খালেদ হামিদীর মুক্তগদ্য: প্রকৃত কবিতা কি আসলেই দুর্বোধ্য কিংবা ছন্দহীন হতে পারে?

কবিতায় দুর্বোধ্যতা আসলে কি? তা কি সৃষ্টি হয় জনজীবনে অপ্রচলিত শব্দ কিংবা উপমা-উৎপ্রেক্ষা-মেটাফর জাতীয় অলংকার কাব্যে ব্যবহারের ফলে? নাকি অন্য কোনো কারণে? গেলো শতকের সত্তরের দশকের একজন অগ্রজ কবি ও অনুবাদকের কাছ থেকে, আমার আবির্ভাবকাল আশির দশকের মাঝামাঝি কোনো একদিন, সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কবিতা সংগ্রহ ধার নেয়ার সময় শুনতে হয়: ‘এ কাব্য দুর্বোধ্য, দেখো, কতোটা পড়তে পারো!’ সুধীন্দ্রনাথ-ব্যবহৃত অনেক তৎসম শব্দের অর্থ উদ্ঘাটনের উদ্যোগ তখন আমি গ্রহণ না করলেও প্রথম পাঠেই তাঁর অনেক কবিতা গেঁথে যায় আমার সত্তায়। শব্দার্থগত অগম্যতা সত্ত্বেও সুধীন্দ্রীয় স্থাপত্যপ্রতিম নির্মাণ ভেদ ক’রে তাঁর কবিতার সুধা গড়িয়ে এসে ভিজিয়ে দেয় আমার সমগ্র অন্তর। কিন্তু আমার ভাই বা বোন এই কবিতা সংগ্রহের রসাস্বাদনে অপারগ থেকে যায়। এভাবে পাঠকসাধারণের কাছে সুধীন্দ্রনাথের কাব্য দুর্বোধ্য কেবল নয়, অগম্য ও অবোধ্যই ঠেকে সবসময়। কেবল অ-সামান্য (ইংরেজি আনকমন অর্থে) শব্দরাশিই কি এ-ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক? কবিতার সঙ্গে দীর্ঘকালের নিয়মিত সখ্য নেই এমন পাঠকের জন্যে এই শব্দ ও কাব্যালংকারই একমাত্র বাধা নয়। মূলত কাব্যরসের সঙ্গে অপরিচিতিই এবং পাঠকের নিজের মধ্যে এর অভাবই কথিত দুর্বোধ্যতা-অবোধ্যতার প্রকৃত হেতু। নইলে সুধীন্দ্রনাথের ‘আমি বিংশ শতাব্দীর সমান বয়সী/বঙ্গোপসাগরে মজ্জমান’ কিংবা ‘মৃত্যু কেবল মৃত্যুই ধ্রুব সখা/যাতনা শুধুই যাতনা সুচির সাথী’-এর মতো অজরামর পঙ্ক্তিরাশির আবেগ ও তাৎপর্য অনুধাবন থেকে কিভাবে বিরত থাকেন পাঠকসাধারণ? তিরিশের এই প্রাজ্ঞ কবির উটপাখি কবিতাটি যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি, তা কাব্যরসশূন্য পাঠকদের বোঝায় কে? যদিও, ‘ফাটা ডিমে আর তা দিয়ে কি ফল পাবে/মনস্তাপেও লাগবে না তাতে জোড়া (উটপাখি)’-এই উচ্চারণে বিধৃত মর্মবেদনা ব্যাখ্যার অতীত এবং রীতিমতো সংক্রামক। তবে একই কবিতার আরো সংবেদী পঙ্ক্তিগুচ্ছ, যেমন, ‘তার চেয়ে চলো বিরোধী স্বার্থ সাধি/তুমি নিয়ে চলো আমাকে লোকত্তরে/তোমাকে বন্ধু আমি লোকায়তে বাঁধি (দ্রষ্টব্য : স্মৃতি থেকে উৎকলিত ব’লে উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিগুলোয় যতিচিহ্ন ব্যবহারের সুযোগ থাকেনি।)’, প্রেক্ষাপট ও পরিপ্রেক্ষিতসহ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। কিন্তু তারপরও তা ন্যূনতম শিক্ষা ও রুচির অধিকারী পাঠকের গভীর আবেগকে উজ্জীবিত না ক’রে পারে না ব’লে আমার বিশ্বাস। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত থেকে তিরিশের কবিদের কেউই রেহাই পাননি। তবে তা আমাদের আলোচ্যমান কবির সত্তায়ই সবচেয়ে বেশি এসে লাগে ব’লে পাঠ-অনুভবে টের পাওয়া যায়। এ জন্যেই তাঁর কবিতা আর দুর্বোধ্য বা অবোধ্য থাকে না মোটেও। তাঁর কঠিন বেদনা আশ্চর্য সংবেদন হয়ে সহজ আবেগে, কবিতার নির্মিতির কঠোরতা থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসে। তাই সুধীন্দ্রনাথের স্রষ্টা ও নির্মাতা সত্তা দুটি শেষ অব্দি আর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় না। এভাবেই প্রাগুক্ত দুর্বোধ্যতার অভিযোগ-অনুযোগও আর টেকে না।

