শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: হিরণ্ময় স্মৃতি

সেলিম জাহান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একশ’ বছরে পড়ল। ১৯২১ সালের ১লা জুলাই পূর্ববঙ্গের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টি তার দ্বার উণ্মুক্ত করে দিয়েছিল শিক্ষার্থীদের জন্যে। আর তার প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ১৯৬৯ সালে আমরা শিক্ষার্থী হয়ে প্রবেশ করেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। তুঙ্গ সময় সেটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক আবু মাহমুদ কিছুদিন জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের গুন্ডাদের দ্বারা প্রহৃত হয়েছেন। নিহত হয়েছে ঐ ছাত্রদলের নেতা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের ত্রাস পাঁচপাত্তুর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের তথাকথিত লৌহমানব আইয়ুব খানের পতন হয়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান মুক্তি পেয়েছেন। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে আমাদের সরব প্রকাশ।

১৯৬৯ এর এক স্নিগ্ধ সকাল থেকে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার নিত্য আনাগোনা—ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে। উচ্চশিক্ষা ও বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্যে ছ’ বছর আর পরামর্শক হিসেবে দু’বছর বাদ দিলে বাকী সতের বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকে-পিঠেই আমার জীবন কেটেছে। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনের বাইরে থাকলেও এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার নাড়ীর টানে কোন হেরফের হয় নি। এই সিকি শতাব্দীতে আমার বেড়ে ওঠা, বিকাশ ও বিবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে এক অমূল্য ভূমিকা রেখেছে।

প্রথমত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় আমাকে একটি প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের সঠিক স্বরূপ বুঝতে সাহায্য করেছে। আমি বুঝতে পেরেছি যে, বিশ্ববিদ্যালয় মানে ‘বিশ্বের বিদ্যালয়’ নয়, বিশ্ববিদ্যালয় মানে যেখানে জীবন ও জগত সম্পর্কে একটি বিশ্ববীক্ষণ পাওয়া যায়, যেখানে চিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সে’টি আমাকে দিয়েছে। একটি বৈশ্বিক সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গী আমি লাভ করেছি এবং একটি ‘মুক্ত বুদ্ধি, মুক্ত চিন্তার’ চেতনা ও বোধ আমি অর্জন করেছি। পরবর্তী কালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে আমার এ বোধ আরও গভীরতর হয়েছে এবং একটি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গী, মুক্ত বুদ্ধি ও মুক্ত চিন্তা আমার সারা জীবনের পাথেয় হয়েছে। হয়তো এ কারণেই বহু ক্ষুদ্রতা, বহু নীচতা, বহু কূপমন্ডুকতা আমাকে গ্রাস করতে পারে নি।

দ্বিতীয়ত: ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে আমি ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের অঙ্গনে বহু অনন্য মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পেয়েছি, যাঁরা আমাকে ঋদ্ধ করেছেন। তার মাঝে শিক্ষকেরা আছেন, আমার সহপাঠীরা আছেন, আছেন বহু বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীবৃন্দও।

অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক মীর্জা নূরুল হুদা, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক মুশাররফ হোসেনের মতো দিকপালদের আমি শিক্ষক ও সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। অর্থনীতি শাস্ত্রের বহু শিক্ষা, বহু জ্ঞান, বহুবোধ এঁদের কাছেই পাওয়া। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বুঝেছি কি প্রতিভাবান আর মননশীল ছিলেন আমার শিক্ষকেরা। কত যত্নে, কত দরদ দিয়ে তাঁরা আমাদের পড়িয়েছিলেন। তাঁদের কাছে শেখা বিদ্যের বেসাতি সাজিয়ে এখনও দিন চলছে।

