পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

পাতারপাহাড় রক্তবর্ণ হীম 

বিউটিআপাদের ওই বাংলোর যে কোনো জায়গায় দাঁড়ালে বিস্তর সবুজের দেখা পাওয়া যায়। সেসব সবুজ বর্ণনা করার সাধ্য আমার নাই। যেদিকে তাকাই উঁচা উঁচা পাতারপাহাড়।  সেইসব পাহাড় বড় আয়েশ করে নীল আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে! জোর হাওয়া বইলে পাহাড়েরা সামান্য দোল খেয়ে মৃদু হাসিতে আকাশকে অভিবাদন জানায়। আবার শিশুভোরের রোদ্দুর খেলে গেলে পাহাড়ের পাতায় পাতায় কোমল ও ফিকে সবুজ হেসে ওঠে। যেন সদ্য কেউ দক্ষ হাতে জলে তুলি ডুবিয়ে কিছুটা রঙ মেখে নিখুঁত কোনো ছবি এঁকে দিয়েছে। রোদ্দুর যখন দুপুরের দিকে গড়ায়—গাঢ় সবুজে নেয়ে ওঠে চারপাশ। যেন হঠাৎ করে ঘন ছায়ারা দীর্ঘ চুল খুলে এলিয়ে দিয়েছে। আর বিকেলের দিকে এন্তার সোনারঙের ছড়াছড়ি। কারা যেন ধামা কে ধামা পাকাধানের রাশি বৃক্ষদের মাথায়  মাথায় ঢেলে দিয়ে চলে গেছে। আমি অবাক বিস্ময়ে পাতারপাহাড়ের রঙ বদল দেখি।কিন্তু তীব্র কাশির তোড়ে আমার সমস্ত শরীর ভেঙে পড়তে চায়। আমার এরকম অবস্থা দেখে চাচিমা ভাড়ার দিয়ে  অতি ভোরেই ঝিরি থেকে জল তুলিয়ে আনে। সেই জল রোদের বুকে ফেলে রাখে। গামলার জল উষ্ণ হয়ে উঠলে আমাকে গোসল সেরে নিতে হয়। চাচিমা তার বড়সড় শরীর নিয়ে আমার গোসলের তদারকী করে। ঝিরির জল ভয়ানক ঠাণ্ডা বলে  চাচিমা এই ব্যবস্থা করেছে। আমি যেন কিছুতেই শীতল জলে গোসল না করি। কিন্তু হররোজ গোসল করতেই হবে। চাচিমা বলে–

প্রত্যেক দিন গোসল না করলে বুকে কফ বইস্যা যাবো।

না, আমার বুকে কফ বসে না। কাশি দিলেই শাদাটে পাতলা নোনতা তরল বেরিয়ে আসে।

আমার হয়তো রাতে সামান্য জ্বরও আসে। কিন্তু আমি পাত্তা দেই না। বিউটিআপার সাথে অনুরোধের আসরের গান শুনি রেডিও চালিয়ে।

আমার এত শরীর খারাপেও বৈকালিক ভ্রমণের ইতি ঘটে না। আমরা দুজন রোজ টিলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাই। হাঁটতে হাঁটতে হাওয়ায় গণ্ডার বা ভাল্লুকের গন্ধ পাই। তখন পড়িমরি করে দৌড়ে চলে আসি বাংলোতে। রাবার গাছের সারির ভিতর ইচ্ছে করে হারিয়ে যেতে যেতে ফিরে আসি। বিউটিআপার সাথে থেকে আমিও খানিকটা ফিচকে হয়ে উঠেছি। বিউটিআপা বৃদ্ধাঙ্গুলি চুষতে চুষতে আড় নয়নে দুই-একজন যুবককে দেখে। আমিও দেখি। তারা রাজাকাক্কার সাথে কাজ করে। কিন্তু তারা কখনো আমাদের দিকে তাকায় না। হাঁটতে হাঁটতে মুখোমুখি হলে বিউটিআপাকে সালাম দিয়ে অন্যপথে সরে যায়। আর বিউটিআপারও সেইরকমই ব্যক্তিত্ব, সে কারো সঙ্গে কথাই বলেনা। বিউটিআপার আব্বা রাজাকাক্কা এখানকার সিসিএফ। সব চাইতে বড় অফিসার, ফলে বিউটি আপা ভারিক্কি চালেই চলে।

দুই-একজন যুবককে দেখে বিউটিআপা মুখে ওড়না চাপা দিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে হাসে। কেন সে হাসে আমি ঠিক বুঝতে পারি না। একদিন হাঁটতে হাঁটতে এক অধোমুখী যুবাকে দেখিয়ে বলল—

পাপড়ি দেখস, তেলের পিঠা।

বলেই মুখে ওড়না চাপা দিয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে হাসে। আমি ধরতে পারিনা ‘তেলের পিঠার’ মানে কি?

