সেলিম জাহানের বইয়ের স্মৃতি: ও পারতো কেবল একজনাই

‘এ পৃথিবী একবার পায় তাকে, পায় না কো আর’।

বছর চারেক আগের এক ৩রা ফেব্রুয়ারির কথা। রুজভেল্ট দ্বীপের বাড়ীতে আমি থাকি তখন। সেবার ক’দিন ধরেই কবি জয় গোস্বামীর কবিতার একটি চরণ মনের মধ্যে অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছিল, ‘রাত্রি জাগার রীতি কেবল জানত সে বাড়িটি, সাতাশ নং বকুল বাগান রোডের’।

ও চরণটি অকারণে মনে পড়ে নি, মনে পড়েছিল আমার খুব প্রিয় লেখক নোবেল বিজয়ী জে. এম. কুদসিয়ার The Master of Petersburg বইটি খুঁজতে গিয়ে। হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম, কিন্তু পাচ্ছিলাম না। আমাদের রুজভেল্ট দ্বীপের বইঘরের ৩০০০ বইয়ের পুস্তকারন্যের ভেতর ( ২০০০ ইংরেজি আর ১০০০ বাংলা) থেকে একটি বই বার করা সহজ নয় বটেই। ভাষার বিভাজনের মতো স্বত্বের বিভাজনও তো ছিল – সব বাংলা বই আমার, সব ইংরেজি বই ওর।

সুতরাং কাঙ্ক্ষিত কোন একটি ইংরেজি বই আমি খুঁজেই পেতাম না। একদিন অনুযোগ করলে আমাকে বইয়ের তাকগুলো দেখিয়ে বলা হল যে বইগুলো লেখকের নামের আদ্যাক্ষর অনুসারে সাজানো আছে। বড় স্বস্তি বোধ করেছিলাম।

তবে এ স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হল না যখন ক’দিন পরেই একটা বই বার করতে গিয়ে তাকের সামনে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করেছিলাম যে আদ্যাক্ষর রীতি সেখানে বিলুপ্ত। প্রশ্ন করলে জবাব পেতাম যে সেখানে পুস্তকমালা উচ্চতা অনুসারে সাজানো আছে – লম্বা বই প্রথমে, তারপর বেঁটে বই। জেনেছিলাম এবং শিখেছিলাম।

নিয়মটা ভালই চলছিল। কয়েকদিন পর আবার হোঁচট খেতে হল তাকগুলো ধরে আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই। লম্বা-বেঁটের নির্ণায়ক অন্তর্হিত। শুনলাম, ওখান থেকে প্রথমে শক্ত মলাটের বই, তার বাদে নরম মলাটের। ততদিনে আমার প্রাথমিক বোধোদয় হয়েছিল যে বই সাজানোর এই অতি বিজ্ঞানসম্মত নিয়ম বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে।

তবু যা হোক নিয়মটা মোটামুটি চলছিল। হঠাৎ একদিন বইঘরের এক কোনার তাকের সামনে গিয়ে আবিষ্কার করেছি যে লেখকের নামের আদ্যাক্ষর, বইয়ের উচ্চতা, মলাটের ধরন কোন নিয়মই সেখানে খাটছে না। জানলাম ওটা হচ্ছে ওর প্রিয় বইয়ের জায়গা।

ততদিনে আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। বুঝে গেছি যে এই অতি সৃষ্টিশীল নিয়মের অনাসৃষ্টি থেকে কোন বই খুঁজে বার করা আমার কম্ম নয়। আমার নিয়ম আমিই বার করে নিলাম—ভাবলাম ঐ তিন সহস্রাধিক বইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমি চোখ বুলোতে থাকব যতক্ষণ না ঈপ্সিত পুস্তকটি পাই। তাতে দু’ঘণ্টা লাগে তো লাগুক—কি আর করা!

এটা করতে গিয়ে আমার লাভই হল। আমাকে বইঘরে দেখলেই ও দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসত। ‘কি বই খুঁজছ, বল। এক্ষুনি বার করে দিচ্ছি’। বইয়ের নাম বললেই এক লহমা ভেবে হাত বাড়িয়ে ঐ ৩০০০ বইয়ের কোন এক কোনা থেকে কাঙ্ক্ষিত বইটি টেনে নিয়ে আসত। একবার নয়, দু’বার নয়, এটা বারবার হয়েছে, প্রতিবার হয়েছে। কেমন করে পারত, আজও জানি না।

ভুলো মন ছিল জগতের নানান বিষয়ে, খেয়াল করত না বহু কিছুই, আপন ভোলাই ছিল জীবনের বহু ক্ষেত্রে। ব্যতিক্রম ছিলাম আমরা তিনজন— আমাদের কন্যাদ্বয় ও আমি— এবং আমাদের বাড়ীর পুস্তকারন্য। কোন বইয়ের কথা উঠলেই তার প্রচ্ছদের রং, বাঁধাইয়ের ধরন, পুস্তকের আকৃতি সব বলে দিতে পারত কোন ভাবনা-চিন্তা বাদেই। আমি এটাকে সর্বদাই ঠাট্টা করে ‘বিধিপ্রদত্ত বিশেষ ক্ষমতাই’ বলতাম।

আমি জানি, আমি প্রায়শ:ই বই খুঁজে পাবো না। সে কথা আমাদের কন্যাদের বললে, ওরা খুব মমতার সঙ্গে নরম গলায় বলবে, ‘চিন্তা কোর না, আমরা এসে খুঁজে দেব’। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে ওরা নিশ্চয়ই পাবে, খুঁজতে খুঁজতে আমিও হয়তো একদিন বইটি পেয়ে যাবো।

কিন্তু এক লহমা ভেবে হাত বাড়িয়েই এই পুস্তকারন্যের কোন এক কোনা থেকে যে কোন বই এক নিমিষে বার করে নিয়ে আনতে আমরা কেউই পারব না – না আমাদের কন্যারা না আমি নিজে। ও কেবল একজনই পারত—যেমন ‘রাত্রি জাগার রীতি কেবল জানত সে বাড়ীটি ২৭ নং বকুল বাগান রোডের’।

৩রা ফেব্রুয়ারি—বেনুর চলে যাওয়ার ষষ্ঠতম বার্ষিকী গেল। কেন যেন মনের মধ্যে ‘জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা কয়’ ক’টি লাইন,
‘উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যায়,
মানুষের আয়ু শেষ হয়,
পৃথিবীর পুরানো সে পথ
মুছে ফেলে রেখা তার—
কিন্তু এই স্বপ্নের জগৎ
চিরদিন রয়।’

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।