কিন্তু এঁদের সঙ্গে সম্পর্ক শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গনে, কিংবা শ্রেণীকক্ষের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মনে আছে, বহু সকাল-সন্ধ্যা কেটেছে অধ্যাপক মুশাররফ হোসেন সাহেবের বাড়ীতে। গল্প চলছে, আড্ডা চলছে— অধ্যাপক ইনারী হোসেন চা-কফির অফুরন্ত যোগান দিয়ে চলেছেন। আশির দশকে তাঁদের নিজস্ব বাড়ী তৈরী হবে ধানমন্ডিতে। খোলা রিকশায় বসে স্বর্ণকেশী অধ্যাপক ইনারী হোসেনের সঙ্গে আমি চলেছি পুরোনো ঢাকায় চুন-সুরকি কিনতে। অধ্যাপক আনিসুর রহমান স্বকণ্ঠে গীত রবীন্দ্র সঙ্গীতের ক্যাসেট উপহার দিয়েছেন আমাকে। এখনও তাঁর অনিন্দসুন্দর কণ্ঠ শুনতে পাই – ‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রনে দুয়ার কাঁপে’। কাজে-অকাজে প্রায়ই যেতাম অধ্যাপক মীর্জা নূরুল হুদার ধানমন্ডির ঈদগাহের পাশের বাস ভবনে। কি যত্নে যে আপ্যায়ন করতেন অধ্যাপক কুসসুম হুদা। তবে ঐ বাড়ীতে আমার চেয়েও বেনুর আদর ছিল বেশী।

বিভাগের বাইরে পেয়েছি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতো মনীষীদের যাঁরা আমার চিন্তা-চেতনার বিকাশে সাহায্য করেছেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে লেখালেখি, বেতার- টেলিভিশনে ভাষ্য, সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণে কতবার যে ভাবনা-চিন্তার আদান-প্রদান হয়েছে। বানান থেকে শুরু করে গ্রন্হপন্জী, সামাজিক আন্দোলন থেকে শুরু করে সম্পাদনা কত বিষয়ে যে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি তার লেখা-জোকা নেই। বেতারে কৌশিক আহমেদের সঞ্চালয়ায় ‘প্রভাতী’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত অনুষ্ঠান থাকত আমাদের। নিয়ম করে এক সপ্তাহে প্রচারিক হত স্যারের কথিকা ‘কথার কথা’, এবং অন্য সপ্তাহে আমার কথিকা ‘যা না বললেই নয়’। দেখা হত বেতার ভবনে প্রায়শই দেখা হয় তাহের ভাইয়ের (সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক কবি আবু তাহের) কক্ষে, কিংবা স্টুডিওর সামনে।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে কম জ্বালাই নি। মনে আছে আটকে গিয়ে বেশ রাতে ফোন করে জানতে চেয়েছি, ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন’ রবীন্দ্রনাথের কোন কবিতার অংশ, সঙ্গে সঙ্গে বলে দিয়েছেন। প্রমথ চৌধুরীর ‘রায়তের কথা’ কবে বেরিয়েছিল, তাও জানিয়েছেন অন্য আরেক দিন এক লহমায়। তাঁর কন্যা রুচির আমি শিক্ষক ছিলাম বলে তিনি চিরকাল আমায় ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করেছেন, এই কিছুদিন আগে ‘তুমিতে’ পদোন্নতি হয়েছে আমার। গত বছর আমার ‘বেলা-অবেলার কথা’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন তিনি। সম্প্রতি তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

কি কারণে জানি না, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আমাকে ‘জনাব সেলিম জাহান’ বলে সম্বোধন করতেন। বাড়ীতে গেলেই বলতেন, ‘এক পেয়ালা চা খাইবেন নি, জনাব সেলিম জাহান?’ ফুলার রোডের দোতালা যে বাড়ীতে থাকতেন তিনি, তার দ্বিতলেই থাকতেন অধ্যাপক মুশাররফ হোসোন ও অধ্যাপক ইনারী হোসেন তাঁদের দুই কিশোর পুত্র জাফর আর রাজাকে নিয়ে। সে বাড়ীতে যাওয়ার পথেই রাজ্জাক স্যারের ডেরায় আমার ঢুঁ মারা। মুনীর কাকার কথা বলতেন খুব, বলতেন আমার পিতার কথাও, যিনি তাঁর ছাত্র ছিলেন। বাজার রান্না থেকে শুরু করে পূর্ব বাংলার মুসলমান, হ্যারল্ড লাস্কি থেকে শুরু করে কার্ল মার্কস, ঢাকার ইতিহাস থেকে আমার লেখা—কোন কিছুই সে আলোচনায় পরিত্যাজ্য ছিল না। ছাত্রের পুত্র বলে একটি ‘পৌত্র-ছাত্রের’ মতো ব্যবহার ছিল তাঁর আমার প্রতি— গাম্ভীর্যবিহীন, ঠাট্টা- মশ্করার, হালকা চালের। তবে দাবা বিষয়ে তাঁর ত্রিসীমানায় তিনি আমাকে ঘেঁসতে দিতেন না। লক্ষ্য করেছিলাম, আমাকে যেমন তিনি ‘জনাব সেলিম জাহান’ বলতেন, ছফা ভাইকেও সম্বোধন করতেন ‘মৌলভী আহমেদ ছফা’ বলে। আমার ক্ষেত্রের মতে এর কারণ অজানা।

