স্বাধীনতার মাসে সেলিম জাহানের কলাম: ‘কেঁদেও পাবো না তাকে …’

ছবিসূত্র: শহীদ লুৎফুল আজিমের ছবিটি তাঁর সহপাঠী খালেদা আখতারের সৌজন্যে প্রাপ্ত। ১৯৬৯ এ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে তোলা।

জানি না, ২৫ মার্চের রাতে কেউ তাঁকে মনে করে কি না। আসলে ক’জন তাঁকে মনে রেখেছে, তাই তো জানি না। তার চেয়েও বড় কথা, ক’জনই বা জানেন শহীদ লুৎফুল আজিমের কথা, যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে শহীদ হয়েছিলেন। সে রাতে সলিমুল্লাহ হলের ১৪৩ কক্ষে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাঁকে হত্যা করেছিল।

এখনও মনে আছে, আজিম ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৭১ এর ১৩ই মার্চের সকালে। মনে আছে এ কারনে যে, সেদিন সকালেই তাজুল ভাই (সলিমুল্লাহ হলের ৩৩ নম্বর কক্ষের আমার সহকক্ষবাসী প্রয়াত তাজুল ইসলাম) আমাকে বকছিলেন এই বলে যে, ‘আপনি এখনো ঢাকায় বসে আছেন কি করতে? বরিশাল যাচ্ছেন না কেনো এখনো? জাহাজ-লঞ্চ যে কোনদিন বন্ধ হয়ে যাবে। ভাবেন এ সব কিছু?’ বাপ রে, সেকি বকা! ধমকের লাভাস্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি আমাকে।

বকা-ঝকার দায়িত্ব শেষ করে হৃষ্টচিত্তে বেরিয়ে গেলেন তাজুল ভাই। আমিও বেরুবার জন্যে কাপড়-জামা পড়ে ঘরের তালা লাগাতে লাগাতেই দেখলাম, হলের দু’অংশের বাগান পেরিয়ে আমাদের পূর্ব অংশের টানা বারান্দায় উঠে আসছেন আজিম ভাই। গনিতের ছাত্র ছিলেন তিনি। আমাদের এ দিকটায় তিনি আসছিলেন সম্ভবত তাঁর সতীর্থ মতিন ভাইয়ের সঙ্গে বাহাস করতে। অনবরত রাজনৈতিক তর্ক করতেন দু’জন। আজিম ভাই ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়াপন্হী) ছিলেন। মতিন ভাইয়ের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা আজ আর মনে নেই। ভুলে গেছি।

১৯৭১ সালের ১৩ মার্চের মাত্র ১২ দিন পরেই ২৫ শে মার্চের কাল রাত্রিতে সলিমুল্লাহ হলে তাঁর কক্ষেই গুলি করে আর বেয়োনেট খুঁচিয়ে পাকিস্তানী বর্বরেরা হত্যা করে শহীদ লুৎফুল আজিম কে। শুনেছি ২৮ শে মার্চ আমাদের বন্ধু নিজাম (শহীদ নিজামুদ্দীন আজাদ) ঐ ১৪৩ নম্বর কক্ষে গিয়েছিলে। না, নিজামকেও তো জিজ্ঞেস করতে পারবো না। সে ও তো মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে ১৯৭১ এর নভেম্বরে।

কিন্তু এটা কখনো ভুলি নি যে হলের পূর্ব অংশের ৩৩ নম্বর কক্ষে স্হায়ীভাবে উঠে আসার আগে পশ্চিম অংশের ১৪৩ নম্বর কক্ষে দিন পনেরোর জন্যে অস্হায়ীভাবে আজিম ভাইয়ের সহকক্ষবাসী ছিলাম আমি। মনে আছে একমাথা কালো চুলে লম্বা মুখে মোটা কাচের চশমার পেছনে ভীষন একজোড়া উজ্জ্বল চোখ ছিল আজিম ভাইয়ের। কিন্তু মৃদুভাষী ছিলেন তিনি। নরম গলায় কথা বলতেন— তখন তাঁর চকচকে চোখেও একটি নরম ছায়া নামতো। হলের বহু কিছু তিনিই আমাকে চিনিয়েছিলেন।

