আয়নামহল – মোশতাক আহমদ

“আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।
তার উপরে সদর কোঠা
আয়নামহল তায়।“

আমার ঘরে কোনো আয়না রাখিনি। কে আগ বাড়িয়ে নিজের মুখোমুখি হতে চায় বলুন! আয়নায় নিজেকে দেখতে পেলেই নিজের কাছে কত জবাবদিহিতা বেড়ে যেত। বিধাতার মতো নির্ভার থাকা যেত না এমন।

বারান্দার খাঁচায় বসে বসে টিয়াপাখিটা কাঁচা মরিচ খেতে খেতে আজ আমাকে দেখতে পেয়ে ‘বটু, বটু!’ না ডেকে ‘লিখুন, লিখুন’ বলে ডাকছে! আমি আগে কখনো ওকে এই শব্দটা উচ্চারণ করতে শুনিনি। ওকে আমি অনেক শব্দ শিখিয়েছি- নিজের নাম, দু-একটা ধমক, কখনো কখনো “চা দাও”; কিন্তু, ‘লিখুন, লিখুন!’ কাভি নেহি।

জিগাতলার রাস্তায় এক হাঁটু পানি। কায়দা করে ফুটপাত ধরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে লোকটা আজও এসেছে। আজকে যেনবা একটু বেশিই ক্লান্ত। এসে আগের জায়গাটাতেই বসে ‘নিরাপদ তন্দ্রা’ বইটা টেনে নিল; ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠা খুলে রাখল। তার তর্জনিটা বুকমার্কারের মতো জড়। বললাম, “আজ আবার কী মনে করে?”

সে তাকাল না; শুধু বলল, “আজকে আবার গল্পটা শুরু করবেন, বটু ভাই? শেষ না, শুরু।”
কি বলতে চায় সে? শুরু মানে! শেষ হয়ে যাওয়া গল্প কি আবার শুরু হয় নাকি? বুজরুকি? খাঁচার দাঁড় থেকে হঠাৎ টিয়া পাখিটা ডেকে উঠল, “শুরু! শুরু!” আমি চমকে তাকালাম; আগে কখনো ওকে এই শব্দটাও বলতে শুনিনি।

এবার লোকটা ঠান্ডা দুটি চোখ তুলে তাকালো, “আপনি লিখতে না চাইলে, আমরা লিখব।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এই ‘আমরা’ মানে কারা?”
সে বলল, “আমরা— মানে আপনি যাদের চরিত্র নামের পুতুল বানিয়ে ইদ্রিস কম্পোজিটরের হাতে বই ছাপার জন্যে ছেড়ে দিয়েছিলেন।”
সেদিন বিকেলে বৈঠকখানার ভিড়টা আরও ঘন হলো। না; কবি- লেখক বন্ধুরা আজকাল আর তেমন কেউ আসে না। রঞ্জু মঞ্জু এসে দাঁড়িয়েছে দরজার পাশে, আবদুল খালেক জানালার গ্রিলে, পিচ্চি অনু টেবিলের নিচে রুবিক কিউব ঘোরাচ্ছে। নতুন একজন এসেছে; চোখে কালো চশমা। সিনেমার পোস্টারের সোহেল রানার স্থিরচিত্রের মতো লাগছে তাকে। জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি?”

সে বলল, “আমি সেই চরিত্র, যাকে আপনি আর লেখেননি।” বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে বলল, “আমি তাদের একজন- যাদের আপনি বাদ দিয়েছেন, যারা আপনার গল্পে ঢুকতে পারেনি।”

