নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২৭

ময়নার হাট গিয়ে ভোমরাদহকে কেন যে এত বেশী মনে পড়েছিল নিধির! হয়তো বহুদিন পরে ঢাকার বাইরে পা রাখার জন্য, খোলা প্রান্তর দেখতে পাওয়ার সুবাদে। মনে আছে, বারবারা একটা পাজেরো পাঠিয়েছিল হলের সামনে ওদেরকে উঠিয়ে নিতে। দু’দিন থাকার উপযোগী করে ব্যাগ গুছিয়ে এনেছে।
হলের সামনে উৎসাহী ছাত্রছাত্রীর দৃষ্টি।
কুমকুম পেছনের সীটে নিধির পাশে হাতব্যাগটা ছুঁড়ে দিয়ে বলেছে-‘ ভাবতে পারিস এইখানে যতগুলি ছাত্র ছাত্রী আছে সবাই ভাবতেছে আমরা দুই নম্বর কিছু করতে যাইতেছি!’
-‘যাহ তা কেন?’
-‘জি, তা ই। একলা যাইতেছি, তোর মত সুন্দরীরে নিয়া। বেশ্যা ভাবতে কি পয়সা লাগে? উলটা মজা পায়’।
কুমকুমের আপ্তবাক্য নিধিও কি আগে থেকে জানে না? জানে, এবং মনে গেঁথেও রেখেছে।

ময়নার হাট পৌঁছতে ফেরী পারাপারসহ নিধি পুরোটা সময় চোখে ভোমরাদহ দেখেছে। গাড়ির দোলায় ঘুমে জাগরণে আজমত চাচাকে মাঠের ঢাল বেয়ে নেমে যেতে দেখেছে। আর ভেবেছে এইবার একবার ভোমরাদহ যাবেই। নিজের দাদুবাড়ি যেতে কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না, অনুমতি নেয়ার কিছু নেই।

ছোট টিলার ওপরে ভি আই পি স্যুইটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুমিল্লা বার্ডএর কম্পাউণ্ড নিধিকে যেন ক্রয় করে নিলো। চম্পা আপার কাছে দু’একবার গল্প শুনেছে। সে গল্পের চেয়ে এর পরিবেশ আরো মনোহর। এখানের গল্প সে অন্য আর কার কাছ থেকে শুনেছে? ক্ষীণ রেখার মত স্মৃতি এসে বুড়িছুঁই করে যায় তাকে, কার কাছ থেকে? মথুরাপুরে থাকতে মায়ের কাছ থেকে?
কুমকুম এখনো ঘুমে, নিধির ইচ্ছে করে ঢাল বেয়ে নিচে হেঁটে আসে।
ইচ্ছেটাকে পাত্তা না দিয়ে তাদের কাজ সংক্রান্ত বারবারার দেয়া কাগজ পত্রের ফাইল নিয়ে বারান্দায় বসে যায় সে।
পরিবার পরিকল্পনা ঘিরে প্রশ্নমালা। মনিটরিং এণ্ড ইভালুয়েশন প্রজেক্ট এর আগে বেইজলাইন সার্ভের পাশাপাশি কোয়ালিটেটিভ ষ্টাডি।
স্বামী কনডম ব্যবহার করে কিনা, কতবার যৌন সংগম হয় এ জাতীয় প্রশ্নমালা বাস্তবে প্রয়োগের অনভিজ্ঞতা নিয়ে কিছুক্ষণ দম ধরে বসে থাকে নিধি। নাস্তার টেবিলে কুমকুমকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে। এ সংক্রান্ত সবকিছু তার ক্ষেত্রে অনুচ্চারিত, শব্দহীন ঘটে গেছে।

কুমকুম যথারীতি হেসে উড়িয়ে দেয়- ‘আয় তোর জন্য একটা সেক্স এডুকেশন ক্লাস নেই। তুই কেমনে বাচ্চা হয় জানিস তো? নাকি ভাবিস যে চুমু খাইলেই প্রেগন্যান্ট! গাধা কোথাকার।’
জানা বোঝার বিষয় না, বিষয় হচ্ছে এ নিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলবার।
কিন্তু কুমকুমের কাছে এটা কোন সমস্যাই না। ওর দ্বিধাহীন স্বভাবের তোড়ে নিধির জড়তাও অনেকখানি কমে।

