কাজী রাফি: আমেরিকার বাক এবং যৌন স্বাধীনতা (পর্ব-২)

কাজী রাফি                                                                                              পর্ব-১

ম্যনহাটানের ভোর। অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এর নির্জন রাস্তা।

রবিবার ভোর। চারদিকে ফাঁকা আর সুনশান নীরবতা। অ্যাম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ে সকালের ঝকঝকে মিষ্টি রোদোচ্ছটা। হাডসন রিভারের নীল জলরাশিতে প্রতিফলিত নীলের আলোকচ্ছটা যেন মিশে আছে মাত্র ছড়িয়ে পড়া আলোকরশ্মিতে।

আগস্ট,২০২১ এর শুরুতে ওয়াশিংটন ডিসির বাস-টিকেট বুকড করা ছিল। অনেক ভোরে আমার বন্ধু জহুর গাড়ি ছুটিয়ে আমাকে ম্যানহাটান নিয়ে এলো। ভোরের সোনারং আলো-ছায়ায় খেলা চলছে গাছের সাথে পথের। পথের সাথে পরিচ্ছনতার। জহুরের হাই ল্যান্ডার থামলেও আমি নিউ ইয়র্কের এমন সময় আর সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। যাকে অবলোকন করা বললে অতুক্তি হবে না। জগতের সব সৌন্দর্য, নির্জন প্রান্তর অথবা ব্যস্ততম শহরের এমন সুনসান ভোর, পৃথিবীর সব সাগর, মরুর সকল প্রান্তর, আফ্রিকার নিঃসীম বন -আমার চোখের সামনে অথবা অনুভবে-স্মৃতিতে দেখলেও আমার বিস্ময় সত্যিই কাটে না।

ভার্জিনিয়া থেকে আমাকে রিসিভ করতে আসবেন মেজর রাফি স্যার। বাস থেকে নামলাম। ডিসপ্লে করা সাইনগুলো দেখে দেখে বাহির-পথের দিকে এগিয়ে গেলাম। বাইরে বের হওয়ার আগের টার্মিনালের উপরে তাকালাম। অবাক হয়ে কতক্ষণ তাকিয়েই থাকলাম। তার নির্মাণকৌশলের দিকে। অনেক উঁচুতে এর ছাদ। আশপাশে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ব্রান্ডের শপগুলো। উঁচু ছাদের নিচে অপেক্ষাগার। কফিশপ। রাফি স্যারকে ফোন করে জানলাম তার পৌঁছাতে আরো বিশ মিনিট লাগবে। খিদে পেট চো চো করছে। একটা কফিশপে বসলাম। খাবার অর্ডার করে, টার্মিনালে আসা-যাওয়া মানুষগুলোকে মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। পৃথিবীতে যত দৃশ্য তার মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্রময় লাগে আমার মানুষকে। একজোড়া চোখ, হাত-পা, একটা মাথা-মুখের এই প্রাণিগুলো আমার সবচেয়ে বিস্ময়ের। এই প্রাণির মাঝে কত বৈচিত্র্য! চলায়, পোশাকে, চেতনায়, চিন্তায়, আচরণে, ভাবনায়, জগতকে দেখায় অথবা তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন আর ভালোবাসা আর ঘৃণার ধরনে। তাদের দ্রোহ-বিদ্রোহ অথবা বিশ্বময় অভিপ্রয়ানের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ব্যকরণে!

