কবিতায় ও যাপনে মৃত্যু: খালেদ হামিদী

উইলিয়াম শেক্সপীয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের তৃতীয় অঙ্কের প্রথম দৃশ্যের ৬০তম লাইনে বলা হয়: ‘To die:—to sleep:/No more; and, by a sleep to say we end/The heart-ache and the thousand natural shocks That flesh is heir to, ’tis a consummation/Devoutly to be wished. মরে যাওয়া মানে শেষবারের মতো নিদ্রাচ্ছন্ন হওয়া, নিঃশেষিত হওয়া। এবং, ঘুমের মাধ্যমে আমরা হৃদয়ের তীব্রতম আকাঙ্ক্ষা আর হাজার প্রাকৃতিক আঘাতের সমাপ্তি ঘোষণা করি, যে আর্তি ও যন্ত্রণার মাংসল দেহ রাজসম্পদ অধিকারের জন্যে নিবেদিত চিত্তে চুক্তিবদ্ধ হতে ইচ্ছুক হওয়ার কথা।’ (ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাবানুবাদ) শামসুর রাহমানের একটি কবিতায় ঘুম মৃত্যুর ছোট বোন ব’লে আখ্যায়িত হয়। কিন্তু কোনো জীবিত মানুষের পক্ষেই মরণাভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব নয়। কেবল ব্যক্তিক যাপনে মৃত্যুজনিত ও কবিতা তথা সাহিত্যে মৃত্যুকেন্দ্রিক নানান চিন্তা ও অনুভূতি অনূদিত হয়ে চলে।

ব্যক্তিক সূচনা

মানুষের চিত্তে শৈশব থেকে শুরু করে যৌবন বা বড়জোর প্রৌঢ়ত্ব অব্দি মৃত্যুচিন্তা বা মৃত্যুভয় সচরাচর সক্রিয় হয়ে ওঠে না। এই সময়কালে খুব নিকটের কারো মৃত্যু দেখলে কারো মানসপটে কি পরিবর্তন ঘটে তা যদিও অনুমেয়। যেমন, আমার একচল্লিশ বছর বয়সে আমি বাবাকে হারাই। জানাজা শেষে আমার ও একমাত্র সহোদরেরও কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সেকেন্ডের মধ্যে, দুই ভগ্নিপতি ও যুগল পড়শি যখন খাটিয়া তাঁদের কাঁধে তুলে নেন, তখন জগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের অনিত্যতার বিষয়টি সমগ্র সত্তা যোগে প্রথম অনুভব করি। বেদনা ও ভীতির সেই মিশ্র অনুভূতির অনুবাদ অসম্ভব। সেই প্রথম আমি এতিম হই, বিধবা মায়ের পাশে অর্ধ অনাথ। কিন্তু এই বিয়োগবোধ বুঝিবা প্রচণ্ডতররূপে অনুভূত হয়, ভিন্নতর মাত্রায়, ২০১১ সালের অক্টোবরে, সৌদি আরবে আট বাংলাদেশী শ্রমিকের শিরচ্ছেদের ঘটনায়। ওই মাসের ১০ থেকে ১৬ তারিখের মধ্যে আমি একটি গল্পও লিখে ফেলি, ২১ অক্টোবরে যা ‘দৈনিক ডেসটিনি’তে প্রকাশিত হয় ‘শিরচ্ছেদ’ শিরোনামে। আমার মৃত্যুবোধ অনুবাদের প্রচেষ্টায় এই তথ্যের অবতারণাই সার নয়। ২০১২ সালে প্রকাশিত আমারই প্রথম ও এখনো পর্যন্ত একমাত্র গল্পগ্রন্থ ‘আকব্জিআঙুল নদীকূল’-এ অন্তর্ভুক্ত এ-গল্পের শেষ প্রায় দুই অনুচ্ছেদও এখানে উল্লেখ্য: ‘‘[…] হায়, হায়! একি! মোথাওয়া (সরকার-নিয়োজিত, স্বাভাবিক আরবীয় পোশাকে সজ্জিত বাহিনী। চলমান জনস্রোতে ব্যাঘাত ঘটায় না। এবাদতের প্রাক্কালে ফুটপাতে অথবা টেলিফোন বুথে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে আলাপরতরাই কেবল ধৃত হন মোথাওয়ার হাতে। উপাসনা করিয়ে আটককৃতদের ইকামা বা পরিচয় পত্রে লাল কালির একটা দাগ এঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। কারো ইকামায় পরপর তিনটি দাগ পড়লেই, অবশ্যই তিনি ভিনদেশি চাকুরে বা শ্রমিক হলে, তাঁকে স্বদেশে ফেরত পাঠানো হয়। কখনো তারা প্রবাসীদের, বেশির ভাগই বাংলাদেশের লোকদের, ভিলায়ও হঠাৎ হামলে পড়ে।), মোথাওয়া!! হেঁকে, পিসি অফ ক’রে বিমূঢ় হয়ে পড়ে ইনাম।
টিভি সেট আর পুরোনো, অব্যবহৃত ডিভিডিটা কোথায় লুকিয়ে রাখবে বুঝে উঠতে পারে না বাকি তিনজন। রুমের দুয়ারও অন্যান্য দিনের মতো আধখোলাই থাকে।
অমনি মুহূর্তে দরজা ভেঙে ঢোকার গতিতে রুমে এসে পড়ে দুই মোথাওয়া। নীল ছবির ভিসিডি আছে কিনা জিগ্যেস ক’রে জবাব মেলার আগেই রেগে টিভি রাখার অপরাধে চারজনেরই মুখে ও মাথায় প্রচণ্ড চড় গেঁথে দেয়। পিসিটা প্রথমে নিতে চাইলে, তারা একে অফিসের (চারজনই আল কুসি ইন্টারন্যাশনালের চার প্রকল্প ব্যবস্থাপকের সহকারী হিসেবে, কনট্রাক্ট ভিসার অধীনে কর্মরত) সম্পত্তি ব’লে জানায়। অতঃপর দুই মোথাওয়া কাজী ও বাশারকে টিভি এবং ওই ডিভিডি (সমস্ত ভিসিডিসমেত) তাদের গাড়িতে তুলে দেয়ার হুকুম দিয়েই বেরিয়ে পাশের রুমে হানা দেয়। কাজী রুমে ফিরেই গালাগালমুখর হয়ে ওঠে। অমনি বিল্ডিংয়ের বাংলাদেশ ব্লকের কোথাও বাঙালির আর্তনাদ শোনা যায়। এ-দেশে আগমনের পর থেকে, পৃথিবীতে নিজে না থাকার অনুভবকে যে চৈতন্য থেকে সমস্ত দৃশ্য ও শব্দ হঠাৎ (কিন্তু চিরতরে) নেই হয়ে যাওয়ার অবর্ণনীয় বেদনা-যন্ত্রণা হিসেবেই আপন রক্তে সক্রিয় রেখেছে, সেই ইফতিই (৩২), স্পষ্টই দেখতে পায়: তার ছিন্ন মাথা রুমের দরজার ঠিক বাইরে পড়ে আছে। অতঃপর হয়তো বাংলার ওই আহাজারি শুনেই, নিজেরই দুই খণ্ডের মাঝখান দিয়ে সে এক পা, দুই পা এগিয়ে যায়।’’

