চাঁদ, প্রজাপতি ও জংলি ফুলের সম্প্রীতি-৭

মাসুদ খান

(পূর্বপ্রকাশিত-র পর)

সময়, ইতিহাস ও ভূগোলের বাহির থেকে উঠে আসা এক প্রহেলিকা-মানব…

কত যে রহস্যজড়ানো, কুহকজাগানো ঘটনায় ভরা মহাস্থানগড়ের এই ছোট্ট অঞ্চলটুকু! প্রিয় পাঠকপাঠিকা ভাইবোনবন্ধুগণ, আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে এর আগে হকসেদে নামে একজনের কথা বলেছিলাম অল্প একটু। এই যে হকসেদ খোজা (খাজা নয়, খোজা, হকসেদ খোজা), অদ্ভুত এক রহস্যমানব। ভাঙাচোরা পোড়া-পোড়া মেছতাপড়া চেহারা, কাইস্টা পাটের দড়ির মতো দীর্ঘ পাকানো শরীর, তার ওপর সে খোঁড়া, আবার খোজাও, পেশায় ছিচকে চোর, খুচরা লুচ্চামি-লাম্পট্যে ওস্তাদ, কিন্তু মহাজ্ঞানী, মহাপণ্ডিত। ‘খোজা’ ছাড়াও আরও অভিধা আছে তার। কেউ কেউ তাকে বলে ল্যাংড়া হকসেদ আবার কেউ বলে হকসেদ পণ্ডিত। দুনিয়ার সব বাঘা-বাঘা পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ তার। নোম চমস্কির কাছ থেকে চিঠি আসে তার কাছে। এই কিছুদিন আগে জাক দেরিদা চিঠি দিয়েছে ফরাসি ভাষায়। অনেক জ্ঞান হকসেদ পণ্ডিতের, ভাষাও জানে অনেকগুলি। ইতিহাস, পুরাণ, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, রামায়ণ, মহাভারত, বেদ-উপনিষদ, জেনবাদ থেকে সঞ্জননী ব্যাকরণ, শ্রেণিসংগ্রাম থেকে ক্ষমতাকাঠামো, পেশিবহুল পুঁজিবাদ থেকে জম্বি-পুঁজিবাদ, ভার্ব-বেইজড ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে কসমোলজি, ভাষার ডিপ-স্ট্রাকচার ডিবেট থেকে মহা-মন্দার ডেরিভেটিভ থিয়োরি, কালাজাদু থেকে কমোডিটি ফেটিশিজম, স্ট্রিং থিয়োরি থেকে সেক্স অ্যান্ড ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি, আসমান-জমিন, আন্ডারগ্রাউন্ড-ওভারগ্রাউন্ড… কমবেশি সবকিছুরই হালনাগাদ খবরাখবর আছে তার কাছে।

বগুড়ার অনেক ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করে দেশবিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে। গরমের ছুটিতে ঘরের ছেলেমেয়ে ফিরে এসেছে ঘরে। একদিন দেখি, গণ-উন্নয়ন গ্রন্থাগারের সামনে হকসেদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে। হকসেদ তাদের সঙ্গে ক্ষমতা-র বিবর্তন ও গতিবিধি নিয়ে কথা বলছে, পাওয়ার কী ক’রে গড়াতে গড়াতে ফ্রম প্রিস্ট টু প্রিন্স টু প্রেসিডেন্ট টু মার্কেট-প্লেসে এসে দাঁড়াল কালে-কালে, তার ইতিবৃত্ত। তর্ক তুলেছে দু-তিনজন তরুণতরুণী। এক পর্যায়ে হকসেদ বলছে, “কী সব ডিপ-সিটেড স্টেরিও-টাইপ কথাবার্তা কও-না তোমরা! ভার্সিটিগুলাতে যে কী শেখায়! যত্তোসব ভেড়ার অণ্ডকোষ!” তার কথায় তরুণ-তরুণীরা বিব্রত হচ্ছে দেখে সে আবার বলতে থাকে, “শোনো, রাগ কইরো না, দ্যাখো, হামি হইলাম-গিয়া অশিক্ষিৎ মানুষ, দূষিৎ রক্ত, হামার কথার মধ্যে না-হয় রাসটিসিটি আছে, কিন্তুক ইয়াং শিক্ষিৎ পোলামাইয়াগো মগজে যে রাস্ট ধইরা গেছে-গা, তার কী? কী আর কমু, অবিদ্যা, কুবিদ্যা! স-ব শিক্ষার দোষ!………..” মুগ্ধ হয়ে হকসেদের কথা শুনছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্রছাত্রী। মুগ্ধতায়, টান-টান উত্তেজনায় এই গরমের দিনে তাদের মাথা ও কান আরো গরম হয়ে উঠছে।

