘ বেয়াদপি মাপ করবেন আজ্ঞা, জোড়াসাঁকোর রোববাবু পরকাল নিয়ে চর্চা করতেন। শুনেছি, প্ল্যানচেটে তিনি তাঁর বৌদির সঙ্গেও বাতচিত করেছেন।’ বড়সাহেব মৃদু হেসে যোগ করেন,‘রোববাবুর প্ল্যানচেটের বিষয়টা আমারও কানে এসেছে, কিন্তু প্রয়াতদের সাথে আলাপের কোন খতিয়ান তিনি কোন বইপত্রে লেখেননি।’ দত্তবাবু পাল্টা মন্তব্য করেন,‘রোববাবু বোধ হয় লিখেছেন.. আজ্ঞা, কিন্তু মহর্ষিবাবুর হয়তো নিষেধ দেয়া আছে এ সব প্রকাশে।’ বড়সাহেব হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমার কাঁচ মোছেন। তারপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফিসফিসিয়ে জানতে চান,‘পরকাল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে কোন বইপুস্তক কী একেবারেই লেখা হয়নি?’ দত্তবাবু এবার গলার স্বর নামিয়ে জবাব দেন,‘ তারাপদ ব্রহ্মচারী মহাশয় পরকাল নিয়ে একখানা পুস্তক রচনা করেছেন.. আজ্ঞা। উনি সিদ্ধপুরুষ, তাঁর গ্রন্থখানা আপনি পড়বেন কী?’ বড়সাহেব হতাশ হয়ে বলেন,‘ এ সাধক পুরুষের ঘটনাও আমি শুনেছি, কিন্তু আমার কুতুবখানায় তো তাঁর কোন পুস্তকাদি নেই দত্তজা।’ দত্তবাবু তাঁকে আশ্বস্থ করে জানান,‘বানার্জিবাবুর কোয়ার্টারে বইখানা আছে। আপনি হুকুম দিলে আগামীকাল জোগাড় করে নিয়ে আসবো.. আজ্ঞা।’ বড়সাহেব যেন প্রতিপক্ষ জমিদার রায়-চৌধুরীবাবুদের কোন মহল লাঠিয়াল পাঠিয়ে দখল নেবার ষড়যন্ত্র করছেন, এ রকম গলার স্বর নিচু করে বলেন,‘বইখানা সঙ্গোপনে নিয়ে আসবে দত্তজা। আমি পরকাল নিয়ে ভাবছি, এ সব কথা বানার্জিবাবুর কানে যেন না যায়। বুঝলে..খবরদার।’ দত্তবাবু হাত জোড় করে তাঁকে ফের আশ্বস্ত করলে, বড়সাহেব বিরাট একটি বুককেসের দিকে যেতে যেতে সওয়াল করেন,‘দত্তজা, রোববাবুর কবিতা তুমি পড়েছো?’ তিনি শঙ্কিতভাবে জবাব দেন,‘আজ্ঞা, কেবলমাত্র সোনার তরী পুস্তকখানা আমি পড়েছি।’ বড়সাহেব বুককেইস থেকে তুলে গীতাঞ্জলি গ্রন্থখানা তাঁর হাতে দিতে দিতে বলেন,‘রাতে জ্যোৎস্না হলে আমি ছাদে বসে রোববাবুর এই পুস্তক থেকে একটি দুটি পদ্য পড়ি। তুমিও পড়ে দেখো দত্তজা, নিশিরাতে নীরবে বসে কয়েকটি পদ্য পাঠ করে দেখো, এ ভবসমুদ্রে নোঙর করার মতো মাটি খুঁজে পাবে।’ দত্তবাবু এবার কুর্নিশি কায়দায় বড়সাহেবকে আদাব দিয়ে গীতঞ্জলিখানা বগলে নিয়ে বেরিয়ে আসেন কুতুবখানা থেকে।

খোলা ছাদে আসতেই কাকাতুয়া দুটি খামোকা কুজন করে, সামান্য উড্ডীন হালতে এসে তাঁর কাঁধে বসে । উটকো বিপত্তিতে হাত ঝাঁকিয়ে তিনি রঙদার খেচর দুটির হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে চান। ধূপদানী হাতে গুলগুলের ধোঁয়া ছড়াতে থাকা এক বয়স্ক থুরথুরে ভৃত্য এসে পাখি দুটিকে তাঁর কাঁধ থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়।

