সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ছোট গল্প: পরম্পরা

এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলেন সায়ন চৌধুরী। ভিআইপি বিশ্রামাগারে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। দেয়ালের টিভি স্ক্রীনে দেখাচ্ছে, এমিরেটস এর ফ্লাইট ল্যান্ড করবে মিনিট দশেকের মধ্যেই।

রাস্তায় এমনিতেই জ্যাম ছিল। মহাখালি এসে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে হোল। প্রধানমন্ত্রী পাস করছেন। হতাশ হয়ে তিনি ভাবছিলেন, সময়মতো এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে পারলেন না তাহলে!

তার বাবু অরিণ আসছে আমেরিকা থেকে। কত বছর পর! সাথে স্পেনিশ বৌ আর ওদের বাবু। সায়নের দাদুভাই। ভীষণ রাগ হচ্ছিল তার প্রধানমন্ত্রীর উপর। প্রধানমন্ত্রীর উপর। তিনি কি জানেন, এই সময়টুকু তার কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ! গরীব দেশে অপচয় বেশি। সময়, সম্পদের ব্যবহার সবকিছুতে… বিরক্ত হয়ে ভাবতে থাকেন সায়ন।
বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী প্রায় সাধারণের মতোই চলাচল করেন। রাস্তা বন্ধ হয় না। প্রোটোকলের ডামাডোল থাকে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রী নাকি জগিং করতে বের হন একা একা। ভোরের বায়ু সেবনে আসা লোকজনের সাথে পার্কে বসে চুটিয়ে আড্ডা দেন। তাদের কী প্রয়োজন হয় না নিরাপত্তার?
গোল্লায় যাক নিরাপত্তা! ওসব নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই সায়ন চৌধুরীর। তাঁর অতি ছোট্ট একটা চাওয়া। বাবু ল্যান্ড করার আগেই তিনি এয়াপোর্টে পৌঁছাতে চান।
ড্রাইভারটা চৌকস। ফাঁক বুঝে সাঁ করে বামে ডিওইএইচ এর মধ্যে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল। সেনা কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা। বেশ নিরিবিলি। দ্রুতগতিতে ক্যান্টনমেন্ট হয়ে এয়ারপোর্ট রোডে গিয়ে পড়ল গাড়িটা। গাড়িতে ফ্লাগ স্ট্যান্ড থাকার এই হল বাড়তি সুবিধা, ভাবতে থাকেন তিনি।

প্রোটোকল অফিসার সবকিছু এরেঞ্জ করে রেখেছিল। প্লেন থেকে নামার গেটের মুখ পর্যন্ত চলে যেতে পারলেন সায়ন। নামতে শুরু করেছে প্যাসেঞ্জাররা।

