সেলিম জাহানের বইয়ের স্মৃতি: বরিশালের বইপাড়ার চতুর্পদী

আমার শৈশব-কৈশোরে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বরিশাল শহরের চারটি বইয়ের দোকানের সঙ্গে আমার পরিচিতি ছিল। তার তিনটি বাবার কল্যাণে আর বাকী একটির সঙ্গে আমি নিজেই সংযোগ স্থাপন করেছিলাম। তবে স্বীকার করা ভালো যে শেষেরটির সঙ্গেও প্রাথমিক পরিচিতি আমার অধ্যাপক পিতাই করে দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে এটাও উল্লেখ্য যে সবগুলো বইয়ের দোকানই সদর রোডের ওপরেই ছিল – জেল খানার পুকুরের সামনে থেকে বিবির পুকুরের কোনা তক।

কালীবাড়ী রোড যেখানে সদর রোডের সঙ্গে মিশেছে, রূপায়নের দোকান পেরিয়ে ঐ মোড়ে এসে দাঁড়ালেই হাতের বাঁ দিকেই ছিল ‘পপুলার লাইব্রেরী’। জেলখানার পুকুরের উল্টোদিকে। তার স্বত্বাধিকারী হারান চক্রবর্তী জমি-জমার দালালী করতেন বলেই আমার ধারনা। গরম কাপড়ের বাদামী রঙের পাঞ্জাবী, সাদা ধুতি ও সরু নিকেলের চশমায় সুবেশই ছিলেন তিনি।

চিত্রতথ্য: বরিশালের বইয়ের দোকানগুলোর পরিচিতি সাইন বোর্ড, দোকানের ভিতর আমি ও আমার কন্যা। ডানদিকের নীচের ছবিটি ‘বুকভিলার’ ফারুক ভাইয়ের, তরুণ ফারুক ভাইকে আমরা যেমনটি দেখেছি।

 

১৯৬০ সালে অধ্যাপক বিপিন বিহারী গুহ (বিপিজির) বাড়ী ‘শক্তি-সদন’ বাবা যখন কেনেন, তখন বহু দলিল-পত্র নিয়ে বাবা পপুলার লাইব্রেরীতে গেছেন হারান বাবুর সঙ্গে কথা বলতে। সঙ্গে গাধা-বোটের মতো আমাকেও নিয়ে গেছেন। হারান বাবুও বেশ ক’বার আমাদের বাড়ীতে এসেছেন। অকৃতদার হারান বাবু আমার সঙ্গে বড় একটা কথা-টথা বলতেন না। স্কুল-কলেজের পাঠ্য-পুস্তক বিক্রেতা পপুলার লাইব্রেরী আমার কাছেও পপুলার ছিলো না মোটেই।

সদর রোডের মাঝামাঝি জায়গায় অশ্বিনী কুমার টাউন হল পর্যন্ত আসার আগেই রাস্তার বাঁয়ে ছিল ‘ওরিয়েন্টাল বুক ডিপো’ – পঞ্চাশের দশকে বাবার বইয়ের প্রকাশক। ১৯৫১ সনে বাবার বই ‘Principles of Civics and Economics এর প্রকাশক ছিল ওরিয়েন্টাল বুক ডিপো। প্রকাশক বরিশালের হলেও বইটি মুদ্রিত হয়েছিল কলকাতায়। বাবা প্রায়ই ওখানে যেতেন – সঙ্গে আমি।

ভারী মিষ্টভাষী ছিলেন সেখানকার লোকজন। গেলেই চা-মিষ্টির ব্যবস্থা ছিল। ওটা পেরিয়ে আর একটু সামনে গেলেই ‘নূরমহল সিনেমা হল’ ও ‘রুচিরা ক্যাফে’। নানাবিধ বই ছিল ওরিয়েন্টাল বুক ডিপোতে – প্রচুর ইংরেজি বই। পাঠ্যবই, গল্প-উপন্যাসও পাওয়া যেত সেখানে। আমি যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, তখন একদিন বাবা ও আমি সেখানে গিয়ে দেখি যে বাবার সহকর্মী অধ্যাপক এম. সামসুল হকও সেখানে উপস্থিত (পরবর্তী সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক)। অধ্যাপক হক আমাকে একটি ছোট অক্সফোর্ড অভিধান কিনে দিয়েছিলেন। কেন, মনে নেই। পরবর্তী সময়ে বহু বছর পর্যন্ত দোকানটি দেখেছি, এখনও আছে কি না, জানি না।

দীর্ঘদিন ধরে আমার প্রচুর যাতায়াত ছিল সদর রোড ওর লাইন রোডের মোড়ে ‘স্টুডেন্টস লাইব্রেরীতে’। দোকানটির সামনে ছিল জেলখানার পুকুর, পাশে ডাক্তার এস.সি. রায়ের ‘দি মেডিকাস্’, রাস্তার উল্টোদিকে আলম সাহেবের মনোহারী দোকান। আমার বন্ধু বিভা মিশ্রের (এখন মিত্র) মাতুল ডাক্তার রায় ছিলেন আমাদের পারিবারিক চিকিৎসক। আলম সাহেবের দোকান ছিল আমাদের নানান নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উৎস – তার আগে যে কাজটি আমরা সোনালী সিনেমা হলের কাছে ঝাউতলা রোডের পাশে রামদা’র দোকানেই সারতাম।বেশ পাউডার পাউডার গন্ধ ছিল দুটো দোকানেই।