সেই মহাতঙ্কময় এবং কিছুতেই মেনে ও মনে না-নিতে-পারা মৃত্যু আমাকে আচ্ছন্নই কেবল করে না, ওই মরণের মধ্যেই আমি জীবন ধারণ করি মাসাধিক কাল। বাবাকে হারানোর চারদিন পরই, অন্য অভিভাবকদের সস্নেহ আদেশে, কর্মস্থলে যোগ দেই আর বাড়ি ফিরে ভেসে যাই চোখের জলে। ২০০২ সালের ৩ নভেম্বর সকালে জনকের প্রায়-স্বাভাবিক প্রয়াণের পর কিছুদিন তেমনই চলে। কিন্তু উপর্যুক্ত আট মুণ্ডচ্ছেদের অভিঘাত আমার অস্তিত্বের ভিত্তি কাঁপিয়ে দেয়, মর্মমূল রক্তাক্ত হয় এবং অশ্রু প্রবাহিত হয় সত্তার অতল অব্দি। সে সময় রাহাত ফতেহ আলী খান ও শ্রেয়া ঘোষালের গাওয়া ‘তেরি মেরি মেরি তেরি প্রেম কাহানি হ্যায় মুশকিল/দো লাফজোমে ইয়ে বায়ানা হো পায়ে’ গানটির সুরের সুদূর করুণ আবেদন (অথচ এর লিরিক ইতিবাচক প্রেমের) কেন যেন আমাকে তলোয়ারের ভয়ংকর এক কোপে প্রাণ হারানোর পূর্বমুহূর্তগুচ্ছে উপনীত করে। এতে আমার মর্মবীণার, অন্তর্গত তানপুরার প্রতিটি তার ছিন্ন হতে থাকে। আরো বেশি ভেঙে পড়ি যখন মনে পড়ে, নিহত আট জনের একজন প্রাণ হারানোর আগের রাতে টেলিফোনে তাঁর মাকে বলেন: ‘মা, আমি খুন করি নাই। বিশ্বাস কর, আমি খুন করি নাই। কেন জানি ওরা একটু আগে আমার মাথা ন্যাড়া কইরা দিছে।’ কিন্তু নিশ্চয়ই পরের দিন যখন হাতকড়া, বেড়ি আর যম টুপি পরানো হয় তখন ছ’জনের প্রত্যেকেই বুঝতে পারেন কী ঘটতে যাচ্ছে অচিরেই। উল্লিখিত গানটির সুরলহরের মধ্যেই যেন তাঁদের অশ্রুত আর্তি ও অবর্ণনীয় দুঃখ, বেদনা, যন্ত্রণা বা আরো অজানা অনুভূতি অনুরণিত হয়। অন্যের হাতে, জ্ঞাতসারে, এভাবে পৃথিবী ত্যাগের অভিজ্ঞতা কোনো ভাষায়ই অবিকল অনুবাদযোগ্য নয়। যদিও, ফায়ারিং স্কোয়াডে দণ্ডিত একজনের অন্তিম চিৎস্রোতের অসামান্য সংবেদী বিবরণ মেলে হোর্হে লুই বোর্হেসের ‘In Secret miracle’ গল্পে। (স্মর্তব্য, উপর্যুক্ত ‘শিরচ্ছেদ’ গল্পের উপজীব্য কিন্তু ভিন্ন, রাজনীতিক। সেই গল্পে যা লেখা হয়নি বক্ষ্যমাণ গদ্যে তা উল্লেখের প্রয়াস পেতে চাই মাত্র।) মনে পড়ে, আমার গল্পগ্রন্থখানা প্রকাশের সোয়া এক বছর পরে লিখিত ‘হেলিকপ্টার ও সোনার তলোয়ার’ (প্রথম প্রকাশ: নতুনধারা; ঈদ বিশেষ সংখ্যা; ১৫ জুলাই ২০১৪) গল্পেও শিরচ্ছেদের প্রসঙ্গ আছে যা বাদশার হন্তারক এক রাজকুমারের অমন সাজা লাভের ঘটনার বাস্তবিক ও পৌরাণিক আবহে আবর্তিত।

তবে শৈশবে একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে প্রথমবারের মতো আমাকে এক শিশুর মৃত্যু দেখতে হয়। আমারই বর্তমান ভ্রাতার অগ্রজ, তৎকালে আমার একমাত্র দেড় বছর বয়সী ভাই, সারাদিন কলেরায় ভুগে রাতে শেষ নিঃশ্বাস আঁকে পৃথিবীর বাতাসে, ১৯৭২ সালে। পরে পারিবারিক গোরস্তান ঘেঁষে অটো রিকশায় পরিবারের সকলে কোথাও বেড়াতে বেরুনোর সময় মা নিঃশব্দে এবং আমি ও অব্যবহিত অনুজা সশব্দে কেঁদে উঠলে, চালক প্রতিবারই জিগ্যেস করেন: ‘কি হইছে?’ বাবার মুখে উত্তর শুনে বলেন: ‘পাঞ্জাবিরা (পাক হানাদারেরা) মারছে?’

