কবি ফেরদৌস নাহারের ‘প্রেম- অপ্রেম যাবতীয় স্যাক্সোফোন’, বিরল যাত্রা এবং ভেজা মেঘের স্পর্শ

আসমা চৌধুরী

ফেরদৌস নাহার কবিতার সজীব বৃক্ষ। যার ছায়া আছে, মায়া আছে, পাতায় পাতায় খেলে রোদ জ্যোৎস্নার রং। কবিতায় বসবাস, কবিতায় ভ্রমণ, কবিতায় সুন্দর সর্বনাশ। ‘প্রেম-অপ্রেম যাবতীয় স্যাক্সোফোন’ কবি ফেরদৌস নাহারের গভীর অনুসন্ধানী মনোবিশ্লেষণের ফসল। রাগী এক ক্ষত উন্মোচন করে কবি দেখিয়েছেন জীবনের বৈচিত্র্য, দেখিয়েছেন কাতর নীল না পাওয়ার নদী। মানুষের শেষ পর্যন্ত মুখোশ যাত্রা। কবির এক ভীষণ আকুতি —
এই আমাকে জড়িয়ে রাখ নিবিড় বুকে
দুয়ার থেকে খিড়কিগুলো অনেক দূরে
(আত্মচূর্ণ হৃৎদীর্ণ)

শব্দে কবি ভিন্নমাত্রা যোগ করে তুমুল আলোড়ন তোলেন অন্তর মরুতে। ‘নিসর্গের বোতাম টিপে ভরে নিই রক্তরস সুধা’ অথবা ‘কে আছে কোথায়বা রাখা আছে সবুজ মরণ’ পাঠককে ভিজিয়ে দিয়ে যায় ঘোর ঘোর নৈঃশব্দ্যে। সবুজ মরণ কিংবা নিসর্গের বোতাম ভেতরের ডাক। এই জীবনে কত আয়োজন করে বাঁচা, আবার চেয়ে না পাওয়ার নরম অভিমান, অভিনয় করে দিন পার করা। নিজেকেই কবি বলেন —
এই জানালার একটাই রোগ-শুধু খুলে যেতে চায়
আমি তো জানি, ওপাশে তোমার ঘর
জানালা খুললে কেমন আলোর শোক
তাইতো বন্ধ রাখি এর কপাট,ততই ক্ষুব্ধ হয়
খুলে যায় বদ্ধ বিন্যাস
( জানালার স্বভাব)

মানব জনম উল্টো যাত্রার দাস। আয়োজন করে বেঁচে অবহেলায় ফেলে রাখে চেনা গল্পের সুখ। তার মন ‘এ জীবনে কখনো যার পাইনি দেখা / তার কথাই বারবার মনে আসে ‘। যেন গভীর উপেক্ষা তার সব বন্ধন ঘুচিয়ে তাকে দিয়ে বলায় সময়ের সবচেয়ে ব্যথা ভেজা বাক্য —
আমি চলে যাচ্ছি, তুমি দরজাটা বন্ধ করো
আমি চলে যাচ্ছি,তুমি আলোটা নিভিয়ে ফেল
( ডাক)

পৃথিবীর সবগুলো নদী, বৃষ্টি, বৃক্ষ ফেরদৌস নাহারের কর্মস্থল। সেখানে সে নিজেকে মেলে দেয় পরম স্বাদে যেন চুমুক দিয়ে পান করছে বৃষ্টির গান। কবি আমন্ত্রণ জানান, ‘তোমার কি সময় হবে এইসব বৃষ্টি দেখার ‘ । যাকে ঘিরে আশাহত ভেজা দিন হয়তো তার কাছে এর কোন মূল্যই নেই, এক গভীরতর হাহাকারে ধাক্কা দিয়ে যায় অনধিকার প্রবেশ।
আজ ঘুম ভেঙে বৃষ্টির অনাদি শব্দে
সাহসী হাতের মুঠোতে ধরে রাখি শুদ্ধজল
কী বিষন্ন কেঁদে ওঠে প্রাণ,যেন
এ জল আমার নয়,যেন শুদ্ধতায় অনধিকার
ঘুমের উদাস চোখে নীলরং আঁকা
আহত এবং কিছু ক্ষুব্ধ কাতর
তোমাকে দিয়ে যাব সুসংবাদ সামান্য
আমার বিদায় আর ভেঙেচুরে একাকার হবার সংবাদ
(বৃষ্টি)