বড়বিবির খাসমহল চেমন মঞ্জিলের আঙিনায় ঢুকে কোরান তেলায়তের আয়োজন দেখে দত্তবাবু থতমত খেয়ে যান। বাগিচায় গোলাপকুঞ্জের মাঝখানটিতে পেতে রাখা শ্বেতপাথরের নিচু কুটিচৌকিতে জানু বিড়িয়ে বসে গেরামের আনছর উল্লা ক্বারী মিহিস্বরে কোরান তেলায়ত করছেন। তাঁর সামনে পিতলের খুঞ্চায় রাখা একটি ডাক্তারী যন্ত্র। সামান্য দূরে কাঁঠালিচাঁপা গাছের ছায়ায় সিমেন্টের বেঞ্চে বসে এ আত্রাফের একমাত্র এলএমএফ ডাক্তার সুরেশ দেবনাথ। দত্তবাবুর নমস্কারের জবাবে তিনি স্টেথোস্কোপ খামচে ধরা হাতখানি তুলে প্রণামের জবাব দেন। তাঁকে খানিকটা বিভ্রান্ত দেখায়। বড়বিবির খাস-বাঁধি ফুলজান বেওয়া এসে তাঁকে মঞ্জিলে ঢুকার ইশারা দেয়। তারা পাশাপাশি হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় ফুলজানের ফিসফিসানো বয়ানে পুরো ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবহিত হন। বছর খানেক হলো বড়বিবি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। দিন-কে-দিন বড়সাহেব তাঁর মাহুতের ষোড়শী কন্যা ছায়াবানুর সঙ্গে সান্ধ্যকালীন আশনাইয়ে মাতছেন, হালফিল তিনি রাতের দিকে চেমন মঞ্জিলে বড় একটা আসেন-টাসেন না। তাঁর ক্রমাগত এনকার ও তুমুল অবজ্ঞা বড়বিবির স্নায়ুর ওপর সৃষ্টি করছে তীব্র চাপ। অবহেলা যখন বরদাশত করা কঠিন হয়, তখনই তিনি আক্রান্ত হন উচ্চ রক্তচাপে। এ ব্যাধির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হামেশা রক্তচাপের মাপঝোঁক। বিষয়টি ম্যানেজার বানার্জিবাবুর কানে গেলে, তিনি সুরেশ ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক কলকাত্তা থেকে আনিছেন এ ব্লাডপ্রেসার মাপক যন্তর।

সুরেশ ডাক্তার ব্লাডপ্রেসার মাপক যন্তরটি তাঁর বাহুতে ব্যবহার করার ইজাজত প্রার্থনা করলে, বড়বিবি আনছর উল্লাহ ক্বারীকে পবিত্র কোরান শরীফ খতম করার আদেশ দেন। তিনি গেরামের মসজিদে উনত্রিশ সিপারা অব্দি তেলায়ত শেষ করে আজ চেমন মঞ্জিলে এসেছেন। ক্বারি শেষ পারার কেরাত সমাপন করে, খতম বকশে অতঃপর ব্লাডপ্রেসার মেশিনে ফু দেবেন। তারপর সুরেশ ডাক্তার পর্দার আবডাল থেকে বাড়িয়ে দেয়া বড়বিবির বাহুতে যন্তরের বস্ত্র প্যাচিয়ে রক্তচাপ মাপার অনুমতি পাবেন।

ফুলজান বেওয়া তাঁকে চেমন মঞ্জিলের টানা বারান্দার শেষপ্রান্তে খেলা-কামরা নামে পরিচিত একটি কক্ষে নিয়ে আসে। আজ থেকে বারো বছর আগে, বড়বিবি পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে মঞ্জিলের বারান্দায় এ খেলা-কামরাটি তৈরী করে সংযুক্ত করা হয়। সাহেব-বিবির একমাত্র পুত্রসন্তান, এস্টেটের সাড়ে আট আনি অংশের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী, সাহেবজাদা শ্রীমান ইতমাম উদ দৌলা বর্তমানে শিলংয়ের নামজাদা কনভেন্ট স্কুল সেন্ট এডমন্ড কলেজে পড়াশুনা করছে। হোস্টেলে যাওয়ার আগ অব্দি সাহেবজাদা ইতমাম এ খেলা কামরাতেই সারাদিন কাটাতো। তার প্রাইভেট শিক্ষক হরেন্দ্রবাবু এ কামরাতেই তাকে আংরেজী ও অংক পড়াতেন।

