পাপড়ি রহমানের স্মৃতিগদ্য: সুরমাসায়র

প্রাণের রাজা

 আমাদের ক্লাসের সব চাইতে লম্বা আর ঢ্যাঙা মেয়েটাকে আমার নানান কারণেই পছন্দ হতো। তার ছিল অত্যন্ত মৃদু-স্বর। নম্র স্বভাব। কিন্তু ক্লাসের পড়াশুনা তাকে তেমন টানত না, যেমন টানত ট্রেণ্ডি ফ্যাশন ও চলচ্চিত্রের নানান খুঁটিনাটি । সে ছিল নায়িকা ববিতার ডাইহার্ড-ফ্যান। পত্রপত্রিকার যেখানে যেখানে ববিতার ছবি ছাপা হতো, সে পেপার কাটিং করে নিজের খাতার ভাঁজে জমা করে রাখত। ববিতা বলতে সে ছিল দিওয়ানা। তার গলায় ঝোলানো ছোট্ট লকেটের ভেতরে আমরা নায়িকা ববিতার হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি দেখতে পেতাম। তার হাত দুটি ছিল পেলব। একেবারে পদ্মফুলের ডাঁটার মতো কোমল সৌন্দর্যে ভরপুর। ম্যানিকিউর করা নখগুলি ছিল গোলাপি আভাযুক্ত গোলাপ-পাপড়ির ন্যায়। ক্লাসের অফ-পিরিয়ডে তার সাথে আমার খুব জমে উঠত। কিংবা বলা চলে আমার সাথে তারও।

একদিন খলনায়ক খলিল [চলচ্চিত্র অভিনেতা] কী কাজে যেন আমাদের ইশকুলে এল। খলিল চেয়ার পেতে বসে রইলো আমাদের সাইন্স-ল্যাবের বারান্দায়। পুকুরের এপার থেকে, বিশাল ঘুমগাছের শাখা-পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে আমরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে লাগলাম তাঁকে। আহা! তখন তো সিনেমার যে কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দেখলেই আমাদের পরান-পক্ষী উড়াল দিত! ইস! যদি একটা কথা বলা যেত তাঁর সাথে? কিংবা তাঁর সাথে একটা ছবি যদি তোলা যেত! কিংবা ছায়ার মতো কাছে দাঁড়িয়ে তাঁকে যদি একবার দেখা যেত! অথবা যে কোনো ছলে তাঁকে একটু স্পর্শ করা যেত!

খলিলকে আমরা দূর থেকে দেখছি, কিন্তু ভয়ে বা সঙ্কোচে কেউ কাছে যেতে পারছি না। খলিলও ভয়ানক কঠিন মুখ করে বসে আছেন। হঠাৎ দেখি আমাদের ক্লাসের লম্বা আর ঢ্যাঙা মেয়েটাই অত্যন্ত সাহস নিয়ে খলিলের কাছে এগিয়ে গেল। খানিক বাদে ফিরে এসে তার হাতের খাতাটি মেলে ধরল আমাদের চোখের সামনে। আরে! খলিল তাকে অটোগ্রাফ দিয়েছে। রোলটানা খাতার দুইপাতা জুড়ে লিখে দিয়েছে—

শুভেচ্ছান্তে, খলিল

এ তো দেখি যাদুকরী-কাণ্ড! এই মেয়ে তো দেখি দারুণ স্মার্ট! খলিলের কাছ থেকে অটোগ্রাফ বাগিয়ে এনেছে!

ওই অটোগ্রাফ দেখে নিজেকে খানিকটা গ্রাম্য-ক্ষেত টাইপের মনে হয়েছিল। আমি তো ভয়ে-ভাবনায় কারো কাছে যেতেই পারি না। কথা বলতে চাইলেই হাঁটু কাঁপতে  শুরু করে ঠকঠক করে— অটোগ্রাফ আনা— সে তো সুদূর পরাহত।

