ললিতা: ভ্লাদিমির নভোকভ

১৫.

পরেরদিন মা মেয়ে দুজন মিলে মার্কেটে গেল শপিং করতে। ক্যাম্পে কী কী লাগবে বা লাগতে পারে সম্ভাব্য একতা তালিকা করে সকালের দিকেই বের হল। খেয়াল করে দেখেছি যে কোনো পোশাকই লো’র গায়ে মানিয়ে যায়। রাতে খাবার টেবিলে লো কিছুটা পাগলামী করল। সে ক্যাম্পে যেতে চায় না। খাওয়া দাওয়া শেষে সোজা ও ওর রুমে চলে গেল। ক্যাম্প কিউ এর বৃষ্টির অলস দিনে সময় কাটানোর জন্য কিছু কমিক বই কিনেছিল। সেগুলোতে মুখ ডুবিয়ে আছে দেখলাম। আমিও বিষণ্ণ মনে রুমে ফিরে একটা চিঠি লিখলাম। লো’র স্কুল শুরু না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে যাবার প্ল্যান করে ফেললাম। কিন্তু সমুদ্রও কি লো’র অনুপস্থিতি ভুলিয়ে দিতে পারবে? সম্ভব না। এই মেয়েটাকে ছাড়া আসলে আমি বাঁচতেই পারব না।

পরদিন মঙ্গলবার ওরা আবার মার্কেটে গেল কেনাকাটার জন্য। আমি থেকে গেলাম ঘরেই। ওইরাতে লো খেতে নিচে আসল না। নিজের ঘরেই রাতের খাবার খেয়ে নিল। মেয়েটা কিছুতেই যেতে চাচ্ছে না। মায়ের সাথে চেঁচামেচি শেষে কিছুক্ষণ কান্নাকাটিও করল। বারান্দায় বসেছিলাম, ও সেখানে আসল না। মিসেস হেইজ হেসে আমাকে বললেন, ‘কী শুরু করেছে দেখলেন? ওকে বলেছি আপনিও ওর ক্যাম্পে যাওয়া সমর্থন করেন। তারপর তো কথাই বন্ধ। ভাবছে, আমরা ওর থেকে বাঁচার জন্য এরকম করছি। বয়স প্রায় তেরো হতে চলল এখন কি এরকম বাচ্চাদের মত আচরণ মানায়? অথচ ও নিজেকে এখনো সেই শিশুটিই ভাবে।’
কিছু বললাম না। চুপ করে রইলাম আমি।

বুধবার লো’কে একা পেয়ে ভাবলাম ওর সাথে একটু মজা করি। হয়ত তাতে ওর মন খারাপ ভাবটা কমবে। আমি ওকে কৌতুক বলার চেষ্টা করলাম, কিছুটা সহজ হবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ও আমার দিকে তাকাল না পর্যন্ত। উলটো ওর পুতুলটা দিয়ে আমাকে এমন জোরে মারল, ব্যথা পেলাম। আর ‘দুমুখো সাপ!’ বলে বিড়বিড় করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। আমি আমার বাম কাধের পাশটা ডান হাত দিয়ে ঘষতে লাগলাম। তাই বলে এত জোরে মারে কেউ!

রাতের বেলাও লো খেতে এলো না। দেখলাম চুল ধুয়ে নিচ্ছে, এরপর আবার একটা কমিক বই টেনে নিয়ে শুয়ে পড়েছে। আর তার পরের দিন বৃহস্পতিবার, মিসেস হেইজ ওকে ক্যাম্প কিউ-তে পৌঁছে দিয়ে আসল।

