শকুন্তলা চৌধুরীর গল্প: কোনো একদিন

কে যেন আস্তে আস্তে কানে কানে বললো, “মনে পড়ে? অঙ্ক করতে করতে খাতা সরিয়ে রেখে হঠাৎ তুমি কবিতা লিখতে বসে যেতে?…হঠাৎ আসা ভাবের বন্যাকে ধরতে গিয়ে খাবার ঠাণ্ডা করে দিতে? মনে পড়ে…?”

– “হ্যাঁ, পড়ে…।”

– “এখন আর লেখো না ?”

– “এখন…”

দিওতিমার আর উত্তর দেওয়া হলোনা – তার আগেই মৃদু রিনঝিন শব্দে পাশে রাখা সেলফোনের এ্যালার্মটা দু’বার বেজে উঠে থেমে গেলো। ঋষভের যাতে ঘুম না ভাঙে তাই এই সতর্কতা। পাশেই অঘোরে ঘুমোচ্ছে ঋষভ, ওর এ্যালার্ম বাজবে আরো একঘন্টা পরে।

ঘুমচোখে হাতড়ে হাতড়ে বেডসাইড টেবিল থেকে রিমোটটা নিয়ে বাটন্ টিপলো দিওতিমা। পর্দাটা ধীরে ধীরে দুপাশে সরে গেলো। দু’হাতে চোখ মুছে অভ্যাসমতো দেওয়াল-জোড়া কাঁচের জানালার বাইরে তাকালো—লন-ছুঁয়ে-রাখা জঙ্গলের মাথায় প্রথম সূর্যের লালিমা। “তোমার জন্যে একমিনিট” বলতে বলতে গিয়ে দাঁড়াল জানালার সামনে—

ওম্ শ্রী শ্রী জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং ধান্তারীং সর্বপাপঘ্নং প্রণোতোস্মি দিবাকরম্…।

শাওয়ার নিয়ে, পূজো করে, রেডি হয়ে নীচে নেমে ব্রেকফাস্ট টেবিলে দিতে না দিতে ঋষভ আর মোহনা হাজির। এরপর পাঁচমিনিটের একটা ম্যারাথন। ঝড়ের বেগে যে যার গ্লাসে চুমুক দিয়ে, ফ্রুট আর বার হাতে নিয়ে গ্যারাজ-ডোর খুলে গাড়িতে চড়া। “মহু, তোমার লাঞ্চ….” বলে লাঞ্চব্যাগটা মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দিওতিমা পাশের গাড়ির দরজা খুললো। ঋষভ ততক্ষণে মেয়েকে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট করেছে, জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বল্লো, “দিয়া, তুমি আজ মহুকে তুলে নিও— আমার দেরী হবে।”

গাড়ি স্টার্ট করে গ্যারাজের বাইরে এসে ভুরূ কোঁচকালো দিওতিমা— ড্রাইভওয়ে ক্লিন করেনি এখনো। ডেভকে বলা আছে যে সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যে স্নো পরিষ্কার করে যেতে হবে, কিন্তু মাঝেমাঝেই ও এই কাণ্ডটা করছে। এবারে কন্ট্রাক্টটা অন্য কাউকে দিতে হবে। সাবধানে গাড়ী ম্যান্যুভার করে বড় রাস্তায় এনে ফেল্লো দিওতিমা, সেখান থেকে ইন্টারস্টেট ৫ মিনিটের ড্রাইভ— হাইওয়ে পরিষ্কার করে গেছে, তবু ভালো। প্রথম মিটিং সকাল ৮টায়, এ্যাক্সেলেরেটরে চাপ দিয়ে একবার ঘড়ি দেখে নিলো।

গাড়ী পার্ক করে আবার ঘড়ি দেখলো—না, দেরী হয়নি। কোটের বোতাম এঁটে হাঁটা দিলো। লিণ্ডা ডাকলো পেছন থেকে – “হাই দিয়া!” দাঁড়িয়ে গেলো দিওতিমা। লিণ্ডা পাশে এসে বললো – “আই ক্যান্ট বিলিভ টুডে ইজ দ্য ফার্স্ট ডে অফ দ্য স্প্রিং…..লুক এ্যাট্ দ্য ওয়েদার !” দিওতিমা হাসলো, ও ভুলেই গিয়েছিলো আজকের তারিখটা।

