আমিরুল আলম খানের অনুবাদ: দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড

দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড রেলরোড
সাউথ ক্যারোলাইনা

হাসপাতাল চালুর দিনই এক সাথে শুরু হল প্রদর্শনী। সাম্প্রতিক কালে এ শহরে পূর্বসূরীদের যে সব ভাল কাজ আছে তা প্রচারের জন্যই এ আয়োজন। পূর্বসূরীর শুরু করা কাজগুলো এগিয়ে নেবার জন্য নতুন নির্বাচিত মেয়র নিবেদিতপ্রাণ। এটি তখন গ্রিফিংএ দেওয়ানি উকিলের কাজ দেখাশোনা করতেন। কোরা এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারে নি। কাজ শেষে হলে ডরমিটরির জানালা দিয়ে সে আঁতশবাজির নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করেছিল। সাউথ ক্যারোলাইনায় কৃষ্ণাঙ্গদের ভিড় বাড়ছে। তাদের স্বাস্থ্যে দেখভালের জন্য চলচে নানা আয়োজন। আন্তরিকতার সাথে চিকিৎসাকর্মীরা তাদের স্বাস্থ্যের ইতিহাস রেকর্ড করেন আর পাশাপশি প্রোক্টররা দেখভাল করছিলেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোও। এক বিকেলে মিস লুসি আর কোরা সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটছিলেন। মিস লুসি বললেন, এই যে কত টুকরো টুকরো কথা লিখে রাখছি, একদিন এগুলোই খুব কাজে লাগবে। কালো মানুষদের সম্পর্কে জানতে এগুলোই হবে ইতিহাসের সত্যিকারের উপাদান।

হাসপাতালের সম্মুখভাগটা সত্যিই অসাধারণ। একতলা এই ভবনটি প্রায় গ্রিফিন বিল্ডিং-এর উচ্চতার সমান লম্বা হবে। খুব সাদামাটা কিন্তু এমন চোখজুড়ানো কোন ভবন কোরা আগে দেখেনি। দেয়ালগুলা কত চমৎকার, দেখলে মন ভরে যায়। সাদা আর কালোদের জন্য প্রবেশপথ আলাদা বটে, কিন্তু দুটো পথই একই ভাবে তৈরি, একইভাবে সাজানো।
সকালে কোরা যখন রিসেপশনিস্টের কাছে নিজের নাম লেখাচ্ছিল তখন সেখানে কালো মানুষদের ভীড় জমে গেছে। একদল লোক অপেক্ষায় আছে রক্ত পরীক্ষার জন্য। তাদের অনেককে কোরা সামাজিক অনুষ্ঠানে বা সবুজ মাঠে হাটাহাটি করতে দেখেছে। রক্ত চিকিৎসার কথা কোরা আগে জানত না। এখানে এসে সে জানতে পারে অনেকেরই রক্তে নাকি সমস্যা থাকে। সেটা নাকি খুব খারাপ রোগ। রক্ত থেকেই নাকি খারাপ খারাপ অনেক রোগ ছড়ায়। আর এমন রোগীদের সামলাতেই শহরের ডাক্তারদের হিমসিম খেতে হয়ে। প্রত্যেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বসার জন্য আলাদা আলাদা চেম্বার আছে। ডাক পড়লে একে একে রোগীরা নীচের লম্বা করিডোর দিয়ে নির্দিষ্ট ডাক্তারের চেম্বারে চলে যাচ্ছে।

এখানে কোরা একজন ভিন্ন ধরনের ডাক্তারকে দেখতে পেল। তিনি ডাক্তার ক্যাম্বেলের চেয়ে অনেক বেশী আকর্ষণীয়। ডাক্তার স্টিভেন্স। মাথাভরা কোঁকড়ানো চুল, মুখে সুন্দর করে ছাঁটা দাঁড়ি, সুন্দর মেয়েলী চেহারা। এসেছেন উত্তর থেকে। দেখে মনে হয় এখনো ঠিক ডাক্তার হবার বয়স তার হয় নি। কোরার মনে হল, ইনি নিশ্চয় খুব প্রতিভাবান কেউ হবেন। নাহলে এত অল্প বয়সে কী করে ডাক্তার হবে? কোরাকে যখন পরীক্ষা করা হচ্ছিল তখন যেন তার মনে হচ্ছিল সে একটা কনভেয়ার বেল্টে চেপে চলেছে। ঠিক সিজার যে কারখানায় কাজ করে সেখানে যেমন কনভেয়ার বেল্টে সব কিছু হয় তেমনই। খুব যতœ করে তিনি কোরাকে দেখলেন।

