নাহার তৃণার নভেলা: অদ্বৈত পারাবার- পর্ব-৩

সামান্য আয়োজন কিছু খেলনা, বেলুন, এসব পেয়ে বাচ্চাগুলো এমন আনন্দে রমরমিয়ে ওঠেছে, দেখে মনটা ভরে যায় খাদিজা খানমের। ‘জোনাকি’ নামের এই আবাসিক শিশু নিকেতনটি আদতে এতিমখানারই আধুনিক রূপ বলা যেতে পারে। এখানে বসবাসকারী অধিকাংশ শিশু এতিম। পথে পথে ঘুরে ফিরে বেড়ানো মুক্ত শিশুদের অনেকেই নিয়মের বাঁধা ধরায় আটকে থাকতে চায় না। সেরকম দু’চারজন পালিয়েও গেছে। প্রথম দিকে একুশ জন হলেও এখন পনেরো জন শিশু আছে জোনাকিতে। খাদিজা খানম চেয়েছিলেন বাচ্চাগুলোর জন্য চৌকির ব্যবস্হা করতে। শীতের দিনে ঠান্ডায় কষ্ট পাবে নয়তো। তোবারক ভাই সেসবে না গিয়ে ঢালাও বিছানার ব্যবস্হা করেন। ভারি জাজিমের উপর চাদর পেতে সার বেঁধে সবাই ঘুমায়। চৌকিতে অনেক জায়গা নষ্ট হতো। প্রথম দিকে ব্যবস্হাটা মনোপুত না হলেও পরে তোবারক ভাইয়ের বুদ্ধি বিবেচনায় খুশিই হয়েছেন খাদিজা।

ঢাকা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে এই শিশু নিকেতন ব্যক্তিগত মমতা আর শ্রম দিয়ে গড়ে তুলেছেন খাদিজা খানম আর তার খালাতো ভাই তোবারক হোসেন। শিশুদের জন্য এই প্রতিষ্ঠানটা গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারি অনুমতি জোগাড়ের ঝক্কি ঝামেলার সবটাই একহাতে তোবারক ভাই সামলেছেন। ওঁর কারণেই জোনাকি চালু করা সম্ভব হয়েছে খাদিজা খানমের পক্ষে। নইলে তার একার পক্ষে এতটা করা সম্ভব হতো না হয়ত। বাচ্চাদের দেখাশোনার জন্য দু’জন লোক আছেন। পড়াশোনার জন্য আছেন তিনজন শিক্ষক। পুরো ব্যবস্হাপনার দেখাশোনা করেন অকৃতদার তোবারক হোসেন।

সময় সুযোগের মেলবন্ধন ঘটে গেলে খাদিজা চলে আসেন জোনাকিতে। ব্যবস্থাপনার খোঁজ খবর নেন। মাঝে মাঝে বাচ্চাগুলোর পড়াশোনার দায়িত্বেও জুড়ে যান। জোনাকির অবস্হান যেহেতু শহরের বাইরে আর তার নিজেরও স্কুল থাকে, সে কারণে ছুটির দিন ছাড়া এদিকে নিয়মিত আসা খাদিজা খানমের পক্ষে সম্ভব হয় না। এখানে এলে তার মন কেমন ফুরফুরে হয়ে ওঠে। নিজের সন্তানহীনতা তিনি কচিমুখগুলো দেখে বুঝি ভুলে থাকতে চান। ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলোর সঙ্গে মুখর সময় কীভাবে যে উড়ে চলে যায় বুঝতেও পারেন না। তার একাকী জীবনে জোনাকি আলো ছড়ায়।