বিশ মিনিটের আগেই রাফি স্যার ফোনে নির্দেশিত পথ ধরে বের হতে বললেন। আমি আমার স্বল্প লাগেজের ছোট্ট একটা ব্যাগ বাস-টার্মিনালের সামনে ঝুলানো মূর্তি আর বাতাসে উড়তে থাকা তিনটা বিশাল পতাকার লাইন বরাবর বের হতেই তিনি গাড়ির গ্লাস খুলে হাই দিয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তিনি আমাকে ওয়াশিংটন ডিসি ঘুরিয়ে দেখানোর পরিকল্পনা করেই এসেছিলেন। ওয়াশিংটন ডিসিতে এসে মনে হচ্ছিল, অন্য কোনো গ্রহ থেকে মানুষগুলো নেমে এসে একটা আধুনিক, অনিন্দ্যসুন্দর এবং সুপরিসর রাস্তা-গলি নির্মাণ করে তারা পালিয়ে গেছে। রেখে গেছে কনে দেখা বিকেলের রোদ-ছায়ার খেলা আর সবুজের লালিত্যকে অনাদিকাল থেকে ডেকে যাওয়া নীল আকাশের হাতছানি!

মনুমেন্ট- ফ্রিডম টাওয়ার।

প্রথমেই তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন স্বাধীনতা চত্বরের ওয়াশিংটন মনুমেন্টে। ৫৫৪ ফুট বা ১৬৯ মিটার উচ্চতার এই স্থাপনাটি ভিন্ন ভিন্ন পাথর এবং টন টন মার্বেল দ্বারা নির্মিত। ১৮৮৪ সালে সম্পন্ন হওয়া পাথর এবং মার্বেলের এত উঁচু স্থাপনা পৃথিবীতে এটিই প্রথম। ওয়াশিংটন ডিসির সকল সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর অবস্থান এই মনুমেন্টকে কেন্দ্র করে। দেখে মনে হবে, হোয়াইট হাউজ, মিউজিয়াম, ফ্রন্ট ইয়ার্ড অথবা লিঙ্কন চত্বর সবকিছুই যেন এই মনুমেন্টকে সাক্ষী রেখে নির্মিত।

ফ্রিডম টাওয়ার সংলগ্ন ওয়ার্ল্ড ওয়্যার-২ মিউজিয়ামের বহিরাঙ্গন

এর আশপাশের বিখ্যাত সব স্থাপনা। বিশেষত আমেরিকা’স ফ্রন্ট ইয়ার্ড বা দ্য ন্যাশনাল মল সত্যিই অপূর্ব। এটা আমেরিকার সবচেয়ে বেশি দর্শক অথবা ভ্রমণকারী দ্বারা পরিদর্শিত একটি পার্ক। একদিকে মনুমেন্ট অন্যদিকে লিঙ্কন মেমোরিয়াল, মাঝখানে কয়েক কিলোমিটার ফাঁকা সবুজ মাঠের সুপরিসর এই পার্ক। পার্কটির দিগন্তসম ফাঁকা মাঠ, নির্জনতার মাঝেও পৃথিবীর বিচিত্র জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের সমাহারের নয়ানাভিরাম দৃশ্য অবলোকনে একপাশে বসতে জন্য উঁচু উঁচু গাছের সারির নিচে সোফার মতো স্টিলের বেঞ্চ বসানো আছে। সেইপাশেই আছে আরো ছোট ছোট অসংখ্য পার্ক। যার ঘাস-গালিচায় বসে সারাটি দিন কাটিয়ে দিতে ইচ্ছা করবে। এই পার্কটা নাকি আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রতীক। এটা নাগরিক জীবন উদযাপন ( স্থানীয় জনগণের পিকনিক, জগিং, চিত্তবিনোদন ইত্যাদি), যে কোনো সমাবেশ এবং রাষ্ট্রপতির দ্বারা কিছু উদ্বোবধনের স্থানও বটে।