ঐ পনের দিনে অনেক গল্প করেছিলেন তিনি নিজের সম্পর্কে। বাবা মায়ের বিয়ের ১৪ বছর পর মাত্র ৭ মাসে জন্ম নেয়া সন্তান ছিলেন আজিম ভাই। সেই সময় তূলোর মাঝে রেখে বড় করা হয়েছিল তাঁকে। ভারী স্নেহময় ছিলেন তিনি। খাবার ঘরে আমি একটু দেরী করে যেতে চাইতাম। কিন্তু আমার জন্যে তিনি প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন।

জানা ছিলে না যে, আজিম ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি ছিল পটুয়াখালী জেলাতে। বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরে। স্বাধীনতার পর অনেক খুঁজে আজিম ভাইয়ের ক’জন সহপাঠী গিয়েছিলেন পুরানো ঢাকার একটি বাসায় আজিমের ভাইয়ের বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে। তাঁর বাবা আজিম ভাইয়ের সহপাঠী খালোদা আপার (খালেদা আখতার) কাছে এসে বলেছিলেন, ‘খালেদা, তোমার হাত দুটি আমার বুকে একটু ধরে রাখি, এতে আমার বুকের কষ্ট যদি একটু কমে’। আজিম ভাইয়ের মা একটি কথাও বলতে পারেন নি, শুধুই কেঁদেছিলেন। আজিম ভাইয়ের সহপাঠীদের চোখও শুকনো থাকে নি।

জানা ছিল না যে, আজিম ভাই ১৯৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের সময়ে রায়পুরায় ফজলুল হক খন্দকারের নির্বাচনী প্রচারনায় অংশগ্রন করেছিলেন। আর এও জানতাম না, যে মতিন ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর অনর্গল কথা কাটাকাটি লেগেই থাকতে, সেই মতিন ভাই ই ২৭ মার্চ সলিমুল্লাহ হলে গিয়েছিলেন আজিম ভাইয়র খোঁজে। ১৪৩ নম্বর কক্ষের সামনেই পেয়েছিলেন আজিম ভাইয়ের কালো মোটা ফ্রেমের ভাঙ্গা চশমা আর আজিম ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলার পরে তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় মেঝেতে লাল রক্তের ছোপ।

জানা ছিলো না, কিন্তু আজিম ভাইয়ের সহপাঠী বন্ধু খালেদা আক্তারের কাছে শোনা, ১৯৭১ এর ২২ শে মার্চ আজিম ভাই চার পাতার একটি চিঠি লিখেছিলেন, যার পুরোটাই ছিল দেশের স্বাধীনতায় আমাদের করনীয় দিকনির্দেশনা। খালেদা আপারা গনিত বিভাগের ১৯৭২ এর একুশে সঙ্কলনে চিঠিটা ছাপিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।

এটা অবশ্য জানতাম যে , ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরে ত্রাণকাজ করার জন্যে আজিম ভাই চলে গেছিলেন দক্ষিণাঞ্চলে—চর ফ্যাশন এলাকায়। একমাস ছিলেন তিনি সেখানে। জলের মধ্যে কাজ করতে করতে দু’পা সাদা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। ‘পরোপকার করা আমার মজ্জাগত’, হাসতে হাসতে বলেছিলেন তিনি একদিন আমাকে।

১৯৭১ সালের ১৩ই মার্চ ঐ দিন বারান্দা দিয়ে উঠে আসতে আসতে স্মিতহাস্যে আমাকে বলেছিলেন তিনি, ‘কতদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয় না’। তারপর বাঁয়ে মোড় নিয়ে মতিন ভাইয়ের কক্ষের দিকে চলে গেলন। অপসৃয়মান তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনেকটা অন্যমনস্কভাবে ভাবলাম, সত্যিই বহুদিন ধরে আজিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় নি।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আহা, সেদিন কেন দু’দন্ড দাঁড়িয়ে আজিম ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করি নি? কেন প্রশ্ন করি নি, কবে তিনি ঢাকা ছাড়বেন? কেন জানতে চাই নি কি নিয়ে আজ তিনি বাক্-বিতন্ডা করবেন মতিন ভাইয়ের সঙ্গে? কিন্তু আজ এ সব ভেবে কি আর হবে? ‘কেঁদেও তো আজ পাবো না তাঁকে অজস্র বর্ষার জলাধারে!’

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

One Comment

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।