পয়লা মনে হল শারীরিক পরীক্ষাটা তেমন কিছু নয়। পুরনো নোট দেখে সেই নীল কার্ডে তিনি তার মন্তব্য লিখেলেন। এরই এক ফাঁকে তিনি কোরাকে জিজ্ঞেস করেন, ডরমিটরিতে থাকতে তার কেমন লাগে। “বেশ ভাল,” কোরার সংক্ষিপ্ত জবাব।
কাপড় পরার পর স্টিভেন্স একটা কাঠের টুলে তাকে বসালেন। বেশ হালকা মেজাজে তিনি বললেন, “তোমার দৈহিক মিলন হয়েছে। তুমি কি জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা ভেবেছ?”

তিনি হাসলেন। “সাউথ ক্যারোলাইনাতে জন্ম নিয়ন্ত্রণের ভাল ব্যবস্থা আছে, মেয়েদের তা শেখানোও হয়। জরায়ুতে একটা বিশেষ নল পরিয়ে দেয়া হয় যাতে বাচ্চা না হয়। কোন ঝামেলা নেই। খুব সহজ একটা পদ্ধতি। স্থায়ী আর কোন ঝুঁকিও নেই।” নতুন হাসপাতালে এসবের ভাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি নিজে যার কাছে এ পদ্ধতি শিখেছেন তিনিই এ পদ্ধতি চালু করেন। বোস্টন আশ্রয়কেন্দ্রে কালো মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য এ প্রথম ব্যবস্থা চালু করা হয়। তাকে এখানে আনা হয়েছে এ বিষয়ে অন্য ডাক্তারদের পদ্ধতিটা শেখাবার জন্য যাতে এখানে তা চালু করা যায়। সে ধরনের যন্ত্রপাতিও আনা হয়েছে।
“না হলে কী হবেনে তা তো জানিনে।”

“সিদ্ধান্ত তোমার। কিছু কিছু রাজ্যে বাধ্যতামূলক জন্ম নিয়ন্ত্রণ করার আইন হয়েছে। যেসব কালো মেয়ের দুটোর বেশি বাচ্চা হয়েছে তাদের এটা করতেই হবে। পাগল, মানসিক রোগী বা দাগী অপরাধীদের জন্যই এ ব্যবস্থা। তুমি অবশ্য সে তালিকার বাইরে। তবু নিজের ভালোর জন্য করিয়ে নিতে পার। তাতে তোমার মঙ্গল হবে।

কোরাই শুধু এমন রোগী তা নয়। প্রোক্টর ডাক্তার স্টিভেন্সকে সকল তথ্য জানিয়েছেন। তিনি খুব স্বাভাবিক এবং আন্তরিকভাবে কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, পরেও এ বিষয়ে তারা কথা বলতে পারে।

খুব দ্রুত পায়ে হেঁটে কোরা নিচে এসে খোলা বাতাসে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

শ্বেতাঙ্গদের এমন খোলামেলা কথাবার্তা এড়িয়ে যেতে ধাতস্থ হতে কোরার সময় লাগবে। তার মনে সেই অভিশপ্ত রাতের ঘটনা দগদগে ঘা হয়ে আছে। তামাকের ধূমঘরের পিছনে দুর্বৃত্তরা তাকে একে একে বলাৎকার করেছিল। কোরা কোনদিনই সে যন্ত্রণা ভুলবে না। ডাক্তার স্টিভেন্সের কথায় সে কথারই ইংগিত আছে। সে কথা মনে হলেই ঘেন্নায় তার পেটের নাড়িভুড়ি পাকিয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা বাধ্যতামূলক। এই বাধ্যতামূলক কথাটার সোজা মানে হল এখানে যারা আছে তাদের জন্য অন্য কোন রাস্তা খোলা নেই। সবাইকেই এটা করাতে হরে! তাদের না বলার কোন অধিকারই নেই। এরা যেন সবাই সম্পত্তি বিশেষ, ডাক্তার যা বলবেন তাই করতে হবে। মিসেস এন্ডারসন সর্বদা বিষণœ থাকেন। এটা কি তাকে অযোগ্য করেছে? ডাক্তার সাহেব কি তাকেও এই প্রস্তাব দিয়েছেন? সম্ভবত না।