আমি হেসে বললাম, “গল্পে সবার জন্য জায়গা হয় না।”
‘সোহেল রানা’ শান্ত গলায় বলল, “জীবনে কাউকে জায়গা না দিতে পারেন, কিন্তু গল্পে দেওয়া যায়। নাহলে পরের জন্মে হতে পারে, যদি সেটা আদৌ থাকে। ইন ফ্যাক্ট, তাই তো আজ আমরা এখানে।” এসিবিহীন ঘরের ভেতর হিম নেমে এলো।
রাতে মোটেও ঘুম হলো না। গা- হাত-পা জ্বালা জ্বালা করছে। ঘুমের মধ্যে যে জাহাজটা আসে, সেই জাহাজটা আবার ভিড়েছে। ‘মাটির জাহাজ’ না, এটার নাম দিয়েছি তন্দ্রাভরা জাহাজ। জাহাজের ডেকে শুধু আমার চরিত্ররা নয়, না-হওয়া চরিত্ররাও এসেছে – যারা জন্ম নেয়ার আগেই মরে গেছে, যাদেরকে লিখাবার পরে আবার কেটে দিয়েছি, যাদের নাম সাকিন কিছু দিতে পারিনি। একটা ছেলে এসে দাঁড়ালো, “আমার নামটা দিয়ে দেন তো আংকেল।” আমি বললাম, “কী নাম চাও বাবা? কেন চাও?” সে বলল, “যে কোনো একটা। নাম থাকলেই তো মানুষ হওয়া যায়।” আমি চুপ করে গেলাম। দূরে আমিনুল, পাশে রানু; কিন্তু আজকে তাদের মুখে আর নিজেদের কথিত অসম্পূর্ণ চরিত্রের জন্যে কোনো অভিযোগ নেই।

হঠাৎ জাহাজের ভেঁপু বাজল। কেউ বলল, “নামার সময় হয়েছে।” চারদিকে তাকিয়ে দেখি — ঘাট নেই, পানি নেই, শুধু থকথকে কালো কাদা। কিছু ময়লাটে শেওলা রঙের শ্বাসমূল নীলিমার দিকে নাক উঁচিয়ে ‘অক্সিজেন, অক্সিজেন’ বলে বোবা চিৎকার ক’রে বাঁচতে চাইছে। সোহেল রানার সাদাকালো স্থিরচিত্রটি এগিয়ে এসে বলল, “এই কাদাগুলো আপনার অসমাপ্ত গল্প।” এ কথা শোনার পরেই, বিশ্বাস করবেন না— আমার পা দুটো ধীরে ধীরে তাতে ডুবে যেতে লাগলো। আমি চিৎকার করলাম, “কেউ আছ? টেনে তোলো আমাকে!” কিন্তু কেউ এলো না। রাজধানী শহরের পথিকদের মতো- বিপদাপন্ন মানুষ দেখেও সবাই ঊর্ধমুখ হেঁটে চলে যাচ্ছে। শুধু রানু, হেঁয়ালি করে হলেও কিছু একটা বলল, “আপনি তো সেবারে আমাকেও টেনে তোলেননি। অন্তত হিরনকে টেনে তোলা উচিৎ ছিল আপনার। সবই তো জানতেন। যত সব ক- এর কাসুন্দি!”

আমার মাথার ভেতরে হলুদ রঙের তারার মতো ‘ব-র-ক-ধ -ঝ’ ঘুরে বেড়াতে লাগলো। কামরানের কাছ থেকে ধার নেওয়া ‘উইপোকার জীবনযাপন’ বইটা সামনে ধরে মুখ লুকাতে মন চাইলো। কোথা থেকে কোবেদ আলী হন্তদন্ত হয়ে এলো, “ দ্যাখছেন নাকি কাণ্ডখান! সাহেবে ম্যানহোলে পইরা গ্যাছে গা! হাতটা ধরেন সাব, হেঁইয়ো!”

 


ভোরে ঘুম ভাঙল, শরীর ঘামে ভেজা। খাঁচার টিয়া পাখিটা ঝিমুচ্ছে। টেবিলে একটা কাগজে লেখা- “এবারে গল্প শুরু হয়েছে।” হাতের লেখা অনেকটা আমার মতোই, কিন্তু পুরোপুরি না। আমার খাতায় কে লিখতে আরম্ভ করলো!