কেমনে এতকিছু জানে হকসেদ, কী বৃত্তান্ত, কেউ বুঝতে পারে না। থাকে ভাঙা ঘরে, কম্পিউটার নাই, ইন্টারনেট নাই। বিদ্যুতের কানেকশনই নাই ঘরে, তার আবার কম্পিউটার ইন্টারনেট! কিন্তু কেমনে এত পড়াশোনা, কীভাবে এত যোগাযোগ! এও কী সম্ভব! কেমনে কী! দুশ্চরিত্র আর রহস্যময় স্বভাবের কারণে লোকজন খুব একটা ঘেঁষে না তার কাছে। তবে গ্রামে দারোগাপুলিশ ঘোরাঘুরি করতে দেখলে এলাকাবাসী হকসেদকে নিয়ে যায় তাদের কাছে। হকসেদ তখন থাকে টপ গিয়ারে। ফুটফাট ফরাসি, ইংরেজি আর গুরুগম্ভীর বাংলায় তত্ত্বকথা ব’লে ভড়কে দেয় দারোগাকে। যে তেজ ও বেগ নিয়ে দারোগা এলাকায় ঢোকে, নিস্তেজ হয়ে যায় তার অনেকটাই। দারোগা পরেরবার এলে খোঁজ পড়ে হকসেদের। তার কাছ থেকে জ্ঞানের কথা শুনতে চায় পুলিশ। হকসেদ তো আর কিছুতেই কাছে ঘেঁষে না। দূরে দূরে থাকে। বলে, “না ভাই, যাই-গা, পুলিশের ভালবাসা, গেরস্তের মুরগি পোষা…।”

একবার এক শীতের সকালে চা-খানায় বেঞ্চির ওপর বসে ছোটদারোগা চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর হা হয়ে কথা শুনছে হকসেদের। আশেপাশে গেলাফ-গায়ে বেশ কিছু লোক নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো শুনছে হকসেদের জ্ঞানদেশনা। একসময় ওঠার সময় হলো ছোটদারোগার। উঠতে গিয়ে দ্যাখে, মানিব্যাগটা নাই। অনেক খোঁজাখুঁজি হলো, পাওয়া গেল না। দেহতল্লাশি করা হলো সবার, হকসেদকে ছাড়া। হকসেদ তো জ্ঞানগুরু, তাকে তল্লাশি করলে কেমন দেখায়! তাই আর সার্চ করা হলো না। কিন্তু মানিব্যাগ তো আর পাওয়া গেল না। গ্রেফতার- ও নির্যাতন-বাণিজ্য থেকে পাওয়া বেশ কিছু টাকা ছিল মানিব্যাগে। ছোটদারোগার ইচ্ছা ছিল, বাড়িতে জমানো টাকার সাথে ওই টাকা যোগ করে যা হবে তা দিয়ে আসছে কোরবানি ঈদে এমন এক কোরবানি দেবে যাতে সাতপাড়ার মানুষ টাশকি খেয়ে যায়; আর বউছেলেমেয়েদের জন্যও কিনতে চেয়েছিল হালফ্যাশনের শাড়ি ও কাপড়চোপড়। কিন্তু জ্ঞানের কথা শুনতে গিয়ে পুলিশের যে এমন অজ্ঞান টাইপের অকাম হবে ভাবেনি কেউ। ছোটদারোগার মন খুব খারাপ। হকসেদ বিড়বিড় করে বলে ওঠে, “যা হওনের হইছে/ উৎপাতের মাল চিৎপাতে গ্যাছে।” হকসেদের কথার মানে সবাই বুঝলেও মাথা-ঠিক-নাই দারোগা বুঝতে পারছে না ঠিকমতো। একজন আবার হকসেদের কথার সরলার্থ করে বলছে, “ঠক্কের মাল হক্কে খাইছে।” এটা অবশ্য আরো দুর্বোধ্য লাগছে ছোটদারোগার কাছে। আসলে পুরা ব্যাপারটাই তার কাছে মহাদুর্বোধ্য ঠেকছে।