একবার ভাবলো সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাটা ট্র্যানস্লেট করে বুঝিয়ে দেবে নাকি লিণ্ডাকে ? কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে ইচ্ছেটা দমন করলো। নিজের অফিসের দিকে পা বাড়িয়ে বল্লো— “সী ইউ লেটার”।

টেবিলে ব্যাগ রেখে কম্পিউটার অন্ করতে করতে মনে মনে বল্লো, “এই শুরু হলো দিনের দ্বিতীয় ম্যারাথন।”

আটটা বাজতে এখনো সাত মিনিট বাকী। প্ল্যানারের ক্যালেণ্ডারে চট্ করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো দিওতিমা— প্রথম মিটিং বসের সঙ্গে। এরপর আছে বিজনেস প্ল্যানিং মিটিং, মডেল ডেলিভারেবল টাইমলাইন উইথ দ্য স্টেকহোল্ডারস্, ভেণ্ডারস্ মিটিং, টিম মিটিং, মিটিং উইথ দ্য আই টি টিম…উফ্ ! মিটিং-এর পর মিটিং ! মাঝে মাঝে মনে হয় মিটিং একটু কম করলে বোধহয় কাজটা একটু বেশী করা যায়। কিন্তু কি আর করা ? যস্মিন্ দেশে যদাচারম্ ! গলার স্কার্ফটা একটু ঠিক করে দরজার পেছনে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা ব্লেজারটা গায়ে চাপিয়ে ও পা চালালো বসের ঘরের দিকে।

উইকলি ওয়ান-অন-ওয়ান মিটিং, রুটিন যাকে বলে। বস্ তার বসের থেকে শোনা কথাগুলো দিওতিমাকে শোনাবে, ওয়ার্কলোডটা ওকে পাস্ অন্ করে দেবে আর পরিশেষে খোঁজ নেবে সব কেমন চলছে…’ হাউ ইজ দ্য লিটল্ এ্যাঞ্জেল (মহু) ডুইং’ ইত্যাদি।

দিওতিমা হাসিমুখে মিটিং শেষ করে লিস্টে টিকমার্ক দিলো— এরমধ্যে থেকে কোন্ কোন্ প্রজেক্ট কাকে কাকে দিতে হবে। নিজের অফিসে ফিরে এসে পরের মিটিং-এর ফাইলটা তুলে নিতে নিতে একবার ইমেইল চেক করে নিলো— মডেল রেজাল্টগুলো নিয়ে বসতে হবে, এমা পাঠিয়েছে তো লেটেস্ট আউটপুটটা?

এই করতে করতে কখন যে সকাল গড়ালো…… ঘড়িতে বারোটা বেজে তেইশ, পরের মিটিং একটাতে।

“এবারে পেটে কিছু দাও” – নিজেকেই নিজে বল্লো দিওতিমা— “নাহলে আর সেকেণ্ড হাফ-এ টানতে পারবে না….আই টি-র ভ্যাজর ভ্যাজর আর বস্তাপচা এক্সকিউজগুলো হাসিমুখে শুনতে হবে তো ?”

কাফেটেরিয়া থেকে একটা চিকেন স্যালাড নিয়ে এসে বসল ও, মোবাইলটা হাতে নিয়ে হোয়াটস্ এ্যাপ খুললো।

বারোটা নিউ নোটিফিকেশানস্! প্রথম গ্রুপে কলেজ ব্যাচমেটসদের পাঠানো ৩৩টা নিউ মেসেজ— জোকস্, ভিডিও ফরওয়ার্ড, আর ‘বসন্ত এসে গেছে’র বন্যা…..সব পড়া হয়না কোনোদিনই, আলতো চোখ বুলিয়ে পরের নোটিফিকেশনে গেলো । স্কুল ব্যাচমেটসদের ‘বসন্ত শুভেচ্ছা’…একই মেসেজ!

