নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-১৬

ছুটির দিনের এক সকালে নিধিকে কোলে করে দাদীর কাছে নিয়ে গেলো আজমত চাচা নিজে। প্রথমে ভয়ে শক্ত হয়ে তারপর দ্বিধায় সিঁটিয়ে গিয়ে নিধি তার খাটের পাশটাতে জড়সড় বসলো। দাদী তিনটা বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার পরিস্কার চুল টেনে বেনী বাঁধা, আর মুখটাতে যেন আজমত চাচার ছাচে মুখ বসানো, তেমনি চৌকোনা আর শান্ত। ঘর থেকে আগের পাওয়া প্রাচীন গুমোট গন্ধটা উধাও হয়ে গেছে। নিধির ভয়টাও। দাদী তার গা হাতায়, মুখ হাতায়, মাথাটা টেনে বুকের কাছে নিয়ে চেপে রাখলে তার হৃদপিণ্ডের ধুকপুক শব্দ শুনতে পায় নিধি- ধীরলয়ে ঢাক বাজাবার মত গম্ভীর, স্থিতধী সে আওয়াজ।

তার জন্য ক্ষীরের সন্দেশ আর মালপোয়া পিঠার অর্ডার করলে রান্নাঘর থেকে আবেদা দিয়ে যায়। বিছানার ওপর কাঠের ট্রে’তে রাখা সেইসব সুখাদ্য নিজহাতে মুখে তুলে তাকে খাওয়ায়, দাদীর হাত দুটো সচল।

নিধি সভয়ে মুখ হা করে আর ঘরের চারপাশ দেখে, ঘিয়া রং কাপড়ের চারপাশে লাল কুচি দেয়া শামিয়ানা আর কোনের দিকের দেয়ালে একপশলা পলেস্তারা খসে যাচ্ছে। দেয়াল ঘেষে কাঠের নিচু আলমারী। বিছানার লাগোয়া নিচু গোল চৌপায়াতে দাদির নাগালবন্দী জিনিষপাতি।

কপাট দেয়া জানলার কাছে একটা জামগাছের ডালে মাকড়সা বাসা বুনে যাচ্ছে, এক লাফে দু’তিন টানে ক্ষীপ্রগতির বাসা বোনার অভাবনীয় কায়দা দেখে মুখের ক্ষীরের সন্দেশ মিইয়ে আনতে সময় লাগে নিধির।
-‘ঐ মাকড়ডার পেটের ভিতরে ডিম, দেখ, জানস ওরা কই গিয়া ডিম পাড়ে?’, দাদী গল্প বলার মেজাজে আছে।
নিধির মুখে আরেক দফা মালপোয়া পিঠা, চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
-‘ওরা ডিমপাড়ে গাছের পাকা কলার কাদির উপর, এই এ্যাত্তটুক মটরদানার মতন একটার সঙ্গে আরেকটা আটকায়া থাকে’।
খাবার ভর্তি নিধির মুখ প্রায় হা হয়ে আসে। দাদি মাকড়সার ডিমও দেখেছে!
খাওয়া হলে নিধির ওপর নির্দেশ হয় আলমারীর মাঝের তাক থেকে একটা সেলাইয়ের বাক্স দাদীর কাছে এনে দেবার। দাদি তাকে শাদা কাপড়ে কুরুশ কাটা দিয়ে তোলা ‘হানি কোম্ব’ ডিজাইন দেখায়, নিধির জন্য জামার হাতা বানাচ্ছে।
-‘হানি কোম্ব মানে হইল মৌমাছির চাকের খোপ, জানস’?

নাহ, নিধি এসব শোনেনি। সে জুলজুলু চোখে সুতা কুরুশ কাটায় তুলে খোপ বানাবার মিহিন কারুকাজ দেখে। গরম পড়লে তাকে হাতকাটা নিমা পরে স্কুলে যেতে হবে। ভোমরাদহের গরমকাল নিধি দেখে নাই, দাদী গরমের ভয়াল দাপটের কথা বলে। কিন্তু এই কুরুশ কাটায় বোনা পাতলা ভয়েল ক্লথের নিমা’তে তার কোন গরম লাগবে না।

নিধির ঘুমের জায়গা তারপর বদলে দাদীর ঘর হয়ে গেল। মোমেনার মা মেঝেতে ঘুমায় আর নিধি দাদীর বুকের কাছে গুটিশুটি। তার গায়ের প্রাচীন ঘ্রাণটা ঘুরে ফিরে আসে আর কি আশ্চর্য নিধির সেটা খুব আপন লাগতে থাকে!
-‘তোর মা ওই পাহারাদারের লগে বেশী কথাবার্তা কইতো’?- দাদীর গলা খাটো, দূরভিসন্ধিময়। প্রশ্নের আগামাথা কিছু বোঝে না নিধি। ঘরের জানালা গলে চুনের মত জোৎস্না ঢুকে পড়ছে, বিছানায় ফুরফুরে আলোর গুড়ো উড়ে আসে। হ্যারিকেনের সলতে নিভিয়ে দাদী নিধিকে ঘুম পাড়ায়, পিঠ খুটে দেয়ার আরামে তার ঢুলু ঢুলু চোখ।
-‘পাহারাদার কে?’
-‘ক্যান, ঐ আবেদার ভাতার, পুইড়া মরলো যে’।
দাদী এবার আত্মমগ্ন,-‘বীণারে আমি শিক্ষিত দেইখা, নিজের বোইনের মাইয়া দেইখা তর বাপের লগে বিয়া দিছিলাম। একটা কথা আমারে কেউ বুজায়া কইতে পারে না, ও ওই পাট গুদামে রাইতের বেলা কি কামে গেছিল?’
খেদ দিয়ে মুড়ে থাকে দাদীর স্বগোতোক্তি। তারপর কথা ঘুরিয়ে নিধিকে আরো কাছে টেনে নেয়।
-‘তুই সোনামানিক লেখাপড়া তাড়াতাড়ি শিখস না ক্যান…’।
তাকে নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন কেন যে!