হাসি থামিয়ে বলে—

দেখস মাথায় কী পরিমাণ তেল দিসে! এদের মনে হয় বাড়িতে তেলের ঘানি আছে।

আমি তাকিয়ে দেখি যুবকের চুল জবজব তেলে চকচক করছে। তখন আমিও হাসি। বিউটিআপা ধমক দিয়ে বলে–

এ্যাই শব্দ করে হাসবা না। মানুষ খারাপ বলবে।

আমি বুহু কষ্টে নিঃশব্দে হাসতে থাকি।

এক বিকেলে বিউটিআপা হাঁটতে হাঁটতে বলে–

পাপড়ি, পাখির বাসা!

আমি আগের মতোই বোকা চোখে তাকাই। ভাবি, কোনো গাছে হয়তো পাখি বাসা বেঁধেছে! কিন্তু ফের আমি আরও বোকা বনে যাই।

আমাদের অদূরে এক যুবা মাথা নিচু করে কী যেন করছে। তার উসকোখুসকো কোঁকড়ানো চুল। আমি বুঝতে পারি, আচ্ছা ইনিই তাহলে পাখির বাসা।

আমি বেশ ধন্দে পড়ি। আচ্ছা বিউটি আপা কী চায়? কেউ বেশি করে চুলে তেল দিলে বলে—

তেলের পিঠা!

আবার তেল একদম না দিলে বলে–

পাখির বাসা!

ওই দুই যুবক এই নামেই আমার আর বিউটিআপার কাছে ডাকাডাকি হয়।

অফিসের কাজে এই দুইজনকে প্রায়ই রাজাকাক্কার ড্রয়িং রুমে বসে থাকতে দেখি। আমি হয়তো ঘুরতে ঘুরতে তাদের কাউকে দেখলেই দৌড়ে বিউটিআপাকে বলি–

তেলের পিঠা আসছে।

নয়তো বলি–

পাখির বাসা আসছে।

শুনে বিউটিআপার গৌর মুখের কোনো রেখাই পরিবর্তিত হয় না। সে তার দীঘল চুলে বিনুনি বাঁধা শেষ করে মৃদু লয়ে রেডিও বাজিয়ে দেয়। রেডিওর নব ঘুরিয়ে এত স্লো করে দেয় যে কিছুই আর আমি শুনতে পাইনা। তখন রেডিওর দুইদিকে দুইজন কান লাগিয়ে আমরা গান শুনতে থাকি।

‘তেলের পিঠা’, ‘পাখির বাসা’, ‘রেডিওর গান’, ‘খালি পেটে কাঁচা ছানা’, রোদ্দুর খাওয়ানো ঝিরির জল কোনোকিছুই আমার কাশি কমাতে পারে না। চাচিমা তখন সরিষার তেলে রসুন থেতো করে ফেলে চুলার আগুনে ফুটিয়ে আনে। এনে বিউটি আপাকে বলে–

এত্ত ঠাণ্ডা লাগছে ছেমড়িডার। বিউটি এই ত্যালডা ওর বুকে মালিশ কইরা দিও।

শুনে আমি সংকুচিত বোধ করি।যদিও আমি এখনও ওড়না পরি না, কিন্তু ছোট্ট কুঁড়ির মতো স্তনজোড়া আমাকে বিব্রত করে। আমি সবার সামনে আগের মতো আর হুটহাট জামাকাপড় খুলে ফেলি না। কোথায় যেন বাঁধো বাঁধো লাগে!

বিউটিআপা অত্যন্ত বুদ্ধিমান। অত্যন্ত ভদ্র আর সজ্জনও বটে! সেও আমাকে জামা খুলতে বলে না। বরং জামার গলার ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে দেয়। তার হাতে গরম তেল-রসুনের গন্ধ!