ক্লাসের সবচাইতে ওই লম্বা মেয়েটার নাম নাজরীন রাজা। হাছন রাজার প্রপৌত্রী। নাজরীন রাজার শরীরে বইছে নীলরক্ত। নীলরক্ত যে বইছে তা বোঝা যেত তার চালচলন দেখে। আর যাদের শরীরে ওই রক্তের নামনিশানাও ছিল না, তাদের দেখলেও সেটা স্পষ্টই বোঝা যেত। কীভাবে তা বোঝা যেত? বোঝা যেত তাদের আচরণগত হীনমন্যতায়। নীলরক্তের অধিকারী্নি নাজরীন রাজার পাশাপাশি আমাদের ক্লাসে অবধারিতভাবেই কিছু কিছু মীনগার্ল টাইপের মেয়ে তো ছিলই। কিন্তু ইশকুলে পড়াকালীন সময়ে সেসব তেমন বুঝতে পারি নাই। তখন ছিল আমাদের দারুণ সময়, একেবারে রঙিন ফড়িংয়ের মতো ফুরফুরে জীবন। ফলত ওই নীল বা লালের ঘোরপ্যাঁচে আবদ্ধ ছিল না আমাদেরর চিন্তা-চেতনা। স্ফটিক-স্বচ্ছ ছিল তখন আমাদের সমস্ত অনুভব। কিন্তু বড় হবার পরে সেসব যেমন দেখেছি, বুঝেছি যেসব আগে কখনো উপলব্ধিতে আসে নাই। দেখা-শোনার বিচারের নিক্তিতে নিজের মেলামেশার গণ্ডিটাকেও ছোট করে ফেলছি। কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে? এবং তা খামাখাই?

নাজরীন ছিল আমার মতোই আমুদে-প্রকৃতির। ক্লাসের অফ পিরিয়ডে আমার মতোই নাজরীনও নাচ আর গানে ভরপুর থাকত। ওর ছিল গান লিখবার আলাদা একটা খাতা। সেই খাতা দেখে আমি বহু গান গেয়েছিলাম ও নিজের খাতাতেও লিখে নিয়েছিলাম। নাজরীন অন্য সেকশনে চলে গেলেও আমাদের নিয়মিত আড্ডা হতো। হতোই। আমি প্রায়ই যেতাম ওদের জল্লারপাড়ের বাড়িতে। ও আসত আমাদের বাসায়। নাজরীনের ছিল ছোট একটা ভাই আর বড় একটা বোন। আমার ছিল শুধু একটিমাত্র ছোট ভাই। ওর ভাই তাছওয়ার রাজা পড়ত সিলেট ক্যাডেট কলেজে। আমার ভাইটি যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলো, তখন সে তাছওয়ার রাজার রুমমেট হলো। ক্যাডেট কলেজের প্রতিমাসের প্যারেন্টস মিটিঙয়ে আমার আর নাজরীন রাজার দেখা হতো। টি টাইমে আমরা একসাথে বসে চা-নাস্তা খেতাম।

সিনেমার যে গানটাই তখন জনপ্রিয় হতো, আমরা সকলেই তা গাইতাম। সুরে-বেসুরে গাইতাম। ‘বাদশা’ নামের সিনেমার একটা গান তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল।

গানটার লিপসিঙে ছিল নায়িকা শাবানা। আমিও গানটা সারাদিন গাইতাম। বিশেষ করে নাজরীনকে দেখলেই। যেহেতু নাজরীনের নামের শেষাংশে ‘রাজা’ পদবীটা উজ্জ্বলভাবে ঝুলে ছিল বলে।

আমি দুই হাত বাড়িয়ে গাইতাম—

                 আরে প্রাণের রাজা

                 তুমি যে আমার

            পাশে পাশে থেকো মোর চাইনা কিছুই আর

নাজরীনও পরের কলি গেয়ে উঠত—

                       আমার রানী, আমি যে তোমার

                   তুমি আরে ছাড়া জীবনে নেই তো কিছু আর

নাজরীন রাজা লম্বা ছিল বলে ও হতো নায়ক আলমগীর। আর আমি হতাম শাবানা [আহারে! আমার শাবানাময় দিনগুলি! কই যে হারিয়ে গেল সব?] নাজরীন আলমগীরের গানগুলির অংশ গাইতো আর আমি শাবানার।

তবে আমাদের একটা গান খুব ভালো লাগত। আমরা দুইজনেই সেটা দুলে দুলে টুইস্ট দিয়ে গাইতাম।

জিংগা গৌষ্ঠীর নাজমা জামানের গান।

                   তোমারই জীবনে এল কী আজ বুঝি নতুন কোনো অভিসার

                   আমি এসেছি বলে কী তোমারো মনে কী ফাগুন খুলে দিল দ্বার?

আমি আর নাজরীন ‘নাজমা জামানের’ মতো রঙঢঙ করে, গলায় আদিমভাব ফুটিয়ে এই গান গাইতাম। আজ ভাবলে অবাক লাগে, ওই দূর মফস্বল শহরে বসে আমরা তখনকার একেবারে লেটেস্ট ব্যান্ডসংগীত গাচ্ছি! এবং সবকিছুরই সংবাদ রাখছি। আমরা তখনই চিনতাম নাজমা জামান, পিলু মমতাজ ও আজম খানকে। এবং আজম খানের সেই বিখ্যাত গানটাও আমরা কোরাস করে গাইতাম—

                          আলাল দুলাল

                           আলাল দুলাল

                         তাদের বাবা হাজি চান

            চানখার পুলে প্যাডেল মেরে পৌছে বাড়ি

 