সেই বৃহস্পতিবার সকাল কিছুটা অন্যরকম ছিল। ভাবছিলাম অনেককিছুই। আমি ললিতাকে ভালবাসি। চিরকালের জন্য ভালবাসা যাকে বলে। এখানে ‘চিরকাল’ শব্দটা নিয়ে আমি নিজেও কনফিউজড। ওর কিছুদিন পরেই তেরো হয়ে যাবে। তারপর সে যুবতী হয়ে যাবে। আর তারপর কলেজ পড়ুয়া তরুণী। উফফ! জঘন্য থেকে জঘন্যতর ব্যাপার স্যাপার, আমি ভাবতেও চাই না আর। বড়জোর আর দুই বছর ও নিমফেট থাকবে। এই দুই বছরই আমার কাছে সেই চিরকাল। আর ওর মা কিনা এই দুই বছরের মূল্যবান দুইটা মাস কেড়ে নিতে চাচ্ছে? আমি এই দুইমাসের ক্ষতি কীভাবে পূরণ করব? একবার ভাবলাম মহিলা ছদ্মবেশে ওর ক্যাম্পের আশেপাশেই আমি তাবু করে থাকব। পরমুহূর্তেই চিন্তাটা বাতিল করতে হল। বাজে আইডিয়া!

বৃহস্পতিবার খুব সকালেই ওরা তৈরি হয়ে নিল। জানালা দিয়ে দেখছিলাম। মিসেস হেইজ ড্রাইভিং সীটে বসে আছে। ললিতা লুইসের কাছ থেকে একবার বিদায় নিল। প্রতিবেশী কার কাছ থেকে যেন বিদায় নিল। এরপর গাড়িতে উঠে বসল। দরজা লাগানো হয়নি তখনও। মিসেস হেইজ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ফেলেছেন। এক মুহূর্ত কী হল। দেখলাম আমার ললিতা গাড়ি থেকে দৌড়ে বাড়ির ভিতরে আসতে লাগল। আমি আমার পাজামাটা অপ্রস্তুত একটু টেনে তুললাম উপরের দিকে। দরজা খোলা। সিঁড়িতে ললিতার পায়ের দ্রুত শব্দ। দৌড়ে আমার ঘরে ঢুকে গেল। তারপর? লাফ দিয়ে আমার কোলে উঠে এলো। দুইহাতে জড়িয়ে ধরল আমার ঘাড়। গভীর একটা চুমুতে আমাকে আবিষ্ট করে ফেলল। যেন সেই চুমুতে জমানো কত রাগ, কত অভিমান, কত ভালবাসা জড়ো হয়ে ছিল। সমস্ত রাগ, সমস্ত অভিমান, সবটুকু ভালবাসা আমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে গভীরভাবে উপলব্ধি করছিলাম।

১৬.

লো চলে যাবার পরে পুরো বাড়িটা খাঁ খাঁ করতে লাগল। আমি ওর ঘরে গেলাম। ওর বিছানা ওর কাপড় চোপড় সবকিছুর ঘ্রাণ নিতে লাগলাম। সবকিছুতেই আমার ললিতা যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিশে আছে। ওর কাপড় চোপড়ের ক্লোজেট খুলে সেখানে হুমড়ি খেয়ে ঝাঁপ দিলাম পাগলামীবশত। ঠিক তখনই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলাম।

লুইস আমাকে ডাকছে। ডাকতে ডাকতে উপরে উঠে আসছে। আমি দ্রুত সামলে নিলাম নিজেকে। দরজার কাছে গিয়ে দাড়ালাম। লুইষ একটা চিঠি দিল আমার হাতে। তারপর লুইস চলে গেল। আমি চিঠিটা খুললাম-

‘এই লেখাটা আমার স্বীকারোক্তি, মনের কথা। আমি আপনাকে ভালবাসি। সেদিন রবিবার আপনি চার্চে গেলেন না। আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে এইটুকুই চাইলাম যে আমি যেভাবে আছি এভাবেই আপনার সাথে থাকতে চাই। এর কোনো অপশনই ছিল না আমার। আমি আপনাকে প্রথম যখন দেখি সেই মুহূর্তেই ভালবেসে ফেলেছি। আমি খুব একা, আর আপনিই আমার একমাত্র ভালবাসা।