জ্ঞাতিগোষ্ঠী বলতে কেউই নাই হকসেদের। কোত্থেকে সে এসেছে কেউই বলতে পারে না। কেউ বলে, দূরের কোনো জঙ্গল থেকে এসেছে। কেউ বলে, ওই যে ভাঙা রাজবাড়ির লাগোয়া করতোয়ার খাড়া পাড়, যেখানটায় কয়েকশো বছর আগে বিধর্মী হার্মাদের স্পর্শ বাঁচাতে জহরব্রত পালন ক’রে রাজকুমারীরা ঝাঁপ দিয়েছিল করতোয়ায়, সেই খাড়া পাড় বেয়ে উঠে এসেছে হকসেদ, জলবাঁদরের মতো ঘেঁষটে ঘেঁষটে। গায়ে তার মেছো গন্ধ। আর নামটাও দ্যাখেন কেমন! হকসেদ। মোকসেদও না, বাসেদও না, আক্কাসও না, ঝাক্কাসও না, আবার আসবদেবতা ব্যক্কাসও না। মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যায় সে বেশ কিছুদিনের জন্য। জনশ্রুতি আছে, ওই সময়টায় সে চলে যায় দূরের কোনো শহরে। লাইব্রেরিতে বসে বই আর ইন্টারনেটে বুঁদ হয়ে থাকে একটানা কয়েকদিন। হকসেদের বয়স কত বোঝা মুশকিল। দাড়ি-গোঁফ-চুল কিচ্ছু নাই, এক্কেবারে মাকুন্দা সাফ-সাফ্ফা, মাথাটা তো আদ্যোপান্ত গড়ের মাঠ। জাহাঙ্গীরনগরের নৃতত্ত্বের মাহবুব আর মোশারফ বেশ গবেষণা করে-টরে শনাক্ত করেছে, হকসেদ পণ্ডিত হলো ভেড্ডিড ও মঙ্গোলয়েড নৃগোষ্ঠি আর সেইসঙ্গে পুরাণপ্রসিদ্ধ বায়স পক্ষিগোষ্ঠির সঙ্কর। সময়, ইতিহাস ও ভূগোলের বাইরে থেকে উঠে আসা এই এক প্রহেলিকা-মানব!

একবার সিঁদ কেটে চুরির কাজ সেরে বের হয়ে দৌড়ে পালাবার সময় হকসেদ নিজেরই খুঁড়ে রাখা সিঁদের গর্তে পড়ে পা ভেঙে ফেলে। সেই থেকে সে হকসেদ খোঁড়া। যখন সে অপরাধ করে, কেউই তাকে ধরতে পারে না ঠিকই, কিন্তু কীভাবে যেন আপনাআপনি প্রাকৃতিক ইনসাফ ঘটে যায় তার বেলায়। একবার এক অন্ধকার ঝড়বৃষ্টির রাতে গামছায় মুখ ঢেকে ঢুকেছিল প্রোষিতভর্তৃকা এক গৃহবধূর ঘরে। মাটির ঘর, স্বামী দারোয়ানের চাকরি করে ঢাকায়; পাহারা দেয় অন্যের বাড়ি, এদিকে নিজের বাড়ি হকসেদের হাওলায়। কী হয়েছিল তা জানা যায়নি, তবে জানালা ভেঙে পড়িমরি প্রাণ-হাতে লাফিয়ে বাইরে এসে পড়েছিল হকসেদ। পড়েই হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড় জঙ্গলের দিকে। পরে, জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকারে পেশাব করছিল হকসেদ। এদিকে টিপটিপ বৃষ্টির ভেতর কোলাব্যাং ধরতে নিচেই ওৎ পেতে ছিল এক খাটাশ। খাটাশটা কোলাব্যাঙের বদলে খাবলা দিয়ে সোনাব্যাং ছিঁড়ে নিয়ে দৌড়… সেই থেকে হকসেদের নাম হকসেদ খোজা।