নিরব অভিযোগ এখানে সরব অভিমানে ধাক্কা দিয়ে গেছে। টালমাটাল হয়েছে ভেতর বাহির। এইসব অপ্রেম কবিকে উজার করে দিয়ে গেছে শব্দস্রোত। ফুটে উঠেছে দাহজ্বর, না পাওয়া না চেনা মেঘের বাড়িতে। ‘মদস্বাদ নিতে চাই জন্মের ভেতর’ কবিতার শিরোনামই অনবদ্য দর্শন। একজীবনে এই চাওয়া যত খাঁটি, পাওয়া ততটাই দূরের। এর তীব্র মোহন বারবার আমাদের হাতছানি দিয়ে হাতছাড়া হয়ে যায়। সত্যিকারের কবি সেই অমর সুন্দর অনুভব করতে চান আমৃত্যু। অসাধারণ এই কবিতায় কবি ফেরদৌস নাহার এক গভীর জীবনমাতাল যে ছুঁয়ে থাকতে চায় অমরত্ব। অথচ —
উজার বর্ষা এলো, এলো অচেনা জীবন
কষ্টের আদভেজা জলে ভিজতে ভিজতে
দুয়ারে দাঁড়ালো যে তার কথা মনে কি পড়ে
দাবায় উঠেছে ঘোর চাল চাল ঝড়
ঘোড়ারা লাফিয়ে চলে পিঠে তার অদেখা চালক

এ কবিতায়ই কবি জানিয়ে দেন —
অনেক ছাইয়ের পাশে শুয়েছি জ্বলন্তরাত
শবদেহ দুমড়ানো ভোর

কবি ফেরদৌস নাহার এভাবেই অনেক কথা বলে যান ছবি সাজিয়ে শব্দের খোড়লে। এই সত্য এত নিবিড় যে তার ‘প্রেম-অপ্রেম যাবতীয় স্যাক্সোফোন’ ভেতরে বাজিয়ে যায় অধরা জীবন পিপাসার অমোঘ স্পর্শ। মনে হয় এক, দুই, তিন, চার অনেকের না বলা কথন। কোথাও থেমে না গিয়ে এগিয়ে যাই আমরা কবি ফেরদৌস নাহারের শব্দের জাদু-খেলায়। এই পাঠ বহমান।
২০১৭-তে ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ১৬০ পৃষ্ঠার কবিতা বই যাতে আছে পাঁচটি পর্ব ও চিত্র। প্রচ্ছদ ও আলোকচিত্র: আবিদ আজাদ। পর্বগুলো —
১. বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রকৃতি
২. আগমন প্রস্থান ও ভ্রমণ
৩. যাবতীয় স্যাক্সোফোন
৪. প্রেম-অপ্রেম
৫. হাত ও হাতুড়ি

 

আসমা চৌধুরী

 

 

 

 

 

 

 

আসমা চৌধুরী জন্ম–৩০নভেম্বর ১৯৬৫ মেহেন্দিগঞ্জ,বরিশাল । তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সহকারী অধ্যাপক। লেখালেখি – গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ ও শিশুতোষ সাহিত্যে বিচরণ। বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, বসবাস,গল্পগ্রন্থ। প্রকাশকাল–১৯৯০। প্রকাশিত গ্রন্থ– ১৭টি। পুরস্কার– ২০০০সালে শিশুতোষ সাহিত্য রচনায় ইন্টারলাইফ বাংলাদেশ কর্তৃক সুনীতি পুরস্কার। ২০১৩তে জয়িতা পুরস্কার, ২০১৬তে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক, ২০১৬তে জাতীয় কবিতা পরিষদ কর্তৃক কবি সম্মাননা,২০১৭তে বরিশাল জেলাপ্রশাসন কর্তৃক জীবনানন্দ পদক লাভ ।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।