নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-১৫

এই বাড়িতে প্রথমদিকে আজমত চাচাকে খেয়াল করেনি নিধি। উঠানের চারপাশ জুড়ে কতগুলি বড় বড় ঘর, কারা যে সেখানে থাকে! কত লোক সারাদিন আসে যায়।

ভোরে হাঁস মুরগীর খোয়াড় খুলে দিলে ঝাঁট দেয়া উঠান সরগরম হয়ে ওঠে। কে একজন প্রতিদিন সেখানে ডালা ভর্তি চাল গম ছিটিয়ে ছিটিয়ে দেয়। সেসব খুটতে গিয়ে মুরগীর বাচ্চাদের ফুলে ওঠা ক্ষুদে পাখনা দেখতে দেখতে নিধি শুনশান পুস্কুরিনীর মত নিশ্চুপ হয়ে বসে মুহূর্তেই নিধি আবার সচকিত হয়ে ওঠে। কারণ ততক্ষণে উত্তর কোনের ঘরের মাথায় সারি সারি ছ’টা কবুতরের খোপ খুলে দিয়েছে সেই লোক। ভুরুক ভুরুক শব্দে পায়রাগুলি ততক্ষণে উঠানময় ইন্দ্রজাল  ছড়িয়ে খাবার খুটে খাচ্ছে। আর নিধিও বারান্দায় প্রায় উপুড় হয়ে বসে গেছে, সে খেয়াল করে না সেই কেউ একজন তাকে দ্যাখে আর মুচকি মুচকি হাসে। এই কেউ একজন যে আজমত চাচা তা জানতে বেশ কয়েকদিন লেগে গেল।

এই ক’দিন যাকে তেমন চোখেই পড়েনি এখন তাকে সর্বত্রই দেখতে পায় নিধি।

দাদুর বড় ছেলের সঙ্গে নিজের বাবার সঙ্গে কোন মিল খুঁজে পায় না নিধি। লুঙ্গির ওপরে হাফ শার্ট, চুলে পাক, ঝুঁকে থাকা শরীর, হাতের কব্জিতে পাকানো শিরা উপশিরা। পোড় খাওয়া খয়েরী মুখের চামড়া ভেদ করে ঝকঝকে শাদা দাঁত।

পান তামাকের অভ্যাস বড় বদভ্যাস- আজমত চাচার সঙ্গে নিধি মাথা নেড়ে একমত হয়। দাদুবাড়ির সবকিছুর দেখভাল করে আজমত চাচা। চাষাবাদ, ক্ষেতের আইল, জমির সীমানা, লিচু বাগান। কিষাণ মজুর। আর দাদীর ডাক্তার কবিরাজ (দাদীর সঙ্গে বসবাসকারী জ্বীনটাকেও বোধহয় ভালোবাসে)।

আজমত চাচা প্রথম প্রথম শুদ্ধ বাংলা, স্থানীয় ভাষা আর মুন্সীগঞ্জের মিশেলে জগাখিচুরী করে কথা বলতো, আর নিধি মজা পেতো।

-‘ বুজলি নিধুয়া, তোর মা’র নামটার জন্য কিন্তু তোর বাবা তাকে বিয়া করবার চাইছিল, বীণা একখান বাইদ্যযন্ত্রের নাম’।

আচ্ছা, বীণা যে একটা বাদ্যযন্ত্র নিধি কি সেটা জানে না? সে তো একেবারে জন্ম থেকেই জানে।

-‘বাবা এখানে থাকতেও গান গাইতো চাচা?’

-‘গাইতো রে নিধুয়া পাথার! তোর বাবা ইস্কুলে পড়ার সময় একজন গানের মাষ্টারের জইন্য কত যে ঘুরছে! এই এলাকায় তো ধর, মুশলমানের মইদ্যে গান বাজনার চল নাই, আমাদের যে আধিয়ার হীরেন্দ্র পলিয়া আছিল, তার কাছ থেইকা হারমোনিয়াম শিখার যইন্য তোমার বাপ একেবার কাইজ্জা পযন্ত বাজায়া দিল বাড়িতে। একেই তো আধিয়ার তার উপরে আবার কাছিম খাওয়া জাত, তোর দাদি কিছুতে রাজী হয় না। কিন্তু সারাদিন হাল চইষা সন্ধ্যাবেলা ওই ব্যাটা যে হারমোনি বাজায় না দেখলে বিশ্বাস যাবি না, আর দেখলে একদম অজ্ঞান হইয়া যাবি। ভালো! মানে? খালি ভালো? সেই ভালোর কুনু সীমা হয় না’!