ফুলজান বেওয়া দরোজার কাঁচের পাল্লা খুলে ধরলে দত্তবাবু খেলা-কামরায় ঢুকে পড়েন। কামরায় কাঠের ঘোড়া, ছোটখাট রিক্সার মতো দেখতে একটি বাচ্চাদের বাইসিকেল ও হরেক কিসিমের বিলাতি খেলনা সাজিয়ে রাখা আছে। সাহেবজাদা ইতমাম বইপুস্তক পড়তে ভালোবাসে। বুক-কেইসে দেবসাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত গল্পের বইগুলোর পাশে বাঁধাই করে রাখা আছে শিশুতোষ পত্রিকা সন্দেশের অনেকগুলো কপি।

দত্তবাবু কামরায় ঢোকা মাত্র চেমন মঞ্জিলের চাকর-নওকরদের কয়েকটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে দরোজায় ভিড় করে দাঁড়ায়। ফুলজান বেওয়া হাতের ইশারায় তাদের সরে জানালার কাছে দাঁড়াতে বললে, দত্তবাবু সাবধানে দেয়াল থেকে নামিয়ে আনেন একটি কুককো ক্লক। পর পর তিনটি কন্যাসন্তানের জন্মদানের সাত বছর পর, সর্বশক্তিমানের অশেষ মেহেরবানীতে বড়বিবি পুত্রলাভ করলে বড়সাহেব তাঁকে এ কুককো ক্লকটি উপহার দেন। ঘড়িটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে জার্মানীর ব্ল্যাক ফরেস্ট ক্লক কোম্পানি তৈরী করে তাদের অসাধারণ কারিগরিতে। ঘড়িটির কেইস দেখতে অনেকটা কাঠের দোচালা কটেজের মতো। তার বেলকনিতে বসে দুটি ছোট্ট পাখি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘড়ির ভেতর থেকে খেচরকন্ঠে আওয়াজ হয় কুককো ধ্বনি। তখন নড়ে ওঠে পাখি জোড়ার টুকটুকে লাল ওষ্ঠ। শিশু ইতমাম ঘড়ির কুজনের মতো ঘণ্টাধ্বনি শুনতে এতো ভালোবাসতো যে, বড়বিবি ঘড়িটি তার খেলা-কামরার দেয়ালে ঝুলানোর আদেশ দেন।

দত্তবাবু কুককো ক্লকের চেইন টেনে কিছু একটা এডজাস্ট করলে, তা থেকে কুককো কুককো ধ্বনিতে বেলা এগারোটা বাজার সংকেত হয়। তাতে উল্লসিত হয়ে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চারা হাততালি দিয়ে কলরোল করে ওঠে। এতে বিরক্ত হয়ে ফুলজান একটি কাঠের খেলনা বন্দুক তুলে তাদের শাসায়। তার বক্তব্য পরিষ্কার, দাসী-বান্দির সন্তানরা আরেকবার চূচেরা আওয়াজ করলে সে তাদের দিকে তাক করে ছুড়বে বন্দুকের ছররা। বাচ্চাগুলো ভয় পেয়ে খামোশ মেরে যায় বটে, তবে তাদের চোখমুখে খেলা করে আচানক কিছু পর্যবেক্ষণ করার উত্তেজনা।

