পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

পাঁচিলের ফোকর গলে—১২

অগ্রগামী ইশকুল থেকে কোনো ছাত্রীরই ক্লাস-চলাকালীন অবস্থায় বের হওয়ার সুযোগ একদম ছিল না। এমনকি টিফিন-পিরিয়ডেও না! গেটের বুড়ো-দারোয়ানটা ছিল হাড়বজ্জাত। ফুকলওয়ালা, তুক্তুকিওয়ালা, আঁচারওয়ালা, তেঁতুলওয়ালারা বসতো ছোট-গেটের বাইরে। আইস্ক্রীমওয়ালা, চানাচুরওয়ালাকেও বড়-গেটের বাইরেই থাকতে হতো। কিন্তু বড়-গেটের ওইটুকুন ফাঁক দিয়ে আমরা হাত গলিয়ে চানাচুর আর আইস্ক্রীম দিব্যি কিনে আনতে পারতাম। ফুকল [মাখনা] খেতে হলে গেটের বাইরে যাওয়া অবধারিত ছিল। বা তেঁতুল নুন-ঝালে খাওয়ার জন্য বাইরে  গিয়ে কিনতে হতো। কিন্তু দারোয়ানটা ছিল বজ্জাতের বজ্জাত। একেবারে পুলিশের চাইতেও বড় পুলিশ। টিফিনের বেল বাজলেই ছোট-লোহার গেটের সামনে একহাতে ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। অতি-কৃশ-হাত আর কাঁচাপাকা দাঁড়িতে ঢেকে থাকা অবয়ব তার বয়স ও শারীরিক শক্তিকে জানান দিত ভালোভাবেই। কিন্তু সে ওসবের তোয়াক্কা করত বলে মনে হতোনা। আমি ভদ্রভাবে রিকোয়েস্ট করলেও সে চেঁচিয়ে উঠত! এত জোরে চিৎকার দিত যে, ভয়ে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। ওই দারোয়ানের চিৎকার ছিল একেবারে নেকড়ে-বাঘের মতো। তার চিবুকও ছিল নেকড়েদের মতোই সুচারু— যা তার দাঁড়ির জঙ্গল ভেদ করেও স্পষ্ট  আভাস দিত।  আর সে চিৎকারও করত উপরের দিকে মুখ তুলে—

খইলাম গেইট খুলা যাইতয় নায়— এত খরি খই, তাও কিতা তুমার কানত যায় নানি?

দারোয়ানের বিকট মুখ-ঝামটা দেখে আমি ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কিন্তু একটা ফুকল না খেলে দিন চলে কীভাবে? ফুকল খেয়ে দাঁত-ঠোঁট শাদা রঙে মাখামাখি করে না রাখলে টিফিন-পিরিয়ড একেবারেই অর্থহীন। কিংবা চালতা বা বড়ইয়ের আচার?

কিন্তু দারোয়ান-পাহাড়কে টলানো যেত না কিছুতেই। ইশকুলের সামনের বিশাল গেটের পাশে একটা ছোট-গেট— এই দুটোই ইশকুলের এন্ট্রি আর এক্সিট। আর অন্য কোনো পথ ছিল না আমাদের ঢোকার বা বেরুবার। অবশ্য আমাদের প্রয়োজনও পড়ত না বেরুবার।

আমাদের মল্লিকাবনে তখন প্রথম-কুঁড়ি ফুটবার-কাল! আমরা ছেলেছোকরাদের আড়নয়নে দেখছিটেখছি, কিন্তু ভালো লাগছে না কাউকেই। আমার আবার মরার স্বভাব— যে-ই পিছু নেয় তাকেই আমার গুণ্ডাষণ্ডা মনে হয়। আম্মাও বলে গুণ্ডা লাগবে কিন্তু, দেখেশুনে চলো। ভদ্রঘরের ছেলেরা কারুর পিছু নিয়ে বাসা পর্যন্ত আসতে পারে, তখন পর্যন্ত আমার মনভূমে তা নাই বা ছিলনা। যারা আসত সকলকেই আমি গুণ্ডাই ভাবতাম!