আমার সদ্য উঠন্ত গোলাপকুঁড়ি স্তনের ধারেকাছেও যায় না সেই হাত। গভীর মমতায় ধীরে ধীরে কুঁড়িস্তনের মাঝখানের সরু ঝিরিতে বিউটিআপা তেল মালিশ করে দেয়। বহুদিনের তীব্র কাশিতে আমার অবসন্ন হয়ে পড়া শরীর তাতে কিছুটা আরাম পায়। বিউটিআপার হাতের মখমল আমাকে বহুদিন পরে নিদ্রার রাজ্যে পাঠিয়ে দেয়।

চাচিমা গরম রসুন-তেল, রোদ খাওয়া ঝিরির জলের সাথে তুলসিপাতার রসও যুক্ত করে দিলো। তুলসিপাতার রসের সাথে খাঁটি মধুর ওষুধ দিবারাত্রি আমার গলায় সস্নেহে ঢেলে দেয় বিউটিআপা। কিন্তু কাশির গমক তাতে একফোঁটাও কমে না।

কাশতে কাশতে আমি বেঁকেচুরে যেতে থাকি। কিছু খেতেও আর ভালো লাগে না। কিন্তু চাচিমার চেষ্টার কোনো কমতি নাই। পাহাড়ি পাকা পেঁপে আর কলা সকালের নাস্তার টেবিল আলোকিত করে বসে থাকে। কিন্তু আমার একদম খেতে ইচ্ছে করে না।

এই অবস্থায় একদিন সকালের ট্রেনে আব্বা চলে আসে। এবার আমাকে ফিরে যেতে হবে। ফেলে যেতে হবে পাতারপাহাড়ের একান্ত রাজ্যপাট। এই নিবীড় সবুজ বনভূমি। ফেলে যেতে হবে বানরের দঙ্গল আর অচেনা পাখিদের কুজন। ঝিরির বয়ে চলা সুর আর অজস্র শীত। আমি ফেলে যাব শিশিরের শব্দ আর চাচিমার মায়া। বিউটিআপার সংগে গড়ে ওঠা অমলিন হৃদ্ধতা।  আমাকে এইবার ফিরতে হবে আমার অতিচেনা কারাগারে। যেখানে শাসনের ডাণ্ডাবেরি আমার পায়ে ঝনঝন করে নিয়ত বেজে চলে!

বাসায় ফিরে  ফ্লানেনের চেক এজমালি মাফলারটা ছোটকাকে দিয়ে দিতে হয়। মাফলারের বদলে আমি গায়ে একটা মোটা কাঁথা চাপিয়ে দেই। কিন্তু শীতের ছোবল থেকে কিছুতেই উদ্ধার পাই না। শীত আমার হাড়ের ভেতর মারাত্মক বিষ ঢেলে চলে! পাতারপাহাড় ছেড়ে আসার দুঃখ ভুলতে একদিন সকালে  আমাদের ফুল বাগানে ঢুকে পড়ি। আম্মার কলমের গোলাপ গাছে ঝেঁপে গোলাপি ফুল ফুটেছে। কী তাদের সৌরভ আর সুরত! আহা! মরি মরি! আমি যেন হঠাৎ জঙ্গলের ঘ্রাণ পাই। বিউটিআপা বলেছিল, যে এই ঘ্রাণ একবার চেনে, সে আজীবন তা বয়ে বেড়ায়।

শীতের শিশিরের হীমজল আমার পা ভিজিয়ে দিলে কাশির প্রকোপে ফের আমি বেঁকেচুরে যেতে থাকি। সেই আগের মতোই উষ্ণ নোনতা তরলে আমার মুখ ভরে যায়। বাগানের সবুজ ঘাসে সেই তরল থু করে ফেলতেই ভয়ে আপাদমস্তক কেঁপে উঠে! রক্তবর্ণ তরল! আমি ভাবি, ধুর আমার দেখার ভুল। ফের কাশি ফেললে দেখি— টুকটুকে তাজা ঘন তরল সবুজ ঘাস বেয়ে মাটির শরীরে মিশে যাচ্ছে!

কী করব, কাকে বলব আমি? ভয়ে আরেকবার কাশি দিতেও ভুলে যাই। বাসায় যাকে সবচাইতে নির্ভর করা যায়, যার রাগ-ক্রোধ-মায়ামমতা-অত্যাচার,গর্জন সবচাইতে বেশি– আমি তার কাছেই ছুটে যাই। কারণ আমি জানি, সেই আমার একমাত্র দরদী!  আমার একমাত্র নিদান।

আব্বাকে বলি–

আব্বা, আমার কাশির সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে।

অ্যাঁ ,কী বল? কই দেখি?

বাগানের ঘাসের উপর।

আব্বা যেন উড়ে আসে। আমি আব্বার পাখসাট শুনতে পাই।

আব্বা এসে দেখে, সবুজ ঘাসের উপর টুকটুকে একথোক লালরক্ত রঙিন ফড়িঙয়ের মতো ডানা মেলে বসে আছে…! (চলবে)

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।