অন্য আর কি কারণে কবিতার বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ গুঞ্জরিত হয়? কবিতা থেকে পাঠকের উপর্যুক্ত দূরত্বই অগম্যতার অভিযোগের একমাত্র উৎস নয়। কতিপয় পদ্যকারও পাঠকের এই সংযোগহীনতার জন্যে কম দায়ী নন। তৎসম-তদ্ভব শব্দ ব্যবহারের যুগ শেষ হয় কম করে হলেও অর্ধ শতাব্দী আগে। তাহলে সমস্যা কোথায়? সঙ্কট কবিতায় সারফেস মিনিং না মেলা কিংবা তা ব্যাহত হওয়াকে কেন্দ্র করেই তৈরি হতে দেখা যায় কখনো কখনো। আবেগ ও চিন্তার ভাষাশ্রয়ী উপস্থাপনায় ভাষা চিন্তানুগ না হলে এমনটি হয়। ভাষায় রচয়িতার পর্যাপ্ত অধিকার অর্জিত না হওয়া অব্দি এই দুর্যোগ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব নয়। জীবনানন্দ দাশ অনেক জটিল ও মহৎ চিন্তাকেও কবিতায় চারিয়ে দেন ভাষাকে আবেগে তরঙ্গিত, স্বচ্ছ এবং নিজস্ব এক বিশেষ সুরময়তায় সঞ্জীবিত রেখে। তাই তাঁর কবিতা পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। তার মানে আবার এই নয় যে রূপসী বাংলার মতো দাশবাবুর সব কাব্যেরই আপাত সরল পাঠ সম্ভব। এদিকে বনলতা সেন-এর প্রকৃত তাৎপর্য সাধারণ পাঠকদের ক’জনইবা অনুধাবনে সক্ষম। কিন্তু এর আবৃত্তি শুনে মুগ্ধ হন তাঁদের সকলেই। ভাষা যখন ভাব প্রকাশের অনুকূল বাহন না হয়ে চিন্তাভারাক্রান্ত হয় এবং সেই চিন্তাও থাকে অস্বচ্ছ কিংবা জটিল, তখন বর্জনীয় দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি হয়। এই পর্যায়ে কেউ কেউ ভুল বাক্যও লিখে ফেলেন উল্লিখিত মর্বিডিটি থেকে বেরুতে না পেরে।