আজমত চাচার নাকের ফুটো বেজায় বড়। সবসময় মনে হয় প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণ বাতাস টেনে নিচ্ছে, আর তেমনি বিপুল প্রাণশক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারপাশে।

-‘তারবাদে যখন দিনাজপুর যায়া কলেজে ভর্তি হইল, ওর বন্ধুর খালার বাড়ির কাছে এক হাসপাতালের নার্স আছিল, মিসেস শোভা রানি আর তার স্বামী সুশীল বড়ুয়া, রীতিমত উস্তাদ মানুষ। সুশীলের এক বোইনও আছিল, সুলেখা -আহা কীযে ভালো গান গায়! ঐ গান আমি দিনাজপুরে গেলে দুইদিন শুনছি’।

আজমত চাচা গুনগুন করে (নিজেই কেন গান শিখলো না!)

-‘কথায় কয় না যে আমরা মোসলমানেরা আমসিপারা শিখতে শিখতে বড় হই আর হিন্দুরা জন্মায়াই সা রে গা মা গাইতে গাইতে মুখে ফেনা তুইলা ফালায়। সুর ওদের গলায় থাকলো কি না থাকলো সেইটা কথা না, সুর ওরা দরকার হইলে গ্রেফতার কইরা নিয়া আসে’।

আজমত চাচাকে নিধির একটুও ভয় লাগে না, হাতে একটা ভাঙ্গা ডাল নিয়ে তার পাশে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ায়। তাকে স্কুলে আনা নেয়া করবে চাচা। আধ মাইলটাক দূর ভোমরাদহ প্রাইমারী। খানিকটা কাঁচা আল, মাটির রাস্তা, মাঝখানে একটা বড় সড় ইটের ভাটা, তারপর অনেকখানি পীচঢালা পথ পাড়ি দিলে নিধির স্কুল। দাদু এই স্কুলে শিক্ষক ছিলো।

স্কুলের আপা নিধিকে প্রায় কোলে নিয়ে আদর ক’রে সামনের বেঞ্চে বসিয়ে দেয়।

ক খ লিখতে গিয়ে নিধি আপার বোঁচা নাকের নাকফুল লাল পেন্সিলে এঁকে ফেলে। আপা তাকে তাও কিছু বলে না, নিধির জন্য নাকি মায়া লাগে তার।

নিধি যখন স্কুলের বারান্দায় খাম্বা ধরে এক হাতে ধরে ঘুরে ঘুরে খেলে আপা তখন স্কুলের দপ্তরী শাজাহানকে কিছু বলতে মানা করে- ‘ আহ হা রে, মেয়েটা। মা এমন হইল, এতিম না হয়াও এতিমের মতন,আহ হা’।

-‘আপা, এর মা ও নাকি আগুনত পুড়ি… পাটগুদামের পাহারাদারের সঙ্গে। সেই পাহারাদারের বেটিছাওয়া এখন এইখানে আইসছে…’।

-‘শ্‌শ শ…’ আপা ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে থামিয়ে দেয়। ইসমত মাষ্টারের পারিবারিক বিষয় নিয়ে কথাবার্তা ভালো দেখায় না।

নিধি স্থির করে ফেলে দপ্তরী শাহজাহানের সঙ্গে কোনদিন কথা বলবে না।

স্কুলে তার একটাই খেলা, এক হাতে বারান্দার খাম ধরে ঘোরা, মাঠে ক্রীড়ারত অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের সে চক্রাকারে দেখতে পায়, তার মাথা নিচু হলে ছেলেমেয়েগুলি ইষৎ কাত হয়ে যায়, নিধি আবার সোজা হয়ে তাদের দেখে, স্কুল ড্রেস ছাড়া, কারো কারো পায়ে জুতা আছে, কারো চুলে হালকা ভুসভুসে ধুলা।