ফুলজান বেওয়া জানালার পর্দা ফেলে দিয়ে তার কোঁচড় থেকে বের করে দত্তবাবুর হাতে দেয় অলংকারের বাক্সের মতো দেখতে কাঠের একটি ছোট্ট কেইস। তিনি কেইসটি খুলে দেখেন তাতে নীল ভেলভেটে মোড়া একটি গোল্ড-ওয়াচ। ফুলজানের ফিসফিসানো বাচনিকে জানতে পারেন, মাস দেড়েক পর গ্রীষ্মের ছুটিতে সাহেবজাদা ইতমাম ফৌজদারবাড়িতে ফিরে আসবে। পুত্রের জন্য উপহার হিসাবে বড়বিবি তাঁর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কলকাত্তা থেকে এ রিস্টওয়াচটি খরিদ করিয়েছেন। এটি ক্রয় বাবদে তাঁর খরচ হয়েছে অনেক টাকা-পয়সা। ঘড়িটি সোনালি রঙে ঝলমলে হলেও এটিতে কীভাবে দম দিতে হয়, এ ব্যাপারে বড়বিবির আত্মীয় ঠিক ওয়াকিবহাল নন। দত্তবাবু কাঠের কাসকেট থেকে রিস্টওয়াচটি বের করে নেড়েচেড়ে দেখেন। কাসকেটের তলায় পাওয়া যায় ভাঁজ করা এক টুকরা কাগজ। তাতে ছোট হরফে মুদ্রিত আছে হাতঘড়িটি চালানোর কলাকৌশল। দত্তবাবু চিন্তিতভাবে কাগজটি থেকে চোখ তুলে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবেন। ওখানে ঝুলানো টাকসিডো স্যুটের সাথে বো-টাই পরা সহেবজাদা ইতমামের ফটোগ্রাফস। শ্রীমানের বয়স মাত্র বারো, সে কী ইতোমধ্যে কব্জিতে গোল্ড-ওয়াচ বাঁধার মতো লায়েক হয়ে উঠলো? দত্তবাবু সচেতন যে, মুনিবপুত্র সম্পর্কে এ ধরনের ভাবনা শিষ্টাচারের দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিবেচনার কাজ নয়। তো, তিনি কাজ সম্পন্ন করার অসিলায় উঠে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পর্দা সরান। চশমা লাগিয়ে বেজায় ছোট ছোট হরফে লেখা কাগজটি চোখের সামনে তুলে ধরলে অজানা আতঙ্কে দাসীদের সন্তানাদি পিছু হটে। বিবরণ পড়ে তিনি বুঝতে পারেন, গোল্ড-ওয়াচটি তৈরী করেছে সুইটজারল্যান্ডের এক কোম্পানি। সলিড গোল্ডের এ আর্ট-ডেকো ডায়েলে লাগানো আছে অতিক্ষুদ্র সতেরোটি ডায়মন্ড জুয়েল। কোম্পানি এলমন্ড গোল্ডটোন ম্যান’স ওয়াচ ব্র্যান্ড নামে এ ঘড়ি বাজারজাত করে দাবি করছে, এটিতে অত্যাধুনিক কারিগরি দক্ষতায় জুড়ে দেয়া হয়েছে সেলফ ওয়াইন্ডিং সিস্টেম। অর্থাৎ এটি চালাতে দম দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। এ ধরনের রিস্টওয়াচের কথা দত্তবাবু শুনেছেন, কিন্তু কখনো চাক্ষুষ করেননি। তিনি কাগজখানা মুড়ে কাসকেটে রেখে ঘড়িটি কানে লাগিয়ে শুনেন। বেজে যাওয়া সূক্ষ্ম টিকটিক ধ্বনিতে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি ফুলজান বেওয়াকে বলেন, এতে চাবি দেয়ার আপাততঃ কোন জরুরত নেই। সাহেবজাদা ইতমাম বাড়িতে এসে এটি হাতে দিয়ে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে তাঁকে যেন তৎক্ষণাৎ মঞ্জিল থেকে এত্তেলা পাঠানো হয়।