দুপুরে লোকটা আবার এলো, এবারে সে আর ল্যাংচাচ্ছে না। আমি তাকিয়ে বললাম, “পা ভালো?” সে হাসল, “আপনিই তো লেখাটা ঠিক করে দিয়েছেন।” বই খুলে দেখাল, ৭৩ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা—“লোকটা এখন আর ল্যাংচায় না।” ব-র-ক-ধ-ঝ, ব-র ক-ধ-ঝ! বিষম চিন্তা।

সন্ধ্যায় আমাদের বায়তুল মোকাররমের দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে— আপনারা জানেন তো, আমাদের একটা সোনার দোকান আছে- তো সেখানে দাঁড়িয়ে আমি লিখি। খস খস করে লিখলাম, “জাহাজটা এবার থামবে।” তারপর লাল কালিতে কেটে দিলাম। আবার লিখলাম, “জাহাজটা থামে না।”

কোথা থেকে যেন সেই মরণ মাঝি গামছায় ভাত আর মাছের সালুন বেঁধে নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে, “মাইয়ার বিয়া। গয়না বানাইতে আইছি। আইজকা নাওয়ে বেরাইবেন না সাব?” ওকে জাহাজের সব বৃত্তান্ত বললাম। সব শুনে বলল, “এইবার ঠিকমতো লেকছেন।” গয়না- টয়না দেখে সদরঘাটে চলে গেল।
“ভয় ঘোচে না আমার দিবা-রজনী
কার সঙ্গে কোন দেশে যাব না রে জানি”
রাতে আবার জাহাজে। এবার জানি, এটা কোথাও যাচ্ছে না, একই জায়গায় ঘুরছে। তেলের খরচ বাঁচায়। রাতেও লৌহজং, মাঝ রাতেও লৌহজং, সুবহে সাদেকেও…। চরিত্রগুলোও কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নামতে চায় না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “নামছো না কেন?” রানু বলল, “আপনি তো নামেননি।” আমিনুল হেসে বলল, “আপনি কি আসলে লেখক, না যাত্রী? একটু আগে আপনার চেহারার আরেকজন যাত্রীকে দেখেছি।”
আমার মনে হচ্ছিল, আমি নাবিক। ওদের কথাও ফেলে দেওয়ার মতো মনে হলো না। লোকে বলে, আমি নাকি দ্রষ্টা টাইপের লেখক। ওদেরকে কি উত্তর দেবো এখন?
ভোরে টিয়া পাখিটা ডেকে উঠল, “লিখুন!” আমি যন্ত্রার্পিত হয়ে টেবিলে বসলাম। বাইরে সোয়ারি ঘাট না, এটা জিগাতলা বাজার— মানুষ হাঁটে, যে যার মতো চা খায়। বাখরখানি খায়। মহল্লার পুরনো বাসিন্দা হয়েও এখন আর কাউকে চিনি না, সবার খোমা পালটে গেছে, বুলি পালটে গেছে, আর বয়স…।
আমি লিখতে শুরু করলাম। জাহাজ চলছে, তন্দ্রা আছে — আট কুঠুরি ভর্তি তন্দ্রা; কিন্তু আমি জেগে আছি।

 


টিয়া পাখিটা চুপচাপ বসে আছে, চোখ বন্ধ; যেন সেও এক নিরাপদ তন্দ্রায় ডুবে আছে। আমি ওকে এক মুঠো সবুজ রঙের মরিচ খেতে দিতে গিয়ে দেখি— খাঁচার দরজা খোলা। কখন খুলেছি মনে পড়ে না। পাখিটা সুযোগ পেলেও উড়ে যায় না। বাসার একজন হয়ে গেছে তাহলে। যাবেই বা কোথায়?