পরেরটা বৃষ্টি পাঠিয়েছে — “কেমন আছিস্ ? উইকেন্ড-এ ফোন করবো।”

একটু গিল্টি ফিল করলো দিওতিমা। খুড়তুতো বোন, সমবয়সী, এখন মিডল্ ইস্টে আছে। ওর কোনো ছেলেমেয়ে নেই, মহুকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে। প্রায়ই ফোন করে। দিওতিমা প্রতিবারই ভাবে যে ‘পরের বার আমি ফোন করবো’, কিন্তু হয়ে ওঠে না। উইকেন্ড এলেই মহুর এ্যাকটিভিটিস নিয়ে দৌড়োদৌড়ি, তার ফাঁকে লণ্ড্রী, গ্রসারী, সারা উইক-এর রান্না করে রাখা— সময় আর হয়না!

পরের মেসেজটা ঋষভের— ‘কোনো মজার ভিডিও নিশ্চয়ই, চট্ করে দেখে একটু হেসে নিই একা একা…..পরের মিটিং-টা যাদের সঙ্গে তারা দুজনেই রামগড়ুরের ছানা’ ভাবতে ভাবতে খুললো দিওতিমা।

খুলেই অবাক— “প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস….”

আজকে ৬ই চৈত্র ??? অন্ লাইন বাংলা ক্যালেণ্ডার চেক করলো দিওতিমা— ঠিক ! ফার্স্ট ডে অফ স্প্রিং-এর সঙ্গে এবার একদিনে পড়েছে ওর আর ঋষভের প্রথম দেখা হওয়ার দিনটা। কেন যে ঋষভ এই দিনটা বাংলা ক্যালেণ্ডার ধ’রে সেলিব্রেট করে ! বাংলা ক্যালেণ্ডার কারুর মনে থাকে ?

ঋষভ বলে— “থাকে, থাকে, একটু চেষ্টা করলেই থাকে। আরে, জন্মদিন থেকে আরম্ভ করে বিবাহবার্ষিকী, সবই তো ইংরেজী মতে সেলিব্রেট করছি —এটা একটু অন্য থাক।…. তোমাকে তো আর আমি স্নো-ঢাকা আমেরিকার মাটিতে প্রথম দেখিনি, তোমাকে যেখানে প্রথম দেখেছিলাম…।

ঋষভ বলে – “থাকে, থাকে, একটু চেষ্টা করলেই থাকে। আরে, জন্মদিন থেকে আরম্ভ করে বিবাহবার্ষিকী, সবই তো ইংরেজী মতে সেলিব্রেট করছি – এটা একটু অন্য থাক।…. তোমাকে তো আর আমি স্নো-ঢাকা আমেরিকার মাটিতে প্রথম দেখিনি, তোমাকে যেখানে প্রথম দেখেছিলাম সেদেশে চৈত্রমাসের বেলাশেষের আলো অনেক কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই চৈত্রমাসটাই ভালো।”
ক্যাথলিক স্কুলে পড়া ঋষভের অকেশনাল রোমান্টিসিজম্ !

একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলো দিওতিমা – জীবনে কতো বসন্ত এলো আর গেলো ! হিসেব রাখারও যেন সময় হয়না। দেশ পাল্টেছে, বেশ পাল্টেছে, খাওয়া পাল্টেছে…..সে নিজেও কি পাল্টায়নি ? তবু কোথায় যেন সেই লম্বা বেণী ঝোলানো তাঁতের শাড়ী পরা কলকাতার কাজলনয়না দিওতিমা সেন এখনো লুকিয়ে বসে আছে এই স্টেপ-কাট্ চুলের ওয়েস্টার্নাইজড্ দিয়া বাগচীর মধ্যে। অন্তঃসলিলা ফল্গুনদীর মতো। তাকে দেখা যায় না, কিন্তু সে আছে।