মানুষদের মধ্যে নরসুন্দর, প্রাণীদের মধ্যে শৃগাল, আর পাখিদের মধ্যে কাকেরা খুব বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর হয়। শোনা যায়, বিদুষী, বাকসিদ্ধা খনা-র জিহ্বাটা নাকি ভাগাভাগি করে খেয়ে নিয়েছিল শৃগাল ও কাক। সেই থেকে তাদের এত বুদ্ধি। বলা হয়ে থাকে, শিয়ালেরা হাইপার-অ্যানিম্যাল আর কাকেরা, অ্যান্টিবার্ড। তো, পণ্ডিত হকসেদ মানুষের ভাষা শেখাত প্রবাদপ্রসিদ্ধ সেই শৃগাল আর কাকদের। বেশ কিছু শিয়াল ও কাক ইতোমধ্যে রপ্ত করে ফেলেছে ভাঙা-ভাঙা বাংলা। প্রবীণ এক শৃগাল আর এক বায়স তো এখন গ্রামের নানান শালিশ-বৈঠকেও উপস্থিত থাকে। মূল্যবান মতামত দেয় তাদের সেই পাশবীয় বাংলা আর রপ্ত-করা ইশারা ভাষার মিশাল দিয়ে। বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথম মানবকুলের বৈঠকে শিয়াল ও কাকের কার্যকর অংশগ্রহণ। কাক বসে উঁচু এক টুলের ওপর আর বড় একটি চেয়ারের ওপর উঠে বসে শিয়াল। শিয়াল প্রথম-প্রথম লেজ পেছনের দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বসতো, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে দুষ্ট পাবলিক লেজে চিমটি কাটে, এখন তাই লেজ সামনের দিকে রেখে বসে। পণ্ডিত হকসেদকে কেউ মানে না বটে, কিন্তু তার ওই দুই পাশব সাগরেদ-  শিয়াল আর কাক-  তাদেরকে ঠিকই মাতবর মানে পাবলিক।

একবার হলো-কি, হকসেদের এক অপকর্মের বিচার বসেছে। শালিশে অন্যান্য মাতবরের সঙ্গে হাজির আছে হকসেদেরই একনিষ্ঠ সাগরেদ ওই শিয়াল আর কাক। হকসেদকে ধরে এনে বেঁধে রাখা হয়েছে কলাগাছের সাথে। এই প্রথমবারের মতো সে ধরা খেয়েছে। অন্যসময় তো অকাম করেই লাপাত্তা হয়ে থাকে বেশ কিছুদিন। পরে সবকিছু যখন ঠাণ্ডা হয়ে আসে, এলাকায় হাজির হয় সে। অবশ্য খুব বড় ধরনের অপরাধ সে করে না, এই ধরেন, ছ্যাঁচড়া চুরিচামারি, খুচরা লুচ্চামি এইসব। তো যাই হোক, হকসেদের বিচারে নানাজনের নানা মত। শেষে সাব্যস্ত হয় হকসেদকে ধোলাই দেওয়া হবে আচ্ছামতো। ঘোড়াঅলা দানেছ মল্লিকের ঘোড়া-চাবকানো চাবুক দিয়ে চাবকানো হবে। গুনে গুনে ২৯ চাবুক। এর মধ্যে হঠাৎ করে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শিয়াল মাতবর তার ভাঙা-ভাঙা হুক্কাহুয়া বাংলায় উঠল, “খোজাটারে এমন মাইর দেওনের কাম, খোজা খাড়া-ই থাকবে, খোজার জান থাকবে না।” শিয়ালের কথা শুনে পাবলিক তো থ, কেউ কেউ হাসতে হাসতে খুন হবার জোগাড়। রাগের চোটে হকসেদের চোখ বড় হতে হতে ফেটে বেরিয়ে আসার উপক্রম। “আরে! ইবলিশটা কয় কী! তাজ্জব-কি-বাত!” গজগজ করতেই থাকে হকসেদ, “শালার শিয়ালটারে তো মানুষ বানাইতে পারলাম না! কীর’ম হাড়ে-হারামজাদা দ্যাখ্ দিনি! বজ্জাতের হাড্ডি কোনহানকার! ওস্তাদের ওপর ওস্তাগরি, না?” পরে অবশ্য একটা মিলমিশ করে দেবার অভিপ্রায়ে শিয়াল মাতবরসহ আরো কিছু মাতবর হকসেদকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ব্যাটা ইল্লৎ, মাফ চা, অকাম করছোস, মাফ চা মুরুব্বির কাছে।” হকসেদ আত্মপক্ষ সমর্থনও করে না, মাফও চায় না। রাগে খালি গরগর করতে থাকে আর কটমট করে তাকায় শিষ্য ইবলিশটার দিকে। অবশ্য যখন দ্যাখে যে, উপায় নাই, সত্যি-সত্যি পড়েছে এবার মাইনকার চিপায়, তখন হরু মির্জার কাছে গিয়ে বলে, “মুরুব্বি, ভুল হইছে, মাফ কইরা দ্যান।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার গোমর ভাব পুরাপুরি অটুট। হরু মির্জা মাফ করে না তো করেই না। অনেক্ষণ হাতজোড় করে সাধ্যসাধনা করে আসামি হকসেদ, অবশেষে বিরক্ত হয়ে একসময় উষ্মামেশানো স্বরে বলে ওঠে, “মাফ দিলে দ্যান, না দিলে তা-ও কন, মাফ কেমনে পাওন লাগে তা ভালো কইরা জানি।” আরে, দ্যাখ্ তো কারবার, মাফও নেবে দেখছি মাস্তানির মাধ্যমে। চোরের মায়ের বড় গলা/ লাফ দিয়া খায় গাছের কলা। এদিকে আবার এরই মধ্যে কিছু লোকজন হরু মির্জার ওপর বিরক্তও হতে শুরু করেছে, বলে, “হরু মির্জার খালি বেশি-বেশি, পোংটা পণ্ডিতটা এত কইরা মাফ চাইতেছে, মাফ কইরা দিলে কী হয়।” পরে অবশ্য অবস্থা বেগতিক দেখে হকসেদকে মাফ করে দেয় হরু। ছাড়া পাবার পর, লোকজনদের হকসেদ কী বলে জানেন? বলে, “দ্যাখ্ তো কিত্তিখান! হামাক লিয়া বানছে গিয়া কলাগাছের সাথোত। কী কমু খালি হাসি আইসলো দেইখা, তা নাইলে এইসব কলাগাছ-মলাগাছ এক্কু ঝাঁকিত উপড়ায়া ফেলায়া কখন যাইতাম গিয়া পলায়া, হামাক আর পায় কেডা! প্রত্যুত্তরে একজন আবার বলে ওঠে, “ও, ওই যে মেনি মাছ না ভ্যাদা মাছ, কি জানি এক মাছ আছে না, জালে আটকা পইড়া নাকি কয়-  ফৌজদারি জাল ছিঁড়তে পারি/লাগে আমার এক তুড়ি//কিন্তু যেই মাথা দেই জালের ফাঁকে/অমনি আমার খালি-খালি হাসি লাগে//।  হকসেদের হইছে-গিয়া হেই দশা।”