চোখের সামনে ভাসতে থাকে সবকিছু। এই তো সেদিন। নার্স অরিণকে এনে তার কোলে দিল। বিশ্বাস হচ্ছিল না, তোয়ালে জড়ানো তুলতুলে একরত্তি এই বাবুটা তার নিজের। কেমন চোখ বুজে আছে। কালছে টাইপের গায়ের রঙ। শিরাগুলো দৃশ্যমান সারা শরীরে।
তার সেই বাবু আজ দেশে আসছে কত বছর পর। সাথে নিয়ে আসছে তার নিজের ছোট্ট বাবুকে। ছবিতে দেখেছেন সায়ন, নাদুস নুদুস গুল্লু একটা। মায়ের মতো নীল চোখ। কিন্তু চেহারাটা? তার বাবু অরিণের সেই ছোট্টবেলার মতোই কি!
বাবু যখন আমেরিকা গেল কত বয়স ছিল তখন তার! সতের নাকি আঠারো!
ডিসি’র দায়িত্ব পালন করে প্রোমোশন পেয়ে তখন ঢাকা এসেছেন সায়ন। কৃষি মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেছেন জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবে। বাবু এ-লেভেল শেষ করে ভর্তির জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছুটোছুটি করছে।
হঠাৎই একদিন সকালে ডাইনিং টেবিলে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল- বাবা, আমি যদি দেশের বাইরে পড়তে যাই, তাহলে কি তুমি আপত্তি করবে?
আপত্তি করব কেন! মুখে উদার হাসি ঝুলিয়ে বলেছিলেন সায়ন।
তাহলে বাবা আমি আমেরিকা যেতে চাই। কিছু টাকা পয়সা লাগবে। দিতে পারবে?
পারব না কেন! কষ্ট একটু হলেও ঠিক জোগাড় করে ফেলব। কিন্তু, তুমি না বললে ঢাকা ইউনিভার্সিটি নয়তো আইবিএ-তে পড়বে?
যদি আমেরিকা যেতে না দাও তাহলে নিশ্চয়ই পড়ব। কফিতে চুমুক দিয়ে বলল অরিন।
যেতে না দিই মানে! তোমার কোন ইচ্ছেটা অপূর্ণ রাখি আমি? আহত কন্ঠে বলেছিলেন তিনি।
না, বাবা। সে কথা বলি নি। ইউ আর দ্য বেস্ট ফাদার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। মা মারা যাবার পর থেকে সব তুমি একাই সামলে চলেছো। আমার সব চাওয়া পূর্ণ করেছো। তোমাকে একা ফেলে তাই কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না বাবা। চোখ মোছে সে।
কিন্তু, কেরিয়ার গড়তে গেলে সেক্রিফাইস তো করতেই হবে বাবা। আমার কোন আপত্তি নেই। তুমি প্রসেস শুরু করে দাও। মাথা নিচু করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করেন সায়ন চৌধুরী।
তোমাকে ঠিক বলা হয় নাই বাবা। আমি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে স্কলারশিপ পেয়েছি। এই যে একসেপট্যান্স লেটার। কাগজটা টেবিলের উপর মেলে ধরে সে।
বেদনাহত দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন সায়ন। ছেলে এখন বড় হয়ে গেছে। অনেক কিছুই তাকে আর জানানোর প্রয়োজন মনে করে না।
ডোন্ট ওরি বাবা। দিস ইজ নট ফাইনাল। তুমি না চাইলে অবশ্যই আমি যাব না। তাড়াতাড়ি বলল সে।
না না। চাইব না কেন। আগে তো কিছু বল নাই। তাই একটু অবাক হচ্ছি।
স্যরি বাবা। আসলে আমি চেয়েছিলাম হার্ভার্ডে পড়তে। কিন্তু ওরা জুনিয়র লেভেলে স্কলারশিপ দেয় না। তাই স্কলারশিপের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ট্রাই করছিলাম। হয় কি না হয়, এজন্যে আগে বলি নাই। এখন সিদ্ধান্ত তোমার।

দীর্ঘশ্বাস ফেলেন সায়ন চৌধুরী। সবকিছু ঠিকঠাক করে এখন বলে কিনা, সিদ্ধান্ত তোমার!
তোমার কি মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে বাবা? তাহলে আর এগোবো না।

মন খারাপ তো একটু হবেই। তাই বলে কি কেরিয়ার গড়বে না! বরং তুমি হার্ভাডেই দেখ। এত শখ যখন তোমার। কেমন খরচ লাগতে পারে? যা কিছু আছে, সব বিক্রি করে দিলে হয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

ডোন্ট বি ইমোশোনাল বাবা। তোমাকে আমি কিছুই বিক্রি করতে দেব না। তাছাড়া ওদের টিউশন ফি ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে চেষ্টা করার কোন প্রয়োজন নাই। আন্ডারগ্রেডে মিশিগান ইউনিভার্সিটি খুবই ভাল। চিন্তা কোরো না। মাস্টার্স আমি হার্ভার্ডেই করব।
সত্যিসত্যি বাবুটা তার আমেরিকা চলে গেল। কথাও রাখল। গ্রাজুয়েশনে অসাধারণ রেজাল্ট করল। স্কলারশিপ নিয়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করল, পিএইচডি করল। তারপর চাকরি, ব্যস্ততা…

অরিণ আসছে। সে কি ছুটে এসে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে আগের মতোই! ধুর, কি ভাবছেন তিনি পাগলের মতো! হেসে ফেলেন সায়ন। তা কি আর সম্ভব! বাবু এখন ছয় ফূটের উপরে লম্বা। তার সাথে মিলিয়ে চওড়াও। এখন নিজেই সে বাবা।

অরিণ তার বাবুকে কোলে নিয়ে এগিয়ে আসছে। যেন অনন্তকাল ধরে হেঁটে হেঁটে আসছে সে… পেছনের মেয়েটাই বোধকরি বৌমা! তার দুই হাতে দুটো ব্যাগ। বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। ফিরে পাওয়ার হাহাকার যেন! একটা ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকেন সায়ন চৌধুরী।