                       আমি আর নাজরীন একেবারে আজম খানের মতো গলা সরু করে এই গান আলগোছে হাওয়ার থ্রো করে দিতাম। আর তবলা সহযোগ করতাম দুই হাতের তালু আর আঙুলে কাঠের ডেস্ক বাজিয়ে। কখনও শক্ত হার্ডবোর্ডে বাঁধাই খাতা বাজিয়ে তবলার অভাব পূরণ করতে চাইতাম। ক্লান্তিহীন ছিল আমাদের ক্লাসের সেইসব গানের আসর।

সামান্য বড় হবার পরে রেডিওতে ‘রাজা কনডমের’ বিজ্ঞাপন শুনে আমি নাজরীনকে ‘রাজা কনডম’ ডাকতাম। [যদিও কনডমের ব্যবহার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও আমাদের ছিল না তখন অব্দি] । যেভাবে যত ‘ফান’ করা যায় আমি সেটাই করতাম বন্ধুদের সাথে। আর আমার বন্ধুরাও প্রায় সকলেই ছিল ‘ডোন্ট মাইণ্ড’ ঘরানার। ফলত কোনোকিছুতেই  কারো সঙ্গেই ক্ল্যাশ হতো না। এমনকি মন কষাকষিও।

বাংলাদেশ, ইন্ডিয়ার নায়িকাদের হাবভাব চালচলন সবই ছিল নাজরীনের নখদর্পণে। যেমন নায়িকারা ডান স্তনের অর্ধেক অংশ দৃশ্যমান করার লক্ষে শাড়ি পরতো খানিকটা কায়দা করে। এই ঢঙয়ে শাড়ি পরত ববিতা, নতুন, অলিভিয়া এঁরা। ক্লাস অফ থাকলে নাজরীন আমার বুকের একাংশ দৃশ্যমান করে জর্জেটের ওড়না ছড়িয়ে দিয়ে বলত—

তোকে ববিতা বানাইলাম। ববিতা এভাবে শাড়ি পরে।

নাজরীনের কাণ্ড দেখে আমরা হাসতে হাসতে লুটিয়ে পরতাম। ও চাইত আমরা সকলেই যেন স্মার্ট আর গোছানো থাকি। নাজরীন নিজেও অত্যন্ত গুছিয়ে চলত।

নাজরীন ছিল আমাদের ক্লাসের সবচাইতে আন্তরিক একটা মেয়ে। যার কাছে সবকথাই খুলে বলা যেত অকপটে। ‘গরিমা’ শব্দটি তার স্বভাবের কোনো খাঁজে লুকিয়ে থাকার মতো অবস্থাতেও তখন ছিল না।

নাজরীন নিজেও ছিল অত্যন্ত বন্ধু-অন্ত-প্রাণ। প্রায় সকলের খোঁজখবর সে রাখত। নাজরীনের সাথে আমাদের ক্লাসের কারোই কোনোদিন ঝগড়াফ্যাসাদ কিচ্ছুটি হয় নাই। আমার সঙ্গেও কোনোদিনই কারো ঝগড়াফ্যাসাদ কিচ্ছুটি হয় নাই। শুধু একবার একজনের ভাইয়ের সাথে প্রণয়ের প্রপোজাল নাকচ করে দেয়ার পরে এক আজগুবি অবস্থার  সৃষ্টি হয়েছিল। আমি সেই মেয়েটির সাথে দীর্ঘদিন কথা বলি নাই।

 

পাপড়ি রহমান

নব্বই দশকের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একজন কথাশিল্পী। এ পর্যন্ত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় পঁচিশটি। কথাসাহিত্যে কাজের পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনাও। বাংলা একাডেমী থেকে গবেষণা গ্রন্থ ‘ ভাষা শহিদ আবুল বরকত’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তাঁর ভিন্নধারার উপন্যাসগুলি প্রকাশ মাত্রই বোদ্ধা পাঠকের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তন্মধ্যে জামদানি তাঁতিদের নিয়ে উপন্যাস ‘বয়ন’ (২০০৮) প্রকাশিত হয় মাওলা ব্রাদার্স থেকে। পালাকারদের জীবন ভিত্তিক উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। আট বছর বিরতির পর বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ (২০১৯)

২০২০ সালে উপন্যাস ‘পালাটিয়া’ রি-প্রিন্ট হয় কলকাতার বনেদী প্রকাশনা সংস্থা ‘অভিযান’ থেকে।

তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সম্মাননা পেয়েছেন ২০১০ সালে। কলকাতার ‘ঐহিক মৈত্রী সম্মাননা’ পেয়েছেন ২০১৭ সালে। ২০২০ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমী পরিচালিত ‘সাদ’ত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার’।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।