হকসেদ খোজাকে এই দেখা যায় মহাস্থানগড়,  তো পরক্ষণেই বগুড়া শহর। তার কায়কারবারই অন্যরকম, মহা-তেলেসমাতি। একদিন পড়ুয়া-র সামনে জাহাঙ্গীরনগরের ‘শান্তি ও সংঘর্ষ’ ডিপার্টমেন্টের চৌকস ছাত্র ফারুক তর্ক করছে বিশ্বরাজনীতির জিওগ্রাফি ও কেমিস্ট্রি নিয়ে, বুশ-ব্লেয়ার-লাদেন-সাদ্দাম-লুলা-চাবেজ-মোরালেস নিয়ে, তার সাথে ফুকো, দেরিদা, লাকাঁ, ডেলুজ, হাইপার মডার্নিটি, ইডিওলজি ম্যানুফ্যাকচারিং, প্রোপাগান্ডা মেশিনারি, সাবঅলটার্ন, জৈন ও সুফিপ্রভাব… আরো কত কী মিশিয়ে-টিশিয়ে বকে চলেছে অনর্গল। পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে হকসেদ, শামীম, অসিত, আরজু …। ফারুকের বাকবিভূতির টানে শামীম, অসিত আর আরজু যেই যাওয়া ধরেছে পড়ুয়ার দিকে, অমনি হকসেদ ঠাস করে বলে ওঠে, “সাবধান! কাছে যাইস না, দ্যাহোস-না কেমন বদহজম হইছে ফারুকের, বমি-উমি ছিট্যা আইসা গায়ে লাগবো কইলাম। এঃ, বেবাক বিদ্যা এক্কেরে খায়া লইছে একসাথ!” তারপর বলে, “ও, কাল তো কী জানি একটা সেমিনার আছে না? ফাটাফাটি বক্তৃতা দিবো ফারুকে… বুর্জোয়া, জঙ্গি, সিভিকো-মিলিটারি-কর্পোরেটারি… সবগুলারে একধারসে খালি ধ্যান-ধ্যানা-ধ্যান কচুকাটা করবো, হের লাইগা দ্যাহোস-না জিব্বায় ক্যাংকা ধার দিচ্চে, আর দ্যাখ্ দ্যাখ্ ভোদাই পাবলিক হা কইরা তা-ই শুনিচ্ছে! আর কইস-না, যত্তোসব পান-জর্দা আভাঁ-গার্দা! ‘বিস্ফোরণ’ কইয়া জোরে আওয়াজ মারলেই কি আর বিস্ফোরণ হয়? বিস্ফোরণ ঘটায়া দেখাইতে হয়।”