বাবা, দিস ইজ জেন। জেন হি’জ মাই ড্যাড। মাই এভরিথিং এন্ড ইউ নো বেটার।
হাই, বলে জেন হাতের ব্যাগ নামিয়ে প্রণাম করার ভঙ্গিতে নিচু হয়ে বসল। এসবে অভ্যস্ত নন সায়ন চৌধুরী। ব্যতিব্যস্ত হয়ে দুই হাত দিয়ে জেনকে ধরে উঁচু করে বলেন- মাই ডটার। হ্যাপি টু সী ইউ।

ইয়েস ড্যাড্। আমিও খুব খুশি। বাংলাদেশ আমার পছন্দ। অরিণের কাছে শুনে শুনে তুমি আমার আরও বেশি পছন্দ।
সায়ন মুগ্ধ চোখে জেনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কি সুন্দর করে গুছিয়ে বাংলায় কথা বলল।
স্যার, আমরা এগোই। আপনাদের বসিয়ে লাগেজগুলো কালেক্ট করে নিয়ে আসি। প্রোটোকল অফিসার বলল।
নো জেন্টলম্যান। তুমি কেন কষ্ট করবে। কাম অন অরিন। শশব্যস্ত হয়ে বলে জেন।
জেন, উই আর নাউ ইন বাংলাদেশ। নট ইন স্টেটস্। মাই ড্যাড ইজ ভিআইপি হেয়ার। সেক্রেটারি টু দ্য গভর্ণমেন্ট। ফরচুনেটলি অর আনফরচুনেটলি ইউ আর হিজ ডটার ইন ল। সো ইউ হ্যাভ টু এভেইল দিস অপরচুনিটি। নো ওয়ে.. দুষ্টুমি মাখা হাসি নিয়ে অরিন প্রথমে তার বাবার দিকে, তারপর জেনের দিকে তাকাল। সেই হাসি। শুধু বোকা বোকা ভাবটা নেই।

নো ডটার ইন ল। ওনলি ডটার। অ্যাম আই রাইট? বলে জেনের দিকে তাকিয়ে সায়নও হাসতে থাকেন।

ইয়া সিওর। আই লাইক ইট। ইউ আর মাই সুইট ড্যাড। জেন জড়িয়ে ধরে সায়নকে।
চোখ ভিজে আসে সায়নের। রাগ, অভিমান ধুয়ে মুছে কোথায় চলে গেল। তিনি ভেবেছিলেন, অরিনকে কোনদিন কিছু বলবেন না। কিন্তু, ক্ষমাও করবেন না কোনদিন। সায়নের পছন্দ করা মেয়েকে অরিন বিয়ে তো করেই নি, এমন কি তাকে না জানিয়েই জেনকে বিয়ে করেছিল সে। সেই কষ্ট বুকে চেপে এতগুলো দিন পার করেছেন তিনি। অরিণের সাথে ভাল করে কথা বলেন নি। যোগাযোগও রাখেন নি তেমন। একদিন অরিণ বাবা হয়ে গেল। সেই খবর শুনে খুশিতে চোখ মুছেছিলেন। ওই পর্যন্তই…
এতদিন বাদে বৌ নিয়ে দেশে এল অরিণ। সন্তানকে ক্ষমা করতে না পারার কষ্ট থেকে মুক্তি পাবার আনন্দে বুকের ভেতরটা তার হালকা পালক হয়ে গেল। জেন এর জন্যে হিরের একটা সেট আনিয়ে রেখেছেন তিনি সিংগাপুর থেকে। ভেবেছিলেন নিয়ম রক্ষা করবেন। মনের কষ্ট মনে পুষে রেখে বৌমাকে আশীর্বাদ করবেন। সেই কাজটিই তিনি এখন করবেন গভীর আনন্দ নিয়ে, অন্তরের সবটুকু স্নেহ উজাড় করে ঢেলে দিয়ে।
সবাইকে নিয়ে সায়ন এগোতে থাকেন গর্বিত বাবার মতোন। দাদুভাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে কোলে নিয়ে চুমু খান। বুকটা টান করে হাঁটতে থাকেন। যেন তার সেই ছোট্ট অরিণকেই কোলে নিয়ে হাঁটছেন তিনি।

বাবা। ইউ আর ভেরি সুইট। আই অ্যাম ইমপ্রেসড। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে জেন বলল।
থ্যাংকস মাই ডটার। সায়নও হাসতে থাকেন।