শুনে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকায় ফুলজান, তবে মুখে কিছু বলে না। রিস্টওয়াচের কাসকেটটি কোঁচড়ে গুঁজে সে একটি বটুয়া থেকে বের করে রূপালি চান্দির একখানা ভারি সাতনরি হার। হারখানিতে বেশ কয়েকটি মুক্তা গাঁথা। দত্তবাবু হারখানা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে জানতে চান,‘কী সমাচার ফুলজান?’ সে থুতনিতে আঁচল চেপে ধরে বলে,‘ বড়বিবি আজকাল নামাজ-কালাম নিয়ে মশগুল হয়ে আছেন। তাঁর রাতে ঘুম কম হয়, তাই সুবে সাদেকের আগে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে পারেন না। তিনি চাচ্ছেন, দত্তবাবু যেন চেনা পৌদ্ধারের দোকানে সাতনরী হারখানা ভাঙ্গিয়ে তা বিক্রির টাকায় তাঁকে খরিদ করে দেন একটি এলার্ম দেয়া টেবিল ক্লক।’ সব শুনে তিনি মন্তব্য করেন,‘আমি খাজাঞ্চী সিদ্দিকি সাহেবের সাথে কথা বলে এস্টেটের ইজমালি তহবিল থেকে টাকা নেব। তারপর কলকাত্তা থেকে কাউকে দিয়ে না হয় কিনে আনাবো একটি এলার্ম দেয়া টেবিল ক্লক।’ তাঁর প্রস্তাবে ফুলজান বেওয়া রাজি হয় না, বড়বিবি নাকি ওয়াদা করেছেন, এস্টেটের তহবিল থেকে তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য কোন টাকাপয়সা ব্যয় না করতে। দত্তবাবু নীরবে ফুলজানের বক্তাব্য শুনে সাতনরী হারের বটুয়াটি নিয়ে বেরিয়ে আসেন খেলা কামরা থেকে।

চেমন মঞ্জিলের দেউড়ি থেকে হেঁটে মসজিদের কাছে আসতেই তাঁর সাথে দেখা হয় সুরেশ ডাক্তারের। ডাক্তারবাবুকে চিন্তিত দেখায়। টুকটাক বাতচিতে জানতে পারেন, বড়বিবির শরীরের গতিক মোটেই সুবিধার নয়, তাঁর উচ্চ রক্তচাপ রীতিমতো মাথায় চড়ে বসেছে। তাঁকে গোরা ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানোর জন্য শিলং বা কলকাত্তায় পাঠানো অক্তে-জরুরি। সুরেশবাবু বড়বিবিকে গোরা ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার, গোরা ডাক্তারের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে অবধারিতভাবে খেলাফ হবে পর্দাপুশিদার। রইস খানদানে তাঁর জনম, পর্দাপুশিদা তাঁর অঙ্গের মূল্যবান ভূষণের মতো। এ ভূষণের কোনভাবে খলল হোক তা তিনি চান না। যখন হায়াত ফুরাবে, তখন তিনি ইজ্জত হুরমত নিয়ে মঞ্জিলের নিজ ভিটায় ইন্তেকাল করতে চান। দত্তবাবু ডাক্তারকে কাছারি বাংলোতে গিয়ে এ সংকট সম্পর্কে ম্যানেজার বানার্জিবাবুকে রিপোর্ট করার পরামর্শ দেন।

অতঃপর তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ‘গুরুদেবো.. দয়া করো দীনজনে’ বলতে বলতে ছোটবিবির মহলের দিকে রওয়ানা হন। সুরুয চাদির ওপর উঠে যাওয়ার আগেই ওখানকার ব্যালেরিনা ক্লকে দম দেয়ার বিষয়টি তিনি সম্পন্ন করতে চান। তারপর বাতিঘরে গিয়ে ডায়নোমাতে কিছু মেরামতির ব্যাপারও আছে। বাজারের দিকে রওয়ানা দেয়ার আগে বাতিগুলোর ফাইনাল তদারকি সেরে ফেলতে হয়। তাঁর কাজকর্মের কী আর কোন গাছপাথর আছে?

মঈনুস সুলতান

জন্ম সিলেট জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ে ডক্টরেট করেন। বছর পাঁচেক কাজ করেন লাওসে-একটি উন্নয়ন সংস্থার কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ হিসাবে।

খণ্ড-কালীন অধ্যাপক ছিলেন ইউনিভারসিটি অব ম্যাসাচুসেটস এবং স্কুল অব হিউম্যান সার্ভিসেস এর। কনসালটেন্ট হিসাবে জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক, মেসিডোনিয়া ও কিরগিজস্তান প্রভৃতি দেশে কাজ করেন অনেক বছর।

ইবোলা সংকটের সময় লেখক ডেমোক্রেসি এন্ড হিউম্যান রাইটস নামে একটি ফান্ডিং কর্মসূচির সমন্বয়কারী হিসাবে সিয়েরা লিওনের ফ্রিটাউনে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাভানা শহরে বাস করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে প্রাচীন মুদ্রা, সূচিশিল্প, পাণ্ডুলিপি, ফসিল ও পুরানো মানচিত্র সংগ্রহের নেশা আছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।