আজ লোকটা একটু দেরিতে এলো, তবে একা না। তার পেছনে আরও দুজন – একজন বৃদ্ধ, চোখে ক্লান্তির গভীর ছাপ, আরেকজন সেই কিশোর, যে একটা নাম চেয়েছিল। আমি টেবিলে বসলাম। একটা ফুলস্কেপ কাগজ টানলাম। কাগজে কুয়াশা। কলম ধরতেই হাত কেঁপে উঠল। লিখলাম, “তার নাম —” তারপর আর কিছু মাথায় আসে না। কিশোরটা মরীয়া হয়ে তাকিয়ে আছে, যেন নাম না পেলে সে মুছে যাবে, একদম ডিলিট হয়ে রিসাইকেল বিনের পথ ধরবে। মনে হলো, ওকে একটা নাম দিয়ে বাঁচিয়ে দিই। আমি লিখলাম, “তার নাম চিক্কো।” ছেলেটা হাসল- নিঃশব্দ চেশায়ার ক্যাটের হাসি; তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল, হাসিটা সহ। হয়তো কোনো একটা বইয়ে ঢুকে বসেছে। এই বয়সেই এমন অমরতার লোভ!

বৃদ্ধ লোকটা বলল, “আমাকে কেন ফেলে দিলেন?” আমি তাকে চিনতে পারলাম না। সে বলল, “আমি সেই বাবা, যে ছেলেকে খুঁজতে শহরে এসেছিল। আপনি আমাকে শুরু করেছিলেন, শেষ করেননি। ছেলেকে তো নাম দিয়ে নিজের ক’রে নিয়ে গেলেন। আমাকে অন্তত ভাগ্যকুলের গ্রামের বাড়িতে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।” আমি বললাম, “আজকাল কিছু মনে থাকে না। আমার মনে নেই…” সে বলল, “তাই তো। আমাদেরকে আপনার মনে থাকার দরকার কি! নিজের নাম ফুটলেই তো চলে আপনার।” আমি এই বিটকেলে বুড়োর হাত থেকে বাঁচার জন্যে হাঁসফাঁস করতে থাকি। ল্যাংচানো লোকটা কোথায় গেল? সেও ভোজবাজী হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।
“দেখলাম এ সংসার ভোজবাজি প্রকার
দেখতে দেখতে অমনি কেবা কোথা যায়।“

সেদিন রাতে জাহাজটা থামল। চারপাশে ঘন কুয়াশার সাদা কাগজ। আমি ধীরে পাটাতন থেকে নামলাম। পায়ের নিচে এবার কাদা না; শক্ত লাগলো, সব বরফ হয়ে গেছে- কালো রঙের বরফ। দূরে একটা শহর;- চেনা, আবার অচেনা। আমিনুল পাশে এসে দাঁড়াল, “এবার নামলেন তাহলে, স্যার?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। নামছি এবার।”
রানু ধীরে বলল, “আমাদের কী হবে?”
আমি বললাম, “তোমাকে আমি দু’বার করে লিখতে পারবো না। তোমাকে মাটির জাহাজ বানিয়ে দিলে আর নদীতে ভাসতে পারবে না। দূর্গার মতো ডুবে যাবে। নিজের জগতে চলে যাও।“

হঠাৎ কুয়াশা কেটে গেল। দেখি, জিগাতলা বাজারের মোড়। রাস্তার পানি নেমে গেছে। হলুদ বাড়িটা চোখের সামনে। জানালার ধারে বসে একজন কি যেন লিখছে। সামনে একটা খালি স্কচের বোতল। গ্লাসের তলানিতে সোনালি একটা পানীয়। আমি চমকে উঠলাম- “ওই লোকটা কে?” আমিনুল বলল, “ওটা আপনি।” আমি বললাম, “আমি তো এখানে তোমার সামনে দাঁড়ানো! আর লোকটা তো টেবিলে বসে লিখছে।” সে বলল, “আপনি এখানে আছেন— আর ওখানেও থাকেন।”

 