আরো আছে। হকসেদ যাচ্ছে বাদুড়তলার মধু মোহন্তের ভুসিমালের দোকানের পাশ দিয়ে। সঙ্গে রাশেদ, ফিরোজ, অশোক, রন্টি। দোকানে কালার টিভি লাগিয়েছে মধু মোহন্ত, তাতে ডিশের কানেকশন। সন্ধ্যার পর দোকানে বসে টিভি দেখছে দত্তবাড়ির শাহীন, পেয়ারা পাকা লেনের স্বপন, বৃন্দাবনপাড়ার রফিক, ঠ্যাঙ্গামারার বাপ্পি… আরো অনেক লোকজন। টিভিতে ডাকসাইটে এক বহুজাতিক কোম্পানির শানদার বিজ্ঞাপন। নতুন এবং ফাটাফাটি। স্বপন, শাহীন, রফিক, বাপ্পি ও আরো কয়েকজন যুবক… বিজ্ঞাপনটার নান্দনিক নানা দিক নিয়ে আলাপ করছে, তারিফও করছে বেশ। তারা বেশ উচ্চকিত, উচ্ছ্বসিত। হকসেদ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। রাশেদ-ফিরোজরাও দাঁড়িয়ে গেল। একটুখানি দেখল বিজ্ঞাপনটা। তারপর যুবকদের উচ্ছ্বাসের ওপর বেমক্কা ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়ে খর্খরে গলায় বলে উঠল হকসেদ, “কেডা জানি কইছিল-না, বিজ্ঞাপন হইল-গিয়া পুঁজির ধর্ষণ। তয় বেশ আর্টিস্টিক কইরা ধর্ষণ করে তো, হের লেইগা ধর্ষণে আমরা বেশ মজাই পাই, ভালোই এনজয় করি! আর খালি মিঠা-মিঠা মিছা কথা! ফলনা মাখলে ফর্সা হয়, দখনা মাখলে লম্বা হয়, থুক্কু, দখনা খাইলে লম্বা হয়! শা-লা! কোটি-কোটি টাকা চুইষা নিয়া বিদেশ পাচার করিচ্ছে নয়া জমানার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিগুলান, আর এইদিকে দ্যাখ্ অ্যাকটিং করলে কয় টাকা দিবো-না-দিবো হের লেইগা, টিভিতে চেহারা একটু দেখাইব-কি-দেখাইবো-না হের লাইগা পোলা-মাইয়া জুয়ান-বুড়া সবতে মিল্যা কীর’ম নাচন-কোঁদন করিচ্ছে বিস্টি-ক্যাদা-প্যাঁকের ভিৎরে, ঝাঁকে-ঝাঁক… এই একবার বিলের ধারোত, আরাকবার লঞ্চের উপরোত, আরে আরে! উল্টাইবো তো লঞ্চটা! ফের দ্যাহো দ্যাহো যায়া উঠছে গাছোত, আবার-ফির হাইরাইজের ছাদোত! কত কিত্তি! আর নেটকি-ভেটকি করিচ্ছে কতর’ম…ওই দ্যাখ্ দ্যাখ্ কোট-টাই-পরা চান্দিছিলাটারে দ্যাখ্, ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার লাহান ক্যাংকা তিড়িংবিড়িং ফাল পারিচ্ছে খালি। বাঃ! বাঃ! ফের দ্যাখ্ দ্যাখ্ দ্যাখ্ ঘাড়গর্দান-এক-হয়া-যাওয়া গণ্ডারটারে দ্যাখ্, না পারে ঘাড় ঘুরাইতে, না পারে মাঞ্জা লড়াইতে, তা-ও দ্যাখ্ নাচিচ্ছে ক্যাংকা! আহ! কী জেল্লা! আর জোশ দ্যাখ্ কত! আর এইহানে বইসা বিজ্ঞাপনের অ্যাসথেটিকস নিয়া এইসব অ্যাজলা পোলাপান, বোঝে-না-সোঝে-না, গ্যাঁজলা তুইলা ফালাইচ্ছে মুখোত।”
(চলবে…)

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।