ফ্রিডম টাওয়ারের সামনে লেখক।

এরপর আমেরিকার ষোলোতম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতির প্রতি স্রদ্ধাস্বরূপ ১৯৩২ সালে নির্মিত লিঙ্কন মেমোরিয়ালে গেলাম। গ্রিসের অ্যাথেনস নগরের অ্যাথিনী দেবীর মন্দিরের আদলে নির্মিত এই মেমোরিয়াল সময়ের অভাবে বাইরে থেকে দেখেই সাধ মেটাতে হলো। এর ৩৬ টা কলাম লিংকনের সময়ের আমেরিকার ৩৬টা পুনঃগঠিত স্টেটসকে রিপ্রেসেন্ট বা চিত্রিত করে। সবশেষে গেলাম হোয়াইট হাউজ এলাকায়। আগে হোয়াইট হাউজের পুরোটাই খোলা থাকলেও এখন প্রেসিডেন্ট ভবনের এলাকাটা বেড়া দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের ইলেকশন মেনে না নেওয়ার ঘোষণার সময় আমেরিকার জনগণের দ্বারা হোয়াইট হাউজ আক্রান্ত হওয়ার কারণেই এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউজের সামনে।

আয়ারল্যান্ডের লিয়েন্সটার হাউজের আদলে ডিজাউনকৃত স্থাপনাটির নির্মাণকাল ১৭৯২ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত হলেও প্রেসিডেণ্ট থিওডোর রুজভেন্ট ১৯০২ সালে এর নামকরণ করেন হোয়াইট হাউজ। বেড়া থাকলেও এ পাশের মাঠ থেকে হোয়াইট হাউজ স্পষ্ট দেখা যায়। অসংখ্য মানুষ ছবি তুলছে, ঘাসে বসে পারিবারিক আড্ডাও চলছে। রাফি স্যার বললেন,

হোয়াইট হাউজের সামনে তুমি বাইডেনের জাত-পাত তুলে গালি দাও -কেউ কিছু বলবে না। তোমার দ্বারা কেউ লাঞ্ছিত অথবা ক্ষতিগ্রস্ত না হলে কারো কিছু এসে যায় না। আমেরিকা মানুষের কথা বলার সর্বোচ্চ বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে।

আমার আগমনের খবরটুকু রাফি স্যারের মাধ্যমে মেজর সালাহউদ্দীন (অবঃ) পেয়েছিলেন। আমি যখন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট ছিলাম  তখন সালাহউদ্দীন স্যার সেখানে প্রশিক্ষক (প্লাটুন কমান্ডার) হিসেবে সেখানে কর্মরত ছিলেন। তিনি রাফি স্যারকে অনুরোধ করেছিলেন যেন আমরা একত্রিত হয়ে কোথাও বসি। রাফি স্যার শেষ বিকেলে গাড়ি ছুটালেন শহরের শেষপ্রান্তে নদীর কিনারে একটা পার্কের দিকে। সেখানেই আমাদের বসার কথা। কার-পার্কিং করতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হলো। হাজার হাজার গাড়ি সব পার্কিং স্পেস দখল করে আছে। পার্কের ফাঁকা স্থানে অবশেষে একটা গাছের নিচে তিনি গাড়ি রাখলেন। সালাহউদ্দীন স্যার আমাদের গাড়ির কয়েক মিনিট আগেই পার্কেই প্রবেশ করেছিলেন। তিনি আমাদের পেয়ে যেন আবেগাপ্লুত হয়ে উঠলেন। আমরা নদীর দিকে ক্রমশ ঢালু পার্কটির প্রান্তে নদীর কিনারার দিকে জায়গা খুঁজলাম। পার্কের সর্বত্র মানুষ। চাদর মাদুর বিছিয়ে কোনো কোনো পরিবার অথবা কপোত-কপোতি একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে শুয়ে-বসে নিজেদের মাঝে মগ্ন হয়ে আছে। করোনা থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়ে মানুষ বাইরের এই খোলা চত্বর এবং যেন প্রকৃতিকে প্রাণভরে আলঙ্গন করছে।