কিন্তু আমার একজন বন্ধুর তখন প্রণয়ের পারিজাত সদ্য প্রস্ফুটিত হয়েছে।

[আমাদের বয়স তখন এত কম যে, সেসবকে প্রণয় না বলে সর্বনাশা নিয়তির ভুলভাল খেলা বলা যায়]

কিন্তু বন্ধু আমাকে তা নিজে থেকে বলে নাই। আমি তার একটা খাতার আলগা-মলাট খুলে আচানক দেখে ফেলেছিলাম। ক্যালেণ্ডারের পাতা কেটে মুড়ে দেয়া খাতার মলাটের বাইরেও কিছু অতিরিক্ত পাতা [গোপন রাখার লক্ষ্যে] ভেতরে  থাকাতে আমার সন্দেহ ঘনীভূত হয়। দুরন্ত আমি তা দেখার জন্য মরীয়া হয়ে উঠলে সে কাড়াকাড়ি শুরু করে। ফলত আমাকে সেই খাতা নিয়ে মাঠ বরাবর দৌড়াতে হয়। ওই বাড়তি পাতার রহস্য ভেদ করা হলে খাতাটা বন্ধুকে ফেরতও দিয়ে দিই আমি। আমার কাছে যা অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয় মনে হতে থাকে— তা হলো আমার বন্ধুটিকে কেউ একজন অন্য নামে ডাকে। আর যে ডাকে তার নামও সেই নামের কাছাকাছি। যেমন ধর যাক, যদি লোকটার নাম হয় চাঁদ, তাহলে সে আমার বন্ধুটিকে ডাকে চাঁদনী নামে। যদি তার নাম হয় নয়ন, সে ডাকে নয়না বলে। যদি অপু হয়, তাহলে সে ডাকে অপি বলে। তার নাম ‘লাভ’ হলে সে আমার বন্ধুকে ডাকে ‘লাভলি’ বলে।

বলা বাহুল্য আমি এই গোপন জেনে যাই। কিন্তু ক্লাসের কাউকেই তা বলিনা। [এখন ভেবে অবাক লাগে— ওই ছোট বয়স থেকেই আমি অন্যের গোপনকথা কেন বা কীভাবে যেন গোপন রাখতে শিখে গিয়েছিলাম। এখনও তাই। কিন্তু এই ব্যক্তিত্ব আমার ওই বয়সেই কীভাবে অর্জিত হয়েছিল আমি ঠিক জানিনা!]

এখন চাঁদ আর চাঁদনীকে নিয়ে আমার উৎসাহের অন্ত নাই। চাঁদনীকে আমার সেই  অদেখা চাঁদ লিখেছে—

‘আমি জানি তুমি এবার বার্ষিক পরীক্ষায় ঠিকই প্রথম হবে!’

এইখানে সন্দেহজনক কোনো শব্দই কিছুই নাই। কিন্তু সমস্ত গোমড় ফাঁক করে দেয় দুইটা নাম—

চাঁদ আর চাঁদনী!

বাহ! এমন ওয়েল-উইশার আমার বন্ধুর আছে! এদিকে আমার কিন্তু পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ার জন্য কোনোই চিন্তা-ভাবনা কখনোই নাই। ধুস! কে অত জবোজবো করে দিনরাত পড়ে? আমার স্টাইলেই আমি চলতে চাই— পরীক্ষার আগে দুই-তিন দিন পড়ো, পড়ে যা রেজাল্ট হয় তাতেই খুশি থাকা। সিলেবাসের এত পড়া পড়লে বড়দের নভেল পড়ার টাইম কীভাবে ম্যানেজ করা যাবে?

এখন চাঁদনী আমার কাছে ধরা খেয়ে লজ্জায় তার শ্যামল-সুন্দর-শ্রী বেগুনী বরন করে ফেলতে লাগল। আমি তাকে অভয় দিয়ে বলি—

শরম পাইতেছিস ক্যান? একদিন দেখা করিয়ে দিস।

চাঁদনী একদিন বলে—

চল, আজ দেখবি।

কিন্তু সে বললেই তো আর হয় না? আমরা ইশকুলের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তো আর যেতে পারব না। যদি টিফিন-আওয়ারে যেতে চাই, সেটাও সম্ভব নয়। আমাদের নেকড়ে-দারোয়ান তার পানগুয়া-খাওয়া দাঁত বের করে, আকাশের দিকে মুখ উঁচিয়ে এমন চিৎকার শুরু করবে, যেন পৃথিবীতে পূর্ণিমা নেমেছে! আর আমার দিকে মুখ ঝামটা মেরে বলতে শুরু করবে—

কিতা, তুমি কিতা কানত কম হুনোয় নি? এত খরি খই বাইরে যায়তায় না, যায়তায় না, তুমার কানত যায় নানি?