…..ডিনার-এ বাইরে যাওয়া যাবে আজ রাতে ? বোধহয় না, মহুর এক্জাম উইক চলছে, তারওপর উইকেণ্ড-এ ওর ‘স্যাট’ প্রেপ টেস্ট; তাছাড়া ঋষভের-ও দেরী হবে, ইউরোপীয়ান অফিস থেকে টিম এসেছে – হয়তো ডিনার থাকবে। আর বেশী ভাবার সময় নেই। ঋষভকে উত্তরে “থ্যাঙ্কস্ ঋষ্” আর একটা স্মাইলি ফেস পাঠিয়ে দিওতিমা দৌড় দিলো ফাইল হাতে।

ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে সব গুছিয়ে যখন গাড়ীর দিকে হাঁটা দিলো, তখন ঠিক পাঁচটা বেজে দশ মিনিট। মহুকে স্কুল থেকে তুলতে হবে ছ’টার মধ্যে। আবার ম্যারাথন !

কপাল ভালো যে আজ ট্র্যাফিক ততো খারাপ নয়, অফিস থেকে মহুর স্কুল আর স্কুল থেকে বাড়ী পৌঁছতে বেশী দেরী হলো না। ডেভ স্নো ক্লিন ক’রে ড্রাইভওয়ে ঝকঝকে করে দিয়ে গেছে। গাড়ী পার্ক করে, মেইলবক্স থেকে মেইল নিয়ে ঘরে ঢুকলো দিওতিমা।
মেয়েকে বললো – “আমি চেঞ্জ করে এসেই তোমাকে ডিনার দিয়ে দিচ্ছি…..ইউ জাস্ট ফ্রেশেন আপ, ওকে?”
মহু ওপরে উঠতে উঠতে বললো – ” আই এ্যাম স্টার্ভিং…হোয়াটস্ ফর ডিনার, মম্ ?”
“এসেই দ্যাখো না !” ব’লে হাসতে হাসতে শ্রিম্প ক্যাসারোল-টা মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে চেঞ্জ করতে গেলো দিওতিমা । এটা মেয়ের পছন্দের ডিশ !

ডিনার টাইমের আড্ডাটা মহুর ফেভারিট – কলকল কলকল করে স্কুলের গল্প বলে যায়। টিচার্স, ফ্রেণ্ডস, ক্লাবস, অনার্স সোসাইটি, ‘ডেকা’ কম্পিটিশন, স্নো-বোর্ডিং ট্রিপ, ডান্স শো, কলেজ এ্যাপ্লিকেশন – কতো যে কথা ! দিওতিমা খুব মন দিয়ে শোনে। এ’দেশে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খোলামেলা বন্ধুত্ব না রাখলে মুস্কিল, কবে যে দূরত্ব তৈরী হয়ে যাবে বোঝাই যাবে না। এদের জগতটাই অন্যরকম।

নিজের এই বয়সের সঙ্গে মহুর এই ১৬ বছর বয়সটা মাঝেমাঝে তুলনা করে দিওতিমা – এদের কতো এক্সপোজার, কতো প্রাচুর্য, কতো নলেজ, কতো ইনডিপেন্ডেন্ট থিঙ্কিং, অথচ কতো সরলতা ! স্বাধীনতার আকাঙ্খাটাও এদের অনেক বেশী – এতো স্বাধীনতা পাওয়া দূরে থাক, চাওয়া যে যায় তাই জানতো না ছোটবেলার ঋষ্-দিয়ারা ! সেটা মেয়েকে বলেওছে দিওতিমা। মহু তার উত্তরে ওর বিশাল উজ্জ্বল চোখ দুটো তুলে ধ’রে বলেছে – “কেন মম্ ? ইজ ইনডিপেন্ডেন্স ব্যাড?……ডিডন্ট ইয়োর আঙ্কলস্ অল ফাইট ফর ইণ্ডিয়াস্ ইনডিপেন্ডেন্স ?”
– “আরে, সেটা তো অন্য ইনডিপেন্ডেন্স ! দেশের ইনডিপেন্ডেন্স !”
– ” ইটস্ অল দ্য সেম মা……. ইনডিপেন্ডেন্স ইজ নট্ ব্যাড, মিসইউজিং ইনডিপেন্ডেন্স ইজ ব্যাড। আই প্রমিস ইউ, আই উইল নেভার ড্যু দ্যাট।” ঋজু, স্বচ্ছ মহুর দিকে তাকিয়ে মুখে আর কথা সরেনি দিওতিমার।