কবিতায় মৃত্যু

পিতার অন্তিম যাত্রা শুরুর সেই মুহূর্তে বৌদ্ধ দর্শনের একটা কথা মনে পড়ে আমার : দৃশ্যমান জগৎ অদৃশ্য মূল জগতের প্রতিভাস মাত্র। পূর্ব এশিয়ায়, বিশেষত চীন, কোরিয়া ও জাপানে রচিত মৃত্যু বিষয়ক কবিতাগুলোও বুদ্ধের দর্শনসঞ্জাত। বিশেষত অস্তিত্বের তিনটি সংকেত, বস্তুজগতের অস্থায়িত্ব, এই জগতের সঙ্গে নিবিড়তার যন্ত্রণা ও সকল বাস্তবতার শূন্যতারূপ পরিণতিই উল্লিখিত কবিতাগুলোর আধেয়। এই কাব্য কবি, যোদ্ধা, মহৎ ব্যক্তি অথবা বৌদ্ধ ভান্তের হাতে রচিত হওয়ায় সমাজের শিক্ষিত, অধ্যাত্মবাদী ও নেতৃস্থানীয় স্তরে বেশি আদৃত হয়। মৃত্যু সংক্রান্ত এই দর্শন যথাক্রমে জাপানে জেন, চীনে চ্যান ও কোরিয়ায় সিয়ন বুড্ডিজম থেকে উৎসারিত। এই দর্শন মৃত্যুকে গুরুত্ব দেয়। কেননা মরণ বিষয়ক সচেতনতাই গৌতম বুদ্ধকে জাগতিক নিমগ্নতা ও আনন্দ-উল্লাসের পরিণতিরূপ চূড়ান্ত শূন্যতা অনুধাবনে সহায়তা করে। পূর্ব এশিয়ার এই মৃত্যুর কবিতাগুলো চিরএকাকিত্বের দৃষ্টান্ত যেমন হয়ে ওঠে, তেমনি এগুলো জীবনকে দেখার নতুন উপায় সন্ধানেও সহায়ক হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামুরাই সংস্কৃতির সাহসী সৈন্যগণ আত্মহত্যার আগে এই মৃত্যুর কবিতা রচনা করেন। মার্কিন বাহিনীর হাতে পরাজয় বরণের আগে জেনারেল তাদামিচি কুরিবায়াশি হেড কোয়ার্টারে কবিতা পাঠান বার্তার বদলে: Unable to complete this heavy task for our country/Arrows and bullets all spent, so sad we fall./But unless I smite the enemy,/My body cannot rot in the field./Yea, I shall be born again seven times/And grasp the sword in my hand. আমাদের দেশের জন্যে গুরুদায়িত্ব পালনে অসমর্থ। সমস্ত তীর ও বুলেট নিঃশেষিত বিধায় আমরা পরাস্ত। কিন্তু যতোক্ষণ আমি শত্রুনিধনে নিরত ততোক্ষণ আমার শরীর ময়দানে ভূপাতিত নয়। হ্যাঁ, আমি আরো সাতবার জন্ম নেবো আর হাতে তুলে নেবো তলোয়ার। (সূত্র : উইকিপিডিয়া)

১৯৭০ সালে টোকিওতে শিষ্যসমেত ঐতিহ্যবাহী আত্মহননের আগে লেখক ইউকিউ মিশিমা লেখেন: A small night storm blows/Saying ‘falling is the essence of a flower’/Preceding those who hesitate. ছোট ঝড় বয়ে যায় রাতে সংশয়ী লোকদের এই ব’লে:/ঝরে পড়াই ফুলের মৌলিক গুণ। (প্রাগুক্ত) জাপানের কোনো কোনো কবি আবার এই বিষয়ক স্বরচিত কবিতায় কৌতুক বা দ্ব্যর্থবোধকতাও প্রকাশ করেন। যেমন টোকো লেখেন: Death poems/are mere delusion —/death is death. মৃত্যুর কবিতাগুলো গুরুত্বহীন মিথ্যা ধারণাপুঞ্জ তুলে ধরে-মৃত্যু মরণই। (প্রাগুক্ত)

