নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-১৯

স্বপ্নে একটা গ্রীস্মকাল এসেছিল জাঁকালো, তাদের দরজায় কড়া নেড়েছিল। ঘামে চ্যাপচ্যাপে হয়ে গিয়েছিল নিধির মাথার চুল। ঘুম ভেঙ্গে আবেদার শত অনুরোধেও ঘর থেকে বারান্দায় আসতে চায়নি সে।

এক্কা দোক্কার কোর্ট পদভারের শূন্যতা নিয়ে পরেছিল, খোলা। নিধি আবেদাকে ফ্যানও চালাতে দেয়নি, ভাঁজ করা চাদর বালিশের মধ্যে অনড় বসেছিল। ঘামে ভেজা চুল আর গরম জেঁকে বসে বুকের কাছে খলবল করেছিল কফ-কাশি। মা যখন ফিরলো- নিধির গলা বসে ঘড়ঘড় শব্দ করছে।

টিউবওয়েলের পানি চেপে চেপে ঠান্ডা করার পর তার মাথায় দু’তিন বালতি ঢাললো মা আর আবেদা। তারপর গা মুছিয়ে, পাউডার ছিটিয়ে, মায়ের হাতের ভাতের লোকমার কাছে হা করতে করতে নিধি দেখলো মা’র নাকে চিক চিক করছে শরষে দানা ঘাম। পশ্চিম আকাশ তখনো ফিকে লালে ভাসছে, দূরে কেউ ঢাকের বাজনা বাজাচ্ছে, হাটে আসা কোন নাকগানের দল হবে।

নিধির রাগ কমেনি, সে জানতেই চায়নি মা কেন তাকে রেখে গেল, কখন ফিরেছে।

সেজন্যেই আর পরদিন বিকেলে আবেদাকেও সে জিজ্ঞেস করেনি- মা কোথায়?
কি করতে পারতো সেই সময় তার বয়সী অত অভিমান পটিয়সী একটা মেয়ে?
এতদিন পর স্মৃতির ঘট হাতড়ে নিধির মনে সংশয় দেখা দেয়। আবেদার কোলে পাঁজাকোলা হয়ে শীতের ভোররাতে আগুনের আঁচে ঘামে ভেজা নিধি বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে চিৎকার করে উঠলে ভালো হতো?
ঝাঁপিয়ে ছুটে গিয়ে তার মা’কে খোঁজা উচিৎ ছিল? অথবা, তার অচেতন মন জেনে গিয়েছিল সব! স্তব্ধ ভবিতব্য এভাবে আগে থেকে টের পাওয়া যায়!
বিকেল বেলায় বাইরে যাওয়ার আগে, তারও আগে যখন গোসল সেরে ভেজা চুল ঝেড়ে রোদের ওপর রং ধনু বানিয়ে গামছাটা তারে মেলে দিচ্ছিল মা, কই নিধি কিছু টের পায়নি তো! বুঝতেই পারে নি যে মা জামা কাপড়ের নিচে ক্ষয়ে ক্ষয়ে খুলে যাচ্ছে, আবার কী এক মন্ত্রবলে আটকে নিচ্ছে নিজেকে নিজের ভেতরে! সে এত কিছু বোঝার মত ছিল নাকি!

আচমকা দু’একটা বিকেলে মা’কে একলা দেখা গিয়েছিল, সেটাও কেমন গুজব হয়ে চাউর হয়ে মথুরাপুরের সবচাইতে মুখরোচক খবর হয়ে উঠতে দিন তিনেকও লাগেনি। জুট পার্চেজারের বৌ রিক্সা নিয়ে একলা একলা বেড়ায়। নদীর পারে একলা বসে থাকে, দূরে দাঁড়িয়ে থাকে রিক্সাটা, বিস্তৃত ধূসর নদীর ধারে রিক্সার রঙ্গিন চিত্রাবলী স্পষ্ট দৃশ্যমান থাকে। জলীয় বাতাসে তার চুল অনিচ্ছাতেও উড়ু উড়ু হয়। যেদিন মা বাইরে যায়, সূর্যের সঙ্গে জেদ করে অস্ত যাওয়ার পরে বাড়ি ফেরে।

কেউ বলে দেয়নি তবু নিধি তার সাড়ে সাত বৎসর বয়সী চোখ দিয়ে আবেদার স্বামী মজনু’র কালো পোড়া দেহ দেখতে পায়। নিধির মা তাকে দু’তিনদিন নিজহাতে ভাত বেড়ে খাইয়েছে। খোঁচা খোঁচা দাড়িসমেত লোকটার চোখের তলায় গভীর কালি, কমবয়সে আধা পেকে যাওয়া চুলগুলি আদ্র, বিষন্ন। চেয়ারে একপা তুলে খেতে খেতে সে আরো একটা কাঁচা মরিচ চেয়ে নিয়েছে। কে জানে, হয়তো শীতে মরিচের প্রবল ঝাঁঝে শরীরের ওম বাড়ানোর গোপন অভিলাষ ছিল তার।

