বিসর্গ তান-৩


নাহার মনিকা


দেখতে দেখতে মেইন রাস্তা ছেড়ে গলির ভেতর শ্যামলীর দোতলা বাড়িও নাগালের মধ্যে চলে আসে, আর ফুপু বোধহয় ফুস্কুরির মত আতংক চেপে না রাখতে পেরে বলে ফেলে–  ‘অয়ন কি বাসায় আছে, নাকি বের হইয়া গেছে’!-ফুপু পেটের ছেলেকে এই হারে ভয় পায়! সাড়ে সাতে নিধিও পেত (অংকুরোদ্গম থেকে অয়ন তাহলে এখন মহীরুহ!)।

দু’বার হর্ণ বাজে, কেউ গেট খোলে না, অগত্যা নিধিরা নেমে যায়। লোহার গেটের খোপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরের তালা খোলে ফুপু। গলিটা আগের চেয়ে সরু, পেছনে দুটো গাড়ি হর্ণ দিচ্ছে, কিছু রিক্সাও পাশ কাটানোর অপেক্ষায়। গাড়িটা গলির ভেতরে না ঢোকালেও হতো কিন্ত ব্যাগট্যাগ কেমন করে আনতো ওরা!

আট বছর আগের বাড়িটা অনেক না হলেও বদলেছে অবশ্যই। বাড়ির বাইরে, রাস্তার ডানে-বায়ে, ঈশানে-নৈঋতে, উর্ধ-অধঃতে বদলেছে কতকিছু! আরও পালটে গেছে ভেতরের প্রাণ, মৃতপ্রায়, নিশ্চল, জেলে নৌকার পাটাটনে ধৃত মাছের মত।

–‘অয়ন ডেভেলপারকে দিয়ে দিতে চায় কিন্তু এইটারে নিয়া ভ্যাজাল তো শেষ হয় না’।

জালাল ফুপার মত ক্লিন শেভড লোকও দুই শরীকের সই সাবুদ ছাড়া জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে ফেলে! অথচ তাকে দেখে মনে হতো প্রমাদমুক্ত জীবন! আর এখন সমস্যার স্তুপে বসে তা সামলাচ্ছে ফুপু। নিধি যাওয়ার বছরই তো মামলা শুরু হলো, দেওয়ানী মামলা ফুপুর চোখের চারপাশে কাকের ঠ্যাংএর ছাপগুলি স্পষ্ট করে তুলছে।

নিধির দিকে চেয়ে ফ্যাকাশে হাসে ফুপু-‘সকাল নয়টা মানে অয়নের দাদির এখনো ভোর’। বাইরে গলি আটকে রাখা ভাড়া করা গাড়ি ছেড়ে দিতে তৎপর হয় তারা।

এ বাড়ির দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা আচমকা বানানো, কিছু একটা লুকিয়ে রাখার  এবড়ো থেবড়ো ভাব। সিমেণ্টের ওপরে ক্ষয়ে যাওয়া ছাই রং- ফুপু ব্যাগ টেনে ওঠায় আর বলে–‘এর সঙ্গে আমাদের দিক নিশানা ছাড়া জীবনের সঙ্গে মিল আছে’। বিশেষ করে সিঁড়ি যেখানে ছাদে গিয়ে মিশেছে, বিশেষত তারে ভেজা কাপড় মেলতে দেয়ার কালে তার কাঁধের চৌকোনা ঘিরে কারণ অকারণ বিষন্নতা ভর করে যখন, তখন এসব কথা বেশী করে মনে হয়।

স্যুটকেস দু’টো নিধিই টেনে ওঠায়। দোতলা শেষ হয়ে ছাদে ওঠার সিঁড়ির মুখে উপচে পরা জিনিসে ঠাসা তেছরা নিচু সিঁড়িঘর। ফুপু মাজা টেনে দাঁড়িয়ে পড়ে, নিধি যখন এখানে থাকতো তখনকার মতই আছে এই সিঁড়িঘরে জিনিসপত্র ডাই হবার কাহিনী। নিধি চোরা চাউনি দিয়ে সিঁড়িঘরটা দেখে, একদিন সে ভালোমত হাঁটকাবে এই ষ্টোররুম।

ফুপু ঢোক গিলে ফেললেও কিছু কিছু কথা ফুলকো লুচি ফেটে যাওয়া ভাপের বেগে ছিটকে বেরিয়ে আসে। -‘অয়ন এ বাড়ির বড় ঘরটায় থাকে আজকে তিন বৎসর। তোর ফুপা মারা যাওয়ার পরে বেশীদিন ধৈর্য্য ধরলো না। তুইও দেশে নাই। আর কে থাকলো কাছে!’ ফুপু একা কেমন করে ডাম্বলভাজা, বাইসেপ ফোলানো অয়নকে সামলায়! শাশুড়ি’কে নিয়ে, বাড়িটাকে নিয়ে, তার ওপর অয়নকে নিয়ে নিজের বিষাদগ্রস্থ, অনুভূতিহীন সময়গুলির কথা ভাইঝিকে বলতে তার জিভ সরীসৃপের আদলে সরসর করে এখনি বেরিয়ে পড়তে চায়।