এসব ভাবতে ভাবতেই সে মিসেস এন্ডারসনের বাড়ির কাছে চলে এলো। আনমনা হলে তার পা যেন চলতেই চায় না। হয়ত মনে মনে সে সন্তানের কথাই ভাবছিল। মেইজি বোধহয় এখন স্কুলে। তবে রেইমন্ড এখন বাড়িতে থাকতে পারে। গত সপ্তাহ দুই সে এত ব্যস্ত ছিল যে তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়নি।

যে মেয়েটা দরজা খুলল সে যেন কোরাকে দেখে বিব্রত। কোরা নিজের পরিচয় দেবার পরও তার সন্দেহ যায় না।

“আমার তো মনে হয় তোমার নাম বেসি”,মেয়েটা জিজ্ঞেস করে। খুব হালকাপাতলা গড়নের ছোট্ট মেয়েটি এমন শক্ত করে দরজার পাল্লা ধরে আছে যেন কোন অপরিচিত কেউ ঘরে ঢুকতে না পারে। “কিন্তু তুমি বলছ, তোমার নাম কোরা!” কোরা ডাক্তারের মুন্ডুপাত করে বলল, তাকে বেসি নাম দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে হুবহু তার মায়ের মতই দেখতে বলে এখানে সবাই তাকে কোরা ভাবে।

“মিসেস এন্ডারসন এখন বাসায় নেই। বাচ্চারা খেলতে গেছে। তুমি বরং পরে এক সময় এসো যখন উনি বাসায় থাকেন,” বলেই মেয়েটো মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল।

কোরার পা যেন চলছিল না। নিরুপায় কোরা আড়াআড়ি পথে চলতে শুরু করল। সিজারের সাথে কথা বলতে পারলে ভাল হত। কিন্তু সে তো এখন কারখানায় ব্যস্ত। খাবার সময় পর্যন্ত সে বিছানায় শুয়ে কাটিয়ে দিল। এরপর থেকে সে এন্ডারসনের বাড়ির পাশের রাস্তা এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

সপ্তাহ দুই পর মি: ফিল্ডস জাদুঘরে পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শনে এলেন। কাঁচের দেয়ালের পাশে আইসিস ও বেটি তাদের অভিনয়ের কাজগুলো বেশ রপ্ত করতে ফেলেছে। এই ঘরে নানা ভঙ্গিতে আছে নানা রকম পাখাপাখালি, জীবজন্তু, নানা গাছপালার সংগ্রহ। সেগুলো সবই এমন নিখুঁতভাবে বানানো, সাজানো যে দেখলে মনে হবে একেবারে জীবন্ত।
কোরা মোমের বানানো শ্বেতাঙ্গ মূর্তিগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফিল্ডস সাহেব জীবন্ত কিছু বানাতে পছন্দ করেন। শে^তাঙ্গ মূর্তিগুলো বানানো হয়েছে প্লাস্টার, তার আর রং দিয়ে।

একটা কাঁচের ঘরের মধ্যে দু’জন পশমের উপর বসে প্লেমাউথ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আর জাহাজে তাদের সহযাত্রীরা পাহাড়ের গায়ে আঁকা ম্যুরাল দেখছে।

বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে তারা এক নতুন জীবন শুরু করবে। আরেক জায়গায় তৈরি করা হয়েছে একটা জাহাজ ঘাটে ইন্ডিয়ান মোহাক উপজাতির পোশাক পরে শে^তাঙ্গরা জাহাজের এক পাশে চায়ের গাঁট স্তূপ করছে। তাদের গায়ে জড়ানো নানা রকম শেকল। যদিও তারা কোন বিদ্রোহের আভাস দেখায় নি। অবশ্য বিদ্রোহীরা চিরকালই বিদ্রোহের অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে।

এমন পরিদর্শনের উদ্দেশ্য পর্যটক আকর্ষণ করা। লোকে পয়সা খরচা করে এগুলো দেখতে আসে। দু’জন নিবেদিতপ্রাণ অভিযাত্রী এসেছেন পশ্চিমের পাহাড়ের শেখরগুলো ভাল করে বুঝার জন্য। তারা একদৃষ্টিতে সে সবের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কত কষ্ট সহ্য করেই না অভিযাত্রীরা এমন খাড়া পাহাড় জয় করেছে। কে জানত কোথায় কোন বিপদ লুকিয়ে ছিল। আগামি দিনের জন্য তারা জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিল।
শেষ জানালার কাছে দেখা যাচ্ছে একজন রেড ইন্ডিয়ান তিনজন সাহেবের কাছ থেকে চামড়ার কাগজে লেখা একটা চুক্তিপত্র গ্রহণ করছে।