অর্থনীতি বিভাগ সব সময়েই তারকা-খচিত বিভাগ হয়, কিন্তু ১৯৬৯ এর দলটি ছিল উজ্জ্বল তারকা-মন্ডিত। দেড়শ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪০ জনই ছিল বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ড থেকে প্রথম দশজনের মধ্যে স্হান করে নেয়া ছাত্র-ছাত্রী। কি তাদের অনন্য ধী-শক্তি, বুদ্ধির দীপ্তি, মেধার দ্যুতি— জিলেট ব্লেডের মতো ধার তাদের। পড়া-শোনায়, সাহিত্যে, নাটকে. বিতর্কে, এমন কি সেরেফ দুষ্টুমিতে তাদের সৃজনশীলতা আর কীর্তি-কলাপ কিংবদন্তী পর্যায়ের। আমার সতীর্থদের কাছে আমার ঋণ অনেক। তাদের পঠন-পাঠনের ব্যপ্তি আমার পঠনের পরিসীমা বর্ধনে উৎসাহ যুগিয়েছে; তারাই আমাকে শিল্প-সাহিত্যের বহুধা মাত্রিকতায় উদ্বুদ্ধ করেছে, তাদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে ঋদ্ধ হয়েছি। জীবন ও জগতের বহু শিক্ষা তাঁদের কাছেই।

সতীর্থ বন্ধুদের কথা বলতে গেলে মন ভারী হয়ে আসে। গত ক’বছরে হারিয়েছি কত জনকে। বিভাগের সতীর্থদের মধ্য থেকে চলে গেছে আফসারী, মলি, বেনু, বদরুল, নীলুফার মতিন, পারুল, মাসুদ। বেনু তো চার দশকের জীবনসঙ্গীই ছিল আমার। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে পারুল কিংবা আফসারীর সঙ্গে দেখা হয় নি। বেনুর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল মলি— নিউইয়র্কে আমাদের বাড়ীতে সে এসেছিলো একবার। নীলুফার মতিন নিজের অসুস্হতার মধ্যেও অসুস্হ বেনুকে দেখতে এসেছিলো আমরা যখন একবার ঢাকায় গিয়েছিলাম। আশির দশকে শেষ দেখা বদরুলের সঙ্গে।

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই কবি মাসুদ আহমেদ মাসুদ মানসিক ভারসাম্য হারায়। মাসুদ আমার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। বরিশালের ছেলে অসাধারণ এই মেধাবী বন্ধুটি যখন এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়, তখন আমি উচ্চশিক্ষার্থে ক্যানাডায় স্হিত। পরে দেশে ফিরলে বাবা আমাকে বলেছিলেন যে, মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্হায় মাসুদ প্রায়শ: আমাদের বাড়ীতে আসতো, বাবাকে বলতো, আমাকে সাইপ্রাসে পাঠিয়ে দিতে। পৃ্থিবীর এতো দেশ থাকতে কেন আমাকে সাইপ্রাসে যেতে হবে, সেটা আমার বাবারও বোধগম্য ছিল না, আমার কাছেও এক রহস্য। মনে আছে উনসত্তুর উত্তাল দিনগুলোতে কোলকাতা থেকে দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত মাসুদের কবিতা, ‘সেদিন সকালে, সারা বরিশালে হরতাল হয়েছিলো। অর্থনীতি বিভাগের বাইরেও তো কত সহপাঠীকে হারিয়েছি। মু্ক্তিযুদ্ধে হারিয়েছি কত সহপাঠী বন্ধুদের। নিজামের কথা মনে হয়। ১৯৭৫এ হারিয়েছি শেখ কামাল আর খুকুকে। ক’দিন আগে চলে গেলো জাহাঙ্গীর আর বাদল।