সকালের রোদ তখন মাত্র চড়তে শুরু করেছে। মাথায় ওড়না তুলে দিয়েও বারবারা লাল হচ্ছে। কুমিল্লা বার্ড থেকে আরো ঘণ্টাদুই ড্রাইভ করে ময়নার হাট স্বাস্থ্য প্রকল্পে পৌছানো গেল।
নিধির হাসপাতাল ভীতিকে আশ্চর্য করে দিয়ে অপেক্ষা করছিল ছোট্ট কিন্তু পরিচ্ছন্ন একটা বাড়ি। দু’জন স্বাস্থ্যকর্মী আর পেছনের দিকের একটা ঘরে জনা দশেক মহিলা, সাধ্যমত পরিপাটি কাপড় পরে মেঝেয় পাতা পাটিতে বসে আছে। ময়নার হাট প্রকল্পের কো’অর্ডিনেটর রঞ্জিত সরকারও আছেন।
বাড়ি বাড়ি ঘুরে খুঁজতে হবে না, স্বাস্থ্যকর্মীরা আগে থেকে উত্তরদাতাদের বলে রেখেছে, তারাও কিঞ্চিত জলযোগের আশায় কিংবা আরো গুঢ় কোন কারণে হাজির হয়েছে। তাদের পোড়া চেহারায় আজকের তেলঘষা যথাসাধ্য ধোপদুরস্তপনা একটু খেয়াল করলে বোঝা যায়। বারবারা সম্ভবত টের পাবে না, কিন্তু নিধি বেশ বুঝতে পারছে।
বড় সড় ঘরের দু’কোনায় দুটো টেবিল চেয়ার। কুমকুম একটা দখল করে নিয়ে এর মধ্যেই গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে হাসি ঠাট্টায় মশগুল।
নিধির আড়ষ্ট লাগে আর নিজের ওপরে বিরক্ত হয়। কোথাও কেন সহজ লাগে না তার! না বৃটিশ কাউন্সিলের সিনেমা সন্ধ্যায়, না এই ঘোর গ্রামের বউ ঝি’দের সামনে!
তবে যত কঠিন মনে হচ্ছিল বাস্তবে তা হলো না। সুফিয়া নামের শ্যামলা নাকের ওপর তিল মেয়েটি সারাক্ষণ নিধির সঙ্গে লেগে রইল, বলা যায় সে ই সব প্রশ্ন উত্তরদাতাদের বুঝিয়ে দিল। নিধির কাজ কেবল ইংরেজী প্রশ্নমালা পূরণ করে যাওয়া।
বারবারা ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছে।
কুমকুম কানের দুল নাড়িয়ে স্বভাবমত কথা বলছে।

দুপুরের খাবারে মাছের দোপেয়াজা খুব উৎসাহী হয়ে খায় নিধি। তারপর রসমন্ডা আর সেভেন আপ। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে পুকুরে নারকেল গাছের ঘের। বাঁধানো ঘাট। কুমকুম ঘাটের শানে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে। শুপারী নারকেলের পাতার আওয়াজ ঝিমুনি আনে কিন্তু গরম কমায় না। কর্মরত নারী পুরুষ আর রোগীদের এলাকা ছাড়িয়ে পুকুর ঘাট। তীরের ফলার মত সূর্যের আলো শুষে নিচ্ছে ঘাটের শান্ত আর নির্জীব আমেজ। ঝড় বৃষ্টি হতে পারে সম্ভাবনায় গরমের হলকা বেড়ে গেছে।
-‘মনে হচ্ছে গায়ের চামড়া খুলে ফেলি’, কুমকুম ওড়না ঠেলে পাশে রেখে দেয়।
নিধি তালপাতার পাখায় বাতাস করে। তার আবারো গা গুলোচ্ছে। ভিন্সেন্টের বাড়ির খাবারের পর অগ্নিমান্দ্য এড়াতে কসরত করতে হচ্ছে তাকে। হঠাৎ পেট কামড়ানো শুরু হলে ভয় লাগে। কোনমতে দৌড়ে ভেতরে আসে। আজকের কোন খাবার থেকে বদহজম হচ্ছে, সেটা কি মাছের দোপেঁয়াজা, নাকি ঝাল দেয়া গরুর ভুনা, অথবা টমেটোর টক, নাকি ঢক ঢক করে গ্লাসে পানি খেয়ে ফেললো সেটা।
হড় হড় করে বমি হচ্ছে নিধির আর সঙ্গে বিশ্রী অস্বস্তি। শরীর খারাপ লাগছে বলে যত না, এই খারাপ লাগাটা সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে সেজন্য তার তিনগুণ।
বারবারা অস্থির হলেও একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকছে। আর নিধিকে আশ্চর্য করে কপাল কুঁচকে আছে কুমকুম।
দু’ঘণ্টায় পরপর সাত আটবার বমি-বাথরুম করে নিধি যখন নেতিয়ে গেছে, তখন বিকেল গড়ানো ছায়া, তাদের ফেরার সময়। কিন্তু এ অবস্থায় নিধি যাবে কিভাবে!
দু’ঘণ্টার জার্নি করে বার্ড এর ক্যাম্পাসে পৌঁছানো যায়, কিন্তু পথিমধ্যে টইয়লেট ইত্যাদির এত অবন্দোবস্ত যে সবাই দোনোমনা করে।
স্থানীয় হাটের ডাক্তারকে ডেকে আনতে পরামর্শ দেয় সুফিয়া।
গাড়ি পাঠালে ডাক্তার দ্রুতই আসে। ঔষধ লিখে, স্যালাইন লাগিয়ে আর আর জাউ খাওয়াবার পরামর্শ দিয়ে ডাক্তার চলে যাওয়ার আগে জানায়, নিধির বিশ্রাম দরকার। অনেক পানি বেরিয়ে গেছে শরীর থেকে।
সুফিয়া উদ্যোগী হয়ে কুমকুম আর বারবারাকে ফিরে যেতে উৎসাহ দেয়। আজ রাত নিধি এখানে থাকুক। কাল সকালে সে গাড়ি পাঠালে দুজনে ফিরে যাবে।
নিধির ছলছল চক্ষু দেখে শরীর না কি মনের চক্ষু কাঁদে বোঝার উপায় নেই। তার শুধু মনে হয়- কুমকুম তো থেকে গেলে পারে! কিন্তু মুখফুটে বলতে পারে না সে কথা।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।