লক্ষযোগ্য, উপর্যুক্ত প্রথাগত ও বীরোচিত আত্মহত্যা এবং কৌতুকময় মৃত্যুর কবিতাগুলোর প্রেরণা বুদ্ধের নির্বাণ হলেও জীবন সম্পর্কে এগুলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠাই নিশ্চিত করে। এ ক্ষেত্রে কোরিয়ার কবিতায়ও তাই ঘটে। পঞ্চদশ শতকে সিয়ং স্যাম-মাম মৃত্যুদণ্ডিত হবার আগ মুহূর্তে কারাগারে আবৃত্তি করেন: What shall I become when this body is dead and gone?/A tall, thick pine tree on the highest peak of Bongraesan,/Evergreen alone when white snow covers the whole world. আমি কি হয়ে উঠবো যখন এ দেহ মৃত ও বিগত?/বংগ্রেয়সেনের শীর্ষতম স্থানে আমি হবো উচ্চ, স্ফীত পাইন গাছ,/শ্বেত তুষারে সমগ্র বিশ্ব আচ্ছন্ন হলেও চিরসবুজ একা। (প্রাগুক্ত)
চতুর্দশ শতকে কোরিয়ান নিও-কনফুসিয়ানিজমের জনক ব’লে বিবেচিত জিয়ং মং-জু তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বলেন: Should this body die and die again a hundred times over,/White bones turning to dust, with or without trace of soul,/My steadfast heart toward Lord, could it ever fade away? মরা উচিত কি এ দেহের এবং আবার শতাধিকবার?/আত্মার চিহ্নসহ অথবা ছাড়া শাদা হাড় ধূলিতে পরিণত হলেও/প্রভুর প্রতি নিবেদিত আমার হৃদয় কি কখনো মলিন হতে পারে? (প্রাগুক্ত)
মং-জুর কবিতায় ¯্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসআশ্রয়ী মৃত্যুঞ্জয়ী প্রতীতিও মুদ্রিত হয়।

এশিয়ার উপর্যুক্ত প্রাচীন নমুনাগুলোর পরে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে রচিত ইয়োরোপের কবিতায় কেমন মৃত্যুভাবনা মেলে? জন কীটস্ (১৭৯৫-১৮২১)-এর ‘When I have fears’ শীর্ষক সনেটটিকে, পাশ্চাত্যের কোনো কোনো কাব্যসমালোচক, তাঁর অন্য কবিতা থেকে পৃথকতাযোগে শনাক্ত করেন। কেননা এতে কবির প্রেম ও খ্যাতি না মেলার আশঙ্কা এবং নশ্বরতার ভয় প্রকাশিত হলেও মৃত্যুই সমস্যাযুক্ত আরোগ্য ব’লে বিবেচিত হয়। কীটস্-এর আতঙ্ক, কেবল জীবনের নিয়তি-নির্ধারিত নশ্বরতাজনিত নয়, তা সৃষ্ট হয় ওই ভালোবাসা ও পরিচিতি লাভে তাঁর ব্যর্থতার আশঙ্কার দরুনও। এই মৃত্যু কিংবা নশ্বরতা তাঁকে আবার চূড়ান্ত ওই নৈরাশ্য থেকেও মুক্তি দেয় প্রায়। আলোচ্যমান কবিতাটি শিল্পোত্তীর্ণ কাব্য হিসেবে আলোচিত হলেও, বলা হয়, পাঠককে তা এর কবিতাকেন্দ্রিক পাঠের চেয়ে মৃত্যুকেন্দ্রিক পাঠ গ্রহণেই বেশি উৎসাহিত করে। ফলে এটি কবির ব্যক্তিক বিষয়ের কবিতার চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যু ও জীবন-জিজ্ঞাসার কাব্য হয়ে ওঠে। সনেটটির শুরুতেই কবি বলেন: When I have fears that I may cease to be/Before my pen has gleaned my teeming brain,/Before high-piled books, in character,/Hold like rich garners the full ripened grain; (আমি ফুরিয়ে যেতে পারি ব’লে যখন আমার ভয়/আমার কলম আমারই মস্তিষ্কের অতি সৃজনশীলতাকে গুছিয়ে তোলার আগে,/চিন্তা প্রকাশের পদ্ধতিতে উচ্চ কলামে সজ্জিত গ্রন্থরাজির আগে/যা সমৃদ্ধ সংকলক-গচ্ছিত পূর্ণাঙ্গ বীজসমূহের ধরনে সংরক্ষিত।) এরপর কবি তারকালোকিত রাত্রির সৌন্দর্য, উচ্চ প্রেমানুভূতি ইত্যাদির ছায়া সুযোগের জাদুকরি হাতে (And think that I may never live to trace/Their shadows with the magic hand of chance) কবিতায় নির্ণয়ের জন্যে হয়তো আর বাঁচবেন না বলে জানান। কবিতার তৃতীয় ধাপের চার চরণে কবি সম্ভাবনামণ্ডিত প্রেমাষ্পদকে, যে কিনা এক ঘণ্টার সৃষ্টি, পুনরায় দেখতে না পারার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন (And when I feel, fair creature of an hour,/That I shall never look upon thee more)| কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভে অসামর্থ্য এবং প্রেমের ভুবনে ব্যর্থতার চিন্তায় কবি অস্থির হন মূলত অকাল মৃত্যুর আশঙ্কার ফলে। এ জন্যেই কবিতাটি চূড়ান্তরূপে মৃত্যুকেন্দ্রিক। সনেটের শেষ দুই চরণে কবি তাই বিশ্বের বিস্তৃত এক প্রান্তে প্রেম ও প্রতিষ্ঠা শূন্যতা কিংবা অর্থহীনতায় ডুবে না যাওয়া পর্যন্ত (Of the wide world I standalone, and think/Till Love and Fame to nothingness do sink.) একাকী দাঁড়িয়ে থাকেন। এই নাথিংনেসে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি কীটস-এর পূর্বসূরী উইলিয়াম শেক্সপীয়র তাঁর ৬০-সংখ্যক সনেটেও উল্লেখ করেন, অবশ্যই নিজের ধরনে।
কীটস্ ‘When I Have Fears’ সনেটটি লেখার এক বছর পর তাঁর সহোদর মারা যান এবং এর তিন বছর পরে তাঁরও প্রয়াণ ঘটে। কবিতাটি রচনার আগে থেকেই কবির পরিবার রোগাক্রান্ত ও মৃত্যুর সম্মুখীন হতে শুরু করে। প্রসঙ্গত সামনে এসে দাঁড়ান পি. বি. শেলীও। ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কবি পারসি বাইশি শেলী ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত এবং ইটালির উত্তরে অবস্থিত স্পেজিয়ার উপসাগরে আকস্মিক সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে, তাঁর ৩০তম জন্মদিনের মাস খানেক আগে, ১৮২২ সালের ৮ জুলাই নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান। লেঘর্ন থেকে লেরিসিতে ফেরার সময় সৈকত থেকে দশ কিলোমিটার দূরে, গভীর সমুদ্রে, ওই দুর্ঘটনা ঘটে। কেউ বলেন, তাঁর বোট ‘ডন জুয়ান’ সমুদ্রোপযোগী ছিলো না। কেউ মনে করেন, তা ছিলো এক রাজনৈতিক হত্যাকাÐ। কেননা ১৮১২ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যে এক রাতে হঠাৎ তিনি এক ইনটেলিজেন্স এজেন্ট দ্বারা আক্রান্ত হন। শেলীর নাস্তিক্যের পক্ষে সাহসী উচ্চারণও এসবের জন্যে দায়ী ব’লে কারো কারো ধারণা। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, না, শেলী নিজেই মরতে চান। কেননা খুব অর্থকষ্টের কারণে তিনি বিমর্ষ ছিলেন। এর আগে তিনি আবাসনের ভাড়া পরিশোধেও ব্যর্থ হন। এই শেষ অনুমানটি কাব্যিক সমর্থন লাভ করতে চায়।