তৃতীয়ত: বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সাধারন মানুষের অবিস্মরনীয় চরিত্র আমাকে মানবিক হতে সাহায্য করেছে। অর্থনীতি বিভাগের প্রবাদচরিত্র কানুদাকে কি করে ভুলি? তাঁর স্নেহ-মমতা আমাকে ঘিরে রেখেছে দীর্ঘ ২৫ বছর— আমার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকতা জীবনে। কানুদা’ ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের প্রবাদপুরুষ— জীবন্ত ইতিহাস। জানতেন আমার পিতা ও শ্বশ্রুপিতাকে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জীবনে। আমার প্রতি কানু’দার একটি অন্যরকমের মমতা ছিল। অনেকটা আগলে রাখতেন আমাকে— বিশেষত: আমার শিক্ষকতা জীবনে। কানুদা’ র পুত্র বাবুল, লাবু, মহসীন সেটা জানতো এবং এখনও আমার জন্যে তারা বুক পেতে দেয়। ভুলি নি নাজমুল, দাইয়ুমকে কিংবা বিভাগীয় দপ্তরের রহমান ভাই, নাজির মিয়া কিংবা করিম সাহেবেকে। বিভাগে আমার বিবর্তনের সাক্ষী এঁরা। প্রশাসন দপ্তরে খন্দকার সাহেবকে এখনও মনে আছে।ছাত্রজীবনে বৃত্তির টাকা তুলতে তাঁর কাছে যেতাম। তিনি জানতেন, হয়ত আমি একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা তিনি প্রায়শ:ই স্মরন করিয়ে দিতেন। সে শিক্ষা আজও ভুলি নি।

সলিমুল্লাহ হলের প্রহরী নাজু মিয়াকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। লম্বা পাগড়ীর, বিরাট গোঁফের ব্যক্তিত্ববান নাজু ভাইকে দেখে উপন্যাসের এক অবিস্মরনীয় চরিত্র বলে মনে হত। শুনেছিলাম ২২/২৩ বছর আগে শিক্ষার্থী থাকা অবস্হায় আমার বাবাও নাজু ভাইকে সলিমুল্লাহ হলে দেখেছিলেন। প্রথম সাক্ষাতে বাবার সঙ্গে আমাকে দেখে নাজু মিয়ার চোখে-মুখে সে কি আনন্দের আভা। সে কি যত্ন আত্তি আমার।

ভুলি নি কালুদা’কেও। শিক্ষক থাকাকালীন অবস্হায় কিনি আমার কক্ষের ঝাড়া-মোছা করতেন। শ্রেণীকক্ষে বক্তৃতা করে ফেরত আসলে প্রায়শ: বলতেন তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে, ‘স্যার সব সাফা করে দিছি’। ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরে কালুদা’র সঙ্গে আর দেখা হয় নি।

চতুর্থত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জানার বিস্তার এবং আমার সময় কাটানোর পরিসীমা বেশীর ভাগই ব্যাপৃত ছিল শ্রেণী কক্ষের বাইরে। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মাঠ ও মিলনায়তন, গ্রন্হাগারের চাতাল, শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন— এ সবই ছিল আমার শিক্ষাক্ষেত্র। আড্ডার ঝড় তুলেছি ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মাঠ ও গ্রণ্হাগারের চাতালে— জীবন ও জগতের বহু পাঠ তো সেখান থেকেই নেয়া। ছাত্র- শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে বিতর্কের যুক্তিতে শাণিত করেছি নিজের চিন্তাশক্তি ও বলনের ক্ষমতা।

আর শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন? সে ছিল এক মহা মিলন ক্ষেত্র। শিল্প-সাহিত্য- সঙ্গীত- চিত্রকলার তীর্থস্হান। কে আসতেন না সেখানে— শেখ লুৎফর রহমান থেকে রফিকুন নবী, কবি নির্মলেন্দু গুণ থেকে রশীদ হায়দার, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম থেকে মাহফুজ আনাম। আসতেন কবি আবুল হাসান, সোহরাব হোসেন, অজয় রায়, জাহেদুর রহিম, শওকত আনোয়ার আরো ক’জনা। বাংলা, অর্থনীতি, ইংরেজী আর অন্যান্য বিভাগের দু’এক ক্লাস ওপরের ছাত্র-ছাত্রীসহ আসতো আমার সতীর্থরা। যেমন আসতেন রিজওয়ানুল ইসলাম, মোহাম্মদ মুক্তাদা, সেলিম সারওয়ার, হুমায়ুন আজাদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, তেমনি আসতো কাজী শহীদুল্লাহ, শেখ কামাল, কায়সার হামিদুল হক, ফিরদৌস মুর্শেদ। অনুজদের মধ্যে আতিউর রহমান, হোসেন জিল্লুর রহমান, আনিস আহমেদ, প্রয়াত খান মোহাম্মদ ফারাবী আরো কতজন।

