নাহার মনিকা: বিসর্গ তান- ২৯

ইউসুফ একটা পুরো গ্রুপ নিয়ে হাকিম চত্তরে আড্ডা দিচ্ছে। নিধি ধীর পায়ে নামে, এসে যোগ দেয়। হৈ হৈ করে ইউসুফ- ‘চলো, ইরফান ভাই এর বক্তৃতা আছে’।
ইরফান ভাইয়ের কথা উঠলে ইউসুফ মুখে ফেনা তুলে ফেলে। বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রগতিশীল রাজনীতিতে জীবন উৎসর্গ করা একজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায় সে নত থাকে। ইরফান ভাই নিজের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনে জেল খেটেছে, নির্যাতিত হয়েছে, অর্থ, প্রতিষ্ঠা কিংবা নিরাপদ জীবনের আরাম উপেক্ষা করে গ্রামে গঞ্জে কাজ করেছে দীর্ঘকাল। এ রকম জীবন ইউসুফ কেবল স্বপ্নে দেখতে পারে।
স্বোপার্জিত স্বাধীনতার পাদদেশে জনসভা। ইরফান ভাইএর সঙ্গে দেখা করতে নিধি আজকে কৌতুহলী।

কালো পাঞ্জাবী পরনে ইরফান ভাইকে দেখে নিধি সত্যি চমকে ওঠে। ত্বকের সামান্য রদবদল বাদ দিলে কোন পরিবর্তন হয়নি লোকটার। কিন্তু সে নিশ্চিত এই সেই। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতির অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এর উদাত্ত কন্ঠের বক্তৃতা কখনো শোনেনি।

শ্রোতার সংখ্যা বেশী না, তার ওপর টি এস সি’ চত্তরের বৈকালিক যানবাহন আর লোক চলাচলে বক্তৃতার আওয়াজও থেকে থেকে খেই হারিয়ে ফেলে। নিধি আর সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে শোনে, শেষ পর্যন্ত। তারপর করতালি থামলে ইউসুফকে বিস্মিত করে দিয়ে নিধি সামনে এগিয়ে যায়।

আজমত চাচার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না অনেকদিন, তবে তার খবর শুনেছে ইরফান ভাই।

তারপর স্মৃতিচারণে তার গ্রাসরুট লেভেলে কর্মসূচীর বিবরণ উপস্থিত নেতা কর্মীদেরকে দিতে গিয়ে নিধির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আজমত চাচাকে কমরেড বলে উচ্চারণ করে।

ইরফান ভাইয়ের হাতটা একটু ধরে দেখতে ইচ্ছে করে নিধির। এর হাতে আজমত চাচার স্পর্শ লেগে আছে।

নিধিকে পার্টির ছাত্র সদস্যপদের আবেদন করতে বলে যায় ইরফান ভাই। আর ইউসুফ বাহবা পায় নিধির মত একজনকে পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার জন্য। অন্য কোন কারণে না হোক, আজমত চাচার মত কমরেডের ভাইঝি হিসেবে তার এ দলে যোগদান করা উচিৎ।

সভা ভাঙ্গলে তারপর তারা টি এস সি’র সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চা খায়। আসন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দিতা নিয়ে ইউসুফের সঙ্গে কথাবার্তা বলে।
নিধিকে নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর হলে ফিরতে হবে। কতগুলো বইয়ের লিখে আগামী ষ্টাডি সার্কেলে অবশ্যই উপস্থিতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে আসে সে।

ষ্টাডি সার্কেল খুব যে ভালো লাগছিল, টেনেছিল সে কথা বলার জো নিধি খুঁজে পায় না। বরং তত্ত্বকথা আর কঠিন কঠিন শব্দের ভারে উদভ্রান্ত হতো সে। বিশেষত, ইউসুফ। ছেলেটা সহজ করে বোঝাতেই পারে না। বরং নিধি যেদিন পরিবার ব্যক্তিমালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’র সরল সারমর্ম বললো, ইরফান ভাই উপস্থিত ছিল এবং সে প্রসংশা পেয়েছিল।
সাকুল্যে কয়েকটি পাঠ-আসরে যেতে পেরেছে নিধি।
ততদিনে ক্লাস, কার্ডের অর্ডার ডেলিভারী ইত্যকার কাজে ব্যস্ততা বেড়েছিল তার।