পার্কের সবুজ ঘাসগুলো কার্পেটের মতো ঠিক নয়। কিছুটা বুনো। করোনার কারণে পার্কের বুনো ঘাসগুলোর বাড়-বাড়ন্তে স্পষ্টত ভাটা পড়েছে। কেন না, আমেরিকার জনগণকে ভ্যাক্সিনেশন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনায় তারাও এখন ঘর থেকে বের হয়েছে (বলে রাখি ইউএসএ-এর অনেকেই ভ্যাক্সিন নিতে আগ্রহী নয়। সুতরাং প্রণোদনা হিসেবে সরকার প্রতিজন ভ্যাক্সিন গ্রহণকারীকে ১০০ ডলার প্রদান করছে)। পার্কে যারা আনন্দ-যাপন করছেন তারা মাস্কের ধার ধারছেন না। পার্কের দক্ষিন দিকটা নদীর দিকে ক্রমশ ঢালু। নদীর ওপারেই একটা এয়ারপোর্ট। পাঁচ-সাত মিনিট পর পর এয়ার আমেরিকার একটা করে বিমান আমাদের মাথার ঠিক উপর দিয়ে গিয়ে সেখানে ল্যান্ড করছে। আমেরিকায় আসার পর গত কয়েকদিনে বাস স্টেশন বলতে ওয়াশিংটন ডিসিতে এসে নামা একটাই বাস স্টেশন আমি দেখেছি। তবে বিমানবন্দর চোখে পড়েছে কয়েকটা। রাফি স্যার আবার এত কাছ দিয়ে বিমানের এই অবতরণ খুব উপভোগ করেন বোধ হয়। তিনি এই দৃশ্যগুলো ভিডিও করছিলেন।

দেশ বিশেষ করে সামরিক বাহিনী নিয়ে রাফি স্যারের মতো তার উৎকণ্ঠা আর আবেগের শেষ নেই! দেশ নিয়ে, দেশের রাজনীতি, অবক্ষয় -এসব নিয়ে তারা এত খবর রাখেন যা বাংলাদেশে বাস করেও আমি জানি না। দেশকে নিয়ে তাদের আগ্রহ থাকলেও আমার আগ্রহ আমেরিকা নিয়ে। প্রশ্ন করলাম,

স্যার, সত্যি করে বলুন তো, মাতৃভূমি ছেড়ে এসে এই আমেরিকা দেশটা আপনার কেমন লাগছে?

তিনি একটু থামলেন। নিরাসক্ত কণ্ঠেই বললেন,

কেমন লাগছে…আসলে রাফি, মানুষের ভালো লাগাটা তার স্বাধীনতাবোধ এবং নিরাপত্তায়। এখানে পরিশ্রম করি, খাই-দাই, বিশ্রাম করি, ঘুরে বেড়াই। কেউ আমার জীবন নিয়ে বোদারড নয়, উঁকি দিয়ে দেখেও না। আমার খাবারটা নির্ভেজাল। জো বাইডেন আর একজন সাধারণ মানুষ যে খাবারটা খান তা একই মানের, একই মূল্যের। এর চেয়ে শান্তি আর কী হতে পারে, বলো? এই যে, এই পার্কটার চারদিকে তাকিয়ে দেখো, কত মানুষ, বিচিত্র পোশাক, ছেলে-মেয়ে শুয়ে আছে ঘাসের উপর মাদুর বিছিয়ে। কে কাকে কিস করছে, কার পোশাক কত সংক্ষিপ্ত, কে ড্রিংকস করছে – এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু একটা মেয়েকে কেউ অ্যাবিউজড করার চেষ্টা করুক – সে যে-উ হোক, পার পাবে না। এখানে মন খারাপের সুযোগ নেই।

মন খারাপের কোনো কারণ আসলে লাগে না। দেশ থেকে, পরিবার থেকে দূরে এসেই আমার খারাপ লাগছে। আমি তাদের মিস করছিলাম। বললাম,

এই দেশের কিছুই কি নেই, যা আপনার মন খারাপ করে দেয়, বিক্ষিপ্ত করে দেয়? এবার তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন,