দু’একজন মাঝে মাঝে মধ্যে উঁকি দিলেও মেয়েরা বড় একটা আসতো না শরীফ মিয়ায়। আসলেও বসতো না ঐ ক্যান্টিনে। তারা ঐ গ্রন্হাগারের চাতালেই বসতো। তাদের জন্যে চা-বিস্কুট নিয়ে যাওয়া হত। হাসিতে-গানে-হৈ-হল্লায় ভরে যেত চারদিক। মনে আছে ঐ চাতালে বসেই একদিন রুমা (তাজিন মুর্শেদ) ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ পুরোটা গেয়ে আমাদের তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছিলো। শেখ কামাল কোরাসে ‘পাগলার মন নাচাইয়া, পাগলী গেল চলিয়া’ —তারস্বরে চিৎকার করে গেয়েছিলো।

শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে কত কি যে শিখেছি। হাসান ভাই একদিন ছন্দের শিক্ষা দিয়েছিলেন। আমার বাল্যবন্ধু প্রয়াত শিল্পী হাসি চক্রবর্তী বুঝিয়েছিলো রেখার টান বিষয়ে। শুদ্ধ কবিতার জন্য কবিতা, না সমাজ-চিন্তার জন্যে কবিতা— এ বিতর্কে একদিন রেগেমেগে শাহনূর খান বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এক সপ্তাহ কথা বলেন নি আমার সঙ্গে। নভেরার ভাস্কর্যের ব্যাখ্যা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছিল খান মোহাম্মদ ফারাবীর সঙ্গে। ঐ চাতালের আড্ডা থেকেই কামাল একদিন ধরে নিয়ে গিয়েছিল এদের ৩২ নম্বরের বাড়ীতে—সেইদিন শুধু একবারের মতো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেছিলাম।

পঞ্চমত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক মায়াময় স্মৃতি আমার শিক্ষার্থীদের নিয়ে— দু’দফায়। ১৯৭৫এ এম.এ. পরীক্ষার ফলাফল বেরুবার আগেই বিভাগে যোগ দিয়েছিলাম। ১৯৭৭ এ উচ্চশিক্ষার জন্যে বিদেশ যাওয়ার আগে দু’বর্ষের শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছি— তৃতীয় বর্ষের সম্মান ও এম.এ. ক্লাশে। দ্বিতীয় দফায় পড়িয়েছি ১৯৮৪ সাল থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপান্তে বিদেশ থেকে ফিরে। আমার শিক্ষার্থীদের কাছে আমার অনেক ঋণ। তাদের কাছ থেকে অনেক শিখেছি, বহু ভুল-ভ্রান্তি শুধরে দিয়েছে তারা। পড়াতে গিয়ে তাদের কখনো ঠকান নি। নিজের যতটুকু সক্ষমতা, তার পুরোটাই উজাড় করে দিয়েছি।

যাদের শিক্ষক হওয়ার অননয সৌভাগ্য আমি অর্জন করেছিলাম, তারা আজ জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত। লেখে তারা আজো আমাকে, স্মৃতিচারণ করে সে সময়ের— আমার জন্যে তাদের অপরিমেয় মায়া-মমতা। প্রায়শ:ই ‘আপনি-তুমিতে’ গুলিয়ে ফেলি, তারা আমোদিত হয়। বুঝি, তাদের আস্হার, বিশ্বাসের আর শ্রদ্ধার জায়গাটি হারাই নি। এ প্রাপ্তির কাছে আর কিছু কি আছে?

আমরা দু’পুরুষ— আমার পিতা এবং আমি— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আমি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করেছি। আমার জীবনের একটি শ্রেষ্ঠ সময় কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে— ছাত্র জীবনে ও পেশাগত জীবনে। নিয়েছি অনেক, কিন্তু দিতে পারি নি তেমন কিছু। তবু যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন এক মায়াময় মমতায় আমার মন ভরে ওঠে।

এ বছরের ১লা জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ’ বছর পূর্ণ হলো। আর দু’বছর আগে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবেশের অর্ধশতাব্দী পূর্ণ হয়েছিল। এ দীর্ঘ পথযাত্রার আমিও তো এক ক্ষুদ্র বালুকণা। সে বালুকণারও আছে এক হিরণ্ময় স্মৃতি জীবনের পাতায় পাতায়।

 

সেলিম জাহান

ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।