আরো দুটো কারণ ছিল, তার একটি- কুমকুম।
প্রায় মাস ছয়েক পরে ফিরলো সে। বাবা মা’র সঙ্গে ইউরোপ ভ্রমণে গিয়েছিল।
নিধিকে নাকি ফ্রান্স থেকে একটা পোষ্টকার্ডও পাঠিয়েছিল। কই নিধি পায়নি তো!
-‘হুম, খাম ছাড়া, আর ছবিটা এত্ত সুন্দর। পোষ্টাপিসের লোকজনই মেরে দিছে’।
আর পরক্ষণেই নিধির দিকে পেছন ফিরে মুখ ব্যজার করে বসে থাকে। ঝক ঝক করছে কুমকুম। একটু মোটাও হয়েছে আগের চে। মুখ কালো করে থাকা একদম মানাচ্ছে না।
নিধি ঝুলোঝুলি করলে রেগে যায়-
-‘ তুই নাকি বাঁশি হারমোনিয়াম পার্টির মেম্বার হইছিস? আর অর্থনীতির ঢ্যাঙ্গা ইউসুফ তোর বয়ফ্রেন্ড?’
আরে, এসব সবাই খেয়াল করে না কি? নিধি তো নিজের অগোচর, খেয়াল না করা জীবনে অভ্যস্থ।
-‘ এত তাড়াতাড়ি সম্পর্কে জড়াইস না রে নিধি,’ এবার কুমকুম আদ্র, মমতামাখা, ‘ কত কিছু করার আছে দেখবি’।
আর ভালোবাসা?
এ ছ’মাসের মধ্যেও না কি কুমকুমের একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয়েও ভেঙ্গে গিয়েছে। মনমত না হলে সম্পর্ক টেনে বেড়ানোর মেয়ে সে না।
নিধি কুমকুমের কাছে সবিস্তারে ইরফান ভাইয়ের বর্ণনা দেয়। ভোমরাদহ, আজমত চাচার গল্পও এইবেলা বাদ যায় না। এবার সে আগের চেয়ে সপ্রতিভ।
কুমকুম বাহবা দেয় তাকে।
-‘তোর ইরফান ভাইকে একদিন দেখতে হবে। নিয়া যাইস আমারে’।

সবসময় আবার দেখা হবার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে বিদায় নিলেও ইরফান ভাইয়ের সঙ্গে দেশে থাকতে আর দেখা হয়নি নিধির।

একদিন অত্যাশ্চর্যের মত তাকে আবিস্কার করেছিল টরন্টোর বাংলা পাড়ায়।
ইরফান ভাই ততদিনে আরো বয়স্ক। শরীরের মধ্যভাগ স্ফীতকায়। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্য বাসষ্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছে।

নিধির খুব আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিল। ইরফান ভাই কি জড়সড়? আগেকার সেই দৃঢ় প্রত্যয়ী, দেশ বদলের অঙ্গীকারে আবদ্ধ ছাত্রনেতাটি স্বামী-পিতার ভূমিকার আড়ালে কোথায় লুকিয়ে গেছে!

আর কুমকুম তাকে খালেদ ইউসুফের সঙ্গে ঘোরাফেরা নিয়ে বলেছিল, ঠিক আছে। কিন্তু সে কি ওকে ভালোবাসে?