অয়ন মাকে হটিয়ে বাপের ঘরে গাড্ডা করছে, ততদিনে শাশুড়িকেও নিজের কাছে আনতে হয়েছে ফুপুর, চিকিৎসা ইত্যাদি ঢাকা শহরে ভালো। এরপর নিজের স্থান অয়নের ঘরে। আর শাশুড়ি ডাইনিং স্পেসে স্থানান্তরিত (বিতাড়িত না), অয়নের ছোট ঘর শাশুড়ির পোষায় না, হাতের কাছে খাবার টেবিল, হাত বাড়ালে বাথরুম বেসিন থাকলে সুবিধা হয়। ফুপুর শাশুড়ি মোটা মানুষ, বড়সড় বিছানা দরকার হয়, ডাইনিং টেবিল সুতরাং জানলার ধার ঘেষে। অয়নের দাদি আলো সহ্য করতে পারে না- বিশেষত সকাল বেলায়, খাবার ঘরে তাই গাঢ় খয়েরী পর্দ্দা। বয়স আর অসুখ বোধহয় রোদকে মানুষের শত্রু বানিয়ে তোলে, চলতি ট্রেনের থেকে ফেলে আসা ষ্টেশনের মত, কারখানার মিলিয়ে যাওয়া সাইরেনের মত কেবলই দূরের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।  রোদস্পৃহাবিমুখ শাশুড়ি ডাইনিং স্পেসে ক্রমশ অন্ধকার চায়, দিনের বেলাও লাইট জ্বালিয়ে রাখে (অয়নের রক্তে তার দাদির জিন দৌড় পাড়ে!) । ফুপুর অসহ্য লাগলে সে চুপ করে ছাদে গিয়ে বসে থাকতে পারে, কিন্তু নিধি কিভাবে নেবে এইসব?

নিধি স্যুটকেস তোলে, আর অভয় দেয়–‘ এত চিন্তা করতেছো  কেন? আমি কি আসমান থেইকা আসছি নাকি?’ আর গরম? নিধির এক কথা, বলেওছে ফোনে –‘যাইতেছিই তো গরমের হলকা খাওয়ার জন্য, পাঁচ সাতটা বচ্ছর বিদেশে থাকলে আমি চৈত-বৈশাখ ভুইলা যাবো’!

দুবলা পাতলা, ফ্যাকাশে দেহকান্ড নিয়ে তরতর ক’রে ব্যাগ বাক্স তুলে আনা দেখে অবাক মানে ফুপু। নিধি’র স্বাস্থ্য আর ভালো হলো না। সে কি এখনো খেতে ভালোবাসে না– এখনো কি? আগে না খাওয়ার কত শত অজুহাত বের করতো!– বকবক করেই যাচ্ছে ফুপু।

নিজের পেটের ওপরটা আলতো হাতায় নিধি, তার ক্ষিধে পেয়েছে। এই মুহূর্তে, দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে এখন কেউ যদি জানতে চায় কেন যে দেশে ফিরলো, নির্দ্বিধায় সে লিখে জানিয়ে দেবে যে খেতে এসেছে, ভাত, ফল পাকুড়, মাছ, শুটকি, ভর্তা, তেলেভাজা, রাস্তার পাশের খাস্তা খাবার দাবার, দানাদার, ছানাপুলি যাবতীয় সবকিছু শুধু মাদী হাঁসের মত পেটপুরে খেতে এসেছে। তার মা যেমন গিয়েছিল বাপের বাড়ি তার সেরকম নাইওর যেতে ইচ্ছে করছিল, তাই।

– ‘নিধি  তুই ফুপুর ওপরে হয়তো মনে মনে বিরক্ত হইতেছিস, এতদিন পরে আরেকটু আয়োজন করতে পারতাম না? (আরো লোকজন, স্বাগত জানানোয় আরো উচ্ছাস?)’ – এই জাতীয় কথা বলে দিয়ে ফুপু প্রমাণ করতে চায় যে একটা চিড় ধরা অস্বস্তি তার ভেজা জামদানী শুকিয়ে তুলছে।

ড্রইং রুমের মেঝেতে নিধি আর তার স্যুটকেস জড়াজড়ি করে ধপাস শব্দে বসে পড়লে জানালা দরজার পর্দ্দাগুলি আন্দোলিত হয়, আর সে ফাঁকে কিছু আলো প্রায়ান্ধকার ডাইনিং স্পেসের দিকে ইঁদুর দৌড় দেয়। ফুপুর শাশুড়ির ঘন কাশির খুচরো শব্দ গুটগুট করে এদিকে চলে আসতে চায়। মেঝেতে নিধির পাশে বসে হঠাৎ তার গলা জড়িয়ে ধরে ফুপু কাঁদতে শুরু করে।