মহু খেতে খেতে বললো – “আই এ্যাম স্টিল হাঙ্গরি…..ড্যু ইউ হ্যাভ ডালসেদ্ধ ভাত, মা ?”
“শিওর”। দিওতিমা মেয়েকে ডালভাত এনে দিলো।
ঋষভ টেক্স্ট করেছে, ওদের পুরো টিম নিয়ে ডিনারে গেছে – তাই নিজের খাবারটাও নিয়ে বসে পড়লো একসঙ্গে।

খাওয়া শেষ করে উঠে টেবিল ক্লিন করতে করতে দিওতিমা মেয়েকে বললো – “আই ক্যান ড্যু ইট মাইসেল্ফ সোনা, তুমি ওপরে যাও – ইউ হ্যাভ এ্যান এক্জাম টুমরো।”
– “আর ইউ শিওর?”
– “এ্যাবসোলিউটলি।” মহু তবু ডিশগুলো একটু গুছিয়ে দিয়ে গেলো। ডিশওয়াশার লোড ক’রে, চালিয়ে দিয়ে, গ্রীন টি-র কাপ হাতে নিয়ে দিওতিমা কিচেন টেবিলে এসে বসলো। আজকের মতো ম্যারাথন শেষ !

এই জায়গাটা খুব প্রিয় দিওতিমার। টেবিলের সামনের দরজা দিয়ে বেরোলেই ডেক, তারপরে প্রশস্ত লন, লন-এর শেষে জঙ্গল শুরু। জঙ্গলের থেকে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে আসে হরিণ, খরগোশ, বুনো টার্কি, কদাচিৎ একেকদিন কায়োতি…..দিওতিমার খুব ভালো লাগে ওদের সঙ্গে এই গা ঘেঁসাঘেঁসি করে থাকা। উইন্টার-এ অবশ্য কদাচিৎ এদের দেখা মেলে। কিন্তু বোঝা যায় যে ওরা আছে – স্নো-এর ওপর পায়ের ছাপ রেখে যায় রাতের অন্ধকারে।

প্রায় সাড়ে সাতটা বাজে – ‘ডে-লাইট সেভিংসের’ এর ঘড়ি সবে শুরু হয়েছে, এখনো দিনের আলো রয়েছে। এদেশে এই একটা নিয়ম আছে – প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘড়ি আগুপিছু করে নেওয়া। ফল্ সিজনের শুরুতে ঘড়ি পেছোয় একঘণ্টা, স্প্রিং-এ আবার এগিয়ে আসে একঘণ্টা। আর কিছু লাভ হোক না হোক, মনটা তৈরী হয় শীত এবং গ্রীষ্মের তারতম্যের জন্য।

এখনো তাই। শীত যায়নি, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে উষ্ণ গ্রীষ্ম ঋতু আগতপ্রায়। লন-এর ওপর বনের ছায়া আর কনে-দেখা আলোর মায়া। গাছেরা বরফের তৈরী আইসিকল্-এর গয়না প’রে নির্বাক দাঁড়িয়ে। চারিদিক এতো নিস্তব্ধ যে একটা পাখী উড়ে গেলেও বুঝি শব্দ শোনা যাবে।

