নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২৪

-‘আমি একটা শর্ট কার্ট জানি, চল ঐ দিক দিয়া শাহবাগ যাই রিক্সা নিয়া’- ইউসুফ বলে।
আবারো গাউসিয়ার ফুটপাতের জুতার দোকানগুলি ডিঙ্গিয়ে এপাশে আসে, হকার্স মার্কেটের ধার ঘেষে রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে একটা তেছরা গলিতে ঢুকে যায় দু’জন।
আর সব গলির মতই এই গলি। ঢোকার মুখে ফার্মেসী, ষ্টেশনারী দোকানের ব্যস্ত বিক্রেতা। দু’পাশে সারি সারি দোতলা, চারতলার গুনীতক হিসেবে বাড়ি, সেগুলোর ভারী তালা আটকানো কোলাপ্সিবল গেইট। দুপুরের গায়ে ঠেস দিয়ে থাকা রোদ কোন বহুতল বিল্ডিং এর কোচরে লুকিয়ে গেলে নিধি স্বস্তি নিয়ে দাঁড়ায়।
ভালো করে তাঁকিয়ে দেখে তার মনে হয় এই ফার্মেসীটায় সে আগে এসেছে!
একই রকম করে ঔষধের বিজ্ঞাপন সাঁটা থাকতো কাঁচের আলমারীতে! এখানেই কোন বাড়ির সবুজাভ দেয়াল দেখতে পাচ্ছে সে, আর কতগুলো উড্ডীন পতঙ্গ। এই গলির শেষ মাথায় কালো গ্রীল দেয়া বারান্দায় তার ক্ষুদ্র, অমল আঙ্গুলের ছাপ আছে! আছে তো?
কিন্তু এটা কি সেই রাস্তা? চেনা, তবু তার মনে হচ্ছে কতকিছু বদলে গেছে। এতটা! নিধি এগিয়ে যাচ্ছে দেখে ইউসুফ থামায় তাকে।
-‘আরে এইটা ডেড এন্ড, এইখান দিয়া বাইর হওয়া যায় না। আমি তো ম্যাচ কিনতে থামলাম’।
নিধি দাঁড়িয়ে পড়ে। এই কানাগলি সে চেনে।
-‘এইখানে একটা কে জি স্কুল ছিল’।
-‘স্কুল? আজকাল ঢাকা শহরে লাখ লাখ স্কুল, দেখো উইঠা গেছে কিনা।… তো যা বলতেছিলাম,’
হাত উচিয়ে একটা রিক্সা ডাকে। সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে ইউসুফের কন্ঠ জড়ানো শোনায়, ‘ দুইটা দর্শনকে তুমি মূল স্রোত হিসাবে ধইরা নিতে পারো নিধি, ‘ ইরফান ভাই মার্ক্স আর এঙ্গেলস এর কথা কয়, আর আমি এদের সঙ্গে আরো যোগ করি চার্লস ডারউইন, ওনারা সামাজিক সংগ্রামের কথা বলেন আর ইনি বলেন অস্তিত্বের লড়াই এর কথা। দেখো, তুমি আমি জন্মাইলাম, তার পর থেকেই শুরু হইলো ষ্ট্রাগল, কি, টিকা থাকার লড়াই…’ ইউসুফ কল কল নালা বয়ে যাওয়ার মত বলে যায়।
নিধি অন্যমনস্ক। এই রাস্তাতে সে আবার আসবে। ফুপুর সঙ্গে সেতো কতবার গাউসিয়া, নিউমার্কেটে এসেছে, কে জানে কতদিন এই গলির সামনে দিয়ে গেছে কিন্তু আজকের মত অনুভব তার হয়নিতো! তাকে যে স্কুল রাখতে রাজী হয়নি সে স্কুল কি অত সহজে উঠে যাবে? হুড খোলা রিক্সায় একটা ফুটফুটে কিশোরী গলিতে ঢোকে, চিক চিক করছে তার ত্বক, স্কুল ড্রেস আর পানির বোতল সহযোগে ব্যাগ ধরে রিক্সার ঝাঁকি সামলায় সে। একি সেই নিধিদের বাড়িওয়ালার নাতনী? কি যেন নাম, ফুলের ইংরেজী নামে নাম, মা কতদিন গল্প করেছে। ফ্লোরা, গ্লোরিয়া, নাকি ক্যামেলিয়া! নাহ, তাই বা কি করে হয়, সেতো নিধির সমবয়েসী, এখনো তার কোনক্রমেই কিশোরী থাকবার কথা না।
একটা বারান্দার গ্রীল ঘেষে ফুলছাপা ম্যাক্সি শুকাতে দেয়া, এটা নিশ্চয়ই সেই বাসা। যাবে না কি নিধি একবার, বেল বাজিয়ে ডাকবে? বলবে, ‘আমি বারান্দার গ্রীলে লেগে থাকা আমার আর আমার মায়ের হাতের ছাপগুলি খুঁজতে এসেছি!’

ছাত্রী হলের সামনে রিক্সা থামলে নিধির আগে ইউসুফ লাফিয়ে নামে। দু’হাতে ডায়েরীটা এগিয়ে দেয়- ‘তোমার জন্য’।
-‘আমিতো ডায়রী লেখি না! এইটা দিয়ে আমি কি করবো?’ নিধি অবাক হয়।
-‘লিখলে কিছু হয় না, তবে লেইখা রাখলে ভালো, তোমার জীবন ডকুমেন্টেড থাকে। এখন যাও, আমি এই রিক্সা নিয়াই চইলা যাই’।
রাজনীতি নিয়ে অনর্গল বকতে থাকা ইউসুফকে মনে মনে খারিজ করছিল নিধি, রিক্সায় বসেই। কিছুটা হতবিহ্বল নিধি লাল ডায়েরী হাতে নিয়ে মত পাল্টায়।
রুমে ফিরে দেখে অয়ন তার জন্য স্লিপ পাঠিয়ে অপেক্ষা করছে অনেকক্ষণ। রানু আপা হলের ক্যান্টিন থেকে সেভেন আপ নিয়ে ভিজিটর্স রুমে এনে ওকে খাইয়েছে।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।