“এটা কি?” আরেকটি ঘরে একটা তাঁবু দেখিয়ে আইসিস জানতে চাইল।
“টেপি। আগের কালে উত্তর আমেরিকার আদিবাসীরা কয়েকটা খুঁটির চারপাশে চামড়া দিয়ে ঘিরে তাঁবু বানাত। এটা হল গিয়ে আসল টেপি। আমরা দর্শকদের আমেরিকা সম্পর্কে ঠিকঠাক ধারণা দিতে চাই। তাই এ ব্যবস্থা।”
“তারা এর মধ্যে ঘুমোতো?”

সাহেব তাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলেন। এরপর মেয়েটি তার নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
ডামি নাবিককে কোরা জিজ্ঞেস করে, “তোর কি মনে হয়, স্কিপার জন, ইরা যা বলচে, দেখাচ্চে, সি রকমই সব ঘটিল ? ইসব সত্তি? ডামি নাবিকের সাথে এভাবেই কোরা কথাবার্তা জমিয়ে মজা করে। এটা যেন অনেকটা থিয়েটারের মত সংলাপ। ওদিকে ডামি নাবিকের চোয়ালের রঙ গলে আসল মোমের রং আলগা হয়ে গেছে।

চামড়া শুকিয়ে ভেতরে এটাসেটা ভরে স্টাফ করে রাখা কোয়েটো জাতের যে নেকড়েটা খুঁটির পরে রাখা সেটা কিন্তু মিথ্যে বলে মনে হয় না কোরার। এছাড়া পাহাড়ি

পিঁপড়েগুলোও আসল মনে হয়। তবে আর যে সব জীবজন্তু স্টাফ করে রাখা সেগুলো নিয়ে কোরার মনে সন্দেহ প্রচুর। সেগুলো যেন ঠিক আসলের মত নয়, কৃত্রিম। কোন শে^তাঙ্গ কোন কৃষ্ণাঙ্গকে অপহরণ করছে আর তাদের ধ্বস্তাধ্বস্তিকে জাহাজের ডেকে সামান্য ঝাঁকুনির সৃষ্টি হতে পারে এমন কোন দৃশ্য এখানে রাখা হয় নি। নিচের ডেকে আফ্রিকান ছেলের জুতো পায়ে একটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছে তার পা শক্ত করে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। ফলে সে নিজের মলমূত্রের মধ্যেই গড়াগড়ি খাচ্ছে। গোলামি আসলে সুতো পাকানোর মত একটা ব্যাপার। একঘেয়ে কাজ করতে করতে তারা সবাই ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সেদিকে কারো  ভ্রুক্ষেপ নেই। আসল কথাগুলো কেউ কখনও প্রকাশ করবে না। কেউ তাদের যন্ত্রণার কথা শুনতেও চায় না। এসব প্রদর্শণীতে সত্যের প্রতিফলন কমই ঘটে। অনেক কিছুই থাকে যা শুধু দর্শককে আকর্ষণ করার জন্য।
সাদারা দলে দলে এদেশে আসছে কেবলমাত্র স্বদেশে প্রভূদের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পেতে। আর তাদের মনিবরা আসছে নতুন বিপুল সম্পদের মালিক হতে। কিন্তু সেকথা সবাই অস্বীকার করে। একে অপরের প্রতি সহানুভূমিতও নেই। বিষয়টা শ্রেণীগত। র‌্যান্ডেলে মাইকেল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র আবৃত্তির কথা শুনেছে। সে আবৃত্তি গ্রাম থেকে গ্রামে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হত। তার মাথামুণ্ড কিছুই সে কখনও বুঝত না। অন্যরাও যে বুঝত তেমন নয়। তবে শুনতে ভাল লাগত। তবে সবাই সমান কথাগুলো বেশ মনে ধরত। যে সব শে^তাঙ্গ এসব কথা লিখেছিলেন তারা অন্যদের কথা ভাবেন নি। তারা সবাইকে মানুষ বলেও স্বীকার করতেন না। সকল মানুষ অর্থ সব মানুষ নয়। ইচ্ছে করলেই সবাই সব জিনিসের মালিক হতে পারবে না। স্বাধীনতা তো নয়ই। যে জমিন এখন তারা চাষাবাদ করছে সেটা তো আসলে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের। সে জানে, এইভাবে পরদেশ জবরদস্তি দখল করে এই শে^তাঙ্গরা তার মালিক হয়েছে। আর এ জন্য লক্ষ লক্ষ আদিবাসী নারী-পুরুষ-শিশুকে এরা হত্যা করেছে; কী বীভৎস হত্যাযজ্ঞ তারা চালিয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে।