উপরের দুই অনুচ্ছেদের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রুগ্নতা বা প্রকৃতির কঠিন ইচ্ছা যেমন মানুষের প্রেম ও সৃজনশীলতাকে প্রভাবিত করে তেমনি কখনো বিমাতা বাস্তবতাও সৃষ্টিশীল মানুষকে স্বেচ্ছায় জীবনাবসানে বাধ্য করে। স্মর্তব্য, এ কথা প্রচলিত আছে যে, শেলী ঝড় দেখতে গিয়ে নিজেকে সমুদ্রে সঁপে দেন। আরো লক্ষণীয়, পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ দর্শন-প্রভাবিত কবিতার উপর্যুক্ত প্রাপ্ত নমুনাগুলোর, বিস্ময়কররূপে, বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায় কীটস্-এর মৃত্যুভয় ও মরণচিন্তা এবং শেলীর দেহাবসানের ঘটনাটিও।

বাংলা কবিতায় মৃত্যুকে আমরা কিভাবে পাই? এই প্রশ্ন মাত্রই স্মৃতিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু বিষয়ক মাইল ফলক প্রতিম কবিতা, যা ‘বিপন্ন বিস্ময়ের’ অসামান্য কাব্য, ‘আট বছর আগের একদিন’। এটি আত্মহত্যার পরে লাশ ঘরে নিথর শুয়ে থাকা এক পুরুষকে কেন্দ্র ক’রে আবর্তিত। তবে আমরা সংক্ষিপ্ত পাঠ নিতে সচেষ্ট হবো দাশবাবুর ‘মৃত্যুর আগে’ (ধূসর পাণ্ডুলিপি কাব্যভুক্ত) কবিতার। তাঁর কাব্যের ঐহিক অধ্যাত্মের (এই বিশেষ শনাক্তকরণ শামসুর রাহমানের) কল্যাণে পরমাশ্রয় লাভের গভীরতম আনন্দে, গ্রামবাংলার নৈসর্গিক অপরূপ বৈচিত্র্যের মধ্যে, মাতৃগর্ভে থাকার অনুরূপ অসামান্য নিবিড়তায়, বুঝিবা জড়োসড়ো হয়ে পড়েন পাঠক। এই কবিতা পাঠেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। কেননা : […] আমরা বেসেছি যারা অন্ধকারে দীর্ঘ শীত- রাত্রিটিরে ভালো,/খড়ের চালের ’পরে শুনিয়াছি মুগ্ধরাতে ডানার সঞ্চার;/পুরানো পেঁচার ঘ্রাণ;- অন্ধকারে আবার সে কোথায় হারালো!/বুঝেছি শীতের রাত অপরূপ,- মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার/গভীর আহ্লাদে ভরা; অশত্থের ডালে- ডালে ডাকিয়াছে বক;/আমরা বুঝেছি যারা জীবনের এইসব নিভৃত কুহক;/আমরা দেখেছি যারা বুনোহাঁস শিকারীর গুলির আঘাত/এড়ায়ে উড়িয়া যায় দিগন্তের নম্র নীল জ্যোৎস্নার ভিতরে, […] মিনারের মতো মঘ সোনালি চিলেরে তার জানালায় ডাকে,/বেতের লতার নিচে চড়ুয়ের ডিম যেন শক্ত হয়ে আছে,/নরম জলের গন্ধ দিয়ে বার-বার তরীটিরে মাখে,/খড়ের চালের ছায়া গাড় রাতে জ্যোৎস্নার উঠানে পড়িয়াছে।
এভাবে সপ্তম স্তবকে এসে কবি জানান : আমরা বুঝেছি যারা পথ ঘাট মাঠের ভিতর/আরো এক আলো আছে : দেহে তার বিকেলবেলার ধূসরতা […]
মৃত্যুকে কি কবি তাহলে, ধূসর হলেও, আলোই আখ্যায়িত করেন?
অতঃপর অষ্টম ও শেষ স্তবকে এসে তিনি উপর্যুপরি জিজ্ঞাসায় সচকিত করেন পাঠককে, আর বলেন :
আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর ? জানি না কি আহা,/সব রঙ কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে/ধূূসর মৃত্যুর মুখ;-একদিন পৃথিবীতে স্বপ্ন ছিল-সোনা ছিল যাহা/নিরুত্তর শান্তি পায়;-যেন কোন মায়াবীর প্রয়োজনে লাগে।/কি বুঝিতে চাই আর ?…রৌদ্র নিভে গেলে পাখি-পাখালির ডাক/শুনিনি কি ? প্রান্তরের কুয়াশায় দেখিনি কি উড়ে গেছে কাক !