মনে পড়ল, সেবার লন্ডন থেকে দশ মাস পরে দেশে ফিরলেন সায়ন। অরিণের বয়স তখন এই গুল্লুটার মতোই। ওর জন্যে বড় সাইজের একটা খেলনা রোবকপ কিনে এনেছিলেন। এয়ারপোর্টে নেমেই ছুটে গিয়ে তিনি বাবুকে কোলে তুলে নিলেন। তখন সে গভীর ঘুমে। আদরের অত্যাচারে ঘুম ভেঙ্গে গেল তার। দশ মাসের ব্যবধানে ছেলে তাকে চিনতে পারে না। কেঁদে ওঠার প্রস্তুতি নিতে নিতে তাকাল মায়ের দিকে। মায়ের হাসিমুখ দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে অরিণ।
কাঁদে না বাবু। এটা তোমার বাপন।
সায়ন রোবকপটা তুলে দেন ওর হাতে। বোঝা গেল পছন্দ হয়েছে। বুকের মধ্যে চেপে ধরে ফ্যালফ্যালে হাসি ছড়িয়ে সে তাকিয়ে থাকে সায়নের দিকে। ছেলেকে কোলে নিয়ে গর্বে গ্রীবাটান করে সেদিন গাড়ির দিকে হেঁটে গিয়েছিলেন। আজো তেমনি এই বাবুটাকেও কোলে নিয়ে হাঁটছেন তিনি।

সেই রোবকপটা আজও যত্ন করে তুলে রেখেছেন সায়ন। ব্যাটারি কাজ করে না বলে এখন আর পা টেনে টেনে হাঁটতে পারে না। কমান্ডিং ভয়েসে বলতে পারে না— সারেন্ডার, ড্রপ ইয়োর ওয়েপন। আই অ্যাম দ্য ল। হ্যান্ডস আপ।

কথা বলতে না পারুক। বাসায় গিয়েই সেটা অরিণের ছেলের হাতে তুলে দেবেন তিনি। তারপর নিউ মার্কেটে গিয়ে নতুন একটা রোবকপ কিনে আনবেন। যেটা পা টেনেটেনে হাঁটবে, কমান্ডিং ভয়েসে বলবে—ড্রপ ইয়োর ওয়েপন…
খুব দেখার ইচ্ছা তার, রোবকপ পেয়ে এই বাবুটাও সেই বাবুটার মতো একই আচরণ করে কিনা!
বিশ্রামাগারে অপেক্ষা করছেন সায়ন। প্রোটোকল অফিসার আর অরিণ গেছে লাগেজ আনতে।

বাবা আমি কেমন বাংলা বলেছি! জেন উৎসুক দৃষ্টি মেলে জানতে চায়।

এক্সেলেন্ট। অতি চমৎকার! মুগ্ধ হয়েছি আমি। ভাবছি, কি পুরষ্কার দেয়া যায় তোমাকে।
কিন্তু বাবা, অরিণ ভীষণ নটি। সে আমাকে শেখায় না। বাট বাংলা আমি খুব ভাল করে শিখতে চাই। ভেরি সফট এন্ড সুইট লেংগুয়েজ। আমি বাংলা শিখে টেগোর পড়ব। তোমার পছন্দের গানটা শিখব। ওই যে, হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ। হোয়াট আ নাইস। হোপ ইউ উইল টিচ মি বাংলা।
সিওর। নিশ্চয়ই শেখাব মা।
ডোন্ট ওরি বাবা। আমি খুব ভাল স্টুডেন্ট। তুমি তো বেঙ্গলী রাইটার। তোমার লেখা পড়ব।
কে বলল আমি রাইটার?
অরিণ টোল্ড। সে আমাকে সব বলেছে। অরিণ তোমাকে ভীষণ ভালবাসে বাবা। আই লাইক ইট। তোমার চিন্তায় সারাক্ষণ অস্থির থাকে। বাট কাউকে বুঝতে দেয় না।
তাই নাকি! আমি তো ভেবেছিলাম অরিন আমাকে ভুলে গেছে।

ওকে ভুল বুঝো না বাবা। তুমি ছাড়া অরিণ কিছুই ভাবতে পারে না। তুমিই ওর বাবা, তুমিই ওর মা। আমি জানি, আমাকে বিয়ে করে অরিণ তোমাকে কষ্ট দিয়েছে। আর নিজেও কষ্ট পেয়েছে। আমার তো বাবা-মা থেকেও নেই। আই মিস মাই ড্যাড, মিস মাই মম। তোমাদের কালচার ভেরি নাইস। নাইস ফ্যামিলি টাই। তুমি আমাদের দুজনকেই মাফ করে দাও বাবা।