ইউরোপ আফ্রিকা থেকে দলে দলে মানুষ চুরি করে এনেছে। জোর করে আমেরিকার ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে জবরদস্তি অধিকার করা জমিনে তাদের জবরদস্তি খাটাচ্ছে। এখানে জোর করে যাদের খাটানো হচ্ছে তাদের যেমন চুরি করে আনা, তেমনি যে জমিনে তাদের খাটানো হচ্ছে তাও চুরি করা। এই হল আমেরিকান সভ্যতা। ইউরোপ থেকে দলে দলে এসে তারা আদিবাসীদের সবকিছু লুট করেছে, জমিন থেকে উৎখাত করেছে। এটা এমন এক ইঞ্জিন যা থামতে জানে না। তার বয়লারে শুধু মানুষের রক্ত টগবগ করে ফুটছে। কোরার মনে হয় ডাক্তার স্টিভেন্স এই সব স্বপ্ন চুরির কথাই বলছিলেন। সাদারা এভাবেই কালোদের সব কিছু চুরি করে নেয়।

কালো মেয়েদের পেট কেটে তাদের ভবিষ্যৎকে কেড়ে নাও। যতক্ষণ তারা এই পৃথিবীতে থাকবে তাদের সাথে নিষ্ঠুরতম আচরণ কর। তারপর কেড়ে নাও তাদের সব স্বপ্ন পর্যন্ত। স্বপ্ন, আশা নিঃশেষ হলে আর কী অবশিষ্ট থাকে মানুষের?
কোরা স্কিপার জনকে জিজ্ঞেস করে, “এটা কি ঠিক?”

এক রাতে কোরা লক্ষ্য করল, ৪০ নম্বরে আলো জ¦লছে না। এমন কি ভর সন্ধ্যায়ও না। অন্যদের কাছে সে এর কারণ জানতে চাইল। কেউ একজন বলল, “তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সেখানে তারা এখন ভাল থাকবে।” (চলবে)

 

আমিরুল আলম খান 

ন্ম যশোর জেলার ভারতীয় সীমান্তলগ্ন শিববাস গ্রামে ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ১৫ই অগ্রহায়ণ।
পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে যুক্ত থেকেছেন। যশোর শিক্ষা বোর্ডে প্রথমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পরে চেয়ারম্যান ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি অপেশাদার সাংবাদিকতায় যুক্ত গত পাঁচ দশক ধরে। ইংরেজি দৈনিকে নিউ নেশান-এ প্রায় এক দশক সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, সমকাল, বণিক বার্তায় কলাম লেখেন।

গ্রামীণ পাঠাগার আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে গ্রামোন্নয়নের নতুন মডেল ডিহি ইউনিয়ন পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশের প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম গণপাঠাগার যশোর পাবলিক লাইব্রেরির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিক্ষা, ভাষা, প্রকৃতি, কৃষি, বাস্তুসংস্থানবিদ্যায় আগ্রহী। এসব নিয়েই তার বই: বাঙলার ফল, অরণ্যের পদাবলী, পারুলের সন্ধানে, কপোতাক্ষ-মধুমতীর তীর থেকে, বিপর্যস্ত ভৈরব অববাহিকা, পারুল বিতর্ক, বাংলাদেশের শিক্ষার স্বরূপ সন্ধান এবং বিদ্যাবাণিজ্যের রাজনৈতিক-অর্থনীতি।

তাঁর অনুবাদগ্রন্থ: আফ্রিকান-আমেরিকান উপন্যাস দি স্লেভ গার্ল। হ্যারিয়েট অ্যান জেকব রচিত এই আত্মজৈবনিক উপন্যাসটি বোস্টন থেকে প্রকাশিত হয় ইনসিডেন্টস ইন দ্য লাইফ অব এ স্লেভ গার্ল শিরোনামে, ১৮৬১ সালে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।