ধূসর মৃত্যু এখানে ‘দেয়ালের’ সঙ্গে উপমিত। ‘নিরুত্তর শান্তি’ কি কাব্যালোচক কথিত কীটস্-এর সেই ‘সমস্যাযুক্ত আরোগ্য’? তবু চলিষ্ণু যাপন স্তব্ধ হলেও এর পাশেই জীবন প্রবহমাণ। তাই ‘রৌদ্র নিভে গেলে’ পাখি ডাকে, কাক উড়ে যায় ‘প্রান্তরের কুয়াশায়’।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, দাশবাবুর আগে, দেখতে পান ‘মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে।’ রোমান্টিসিস্ট রবি ঠাকুর ‘জীবন দেবতা’কে খুঁজে পাওয়ার পর মিস্টিক হয়ে ওঠা সত্তে¡ও, শেষ কবিতায় তাঁকে যে ‘ছলনাময়ী’ আখ্যায়িত করেন তা মনে রেখেই বলতে হয়, তাঁর মৃত্যুবোধ উপনিষদীয় দর্শন কিংবা সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে অদূরবর্তী নয়। তাই তাঁর ‘ভানু সিংহের পদাবলী’ কবিতায় ভানু সিংহ বিরহকাতর রাধাকে মৃত্যুসম প্রিয় শ্যামের সন্ধানে ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানান। এই পদাবলীর শুরুতেই বলা (পরে পুনরাবৃত্ত) হয়: মরণরে,/তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান! হিন্দু বিশ্বাসে শ্রীকৃষ্ণ অমর কিংবা শ্যাম জীবন ও মৃত্যুর সমান বড়। ধর্মের আবেগে এমন বিবেচনা খুবই কাব্যিক এবং অন্তিম পরিণতিরূপ শূন্যতায় পরমাত্মার (রাধিকা যাঁর বিপরীতে জীবাত্মা) শক্তি ও সৌন্দর্যারোপ অতুলনীয়ও বটে। যদিও, কীটস্-এর কবিতাটির প্রসঙ্গ আবার মনে আসে যখন ঠাকুরের এই কবিতায় শ্যামকে বিশেষায়িত ক’রে প্রার্থনা করা হয় এভাবে: তুঁহুঁ মম মাধব, তুঁহুঁ মম দোসর,/ তুঁহুঁ মম তাপ ঘুচাও,/মরণ তু আওরে আও। অর্থাৎ মৃত্যুই আরোগ্য, মরণই উদ্ধার। যদিও আবার রবীন্দ্রনাথে যা অন্ধকার (প্রাগুক্ত) জীবনানন্দে তা ধূসর আলো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ শেষাবধি অনেক বেশি ঐহিক। কেননা আরেকটি কবিতায় তিনি সরাসরি বলেন: মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

এ-দফায় পাঠ ও দৃষ্টির অভিজ্ঞতার পশ্চাৎভূমিতে দ্রুত দৃষ্টি সঞ্চারিত না করলেই নয়। হুমায়ুন আজাদ, যিনি তাঁর ‘আমার অবিশ্বাস’ গ্রন্থে বলেন: ‘নাস্তিকতা বলে কিছু নেই, কেননা, আস্তিকতা বলেও কিছু নেই’, জঙ্গি হামলায় জখম হওয়ার পর লেখেন ‘মৃত্যু থেকে কয়েক সেকেন্ড দূরে’ বইখানা। এর আগেই তিনি ‘প্রবচনগুচ্ছে’ প্রতিষ্ঠিত করেন তাঁর এই প্রতীতি: ‘জন্মের আগেও অন্ধকার, মৃত্যুর পরেও অন্ধকার। জীবন হচ্ছে এ-দুয়ের মাঝখানে হঠাৎ আলোর ঝিলিক।’ সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে হাঁটুতে মুখ গুঁজে সর্বহারা বৃদ্ধার মৃত পড়ে থাকার শটগুলো তৈরি করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মৃত্যুদৃশ্য। কেননা তাঁর ভিক্ষার বাটিটা মরদেহ থেকে খসে গড়িয়ে পড়ে বহমান জলে। তাঁর দেহাবসানের ফলে আর্থ-সামাজিক বৈষম্যসৃষ্ট নিদারুণ অভাব তো আর ঘোচে না, তাই। এ-ছবিতে দুর্গার মৃত্যু মর্মস্পর্শী হয়ে ওঠে ওর বিয়োগের ঢের পরে, শহর থেকে ওরই বাবার বাড়ি ফেরার পর। কেননা আপনজনের কান্নায় ভেঙে পড়া দেখানো হয় এ সময়, দুর্গার প্রয়াণ মাত্র নয়। আরেক মৃত্যুদৃশ্য সচেতন দর্শকের বক্ষ বিদীর্ণ করে। অপর্ণা সেনের ‘সতী’ ছবিতে অনেকের অজ্ঞাতে ধর্ষিত ও পরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া বাক্শক্তিহীন মেয়েটি, প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির পরে, গোয়াল ঘরের কাছে মাটিতে, নিজের রক্তের স্রোতে চিৎ হয়ে মৃত পড়ে থাকে। যাপনের ক্ষেত্রেও এরকম বা কিছুটা সাদৃশ্যযুক্ত মৃত্যু যে আমাদের দেখতে হয় না তা নয়। তাছাড়া আমাদের মিডিয়াও তো অস্বাভাবিক সব মৃত্যু সংবাদে পূর্ণ, সবসময়। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আমার সমবয়সী বন্ধু শাহজাহানের লাং ক্যান্সারে অকাল প্রয়াণের ঘটনায় মর্মাহত থাকি কিছুদিন। ছাত্রাবস্থায় আরেক নিবিড় বন্ধু সারোয়ারসহ (আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘হে সোনার এশীয়’ দেশী-বিদেশী বাকি তিনজনের সঙ্গে এ-দুজনের প্রতিও উৎসর্গিত) আমরা তিনজনই প্রায় সাপ্তাহিক ছুটির দিনেই বাসে চেপে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ছুটে যেতাম। সম্প্রতি সারোয়ার জানায়, ঈদের দিন সকালে সে শাহজাহানের কবরের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে পায়, ওর সমাধির কাছে বেড়ে ওঠা গাছে কয়েকটি কাক বসে আছে। আর, সে বলে: ‘ওরা যেন তাকে পাহারা দিচ্ছে।’ এ-কথায় আমার চোখ ভিজে আসে, ওর ভেসে যায়।