স্টুডেন্টস লাইব্রেরীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের তিনটি মাত্রিকতা ছিল। প্রথমত: এরাও বাবার কোন কোন বইয়ের প্রকাশক হওয়ায় এদের নিত্য আনাগোনা ছিল আমাদের বাড়ীতে। এর কর্মচারী ভ্রাতৃদ্বয় নীহার-তুষার সকাল সন্ধ্যা আসতো প্রুফ দিতে-নিতে, দোকানের স্বত্বাধিকারী মাখনলাল চক্রবর্তী আসতেন বাবার সঙ্গে নানান আলোচনার জন্য। আমাদের প্রতি বছরেরে নতুন শ্রেণির বই আসতো স্টুডেন্টস লাইব্রেরী থেকে – অন্যথা করা নিষিদ্ধ ছিলো। দুই, মাখন কাকার পরিবার আর আর আমাদের পরিবারের মধ্যে পারিবারিক বন্ধুত্ব ছিলো – সামাজিক অনুষ্ঠানে আসা-যাওয়া ছিলো। মাখন কাকা আমার মা-বাবাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। একাত্তরের দিনগুলোতে প্রতি রাতে গোপনে তিনি আমাদের বাড়ীতে ঘুমোতেন। তিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ও পড়ানোর কালে বরিশালে গেলেই স্টুডেন্টস লাইব্রেরী ছিল আমার আড্ডার জায়গা। লাইব্রেরীর সন্তোষ’দা ছিলেন, মাখন কাকার ছেলে বাবুল’দা ছিলেন, রবীন’দা (রবীন সমাদ্দর), মিন্টু’দা (মিন্টু বসু ) ও অন্যান্যেরা আসতেন – জোর গাল-গল্প চলতো।

তবে কৈশোর ও যৌবনে বইয়ের জন্যে বরিশালে আমার প্রিয় জায়গা ছিল ‘বুক ভিলা’। বিবির পুকুরের কোনায়, চার রাস্তার মোড়ে, আমার সহপাঠী মাহবুবদের (ঈমান আলী ডাক্তারের পুত্র) ও এন. হোসেন জুয়েলার্সের উল্টোদিকের বইয়ে ঠাসা ছোট্ট বিপণী। তার পাশেই ছিল ব্রাহ্ম সমাজের দালান। পাশে বা সে দালানেই সম্ভবত: একটি ছাপাখানা ছিল। ১৯৬২ সনে আমাদের সহপাঠী ফেরদৌসের বরিশাল ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়ে ওকে দেয়া বিদায়-বার্তাটি আমরা ওখানেই ছাপিয়েছিলাম। বলে নেই, লেখাটি আমার।

বুকভিলায় প্রথম যাই ১৯৬০ এর দিকে -মূলত: দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী, শিবরাম চক্রবর্তীর বই ও স্বপন কুমারের আট-আনা সিরিজের গোয়েন্দা কাহিনী কেনার জন্যে। ফারুক ভাইয়ের বাবা তখনও দোকানে বসতেন, তবে সব কর্মকাণ্ডের হোতা ছিলেন ফারুক ভাই – যিনি তখনও ছাত্র। সুদর্শন তরুণ ফারুক ভাই নানান বইয়ের খবর দিতেন, ভালো বই রেখে দিতেন, ছাড়ও দিতেন মাঝে মাঝে। আমার পঠন-পাঠন, চিন্তাও মননে বুক ভিলার এক বিরাট ভূমিকা ছিল।

অনেক দিন পরে নিউ মার্কেটে ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁদের নতুন দোকানে -বুকভিউতে। এখনও ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ আছে অবয়বপত্র বন্ধু হিসেবে। মাঝে মাঝে বার্তার আদান-প্রদান হয়।

শেষবার বুকভিলায় গিয়েছি ২০০৯ সালে। সেবার ওখানে গিয়েছি কন্যা-জামাতা রোদেলা- মুনিরকে নিয়ে। তখন দোকানে বসত ফারুক ভাইয়ের কনিষ্ঠ ভ্রাতা – আমার ছোট ভাই মঞ্জুর বন্ধু ও সহপাঠী। বুকভিলায় বইয়ের সমারোহ দেখে রোদেলা হতবাক। বহুকাল আগে তার শৈশবে কিনে দেয়া ‘ছড়ার ছবি’ র সব ক’টি বই সেখানে পেয়ে সে হতবাক। কোথাও পাওয়া যায় না ওগুলো এখন। মনে পড়ল, আমার কৈশোর-যৌবনেও যে বই কোথাও পাওয়া যেত না, তাও পাওয়া যেত বুক ভিলায়।

যখন বেরিয়ে আসি, তখন একবার পেছন ফিরে তাকিয়েছিলাম। দেখলাম, একদল কিশোরী হৈ হৈ করতে করতে বুকভিলায় ঢুকল। ঢুকেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল বইয়ের ওপরে। একটু হেসে কন্যার হাত ধরে আমি রাস্তায় পা বাড়িয়েছিলাম।

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।