হ্যাঁ, আমেরিকার একটা বিষয় আমার কাছে খুবই অস্বস্তিকর। তা হলো এদের লাগামহীন গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড সংস্কৃতি। আমরা এসব দেখে অভ্যস্ত নই বলেই হয়তো খারাপ লাগে। ছেলেগুলো একের পর এক গার্লফ্রেন্ড বদলাচ্ছে। মেয়েদের জীবনকে তারা প্রতারণাময় আর হেল বানিয়ে একসময় নিঃসঙ্গ করে দিচ্ছে।

একই কথা ছেলেদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

তা পারে। তবে, মেয়েরা থিতু হতে চায়। ছেলেরা পালাতে চায়। কী ভয়াবহ ক্লাব সংস্কৃতি এখানে। ছেলেরা যাকে পছন্দ নিয়ে রাত কাটাচ্ছে। একজন তাদের গার্ল ফ্রেন্ড আর আনন্দ-স্ফুর্তির জন্য বাকি মেয়েদের এরা বলে ‘গার্লস’। সবচেয়ে খারাপ লাগে, স্কুলগুলো এ নিয়ে কোনো মূল্যবোধ তৈরি করা তো পরের কথা এগুলোকে তারা আরো উৎসাহিত করে।

এ ছাড়া আমেরিকার সামনে কি খুব বেশি পথ খোলা আছে?

প্রশ্নটা শুনে তিনি আমার কাছ থেকেই তিনি উত্তরটুকু শোনার অপেক্ষায় থাকলেন। আমি বললাম,

শত শত জাতি গোষ্ঠীর শত শত সংস্কৃতি, কৃষ্টি আর জীবনাচরণকে নিয়ে আমেরিকার নিজস্ব সংস্কৃতিই এখন ঠিক-ঠিকানাহীন। এত বৈচিত্রময়তা এদের আর কোনো সংস্কৃতির মধ্যে, নির্দিষ্ট সামাজিক মূল্যবোধের কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখতে পারবে না। সুতরাং এ দেশকে সংহত এবং নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেসিক ইন্সটিক্টগুলোকে তৃপ্ত রাখার নীতিতে গেছে আমেরিকা।

এভাবে?

হ্যাঁ, এভাবে। শরীর আর পেটের ক্ষুধা পরিপূর্ণ করার জন্য এই নীতিই তাদের রক্ষা করে চলছে। না হলে আমেরিকা তছনছ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেওয়া দুজন অফিসার একে অন্যের দিকে তাকালেন। এবং দুজনের চোখের ভাষায় আমার কথার পক্ষে সমর্থন খুঁজে পেয়ে আশ্বস্ত হলেন। আমি বললাম,

শান্তকরণের সর্বোত্তম পন্থা হয়তো এটাই।
কিন্তু আমেরিকার পক্ষে তুমি যা ভাবছ, তা কি ঠিক?