 

হত্যা, মৃত্যু, প্রতিবাদ

একটি কাক নিহত হলে এর প্রজাতিভুক্ত অন্যরা তারস্বরে প্রতিবাদ জানায়। এদিকে রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা বা বিবাদ হতে দেখলে এখনো যে কিছু মানুষ সহায়তাকল্পে ছুটে যায়, জঁ জাক রুসো একে আদিম সাম্যবাদী মনুষ্যসমাজের উত্তরাধিকার ব’লে শনাক্ত করেন। যদিও, আজকাল কাউকে খুন হতে দেখলেও ভয়ে কিংবা আত্মস্বার্থবাদিতাহেতু হন্তারককে কেউ প্রতিরোধ করে না। প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত-প্রচারিত অনেক অপমৃত্যু ও শাহাদাতের সংবাদেও আমরা তেমন আর বিচলিত নই। কিন্তু ক্রৌঞ্চ-ক্রৌঞ্চির নিহত হবার ঘটনার অভিঘাতে আদি কবি বাল্মিকী কবিতা রচনা করেন। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’, শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ ও ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ এ ক্ষেত্রে চকিত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এদিকে কবিদের কারো কারো সমান্তরালে আমিও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি, সীমান্তে ফেলানী হত্যা (সেসময় বাংলানিউজ২৪.কম-এ প্রকাশিত) ইত্যাদি অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদে-প্রতিক্রিয়ায় কবিতা রচি। পর কিংবা অপরের হাতে মৃত্যু এক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতারও হেতু। এ ছাড়াও বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যে মৃত্যু আরও নানান মাত্রায় ও প্রেক্ষাপটে বাক্সময় হয়ে আছে।

 