এমন সময় হঠাৎ, একেবারে হঠাৎ, দিওতিমাকে অবাক করে দিয়ে দুটো হরিণ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলো। ধূসর রঙে পিছলে পড়ছে পড়ন্ত সূর্যের কমলিমা – শীতের ‘উইন্টার কোট’ ফেলে খয়ের রঙের সাজ পরার সময় হয়নি এখনো। একটির মাথায় রাজমুকুট, আরেকটি মুকুটহীনা গরবিনী। স্নো-এর ওপর দিয়ে হেঁটে এসে ঠিক ডেক-এর সামনে দাঁড়ালো দু’জনে, মুখোমুখি। কাজলনয়ন ঘুরিয়ে কাঁচের ভেতর দিয়ে দিওতিমাকে একবার দেখলো কি দেখলো না ! ঘুরে দাঁড়িয়ে পরস্পরের মুখে মুখ রেখে আকাশে চোখ তুলে তাকালো – তাকিয়েই রইলো। মুহূর্ত কয়েক, তারপর চোখ নামিয়ে এনে নির্নিমেষে চেয়ে রইলো এ’ ও’র দিকে। যেন একজন আরেকজনকে বলছে – “তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ !” …..

আচ্ছা, ওরা কি জানে আজকের তারিখটা ? নাঃ, ওরা তো দিন-মাসের হিসেবের বাইরে – ওরা ক্যালেণ্ডার দেখে আনন্দ করে না। কোনো ম্যারাথন ওদের অবসরের অবকাশটা পরিমিত করে দ্যায় না।……

কার বার্তাবহ ওরা, দিওতিমাকে একমুহূর্তে পৌঁছে দিলো শীত থেকে বসন্তে – দিওতিমার চোখের সামনে প্রহরশেষের রাঙা আলো অনায়াস যাদুতে পাল্টে দিলো প্রেক্ষাপট। দিওতিমা পৌঁছে গেলো কুড়ি বছর আগের এক স্বপ্ননগরীতে। আইসিকল্-এ সাজা গাছেরা ঝুলিয়ে দিলো লাল-লাল কৃষ্ণচূড়ার তোড়া। লন বইয়ে দিলো ঠান্ডা দখিনা বাতাস। চারদিকের নৈঃশব্দ ভরে গেলো চেনা কলকাকলীতে।
– “তোরা সব কোথায় ছিলি রে….আগে তো দেখিনি ?” ফিসফিস করে বললো দিওতিমা।
ওরা বললো – “এখানেই তো ছিলাম, এখানেই আছি, এখানেই থাকবো !”
– “তোরাও কি অন্তঃসলিলা ?……আজ শুধু জেগে উঠেছিস ফল্গুনদীর মতো ?…….”
ওরা হেসে উঠলো, হাসতেই থাকলো…….চারদিক ভরে গেলো ঝর্ণার মতো মিষ্টি হাসির শব্দে…….আর ঠিক তখনই –

গ্যারেজ-এর শব্দ হল কি ? ঋষভ ফিরলো তাহলে।
দিওতিমা-ও হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালো।
আলো জ্বালিয়ে, মিউজিক সিস্টেম-টা অন্ করে ঋষভের প্রিয় গানটা চালিয়ে দিলো – ‘বনে নয়, মনে মোর পাখী আজ গান গায়’।

তারপর মনে মনে বললো – “এই তো আমার কবিতা – আমি এখন প্রতিদিন এই কবিতাই লিখি….!”

শকুন্তলা চৌধুরী

জন্ম কলকাতায়, বড় হয়েছেন বি. ই. কলেজ ক্যাম্পাসের প্রফেসরস্ কোয়ার্টারে। পড়াশোনা কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিয়ে এবং তথ্যবিজ্ঞানে পিএইচডি করার সূত্রে বিদেশগমন। কর্মসূত্রে বর্তমানে মিশিগানের বাসিন্দা।

স্কুলজীবন থেকেই নিয়মিত লেখেন তিনি। বাতায়ন, পরবাস, ঋতবাক এবং আরো বহু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে শকুন্তলার কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস।

শকুন্তলার লেখা গান ভিডিওতে পরিবেশন করেছেন রূপঙ্কর বাগচী, নচিকেতা চক্রবর্তী, কায়া ব্যাণ্ড। প্রকাশিত গ্রন্থ পৃথা (ঋতবাক প্রকাশনী)।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।