নদীপাড়ের ঢালু অংশ হতে আমি চারদিকে আবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। পার্কের ক্রমশ উঁচু হয়ে অপর প্রান্ত অপরপ্রান্ত মিশে গেছে সমতল ভূমিতে মাথা উঁচু করা ঘন গাছের শীর্ষ রেখাগুলোর সাথে। অস্তমিত সূর্যের লালিমা পার্কের মিলিয়ে যাওয়া ঘাস-গাছের রেখায় মিছে কি যে এক অপার্থিব দৃশ্য তৈরি করেছে। অনন্য এই দৃশ্যের সৌন্দর্য আমাকে ধীরে নেমে আসা সন্ধ্যার আকাশে দু-একটি জ্বলে ওঠা তারার আগাম দৃশ্যকল্পে ডুবিয়ে নিল। সৌন্দর্য, প্রকৃতি, নদী, দিগন্ত, তেপান্তর, নির্জনতা, স্মৃতি, দৃশ্য আর জীবন -মাঝে মাঝেই আমাকে আনমনা করে। কোনো এক গভীর নস্টালজিয়া অথবা ভাবনায় তলিয়ে নেয়। কী সেই ভাবনা, কেন এই মন উদাস করা সকাল অথবা বিকেল – তার রেখাটা একবার ধরা দেয় তো দশবার হারিয়ে যায়। একটা গল্প লেখার বীজ আমার ভিতরে লকলকে পাতার মতো শব্দ হয়ে হয়ে গজাতে থাকে। আমি আমার মাথার মধ্যে সেই গল্পবীজের ভ্রূণ হয়ে ওঠার মহাসঙ্গম ক্ষণের তোলপাড় অনুভবেই কি আনমনা হয়ে থাকি? আবার ফিরে আসি পার্কের অনেক প্রাণের সম্মীলনে। এক যুবক গভীর চুমো আর আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়েছে তার তরুণী প্রেমিকা/গার্লফ্রেন্ড। এই দৃশ্য আমাকে ফিসফিস করে বলে, জীবন সুন্দর। জীবন মোহনীয়। সালাহউদ্দিন স্যার আবার আমাকে প্রশ্ন করেন,

কী মনে হয় তোমার? সম্বিত ফিরে তার প্রশ্নটার উত্তরে ফিরে যাই,

এখানে, এই নদীর দিকে ক্রমশ ঢালু সবুজ ঘাসের বিশাল বড় এই পার্কে এত মানুষ, এত এত অনন্য সুন্দরী-স্বল্পবসনা মেয়ে অথবা নারীগণ তাদের প্রিয় মানুষ অথবা পরিবারের সাথে নিশ্চিন্তে শুয়ে বসে আছে, কেউ কি কারো দিকে একবারের জন্য ফিরে দেখছে? তারা ‘তৃপ্ত’ বলেই এটা সম্ভব। এ দেশে যে মানসম্পন্ন খাবার জো বাইডেন খান সেই মানসম্পন্ন খাবার আমেরিকার সর্বনিম্ন আয়ের একজন মানুষও খেতে পারেন। একজন ক্ষুধার্ত মানুষই অন্য মানুষের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা থেকে সকল প্রাপ্তিকে হিংসা করতে শিখে। এবং একজন শারীরিকভাবে অতৃপ্ত পুরুষই এমনকি অচেনা নারীকেও নিজের সম্পদ মনে করার প্রবণতায় ভোগে। এ এমন এক হিংসা আর বিদ্বেষ যার ধিকি ধিকি আগুন বড় সর্বনাশা। পুলিশ দিয়ে তা পাহারা দেওয়া যায় না, আইন দিয়ে তা প্রতিহত করা যায় না। আমেরিকা খাদ্য এবং যৌনক্ষুধার পাশাপাশি নারী-অধিকার এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বিপর্যয় থেকে বেঁচে গেছে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল। পার্কিংয়ের অনেক স্থানই এখন ফাঁকা। বিকেলে অনেক খুঁজেও পার্কিং না পেয়ে রাফি স্যার গাড়ি রেখেছিলেন কিছুটা পার্কের ভিতরেই একটা গাছের কাছে। আড্ডায় বুঁদ হয়ে আমরা নিজেদের ছবি তোলার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। মনে পড়তেই প্রান্ধকারে আমরা এক তরুণকে ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ করতেই সে আগ্রহভরে আমাদের কয়েকটা ছবি তুলে দিল। বিদায় নিয়ে আমরা ভার্জিনিয়ার পথ ধরলাম।