জাহাজ-ফেরতের জানা আছে, ঘরে কোনো লাইফ সাইজ আয়না নেই। কাজেই নিজের একটা বড় প্রতিবিম্ব অপ্রাসঙ্গিক।
টেবিলের লেখক বটু বলল, “অবশেষে নামলেন?”
জাহাজ-ফেরত বটু হাসল, “আপনি তো গেলেন না।”
“প্রমোদ ভ্রমণে সময় নষ্ট করে কী লাভ? আমার কাজ এখানেই।”
“কাজ, না স্রেফ অভ্যাস?”
টেবিলের বটু চুপ করে রইল। কলমের ক্যাপ লাগিয়ে টেবিলে ঠুকে দেয়, “আপনি পালিয়েছেন।”
“লেখক মাত্রই কমবেশি পলায়নবাদী। কেউ লিখে লিখে পালায়, আবার কেউ লিখতে হবে বলে পালায়।”
টিয়া পাখি এসে একবার একজনের দিকে, একবার আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “লিখুন!”
টেবিলের বটু হাসে, “দেখলেন? ও আমার পক্ষেই।”
দাঁড়ানো বটু বলল, “না, ও মুক্তির পক্ষে।”
পাখিটা আবার ডাকে, “মুক্তি, মুক্তি! উড়ুন, উড়ুন!”
বটু ভাই বললেন (কোনজন যে আসল বটু ভাই, আপনারা বুঝে গেছেন আশা করি), “আমি ক্লান্ত। আর লেখার কিছু নেই। স্মৃতিগুলো সব লেখা হয়ে গেছে। এখন আস্তে আস্তে স্মৃতির ভেতরে ঢুকে বসে থাকব।“
ঘরের কোণে সাক্ষাৎকার নিতে আসা তরুণেরা ভিড় করেছে। কেউ নোটবুক, কেউ রেকর্ডার হাতে। হঠাৎ ক্লিকের শব্দ।
টেবিলের বটু তাকায়, “কে রেকর্ড করছে?” কেউ উত্তর দেয় না। আবার শব্দ। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, “বন্ধ করেন! খুব খারাপ, খুব খারাপ! আমি তো কত কথাই বলি। এসব আলটপকা কথা কখনো ছাপানোর জন্যে বলি না। প্রথম উপন্যাসটাই হারিয়ে গেছে। আর ভারী তো এইসব ছোলা মুড়ি মাখানো আড্ডা! ছো!”
জাহাজ-ফেরত বটু বলল, “ওদের থাকতে দিন। এরা সাক্ষী।”
“কিসের?”
“ওই যে, কে লিখতে ভয় পায় আর কে ভয় পায় না- সেটা চাক্ষুষ করার…।”
টেবিলের বটু হেসে উঠল, “ভয়? কিন্তু কেন?”
“আপনি চরিত্রগুলোকে মেরে ফেলেছেন। ভ্রূণেই।“
“বাঁচাতে পারিনি।”
“চেষ্টা করেননি। আপনি নিষ্ঠুর।”
“আপনি বুঝি খুব দরদী!”
নীরবতা।
“যে করে এই লীলে, তারে চিনলাম না
আমি আমি বলি, আমি কোন্ জনা
মরি কী আজব কারখানা… “

টিয়া পাখি এসে বটুর টেবিলে ঠোকর দিল, “লিখুন!” তারপর উড়ে গিয়ে দাঁড়ানো বটুর কাঁধে, “চলুন!” দুজনেই তাকিয়ে রইল। পাখিটা কার?
সাক্ষাৎকার গ্রহণ প্রত্যাশীরা এখন কেউ আর নোট নেয়ার চেষ্টা করছে না: কিছুটা ভয় পেয়ে, কিছুটা বিব্রত হয়ে, কিছুটা ‘এসব কথার কোনো কাটতি বা টিআরপি হবে না, কেননা বিশ্বাস করার কিছু নাই’ – এইসব আকাশকুসুম চয়নে।
বটু শেষে আরেকবার টেবিলে বসে খাতাটা টেনে নিলো। টেবিলটা দখলে রাখার ছল আর কি। ঘরে একটাই চেয়ার, একটাই টেবিল। জাহাজ- ফেরত বটু দরোজার দিকে হাঁটল।
“যাচ্ছেন?”
“জ্বি, ভাইজান।”
“আবার কবে আসবেন?”
“আপনি ডাকলে, যদি কোথাও বেধে যান…।”
মহল্লার অচেনা ভিড়ে মিশে গেল সে।

 