নিজের মত খেলতে খেলতে এক সকালে নিধি অভাবনীয় দৃশ্য দেখে ফেললো।

স্কুলের মাঠ পেরোলে দিগন্তের কাছে আকাশ ঘেষে ঝকঝকে রাজপ্রাসাদের মত চুড়ায় শুধু সোনার ছড়াছড়ি। নীল আকাশে এত সোনা কে ছড়িয়ে দিলো! বিস্ময়ে নিধির হা করা মুখে চড়ুই পাখি আনাগোনা করলেও সে টেরটি পাবে না। এর মধ্যে আরো কিছু বালক বালিকা স্কুলের বারান্দায় জমে গেছে।

-‘কাঞ্চন জঙ্ঘা দেখা যাইতেছে, কাঞ্চন জঙ্ঘা…’ছেলেমেয়েদের সমস্বর চিৎকারে দপ্তরী শাজাহান এগিয়ে আসে।

নিধির উদ্দেশ্যে বৃত্তান্ত ভেঙ্গে বলে- কাঞ্চন জঙ্ঘা হিমালয় পর্বতের অংশ, শীতকালে যখন তার চুড়ায় বরফ থির হয়ে জমা হয়, সেখানে সূর্যের আলো পড়লে তা আকাশের গায়ে প্রতিচ্ছবি বানায় (শাজাহান আগের জন্মে  শিক্ষক ছিল!), আর সেটাই তারা ভোমরাদহ স্কুলের বারান্দায় বসে দেখতে পাচ্ছে। শুনেও শোনে না নিধি। তার মনের সম্মিলিত কোনগুলি তখন আকাশের কোনে গলিত সোনায় স্থির হয়ে আছে।

ক্লাশের আপা এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় বারান্দায়। বলে- ‘একটু পরেই আকাশে মিলায়া যাবে এই সোনার রাজপ্রাসাদ। যত পারো দেখে নাও’।

নিধি মনে মনে স্থির করে- বড় হয়ে সে এই সোনাগলা কাঞ্চন জঙ্ঘা দেখতে যাবেই যাবে।

বড় হয়ে কেন? এখনি কেন যায় না? বাবা মা থাকলে তো যাওয়া যেত, এটা ভেবে কিচ্ছু ভালো লাগে না নিধির। সে তারপর স্কুলের বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে, উবু হয়ে মাঠ থেকে মুঠোভর্তি ঘাস টেনে টেনে ছেড়ে।

একটু পরেই কড়া স্বভাবের সূর্য আকাশ পরিস্কার করে দিলে নিধি’র আরো মেজাজ খারাপ হয়। স্কুলে থাকতে ভালো লাগে না। আসলে মথুরাপুরে অনেকদিন স্কুলে না গিয়ে গিয়ে আর লেখাপড়া শিখতে যেতেও ভালো লাগে না তার।

কিন্তু বাবা একটা চিঠি লিখেছে দাদুকে। বাঁকা বাঁকা দৃঢ় হাতের লেখা, নরম স্বভাবের মানুষের লেখা এত শক্ত ধাতের হয় কি করে! নীল কালিতে অক্ষরগুলি ঘোড়ার দৌড়ের ভঙ্গিতে কাগজের ওপরে ছবির মত দেখায়।

বাবা লিখেছে, ‘আমার পক্ষে বাড়িতে এসে থাকা সম্ভব না, নিধির পড়াশোনার তেমন উন্নতি হচ্ছে না, তাকে ঢাকায় তার ফুপুর কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। ওখানে ভালো স্কুল আর গৃহশিক্ষকের বন্দোবস্ত করতে হবে’।

ভালোই হয়ে এখান থেকে চলে গেলে। স্কুল যাওয়া আসার পথে ভোমরাদহের বাতাসে একটা অকারণ দোলাচল টের পেয়েছে নিধি, মানুষের চোখ আর ফিসফিসানি, তারা কারণে অকারণে নিধির কাছে তার মা’র প্রসঙ্গ তোলে, ক্ষিদে নেই মুখে খাওয়ার মত বিতৃষ্ণা উঠে আসে তার।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।