আমরা হঠাৎ দিশা পেয়ে যাই। আমাদের পুকুরের পেছন দিকের দেয়ালে একটা ফোকর দেখেছি, কয়েকটা ইট কে যেন ভেঙে নিয়ে গিয়েছে— ওই ফোকর গলে একমানুষ দিব্যি যাতায়াত করতে পারে। আমি আর চাঁদনী টিফিন-আওয়ারে গিয়েই ফিরে আসব। তবে সাক্ষাতের স্থান যেন ইশকুলের আশেপাশেই হয়। তাহলে আমরা টিফিন-আওয়ারেই চলে আসতে পারব।

দিন কয়েক বাদেই এসে যায় সেই মহা-ভয়ের ও বুক-ঢিপ-ঢিপ করা আনন্দের ক্ষণ। আমি আর চাঁদনী বইখাতাসহ ব্যাগ ক্লাসে রেখে পাঁচিলের ফোকর গলে ইশকুল থেকে বের হয়ে যাই। আহা! কী শান্তি! কী মুক্ত হাওয়া! এই পৃথিবীতে স্বাধীনতার স্বাদের চাইতে মূল্যবান আর কী আছে?

আমার চাঁদনীর [ইচ্ছে করেই নাম গোপন করে গেলাম। আমি কাউকে ছোট বা আহত বা বিব্রত করতে চাইনা। শুধু লিখে রাখছি আমাদের এক যাপিত জীবনের গল্প। কারণ, আজি হতে শত বর্ষ পরে, কে তুমি পড়িছ বসি আমার এই স্মৃতিকথা, কৌতুহল ভরে?— শুধু এই আশায় বুক বেঁধে] চাঁদ রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়ে ছিল। চাঁদের সংগে আরেকটা লোক। [সে কী লোক না যুবক তা তখন বোধগম্য হয় নাই, তবে কিশোর সে নয় কিছুতেই]। আমরা চারজন হেঁটে কাছেই একটা বাসায় গিয়ে ঢুকে পড়ি। আমার আর চাঁদনীর ভয় সমান্তরাল, কেউ দেখে ফেললে দুজনকেই সিরিয়াস পানিশমেন্ট পেতে হবে।

চাঁদ লাজুক মুখ করে একটা সোফায় বসে থাকে। আর আমি অই লোকটার নাম  জেনে ফেলি— রানা!  শ্যামলা রঙের রানা দেখতে বেশ নাদুসনুদুস । [আমি মনে মনে তাকে ‘ছোট হাতি’ বলে হাসতে থাকি। অত্যন্ত দুষ্টু ছিলাম আমি, যে কাউকে তৎক্ষণাৎ একটা নাম দিয়ে দিতাম!]  আমরা যে বাসায় গিয়েছি সেটা রানাদেরই বাসা। নানা পদের নাস্তা আসে ট্রে উপচিয়ে। রানার ভাবী এসেও এক ফাঁকে দেখা করে যায় আমাদের সাথে। আমি আর চাঁদনী খাব কী? ভয়ে আমাদের হাত-পা কাঁপছে! ইশকুলে ফিরতে হবে। ফিরে ক্লাস এ্যাটেণ্ড করতে হবে।

আমরা ভয় আর লজ্জায় প্রায় কিছুই খাই না। চাঁদ বেচারাও এতই লাজুক আর ভদ্র যে আমাদের দিকে তাকায় না পর্যন্ত! এমনকী চাঁদনীর দিকেও না।

আমরা তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়ি। রানা নিচু স্বরে আমাকে বলে—

বাসায় ফোন থাকলে নাম্বারটা দিয়ে যাবেন, প্লিজ ।

আমি যেন শুনতেই পাইনা। যেন রানা আমাকে কিচ্ছু বলে নাই। রানা কথা বলছে— এই বয়ে যাওয়া দূরন্ত বাতাসের সাথে!

আমি আর চাঁদনী ভোঁ দৌড় দেই। দৌড়াতে দৌডাতে  কাঁচা রাস্তার ধূলি ওড়াতে থাকি।  আমি একবার থেমে পেছনে তাকাই—

রানাকে দেখা যায় না!

ধুলি-পর্দার ওপাশে রানা হয়তো তখনো স্থির দাঁড়িয়ে আছে!

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।