কয়েকদিন কামাই দেয়ার পর আবার নিধি স্কুল যেতে শুরু করে। আজমত চাচা সাইকেল টেনে পাশে পাশে হাঁটে, বড় রাস্তায় উঠে প্যাডেল চালাতে পারবে। আলের পাশে কচি সবুজ বীজতলা দেখে থ’ দাঁড়িয়ে যায় নিধি। এত সবুজ, সদ্যজাত পক্ষীশাবকের মত সতেজ!
আজমত চাচা তখন বীজতলার একটা গোছা আলতো করে তুলে আনে।
-‘আয় দেখি আজকা তোরে ধান রোয়া শিখায়া দেই, আয় ইস্কুল ফাঁকি দেই’।
চাচা সাইকেল ঠ্যাকনা দিয়ে লুঙ্গি কাছা মেরে নেমে যায়। স্কুলে যেতে হবে না আজকে! নিধি লাফ দিয়ে আকাশ ছুঁতে চায়। বড় রাস্তার ধার ঘেষে দু’পাশের জমিতে ধান লাগানো হচ্ছে। দু’তিনজন কিষাণ সারি সারি বুনে দিচ্ছে ল্যাকল্যাকে ধানের চারা। কোনটা নুয়ে পানিতে ডুবে যায়। নিধি তাদের দুঃখে কাতর হলে আজমত চাচা অভয় দেয়- ‘কিচ্ছু হইবো না, এইসব ধানের চারা এমনেই বাইচা থাকে’।
নিধি জুতো খুলে ক্ষেতে নেমে যায়।
-‘আয় আজকা আমরা এইখানেই তর ইশকুল বানাই’।

কচি ধানের চারা কাদার ভেতরে গেঁথে থাকে, এত দ্রুত ধান লাগাতে পারে আজমত চাচা! এদিকে নিধি এক পা গেঁথে গেলে আরেক পা তুলতে হিমশিম খায়। এককোন থেকে শুরু করে ঘুরে ঘুরে চারা গেঁথে একটা অক্ষর বানিয়ে নিধিকে দেখায়,- দ্যাখ্ নিধুয়া এই আমি একটা স্ব-রে অ বানাইলাম। বানা, এখন তুই আরেকটা বানা’।

নিধির হাতে ধানের রোয়া দিয়ে তার কোমর উজিয়ে ধরে আজমত কাকা। উপুড় হয়ে এক গোছা চারা সে সহজে কাদার ভেতর গেঁথে ফেলতে পারে। এবার একটা স্ব-রে অ হয়ে যায়! তারপর আবার স্ব-রে আ! মায়ের কন্ঠস্বরে শেখানো ক, খ, গ চোখের সামনে পরিস্কার ধরা দিয়ে কি আশ্চর্য দুয়ার খুলে যাচ্ছে নিধির সামনে!

আজকে সারাদিন ধানের চারা লাগাবে সে, সবগুলি স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ শিখে কাকে তাক লাগিয়ে দেয়া যায়! কাকে? প্যাক কাদায় মাখামাখি নিধি ক্ষেত থেকে উঠে আসতে চায় না।
আজমত চাচা জোর করে তাকে তুলে আনে তারপর কাদামাখা পায়ে ধুলোর রাস্তায় লাঠি দিয়ে বর্ণমালা লেখে। নিধি তার ওপরে হাত ঘোরায়।

সেতাবগঞ্জ থেকে এসে ভোমরাদহ ভেদ করে চলে যাওয়া এই সড়ক, দু’পাশে লাগানো সারিবদ্ধ তুত গাছ, হাওয়ায় ধুলামাটির ঘ্রাণ সব কিছু ভালো লাগতে থাকে। ভোমরাদহ ভালো লাগতে থাকে, নিধি এখান থেকে আর যাবে না কোথাও।

চতুষ্কোন এক খন্ড জমির ধান চোখের সামনে রোয়া হয়ে গেলে বাঁশের ঝাকা বোঝাই বীজতলার চারা নিয়ে কিষাণেরা আরেক খন্ড জমির দিকে হাঁটা ধরে। তাদের কাদা মাখা ফাটা গোড়ালির ছন্দের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে নিধি। ভারী বর্ষায় এক ঝলক শুকনা বাতাস এসে নিধির ছোট্ট বুকটা অনেকদিন পর ভরে দিয়ে যায়।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।