তিন কামরাসহ অনেকটা খালি জায়গা নিয়ে জমিটা আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য তিনি কিনেছিলেন বছর সাত আগে। একরকম বাধ্য হয়েই তখন তাকে এটা কিনতে হয়েছিল। ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার মুখে জমির মালিক অজিত ব্যানার্জিকে বোনের কাছে তোবারক হোসেনই নিয়ে এসেছিলেন। তার মতামত, অজিত ব্যানার্জির জমিটা খাদিজা কিনলে ভালো হবে। বহুদিন আগে, লম্পট, মদ্যপ, স্বামীকে ডিভোর্স দেবার পর পর, নিজেকে আরো বেশি কাজে ব্যস্ত রাখার ভাবনা থেকে ভাইকে বাচ্চাদের জন্য একটা আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন। সেকথা মাথায় রেখেই তোবারক হোসেন বোনকে পরামর্শ দেন অজিত ব্যানার্জির জমিটা একাজে দারুণ সহায়ক হতে পারে। কিন্তু প্রথমদিকে অন্যের ভরন্ত সংসার উপড়ে নেওয়া ঘরদোরসহ জমিটা কেনার ব্যাপারে খাদিজা খানমের অস্বস্তি কাজ করেছিল। আহা! মানুষটার কত সাধের ঘর বাড়ি, নিকানো উঠোন, তিনি কোন প্রাণে সেটা নিজের কাজে লাগাবেন! এমন ভাবনায় এক-দু রাতের ঘুম উবে গিয়েছিল তার চোখ থেকে। সাজানো সংসারের মায়া তার কাছে কতটা সে আর কে বুঝে! জমি কেনার আগে ভাইয়ের পীড়াপীড়িতে তিনি যখন জায়গাটা ঘুরে দেখতে আসেন, তখন উঠোনের মাঝখানে উঁচু বেদীতে তুলসী গাছটা দেখে তাঁর বুকে বিষণ্ন এক ব্যথা মোচড় তুলেছিল। হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসীরা তুলসী গাছকে পবিত্র জ্ঞানে পূজা করেন। তাদের বিশ্বাস এই গাছ যে বাড়িতে থাকে, সে বাড়িতে নাকি কখনও শোক থাবা বসাতে পারে না। সংসারে সুখ শান্তি পোষ্য হয়ে থাকে নিরন্তর। তুলসী বেদীটা দেখে বলে দেয়া যায় এ ভিটেতে নিয়মিত পূজা-আচ্চা হতো। যত্নের ছাপ স্পষ্ট। তারপরও তো কই অজিত নামের মানুষটার সংসারে সুখ শান্তি পোষ মানলো না। বিবাগী হাওয়ার মতো কোন পথে সে চলে গেল! শিকড়ের বাঁধন ছিঁড়ে, বিশ্বাস-সংস্কার ভাসান দিয়ে পরিবারটা দেশ ছাড়তে বাধ্যই হলো। কেমন এক আত্ম অনুশোচনায় খাদিজা সেদিন ছেলেমানুষের মতো কেঁদে ফেলেছিলেন। পরে মন শান্ত হলে, তোবারক হোসেনের কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়ে ছিলেন, এই তুলসী বেদী এবং গাছের যত্ন নিতে তিনি কার্পণ্য করবেন না।

খাদিজার মানসিক টানাপড়েন বুঝতে পেরে ভাই তোবারক হোসেন তাকে বুঝ দিয়েছিলেন,
-তুই তো আর ওরে ভিটে ছাড়া করিসনি বোন। করেছে ওর নসিব। তুই জমিটা কিনলে বরং ওর উপকারই হবে বুঝলি! তাছাড়া এরকম পরিস্হিতিতে পানির দরেই পাবি জমিটা।
খাদিজা খানম জমি কিনতে রাজী হলেও ন্যায্য দামেই সেটা কেনার প্রস্তাব দেন। পরিস্হিতির বাড়তি মাশুল অজিত ব্যানার্জিকে যেন গুনতে না হয়, সেদিকটা দেখার ভার তোবারক হোসেনের উপর ছেড়ে দেন। তার কথা মতো ন্যায্য দামেই জমিটা কেনা হয়। অজিত ব্যানার্জিকে, এমন আশ্বাসও দেয়া হয়, চাইলে যখন খুশি তিনি এসে তার জায়গা জমি দেখে যেতে পারবেন। মানুষটার অসহায় উপস্হিতি খাদিজা খানমের পক্ষে সহ্য করা অস্বস্তিকর ছিল। যেকারণে এ সংক্রান্ত সব দায় দায়িত্ব ভাইয়ের উপর দিয়ে তিনি সরে থাকেন।

একটা পরিবারকে তাদের জন্ম ভিটা-মাটি ছেড়ে নতুন দেশে, নতুন করে জীবন শুরুর লড়াইয়ে ঠেলে দেয় যে দেশের রাজনীতি, ধর্মের নামে অর্ধমের উগ্রতা, ভবিষ্যত নাগরিক আজকের শিশুদের জন্য সে দেশটায় এ কেমন উদাহরণ তারা রেখে যাচ্ছেন! এমন ভাবনায় খাদিজা খানমের মন বিদ্রোহ করতে চায়। না পারার ব্যর্থতায় তিনি আরো মুষড়ে পড়েন। স্কুল পাঠ্যে তারা ছাত্রদের পড়ান, ‘সবার উপর মানুষ সত্য,’ অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন আচরণের নজির দেখায়। অজিত ব্যাজার্নির ভরা সংসারটার কথা ভেবে খাদিজা খানমের ভারী কষ্ট হয়। জমি কেনার ছুতোয় মানুষটা তাদের সংস্পর্শে এসে ছিলেন বলেই না বিষয়টা জানা সম্ভব হয়েছে। আরো কত পরিবার এভাবে উজাড় হচ্ছে, তার হিসাব কে জানে! সমাজ-রাজনীতির এসব জটিল কুটিল ঘোরপ্যাঁচ তিনি বোঝেন না। তিনি বোঝেন এক মানুষের পাশে অন্য মানুষের নিরাপদ ঠাঁই। সেই মানুষই যদি না থাকে দেশ-জমি কোন কাজে লাগে?