আরও একটি মৃত্যু আর শোককথা

সেই আট বাংলাদেশী মানুষের মতো আমার আত্মীয় নয় এমন একজনের কথা পরিশেষে বলতেই হয়। আমাদের অপার সম্ভাবনামÐিত তরুণ গায়ক আবিদ, খুলনার সন্তান, পুরো নাম মিনা আবিদ শাহরিয়ার বাপী, কিভাবে হয়ে ওঠেন সমুদ্র-শহীদ? ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ পাশ করার পরপরই একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন আবিদ। সেই সংস্থার বার্ষিক সভা সে-বছরেরই নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় কক্সবাজারে। সেই সুবাদে, ২৯ নভেম্বর সন্ধ্যার পরে, তিন সহকর্মীর সাথে বিচে বেড়াতে গেলে হঠাৎ এক বিশাল ঢেউ এসে তাঁদের গ্রাস করে। আবিদসহ মোট তিনজন হারান অমূল্য প্রাণ। বাবা এডভোকেট মিনা মিজানুর রহমান এবং মা অধ্যাপক রমা রহমানের অত্যুজ্জ্বল এক কৃতি সন্তান আবিদ, মাত্র পঁচিশ বছরের আয়ুষ্কালে যিনি কিনা গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করেন এবং মার্কেটিং বিষয়ে বিবিএ ও এমবিএ পরীক্ষায়ও প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। তবে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রণিধানযোগ্য অর্জন এই যে, ২০০৪ সালে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ আয়োজিত কেন্দ্রীয় প্রতিযোগিতায় আবিদ ১ম মানে উত্তীর্ণ হন। তারপর টেলিভিশনে তাঁর সাঙ্গীতিক উপস্থিতির প্রাণপ্রাচুর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে তাঁরই অসামান্য উপস্থাপনা, বিশেষত, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের দিকে অনুষ্ঠিত একক শিল্পীর সঙ্গীতানুষ্ঠানগুলোর চমৎকার সঞ্চালনা ভুলবার নয়। সেই ২৯ নভেম্বর রাতে টিভি চ্যানেলে আবিদের প্রয়াণসংবাদ শোনা মাত্র আমার বুক ভেঙে কানা পায়। আক্ষরিক অর্থে আবিদ আমাদের ভাই বা বন্ধু না হলেও আমার স্ত্রীর আর আমার চোখ একসঙ্গে ভেসে যায়। ওকে হারানোর সাড়ে সাত মাস পরে, ২০১২ সালের ১৯ থেকে ২২ জুলাই, এই চার দিনে, আমি নিচের কবিতাটি লিখে উঠি। এ আরেক টেলিপ্যাথিক ঘটনা যে, শেলীর দেহাবসানের মাসেই, ওই তারিখ মনে না রেখেই, আমি আবিদের জন্যে এলিজিখানা রচনা করে বসি। কিন্তু এই কবিতা লেখার আগে থেকে এখনো পর্যন্ত সাগরে নামা আর হয়ে ওঠেনি আমার। কক্সবাজার বিচে ছাতাসমেত ভাড়াকৃত সিটে শুধু বসে থাকি আধ-শোয়া হয়ে। নোনা জলে ভেজাই না এমনকি পায়ের পাতাও। ভাবি, কি আশ্চর্য, চোখের পানিও লবণাক্ত! ভূভাগের দিকে ধাবমান সবচেয়ে বড় তরঙ্গটিতে চোখ রেখে কখনো শেলীর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাই, ‘A Lament’ কবিতায় তিনি যেমন বলেন: ‘O World! O Life! O Time!/On whose last steps I climb,/Trembling at that where I had stood before;/When will return the glory of your prime?/No more -Oh, never more!’ ও পৃথিবী! ও জীবন! ও সময়!/যার ওপর আমি বেয়ে উঠি শেষ পদক্ষেপে,/দাঁড়াই যেখানে আগে, সেখানে কম্পিত;/কখন আসবে ফিরে উচ্চতম তোমার মর্যাদা?/আর নয়, আসিবে না, ওহ, আর কখনোই নয়!’ আবিদের মতো মর্মছোঁয়া তরুণ শিল্পীর জৈবনিক অনুপস্থিতির শূন্যতা কিছুতেই পূরণ হয় না। যদিও, ওঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ এখনো বাক্সময় হন:‘আমার যাবার বেলা পিছু ডাকে’…, ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে’…, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’...প্রভৃতি গানগুলিতে, তারুণ্যের অকল্পিতপূর্ব ঋদ্ধিসহযোগে। কিন্তু এতেও আবার হু-হু করে ওঠে শ্রোতার অন্তর, গীতিকার ও গায়কের যৌথ সংবেদনশীলতায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০১২ সালেই আবিদের বাবার সঙ্গে আমার টেলিযোগাযোগ হয়, আবিদের আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে মহীবুল আজিজের লেখা এক অনবদ্য গল্পের সূত্র ধরে। এও বলে রাখা দরকার, গল্পটির খবর পাওয়ার আগেই আমি আমার কবিতাটি লিখে ফেলি। আবিদের বাবা আমার এলিজিটা ফোনে শুনতে চান। কবিতাটির দ্বিতীয় স্তবক শোনার সময় তিনি বলে ওঠেন :‘সাংঘাতিক!’ তারপর কয়েক মুহূর্তের জন্যে স্তব্ধ হয়ে পড়েন। সেল ফোনের সেট খোয়ানোর ফলে আমার নাম্বার হারিয়ে ফেলায় এর আগে প্রায় দুবছর তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সক্ষম হননি। তবে পরে তাঁকে আবার ফোনে পাই এবং সংগ্রহ করি আবিদের জীবন-বৃত্তান্ত। আর নিকটবর্তী কিংবা দূরান্বয়ী প্রসঙ্গকথা নয়। কাব্যের ব্যাখ্যা তো নয়ই। এবার কেবল কবিতাটিই, উপর্যুক্ত অনুচ্ছেদ যার অভিঘাতের ফল, পাঠ করা যাক:

আবিদ শাহরিয়ার*

মহাতরঙ্গ কোন্ সে সন্ধ্যায় হঠাৎ এসে ক্ষিপ্র ভেঙে দেয়
তোমার সরব স্নান? ঢেউয়ের সংক্ষুব্ধ বৃত্তে তুমি কি উন্মূল
তৎক্ষণাৎ, ধাক্কাহত, তীব্র চক্রাকারে?

মোজেস হতাম যদি প্রচণ্ড ঝড়েও
সাগর দু’ভাগ করে ফিরিয়ে নিতাম
তোমারই হারানো প্রাণ।
ধীবরও নই যে দীর্ঘ জাল ফেলে কুড়িয়ে আনবো
তোমার অন্তিম শ্বাস।

মুখারিক** হেন তবু টাইগ্রিসে নয়,
এখনো গাহিছো গান বঙ্গোপসাগরে।
হাতের আঙুলে দশ দিগন্তের আলো জ্বেলে
সৈকতে দাঁড়াই তাই কাতারে কাতারে।

*২০১২ সালে কবিতাটি ‘নতুনধারা’য় প্রকাশিত হওয়ার পর গ্রন্থিত হয় মদীয় পঞ্চম ও এখনো অব্দি শেষ কাব্য ‘স্লামডগ, মিলিয়নার নই (ফেব্রুয়ারি ২০১৩)’-এ।
**বাগদাদের এক মাংসের দোকান থেকে খলিফা হারুনের রাজদরবারে পৌঁছে-যাওয়া কিশোর গায়ক মুখারিক এক সন্ধ্যা-রাতে টাইগ্রিসের বুকে নৌকায় বসে গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করলে নগরবাসী কুপি-হারিকেন ইত্যাদি আলো হাতে ঘর ছেড়ে দলে দলে ওই নদীতীরে সমবেত হয়। (সূত্র: ফিলিপ কে. হিট্টির আরব জাতির ইতিকথা।)

কৈফিয়ৎ: গল্প-উপন্যাস উত্তম পুরুষে লেখা যায়। কিন্তু গদ্য কিংবা প্রবন্ধ-নিবন্ধও কি? না। সচরাচর যায় না। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এভাবে লেখার সুযোগ গৃহীত হয় ছোট কাগজের চারিত্র্য আর উপর্যুক্ত গদ্যের প্রধান শিরোনামের সুবাদে। লিটল ম্যাগের স্বাধীনতার সদ্ব্যবহারের প্রথম দুই উপলক্ষ ইতঃমধ্যে তৈরি করে হাফিজ রশিদ খান সম্পাদিত ‘পুষ্পকরথ’।

০৫-০৮ জুলাই ২০১৭
সংযোজন: ০৯ ও ১২ জুলাই ২০১৭

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Back to Top