ফুপু নিজের ভাইয়ের কথা বিনা দ্বিধায় বলে (নিধির মা’র প্রসঙ্গ এত অনায়াসে আসে না তো!)। বাবার চেহারায় দাদির ধাঁচ, ফুপুকে তার বোন বলে অবিলম্বে সবাই শনাক্ত করে। কতবার নিধি স্বপ্নে দেখেছে বাবাকে! এতদিন পরে কেমন দেখতে হয়েছে (এতদিনে একটা ফটোও দেখেনি সে)! শাদা কালো চুলের নিচে কান ঘেষে পাওয়ারের চশমার ডাঁট, দাদুর মত ঘন ঘন কাঁচ মোছা স্বভাব পেয়েছে বাবা! (ফুপু তাকে আগের মত ডেকে বাপ-বেটির মিলন চেষ্টা চালাবে কি!) ফুপুর সঙ্গে কেঁদে উঠলে নিধিরও এ বাড়ির দেয়াল ফুঁড়ে বেড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু কোথায় সে বুঝতে পারে না। একটা গলা খাকারীর শব্দে দু’জনই চমকে ওঠে। মেঝেতে একজোড়া পা, গোড়ালীর ওপরে পাজামা!

অয়ন বাড়িতে ছিল! নিজের ঘরে ছিল! ঘরটাতো রাস্তার ঠিক মাথার ওপরে। এতটা সময় ধরে তাদের ফেরার শব্দ, সিড়ি বেয়ে ওঠা নামার শব্দ ওর কানে যায়নি!  ফ্লাইট ডিটেইলস তো ওর ই-মেইল এ পাঠিয়েছিলো! মা’কে একা একা এয়ারপোর্টে পাঠানোর মত ধৃষ্টতা বোধহয় এই ছেলেটিই দেখাতে পারে! নিধি ছটফটিয়ে ওঠে যেন উড়তে না শেখা পাখি– বলতে চায়, ‘এত অন্ধকার কেন ফুপু? এত দূর থেইকা আসলাম রোদ্র দেখার জন্য, তোমরা দেখি বৃষ্টি-বাদলা দিয়া বাড়িঘর একদম কবরখানা বানায়া রাখছো’।

– ‘ঢাকা শহরকে এখন  কবরখানাই বলা যায়’, অয়নের ভরাট গলা তার বুকখোলা কুর্তার বোতাম বেয়ে মেঝের দিকে নেমে আসে, এর স্বাস্থ্য বরাবর ভালোর দিকে।

খিস্তি খেউর-গালি গালাজের সঙ্গে বেশভূষার সম্পর্ক কম এটা নিধি আগে জানতো না,  এতদিন পরে, নিধির সামনে জিন্স টি-শার্ট গায়ে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ির ফাঁক দিয়ে অয়ন যদি-‘ট্রাফিক জ্যাম, এই খানকীর পোলাদের কথা আর বইলো না’ বলে ফেলে, অস্বস্তি আর বিরক্ত হওয়া ছাড়া কি করার থাকে!–‘দেশটারে পোন্দায়া এরা কোলন ক্যান্সার বানায়া ফালাইছে’। কার উদ্দেশ্যে গালি গালাজ বোঝা যায় না, ও ধরে নিয়েছে সবাই তার ক্ষোভের খোঁজ রাখে! আগে নিধি ভাবতো যে অয়নের মুখ খারাপ বুঝি গোপনে শুধু তার জন্যই তোলা থাকে, এখন মনে হচ্ছে সেগুলো যুদ্ধবাজ সৈন্যদলের নৈপুণ্যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেরিয়ে আসছে।

অয়নের মুখের দিকে তাঁকিয়ে আরো এক ঝটকায় যেটা মনে হয়– কাউকে বন্ধু ভাবার ক্ষমতা এই ছেলেটা হারিয়ে ফেলেছে। দূরে থেকে ওর প্রতি যে বিবমিষা ঘূর্ণিপাকের মত বড় হচ্ছিল, তা এক ফু’য়ে নিভিয়ে নিধিও দেখতে চায়- কি হয়েছে আসলে (শিশুকাল থেকে না চাইতেই সব পেয়ে যাওয়া) অয়নের?
-এখন যা তো বাবা, নিধি ফ্রেশ হয়ে নিক’ – ফুপু ঠেলা দিলেও অয়ন নড়ে না।
অথচ মনে হচ্ছিল সে এ বাড়িতে নেই, থাকেই না। এত বছর পরে নিধির ফেরার দিনেও!

(চলবে)

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *