সাবেরা তাবাসসুমের কবিতা

উৎসর্গ: ঋতুপর্ণ ঘোষ

মহিমার্ণব

এ কেমন পাখি তুমি
ফেলে যাও রোজ রোজ
দুটো মাত্র পালকের ভার
ভেবে নিচ্ছি এ তোমার
নাচের মুহূর্ত
ভেবে নিচ্ছি মিলনের
আগে পাওয়া আনন্দ
সামান্য জলাধার
তুমি কি লুকিয়ে থাকো
দেবদারু ডালে
লিখে রাখো পাতা
ও পুষ্পের গান
চিরায়ত নেই কিছু তাই
ফুল সুন্দর আর
হত্যা ডেকে আনে
জেনো মহাস্থবির এক
মারীর অবদান
এই বেঁচে থাকা
মহিলতা আর আমার
টিকে থাকা লড়াই
বয়ে তো চলেছি
খামোখাই, যাকে বলে
যথার্থ মৃত্যুর টান
এ কেমন পাখি তুমি
দিয়ে যাও দুটো মাত্র
পালকের ভার
সমস্তই নরকযাত্রা, শোনো
সমস্ত শব কাকের আধার!

 

পাতা!

অপূর্ব আর্ত দুপুর
পার করে দিয়ে তারা আসে
বাঁধা ছকে সূর্যকে নিয়ে
হেসে হেসে– উড়ে উড়ে
অযাচিত গল্পে
পায়ে বেঁধে অক্ষয় গান
দৌড়ায় দেখো
দৌড়াতে ভালোবাসে খুব
বরাবর আলো তাকে
ভালোবেসে গেছে
শিরায় শিরায়
আলাপের অবসর নিয়ে
ঝরে ঝরে ডুবেছে বাতাস
ভারাতুর মন
কিংবা রমণ
কার কানে কূটমন্ত্র ঢালে
অপূর্ণ আর্ত দুপুর
ঘুরে ঘুরে
দল বেঁধে খসে
ধীর সব কোলাহল
আড়ালে আভাস
পাতা ঝরে যায়, পাতা আসে!

 

মিল

মার্জারাতংক ছাড়া বাহ্যত আমাদের আর কোনো মিল নেই
কবিতার প্রেমটা কম-বেশি সকলের আছে
তুমি এক অদ্বিতীয় নক্ষত্র-ঋতু
আমি ঘাড় গুঁজে মিন মিন করে টিকে থাকা কেউ
তবু তোমাকে ‘তুমি’ ডেকে নিচ্ছি
যেন আমরা খুব ভাব হয়ে যাওয়া দুটো মানুষ
খানিকটা সমমনা কিংবা স্বজন
কোনো ভালো না-লাগা বা ভীতি তোমার সিনেমায়
বেড়ালেছানা কিংবা কাটামুণ্ড হুলোকে
মমতা নিয়ে দেখাতে আড়াল তোলে না
আমি বড়জোর বিয়েবাড়ি বা গেরস্থ-ঘর এড়িয়ে চলি
প্রতিবার তাদের সাড়া ঘাড়ের কাছে শক্ত পুঁটুলি পাকায়
ধাক্কায় ধাক্কায় নিয়ে যায় খাদের কিনারে
নিরুপায় আমি চোখ বন্ধ করে ঝাঁপ দিই চিৎকারে আর
মুণ্ডহীন ধড় থেকে টপ টপ রক্ত ঝরে তো ঝরে
ভাবি এই দৃশ্য কী করে তুমি দেখলে
সম্পাদনার টেবিলে, প্রিমিয়ারে, প্রদর্শনীতে
পৃথিবীতে এর চেয়ে নির্মম দৃশ্য আর হতে পারে না
ভাবি, ভয়ে সিঁটিয়ে যেতে যেতে এই দৃশ্য রচনা করেছিলে
ভাবি, বিবমিষা জাগাতে জাগাতে ভীতির মামদোগাথা লিখি
দূরদেশ হতে তুমি ছায়াপথে লীন
আমি খাবি খেতে খেতে বেঁচে ওঠা অর্ধজীবন
তাই মার্জারাতংক ছাড়া আমাদের আর কোনো মিল নেই।

 

৩০ মে

আমরা যখন ভাঙা শরীর নিয়ে
তোমাকে দেখতে গেলাম
তুমি শুয়ে ছিলে
রূপকথার গল্পের বইয়ে
রাজপালঙ্কে যেমন ঘুমায় রাজা
তেমন ঘুমের মধ্যে শুয়ে ছিলে
তোমাকে ভরপুর দেখলাম
তোমার সিনেমায় দেখানো
কোনো ব্ল্যাক হিউমার
তোমার গানের ব্রজবুলি
আমাদের থুত্থুরে চোখ
আমাদের ঝুরঝুরে মন
ঝরে পড়ছে তোমার তিস্তায়
তুমি ঘুমের মধ্যে শুয়ে
ঘুমের মধ্যে একা
দীপাবলীর রাতে ঘরের ভেতর
নিষ্প্রদীপ, একা
একেই তবে যাওয়া বলে
পাণ্ডিত্য, মমতা নিয়ে
একেই তবে একা থাকা বলে
কাচের বাক্সে এঁটে
পাগড়ি বেঁধে, রাজার বেশে
তোমার যাওয়া
কোনো অযুহাত নেই
দ্বিধা ও দৃশ্যের পর্ব নেই
তবু মর্ম বোঝাতে
তোমার সাথে কাকে নিচ্ছ আর
মেরে লালা, আজ না যাইও ইয়ামুনার পার …

 

সাবেরা তাবাসসুম


কবিতা লেখা শুরু পিতা মোঃ সাইদুল হক ভুইয়ার অনুপ্রেরণায়। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে। এ পর্যন্ত প্রকাশিত বই ১৪টি। ১৩টি মৌলিক কবিতা এবং একটি হিন্দী ও উর্দু কবি গুলজারের কবিতার অনুবাদ-গ্রন্থ। একমাত্র পুত্রকে নিয়ে বেশিরভাগ সময় কাটে। চলচ্চিত্রের প্রতি রয়েছে তীব্র টান। সবকিছু্র বাইরে কবিতাই সাবেরার আরাধ্য ভূমি, পাশাপাশি অনুবাদ ও মুক্ত গদ্য লেখা তো আছেই।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।