নীল আকাশ মিশে আছে সবুজ প্রকৃতির হাতছানিতে।

মহাসড়ক বাদ দিয়ে রাফি স্যার আমাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন অন্য একটা পথ ধরে। মসৃন পথটা উঁচু-নিচু। দুই পাশে বন। অন্ধকারে চাঁদের আলোর সব রেখা হারিয়ে গেছে। কিন্তু একটু পর আবার প্রশস্ত দুই পাশ নিয়ে সড়কটা চোখ মেলল যেন। চাঁদের আলোটুকু সড়কের দূর-দূর বেঁকে যাওয়া বিন্দুতে রূপালি থেকে ধূসর, ধূসরতর। সবুজ আর সবুজ। নির্জনতা আর নির্জনতা আমার ভিতর অন্যরকম সব দৃশ্যকল্প তৈরি করে চলল। সেই দৃশ্যকল্প আমার গল্পের কত-শত চরিত্র উঁকি দিয়ে আমাকে যেন দেখে যেতেই থাকল। মায়াবী কত জীবন এই দৃশ্যকল্পের ভিতর ঢুকে গেল আমার শৈশব-কৈশোর থেকে জেগে জেগে ওঠা স্মৃতিঘোরের অনুভব নিয়ে।

রাফি স্যারের বাসার ভিতরের সৌন্দর্যটুকু অনন্য। রাত বলে বাইরেটা ভালো করে দেখিনি। আমার জন্য নিচতলার গেস্ট রুম তিনি দেখিয়ে দিলেন। টিভি রুমে আয়েশ করে শুয়ে-বসে থাকার সোফা। একটা টয়লেট আর পার্টি করার জন্য একটা ডাইনিং টেবিলও আছে এই ভূমি-সংলগ্ন বিলাসবহুল নিচতলায়। ভাবী একজন ফার্মাসিস্ট। এসেছিলেন ছাত্রজীবনে। ত্রিশ বছর ধরে আছেন আমেরিকায়। আমেরিকান এবং বাংলাদেশি খাবারের সমারোহে তিনি টেবিল ভরিয়ে রেখেছেন। পুরো পরিবারের সাথে একসাথে ভোজনে বসলাম। ধোঁয়া ওঠা বিফ স্টেকের ঘ্রাণে সারদিনের ভ্রমণ-ক্লান্তি আর জেট ল্যাগের যন্ত্রণা উবে গেল। স্টেকটা তিনি এত চমৎকার রাঁধেন – অনেক নামী-দামি রেস্তোরায় এমন বিফ স্টেক খাওয়ার স্মৃতি সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়ল না।

(তৃতীয় পর্বের বিষয়- ভার্জিনিয়ার সৌন্দর্য)

 

কাজী রাফি

জন্ম- ২২ নভেম্বর ১৯৭৫, বগুড়া।

‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ প্রথম এই উপন্যাসেই কালি ও কলম পুরস্কার লাভ করেন এবং পাঠক এবং বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। চাকরির প্রয়োজনে আফ্রিকায় বাস করেছেন দুই বছরের অধিক সময় এবং আফ্রিকার প্রকৃতি-সংস্কৃতি, তাদের প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনকে দেখেছেন কাছ থেকে। মানুষ ও তাদের যাপিত জীবন এবং প্রকৃতি দেখার প্রয়োজনে ঘুরেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তর।

পুরস্কারসমূহ :এইচএসবিসি কালি ও কলম পুরস্কার -২০১০; এমএস ক্রিয়েশন সম্মাননা -২০১০; নির্ণয় স্বর্ণপদক-২০১৩ এবং এসএম রাহী পদক ২০১৯

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :

‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’, ‘ত্রিমোহিনী’, রূপডাঙ্গার সন্ধানে’, ‘পাসওয়ার্ড’, ‘রংধনুর সাঁকো’, ‘লে জোঁ নদীর বাঁকে’, নিঃসঙ্গতার নগ্ন খোলস’, অরোরার আঙুল’, ‘ছায়ার নির্বাসন নির্বাসনের ছায়া’, ‘আঁধারে লুকানো সুর’,‘গ্রামটির নাম গোধূলিমায়া’, নোরার ক্যাসল অব ক্যাসাব্লাঙ্কা।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top