কেনার পর জমিটা ওভাবেই ছিল কিছুদিন। গ্রামের বাস ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে সেখানে এসে ওঠেন পিছুটানহীন তোবারক হোসেন। তারও ইচ্ছে নিজের সঞ্চয় বোনের মহৎ কাজে নিয়োগ করেন। যতদিন সেটা শুরু না হচ্ছে ততদিন তিনি খামোখাই জমিটা ফেলে না রেখে লোক লাগিয়ে সব্জি চাষবাস শুরু করে দেন। বেশ কিছু ফলের গাছ লাগানো হয় জমির চারপাশ ঘিরে। জমির ফলন বাজারে বিক্রিবাটা, তার হিসাব নিকাশ সবই তোবারক হোসেনের এক্তিয়ারে। সব্জি চাষের জন্য সামান্য জমি রেখে, আগের কাঠামো ঠিক রেখে ঘর তিনটার পাশে আরো দুটো ঘর তোলা হয়। গত বছর থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে জোনাকি শিশু নিকেতন চালু হয়েছে।

মা-বাবা হারা এসব শিশুদের মাথার ওপর নিরাপদ একচিলতে ছাদ, খাওয়া পরার কোনো ঠিকঠিকানা থাকে না। তাদের পক্ষে জন্মদিনের তারিখ মনে রাখা শুধু অসম্ভব না বাহুল্যেরও সামিল। খাতায় নাম রেজিস্ট্রির সময় তাই নিদির্ষ্ট মাসের নিদির্ষ্ট একটা তারিখকে ওদের সবার জন্মদিন হিসেবে ঠিক করা হয়েছে। সেই তারিখ হিসেবে আজ ‘জোনাকি’র বাচ্চাদের জন্মদিন। খাদিজা খানম বাচ্চাদের জন্মদিন পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দিনটাতে নিকেতনে খাওয়া দাওয়ার একটু বিশেষ ব্যবস্হা করেছেন তোবারক ভাই। মাংস পোলাও পেলে ওরা বেশি খুশি থাকে, তারই তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে সকাল থেকে। সে উপলক্ষে বেলুন, খেলনা, কেক, মিষ্টিসহ উপস্হিত হয়েছেন খাদিজা খানম। তাকে ঘিরেই চলছে আনন্দ উৎসব।

বাড়তি আনন্দ হিসেবে একজন গ্যাস বেলুনওয়ালাকেও হাজির করা হয়েছে। ড্রাইভার ফারুক ছুটোছুটি করে কোত্থেকে তাকে ধরে এনেছে। বেলুন ওড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে বাচ্চাদের মধ্যে। বাচ্চাদের দলে ফারুকটাও মিশে গেছে দিব্যি। বেলুন ওড়ানো খাদিজা খানমের গোপন এক নেশাই বলা যায়। প্রায় তিনি বেলুন কিনে তার গায়ে ঠিকানা লিখেন বেলুন ওড়ান কী এক খেয়ালে। কেক মিষ্টি কিনতে গিয়ে আজ সকালেও উড়িয়েছেন বেশ কিছু বেলুন। নিজের ঠিকানার সাথে এবার তিনি বেলুনের গায়ে এমন কিছু লিখেছেন আর চোখকে শাসন করেছেন। কী কারণে তিনি ছোট্ট বাক্যটা লিখতে গেলেন কে জানে! স্কুলের বাচ্চাদের আগে বিভিন্ন উপলক্ষের ছুতোয় বেলুন উপহার দিতেন। এ নিয়ে নানান কথা কানে আসায় সেটা বন্ধ। এখন নিজেই বেলুন কিনে খোলা আকাশে উড়িয়ে দেন। বেলুনগুলো উড়িয়ে দেবার পর তিনি গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন, যদি কেউ সেরকম একটা বেলুন পেয়ে ঠিকানা ধরে তার সামনে এসে উপস্হিত হয়! এমনটা ঘটবার সম্ভাবনা একেবারে নেই জেনেও ছেলেমানুষি আগ্রহটা মুঠোবন্দী রেখে তার অপেক্ষা করতে ভালো লাগে।

বাচ্চাগুলো যতবার বেলুনে কিছু লিখতে চেষ্টা করছে ততবারই সস্তার বেলুন দুম করে ফেটে যাচ্ছে। আর সে শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে হেসে ওঠছে একদল আনন্দে মাতাল দেবশিশু। শিশুদের জন্য একবুক মমতা নিয়ে একটু দূরে দুটো ফোল্ডিং চেয়ারে বসে ভাই-বোন সে দৃশ্য দেখছেন দু’চোখ ভরে।

 

নাহার তৃণা

জন্ম ২ আগস্ট ঢাকায়। বর্তমানে আমেরিকার ইলিনয়ে বসবাস। ২০০৮ সালে লেখালেখির জগতে প্রবেশ। দুই বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা এবং ওয়েবজিনে লিখছেন গল্প, প্রবন্ধ, গল্প, অনুবাদ, সাহিত্য সমালোচনা। একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০-এ পেন্সিল পাবলিকেশনস প্রতিভা অন্বেষণে তার ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’ সেরা গল্পগ্রন্থ নির্বাচিত হয়। একইবছর অন্বয় প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় ‘এক ডজন ভিনদেশী গল্প’। নাহার তৃণার প্রকাশিত বই দুটি এখন বইয়ের হাট প্রকাশনায় অ্যামাজন কিন্ডেলেও পাওয়া যাচ্ছে।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।