ভোরে ঘুম ভাঙতে স্পষ্ট বুঝতে পারলো, স্বপ্নগুলো মাথাটাকে অতিরিক্ত পাঁচ কেজি ভারি করে দিয়ে গেছে। টেবিলের সাদা কাগজের কুয়াশা সরে গেছে। অক্ষরগুলো পরিষ্কার পড়া যায়। সে লিখে গেছে, “আজ আমি জাহাজ থেকে নেমেছি। মুক্তিপণ চুকিয়ে বন্দিরা ঘরে ফিরে এলে ওদের যেরকম লাগে, আমারও তেমন ফুরফুরে লাগছে। টিয়া পাখিটা খোলা দরজা দিয়ে উড়ে গেল। আমি তাকে আটকানোর চেষ্টা করি না। বিচ্ছেদের সময় না হয়ে থাকলে, ফিরে আসবে একদিন।“

দুপুরে কেউ এলো না। না লোকটা, না আমিনুল। রানু হয়তো অভিমান করেই আসেনি আর। ঘরটা ফাঁকা। নিজের শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে, প্রতিধ্বনি হচ্ছে। বটুর ছায়া ফিরে এলো নাকি? নাহ। উদ্ভট। অতিপ্রাকৃত গল্প লিখতে তো বসিনি।
আমি লিখলাম, “সব গল্প শেষ করতে হয় না। তাহলে খাঁচায় ঢুকে যায়। কিছু গল্পকে ছেড়ে দিতে হয়, তবেই সেগুলো বেঁচে থাকে, আকাশে বাতাসে।”
বাইরে মানুষ হাঁটে। চা সিগারেট খায়। বনরুটি আর কলা খায়। সবাই অচেনা। এ পাড়ার গুন্ডা বদমাসগুলো পর্যন্ত আমার বই থেকে উঠে আসেনি। বরাবরের মতো কাউকে চিনি না, কিন্তু আজ থেকে নিজেকে যেন একটু একটু চিনতে পারছি। জাহাজটা দূরে সরে যাচ্ছে। তন্দ্রা আছে। তবু না ঘুমানোর পণ করেছি। নিজেকে আরেকটু সময় দেবো বলে ঘুমের ওপর এ আমার জন্মের প্রতিশোধ। না ঘুমিয়ে পাখিটার কথাও ভাবা যায়। সে অবশ্যই আসবে। খাঁচা কখনো শূন্যতা পছন্দ করে না। দরকার হলে অন্য বটু এসে খাঁচায় থাকবে, দরকার হলে বাধ্য কোনো গল্প এসে খাঁচায় থাকবে। যখন যাবার, সবাই মিলে একসাথেই চলে যাবে।
“মন তুই রইলি খাঁচার আশে
খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশে।
কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে
ফকির লালন কেঁদে কয়।“

 

মোশতাক আহমদ

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৬৮।
কবি ও কথক। পেশাগত জীবনে একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। পড়াশোনা করেছেন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ, ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ, চট্ট

গ্রাম মেডিকেল কলেজ ও জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। অভিজ্ঞতায় ধারণ করেছেন আশি- নব্বই দশকের সন্ধিক্ষণের সাহিত্য – সাংস্কৃতিক – রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো।
কবি আবুল হাসানের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। এছাড়াও এই উপন্যাসের নেপথ্য কাহিনি লিখেছেন ‘আবুল হাসান ও ঝিনুকের সন্ধানে’ বইতে। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বীগণ’ আশির দশকের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক পটভূমিতে লেখা। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইপত্র – কবিতার বই: ‘সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট’, ‘মেঘপুরাণ’, ‘ভেবেছিলাম চড়ুইভাতি’, ‘বুকপকেটে পাথরকুচি’, ডুবোজাহাজের ডানা’। অনুবাদ কবিতার বই ‘যাই ভেসে দূর দেশে’, স্মৃতিপাঠের বই ‘অক্ষরবন্দি জীবন’, ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গল্প: পাবলিক হেলথের প্রথম পাঠ’, বিচিত্র গদ্যের বই ‘নারসিসাসের আরশি’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top