এখন আমি যা বলছি একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। প্রিয়তম, মসিয়ে (যাই বলি না কেন) দয়া করে আজই আপনার সবকিছু গুছিয়ে চলে যান। এটা একজন বাড়িওয়ালীর আদেশ। আমি আমার ভাড়াটিয়াকে রাখতে চাই না; সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছায় আমি আপনাকে বের করে দিচ্ছি। চলে যান। আমার ফিরতে একটু সময় লাগবে। রাতের খাবারটা ধরতে পারব হয়ত। পথে যদি কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে তাহলে আরকি। আমি চাই না বাড়ি ফিরে দেখি আপনি এখনো যাননি। প্লিজ! আপনি চলে যান। আর দোহাই লাগে নিচের লেখাগুলো পড়বেন না।

আমি জানি আমি আপনার কাছে কিছুই না। আপনি আমাকে নিয়ে কখনোই ওভাবে ভাবেননি আমি জানি। আমি আপনার কাছে একেবারেই কিছু না। যদিও আপনি এখানে একটা বন্ধুত্বসুলভ পরিবেশ পেয়েছিলেন, প্রিয়সব বই পেয়েছিলেন, লো’র চেঁচামেচিও ভাল লেগেছিল- তবু আমি আপনার কাছে কিছু না। ঠিক না? ঠিক! একদম ঠিক! আমি এসেও যদি দেখি আপনি আছেন আমার ভালবাসাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাহলে আপনি একজন ক্রিমিনাল। জঘন্যরকম অপরাধী। আর যদি আমি এসে দেখি আপনি বাড়িতে আছেন তাহলে আমি ধরে নেব আমি আপনাকে যেভাবে চাই, আপনিও আমাকে ঠিক সেভাবেই চান। আমার পুরোটা জীবনের সঙ্গী হতে চান। আমার সাথে আপনার পুরো জীবন জুড়ে দিতে চান। আর আমার মেয়ের বাবা হতে চান।

চিঠিটা পড়া শেষে টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দেবেন। আপনার সিদ্ধান্ত যেটাই হোক না কেন। আরেকটা কথা শুধু বলতে চাই, এই পুরোটা জুন মাস আমি আপনাকে নিয়ে আমার নিজের পৃথিবীতে কোন আসনে বসিয়েছি, কীভাবে সাজিয়েছি কল্পনাও করতে পারবেন না। আমার স্বামীকে নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়, মি. হেইজ ছিলেন চমৎকার একজন মানুষ, একটা নিষ্পাপ মনের অধিকারী, কিন্তু আমার চেয়ে বিশ বছরের বড়। যাই হোক তাঁর ব্যাপারে আর কিছু বলতে চাই না। চিঠিটা ফ্ল্যাশ করে দিন বাথরুমে গিয়ে। আর চলে যান, প্লিজ! হ্যাঁ, যাবার আগে একটা ঠিকানা দিয়ে যাবেন যাতে আপনার কাছ থেকে নেয়া বাড়িভাড়াবাবদ বারো ডলার পাঠিয়ে দিতে পারি। ভাল থাকবেন। বিদায়। যদি বিশ্বাসী হন, আমার জন্য দোয়া রাখবেন।

ইতি-
শার্লট হেইজ

চিঠিটাতে আরো লেখা ছিল। সব মনে নেই। যেটুকু মনে ছিল গুছিয়ে এইরকম লিখে দিলাম। যতটুকু আরো মনে পড়ে, ভদ্রমহিলার বাজে ফ্রেঞ্চ, আর মনে আছে ওই চিঠিতেই আমি জানতে পারি ললিতার একটা ভাই ছিল। দুই বছর বয়সে মারা যায়। ললিতা তখন চার বছরের। আমি চিঠিটা নিয়ে ভাবতে লাগলাম এখন আমার কী করার আছে? হ্যাঁ, একটা কাজ বেশ ভালমত করার আছে। চিঠিটা টয়লেটে ফেলে ফ্ল্যাশ করে দেয়া যায়।

 

রনক জামান

কবি ও অনুবাদক ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১, মানিকগঞ্জে জন্ম। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ : অগ্রন্থিত ওহী [তিউড়ি, ২০১৯] এবং ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [অনুপ্রাণন ২০১৬]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।