মজনু একদিন বারান্দা সামনের চিলতে বাগান নিড়ানি দিতে দিতে নিধিকে আঙ্গুল মটকানো শিখিয়ে দিয়েছিলো- ব্যথা লাগলেও বেশ একটা নেশা’র মত। নাকের ফুটোয় ঝাড়ুর শলা ঢুকিয়ে মজনু হাঁচি দিতো একসঙ্গে দশ বারোটা। আর মোড়ায় বসে থাকা নিধিকে একটা বাঘদাসের গল্প শুনিয়েছিল।

বাঘদাসের সঙ্গে তার প্রতি বিষ্যুদবার হাট থেকে ফেরার সময় দেখা হতো। বাঘদাসটা একটা উলট কম্বল গাছের পাশে কাৎ হয়ে শুয়ে অপেক্ষা করতো। আর মজনুকে দেখলেই- ‘আমার জইন্য দুইটা সরপুটি আনলা না ক্যান’- বলে ঘ্যান ঘ্যান করতো।
-‘আমি ভুলি জাইতাম’ মজনু বলে, ‘আমি আনতাম কাছিমের মাংশ, সুবলের জইন্য, সুবল কামার আমাক একটা তীর ধনুক বানায়া দিবার চাইছিল, কও দেখি সুবলক থুইয়া আমি বাঘদাসাক মাছ আনি দেই, আরচাইয্য কথা আর আছে এই চায়া?’
– ‘বাঘদাস মাছ খায়’?
– ‘খায় খালি? খায়। ওয় তো বিলাইয়ের বংশ, বাঘের অংশ। নিজে খায় আর সুযুগ পাইলে মাছ বিলায়’।
– ‘তারপর?’
তারপর মজনু ফেনিয়ে ফেনিয়ে বাঘদাসকে পোষ মানিয়ে হালচাষ করার গল্প ফেঁদে দিলে নিধি চোখ বড় করে মুখ হা করে থাকতো। গল্পে তখন বাঘদাস বারো কানি জমি চষে মাসকলাই ডাল লাগিয়ে ফেলেছে। সেই ডাল মাড়াই করে শুকিয়ে ভাঙ্গিয়ে ভিজিয়ে বড়ি বানিয়ে আবেদা বেগুন দিয়ে চচ্চড়ি রেঁধে তাকে ভাত দিয়েছে।
নিধিকে একদিন চচ্চড়ি খেতে নিমন্ত্রণ করবে, এই অঙ্গীকার করেছিল মজনু।

মানুষের জটলার একটা গোল ঘেরের ভেতর নিধি আবেদার কোলে চেপে বসে ছিল। আবেদা একদম কাঁদেনি। তার মুখ দেখলে মনে হয় কেউ তাকে দোররা মেরে চুল কেটে দিয়েছে। স্বামী আগুনে পুড়ে মরার অপমান খুব খোলা মেলা হয়ে সামনে এসে শাসিয়ে যাচ্ছে তাকে। মানুষের জটলা ফুঁড়ে অগ্নুৎপাতের লাভার মত প্রশ্নমালা ঠাহর করা যায়। মজনুর পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া আর নিধির মায়ের থার্ড ডিগ্রি বার্ণ নিয়ে যথেচ্ছ প্রশ্ন তোলার অধিকার তখন জনতার ওপর ন্যস্ত হয়ে গেছে।

নিধির পরিস্কার মনে আছে, দাদু তাকে নিতে এসেছিল, অন্যবারের মত এবার সঙ্গে কিছু ছিল না। নিধিরও কিছু না, না কোন স্যুটকেস ব্যাগ, আবেদা শুধু খান কয় জামা ভরে স্কুল ব্যাগটা নিয়েছে, যেটার বাইরের পকেটে প্রতিবার মা বাড়ি বদলের সময় তার সেলাইয়ের বটুয়া ঠেসে ঢুকিয়ে দিতো।

মানুষের উচ্চস্বর কথাবার্তা সেঁচে তোলা মায়ের আর্তনাদ ধুণকরের হালকা চালে তুলো ধূনার মত নিধির কানে ধাক্কা দিচ্ছিল, যতক্ষণ না রিক্সাটা চোখের আড়াল হলো। না দেখলেও সে জানে- কম্বল দিয়ে প্যাচানো মায়ের পরনে ম্যাক্সি, ভেতরে কোন অন্তর্বাস নেই। শতশত লোকের গোল ভীড় আর হট্টগোলের মধ্যে মা’কে নিশ্চয়ই মনে হচ্ছিল গোড়া থেকে মাটি সরে যাওয়া গাছ, শুধু কুড়ালের বড় একটা কোপ খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার অপেক্ষা।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।