সায়নের চোখ ভিজে আসে। অবাক হয়ে ভাবতে থাকেন অসাধারণ এই মেয়েটিকে বিয়ে করেছে অরিন! ঠিকই করেছে সে। অকারণে রাগ পুষে রেখেছিলেন তিনি এতদিন।
স্যরি মা। অভিমান ছিল তোমাদের উপর। কিন্তু এখন আমি সবচেয়ে সুখী বাবা। আই লাভ ইউ মা।
হোয়াট আ নাইস। নট মম, আমি তোমার মা। ঠিক আছে না!
হ্যাঁ মা। ঠিক আছে।
বাবা তুমি কি জানো, অরিণ ইজ ইয়োর কার্বন কপি। ওনলি ডিফারেন্স, হি ইজ টলার দ্যান ইউ। হাসতে হাসতে বলে জেন।
তাই না কি? সবাই তো বলে অরিন দেখতে ওর মায়ের মতো।
মোটেই না। অরিণের চোখ দুটো শুধু মায়ের মতো। বড় বড় চোখে পদ্ম দিঘীর গভীরতা। এটা অরিণ শিখিয়েছে আমাকে। মায়ের ছবি দেখেছি আমি। হোয়াট আ বিউটিফুল লেডি। লাইক গডেজ মা দূর্গা…
বাবুটা জেগে উঠল। সায়নের মুখের দিকে তাকিয়েই সে ঠোঁট ফুলিয়ে কান্নার উপক্রম করল।
বাবু ইটস্ ইয়োর গ্রান্ড পা… হি লভস্ ইউ..
গুটু গুটু বলে সায়ন ওকে আদর করতে থাকেন। যেন বহু বছর আগের সেই কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পান, বাবু এটা তোমার বাপন…
এই বাবুটাও ফ্যালফ্যাল দৃষ্টি মেলে তাকায় তার দিকে। ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে গিয়েও থেমে যায়। অবাক হয়ে দেখতে থাকে সায়নকে।
হি ইজ লুকিং অরিণ ইন ইয়োর ফেস। হাসতে হাসতে জেন বলল।
ইজ ইট?
ইয়া। আ অ্যাম শিওর।
সায়ন মুগ্ধ চোখে গুল্লুটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। গুল্লুটার মুখের মধ্যে খুঁজে ফিরতে থাকেন তার সেই বাবুটার মুখ…

 

লেখক পরিচিতি

বাম চিন্তাধারার যুক্তিবাদী মানুষ। বৈচিত্র আর বৈপরীত্যে ভরা জীবন। হতে চেয়েছিলেন শিক্ষক, নয়তো সাংবাদিক। হলেন আমলা। ভাবেন নি লেখক হবেন কোনদিন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে লিখে ফেললেন নমশূদ্র সম্প্রদায়ের জীবনধারা নিয়ে গবেষণাধর্মী উপন্যাস ‘নমসপুত্র’। পেলেন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং পুরষ্কার। লিখলেন মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় নিয়ে ‘শরণার্থী’, গণ জাগরণ মঞ্চ নিয়ে ‘দ্রোহের দীপাবলি’, বিলের জনজীবন নিয়ে ‘বিলের জীবন’। লিখে চলেছেন একের পর এক উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিগল্প, ভ্রমণ কাহিণি।

জন্ম ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার প্রত্যন্ত বিলের মধ্যে মধুপুর গ্রামে। বাবার কর্মসূত্রে শৈশব, কৈশোর কেটেছে খুলনা, যশোর, বরিশাল এলাকার বিভিন্ন জেলায়। স্কুল জীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতি এবং ‘উদীচী’ ‘খেলাঘর’ এর মতো সংগঠনের সাথে। অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশুনা সম্পন্ন করেছেন টিউশনি আর পত্রিকায় চাকরি করে।

বিসিএস ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। সহকারী সচিব হিসেবে কর্মজীবন শুরু। মাঠ পর্যায়ে ছিলেন ইউএনও, এডিসি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরডিএ, বগুড়ার পরিচালক। কাজ করেছেন উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। অবসর নিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে। উচ্চতর পড়াশুনা করেছেন লন্ডনে। সরকারি কাজে ঘুরেছেন বহু দেশ। অবসর জীবন কাটে মূলতঃ ঘোরাঘুরি আর লেখালিখি করেই।

প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা আঠারো।

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।