ইউসুফের কাছে নিজের একটা জায়গা আছে, এটা নিধি উপভোগ করে। একটা আশ্রয়ের মত।

কিন্তু ভালোবাসলে বুকের ভেতরে যে হাজার প্রজাপতি উড়ে যাবার অনুভব, তা কি আদৌ হয়েছে?
আর ইউসুফ তো প্রকারান্তরে সে যে স্থায়ী সম্পর্কে বিশ্বাস করে না, তা কতভাবে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে।
কুমকুমকে মুখে আশ্বস্ত করতে বেগ পেতে হয়নি।
কিন্তু ওকে বলা হয়নি ঠিক কতদূর সে এগিয়েছিলো ইউসুফের সঙ্গে।
মাঠে পার্কে সে স্কেচ খাতা খুলে বসলে ইউসুফ তার পাশে চুপ করে বসে থাকে না, বরং কানের কাছে বয়ান চালায়- ‘নিধি, তুমি আর তোমার শরীর দুইটা দুই জিনিস। এইটা মিলাবা না। শরীর আর মন মিলাইছো কি সিনিক হয়া গেলা’।
রাজনীতির কথাবার্তা নিধি এর কাছ থেকে শুনে মোটামুটি বোঝে, কিন্তু শরীরের পাঠ তত্ত্বকথা দিয়ে ভালো বুঝতে পারে না নিধি। ছোটবেলার লার্নিং ডিসেবিলিটি ফিরে আসে মনে হয়।

তবুও ওর সঙ্গে বরিশালের লঞ্চে উঠে জলের ওপরে ভাসতে গিয়েছিলো আর আমোদ হয়েছিলো নিধির!

শরীরে শরীর প্রবিষ্ট হওয়ার বোঝা বেশ ভারী, অয়নের কাছ থেকে শুধু চাপ চাপ ব্যথা অনুভব করেছে। ব্যথা আর বিতৃষ্ণবোধের আলুনি অনুভব যখন নিধির চোখের পানির ধারা হয়ে কানের মধ্যে ঢোকে, সে কান্নার ভালো মন্দ অয়নকে আক্রান্ত করেনি। তার ক্ষীপ্র হাত, হাড়সন্ধিতে চাপ কেবল নিধির শিরদাড়া বিদ্ধ করে চলেছিল।

ইউসুফ সে তুলনায় ভিন্ন ঘরানার। নিধির কাছে আসার বিহবলতা নিয়ে কেবিনের বাইরে এসে ষ্ট্র সমেত কোকাকোলা নিয়ে ডেকে বসে। লঞ্চ তখন মেঘনায়। কুলপ্লাবী জোৎস্না চরাচর ছেয়ে দিচ্ছে। ইউসুফ রেলিং এ তবলার চাটি মেরে গান গায়- ‘খাঁচার আড়া প’লো ধ্বসে, পাখি আর দাঁড়াবে কিসে…’ দেহত্বত্ত্বের মারফতী চিন্তার সঙ্গে মার্ক্সবাদ মিলিয়ে বেশ জ্ঞান গর্ভ আলোচনা শেষে ক্লান্ত নিধির ঘুম পায়, ভারী শ্রান্ত লাগে, ইউসুফ তখন আর ঘাটায় না নিধিকে, কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে গিয়ে সারারাত লঞ্চের ডেকে বসে কাটিয়ে দেয়। অথচ নিধি কিন্তু চেয়েছিল ইউসুফ বেপরোয়া হোক।

পরদিন সকালে ঘুমভেঙ্গে লঞ্চের সমান্তরালে উড়ে যাওয়া পাখিদের দেখেও তার আনন্দ লাগে না। কোকাকোলার ভেজা বোতলে চুমুক দিয়ে তার মনে হয়- ট্রেনের মত লঞ্চেরও চেইন টেনে থামিয়ে দেয়ার সিষ্টেম থাকলে ভালো হতো (আছে হয়তো, সে জানতো না)। নিধি তখন লঞ্চ থেকে নেমে একটা ছোট্ট ডিঙ্গিতে টালমাটাল ভাসতো, একা। অতএব, ইউসুফ খালেদ শুধুই ইউসুফ। ডিঙ্গিতে ভাসতে গেলে নিধি তাকে নিতে পারে না।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।