আর, কবিতায় ছন্দহীনতা? সকল বড় কবিই ছন্দে লেখেন। বিশেষত অন্ত্যমিলযুক্ত ধ্বনিপ্রধান কবিতা লিখে ঢের পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু তাঁরা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর মতো কেবল ছান্দসিকরূপে সক্রিয় না থেকে কবি হিসেবে নিজেদের মহত্ত্ব অক্ষুণ্ণ রাখেন। তাছাড়া বাঙালি শ্লোগানও দেয় ছন্দে, সমিল পদযোগে। আমাদের গ্রামীণ জীবনে প্রচলিত-আদৃত প্রবাদগুলিরও বেশির ভাগই সমিল। জনমানসের নিকটবর্তী হতে চাইলে ছন্দ অনিবার্য, এ কথা এখনো বলা যায়। অবশ্য ধনতন্ত্রের বিপরীতে পুঁজিবাদ-উত্তর জীবনব্যবস্থা বা গণমুখী চেতনার প্রতি উন্মুখ হতে না পারলে পূর্বসূরীদের প্রাগুক্ত উত্তরাধিকার বহনের তেমন কোনো তাৎপর্য আর থাকে না। চলমান আত্মরতির কবিতাচর্চায় তা কিছু শ্রুতিমাধুর্য যোগ করতে পারে মাত্র। তবে, বলা বাহুল্য, ছন্দ সবসময় সমিল হতে হয় না। তাছাড়া মুক্ত ছন্দ ও টানা গদ্যে লেখা সার্থক কবিতায়ও এক গভীর ছন্দ কিংবা সাঙ্গীতিকতা থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আবদুল মান্নান সৈয়দের এই কবিতাটি : জ্যোৎস্না কী? না। জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতন চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ডু, জোড়া জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের এক মুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার এবং এক গুচ্ছ ভুল শেয়ালের সদ্যমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার। (জ্যোৎস্না কী; জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ) এই কবিতা পাঠে কবি ও কবিতার শুদ্ধতার প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে যায় বুঝিবা এমনকি ভবিতব্য সম্পর্কিত স্মৃতিময়তায়। অতীত থেকে ভাবিকাল অবধি প্লাবিত হয় যেন জোছনার গলমান কাফনে। সত্তার অতলে জমে ওঠে নৈঃসঙ্গের জল। চন্দ্রহীন রাত শুধু নয়, দিনেও মনে হয় আমি বিশাল বিরান প্রান্তরে জ্যোৎস্নায় কেবলই আর্দ্র হয়ে চলেছি অদৃশ্য অথচ বাঙময় আতঙ্কের উৎসরাজির মধ্যখানে।

আরেকটা কথা, বের্টোল্ট ব্রেশট্ কিংবা সমর সেনের কবিতা ছন্দহীন, নিরেট গদ্যগন্ধী। তাই বলে তাঁদের পদ্যগুলো কি কবিতা নয়? অবশ্যই কবিতা, যে-ঘরানার কাব্য এখনো উন্মোচিত করতে পারে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

০১-০২ সেপ্টেম্বর ২০১৪

 

খালেদ হামিদী

জন্ম: ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৩। জন্মস্থান: বাদামতলী, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম। শিক্ষা: ব্যবস্থাপনায় স্নাতক (সম্মান): ১৯৮৫; স্নাতকোত্তর: ১৯৮৬; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা: প্রকাশনা বিভাগের প্রধান, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কাব্য (০৭টি): আমি অন্তঃসত্ত্বা হবো (ডিসেম্বর ১৯৯৯; একান্তর); হে সোনার এশীয় (ফেব্রুয়ারি ২০০৪; অনন্তর); মুখপরম্পরা (ফেব্রুয়ারি ২০০৭; লিটল ম্যাগাজিন); ধান থেকে শিশু হয় (ফেব্রুয়ারি ২০১০; বাঙলায়ন); স্লামমডগ, মিলিয়নার নই (ফেব্রুয়ারি২০১৩; প্রকৃতি); তুমি কি রোহিঙ্গা মাছি (ফেব্রুয়ারি ২০১৮; খড়িমাটি) এবং
ঘুমোই চশমা চোখে (জানুয়ারি ২০১৯; ঋতবাক; কলকাতা; ভারত)।
গল্প (০১টি): আকব্জিআঙুল নদীকূল (ফেব্রুয়ারি ২০১২; প্রকৃতি)
উপন্যাস (০১টি): সব্যসাচী (ফেব্রুয়ারি ২০১৭; বেহুলাবাংলা)
প্রবন্ধ (০৩টি): কবির সন্ধানে কবিতার খোঁজে (ফেব্রুয়ারি ২০০৭; অনন্তর); না কবিতা, হাঁ কবিতা (ফেব্রুয়ারি২০১৬; খড়িমাটি এবং চেনা কবিতার ভিন্ন পাঠ (ফেব্রুয়ারি ২০১৯; খড়িমাটি)।
অনুবাদ (০১টি): ওঅল্ট হুইটম্যানের কবিতা (ফেব্রুয়ারি ২০১৬; খড়িমাটি)
পুরস্কার: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মহান একুশে স্মারক সম্মাননা পদক ২০১৯ ও  শালুক বিশেষ সম্মাননা পদক ২০১৯।

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।