নাহার মনিকা: বিসর্গ তান-২০

নিধির স্ক্র্যাপবুকে একটা টালিমার্কের ঘর কাটা আছে, ভোমরাদহে এসে ইস্তক এগারোটা ঘরে সে দাগ দিয়েছে। বাবা এতদিনে এগারবার এসে মাত্র দুইদিন করে থেকেছে।
প্রতিবার বাবা চলে যাওয়ার সময় নিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে সে শ্বাস বন্ধ করে অদৃশ্য এক ধানক্ষেতে চারা গাঁথায় মন ঢেলে দিতো যাতে তার কান্না না পায়।

তারপর ঘরে ঢুকে পাঁচগুটি নিয়ে কসরত করতো। পাথরের গুটিগুলো ততদিনে হাতের ঘষায় মসৃণ হয়ে গেছে। পাঁচ থেকে বেড়ে বেড়ে তার গুটির সংখ্যা এখন অনেক, সে সব গুনতে পারে।

শেষবার বাবা ভোমরাদহ এসে দু’দিন বেশী থাকলো, আর নিধির কাছে একসঙ্গে কতগুলি খবর পৌঁছে গেলো, যদিও কেউ তাকে ভেঙ্গে বলেনি। হাতে পাঁকানো তোষা পাটের সুতলীর একটা গোলক খুলে ছড়িয়ে দিয়ে আবার পেঁচিয়ে রাখার খেলা খেলতে খেলতে, দাদু আর বাবার চায়ের টেবিলের পাশে বসে আঙ্গুল মটকাতে মটকাতে জেনে যাচ্ছিল কতকিছু, যেমন-
-বাবা এবার জুট পার্চেজারের চাকরী ছেড়ে দিয়েছে। সে যমুনা পেট্রোল এন্ড ওয়েল কোম্পানির সেলস ম্যানেজার হয়ে খুলনায় পোষ্টিং পেয়েছে। এখন থেকে প্রতি শুক্রবারে ভোমরাদহ আসা সম্ভব হবে না, আর নিধিকেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব না, কারণ দেখাশোনার লোক নাই।
-নিধিকে আবার ঢাকার স্কুলে ভর্তি করা হবে, সে তার ফুপুর বাসায় থাকবে। নিধির বাবা মাস মাস টাকা পাঠাবে (দেখতে আসবে না একদিনও?)।
দাদু আরেকবার বিয়ের ব্যপারে মিন মিন করলে বাবা প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে মুখ লাল করে ফেলেছিল, তাকে একটা পাকা লিচুর মত দেখাচ্ছিল। দাদুও রেগে গিয়েছিল- মেয়ের ভার কে নেবে এইসব বলে উঠলে নিধি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখেছে, তার শীর্ণ চোয়াল আরেকটু ঝুলে গেলে আধা খোসা ছাড়ানো লিচুর মত মনে হবে।
আর কেউ কিছু না বললেও সে জেনেছে যে মা’য়ের কোন খবর বাবা কাউকে দিচ্ছে না।

কত শত প্রশ্ন শুশুকের মত ঝাঁপিয়ে উঠে আবার ডুবে গেল নিধির মনে- মা’র পোড়া শরীর ভালো হয়ে গেছে কিনা এ প্রশ্নের জবাব বাবা দেবে না বুঝতে পেরে নিধিও জিজ্ঞেস করে না।

আবেদা চা নিয়ে এলে দাদু তাকে গ্লুকোজ বিস্কুটের প্যাকেটটা দিয়ে দিলো। সেটা খুলে নিধির হাতে কয়েকটা ধরিয়ে দিলে সে এগিয়ে গিয়ে বাবার চায়ের কাপে ভিজিয়ে নিয়ে খায়, কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবার চেনা গায়ের গন্ধ নাকে আসে, সিগারেট আর আফটার শেভের মিলমিশ। বাবার জুলফির কাছে কয়েকটা চুল ঘামে মুচড়ে আছে, নিচে একটা তিল। সে আগে এই তিলটা খুটিয়ে দিয়েছে কতবার।

তারা কখনো মামাবাড়ি যায় না কেন? – এই প্রশ্নটা নিধি করবে ভাবে, তখনি বাবা উঠে দাঁড়ায়। তার গোছগাছ করার আছে, কাগজপত্র আর কি কি যেন। আগামীকাল সকালে আবার সারাদিনের জন্য বাবা যেন কোথায় যাবে। নিধির খুব ইচ্ছে সঙ্গে যায়।
-‘না’।
-‘কেন না?’ – নিধি বাবার চুল টেনে দিচ্ছিল
-‘নেয়া যাবে না তোমাকে! আর কোন কথা আছে?’ বাবা কেন যে আতকা রেগে ওঠে। নিধিরও তো ঘোত ঘোত করতে ইচ্ছা করে। তখন?
কেবলই মনে হয় বাবা আসলে মা’কে দেখতে যাচ্ছে। তাকে নিলে কি হয়!
-‘তুমি তোমার আজমত কাকার সঙ্গে হাটে যেও, ওখানে চরকী চড়বে, মোরগের লড়াই দেখবে, ঢাকা গেলে এইসব কি আর দেখতে পাবে?’ (নিধি’র ঢাকা যাওয়ার নিত্য-অনিত্য ঠিক করে ফেলেছে বাবা)।
-‘আগেরবার চরকীতে চড়ে আমার ভয় করেছিল, ভালো লাগে নাই বাবা!’ – নিধি যথাসাধ্য ভেজা কণ্ঠস্বর বানায়।
-‘এইবার ভালো লাগবে’– সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ঘরে চলে গিয়েছিল বাবা।
বাবার পেছন পেছন তখনই ঘরে যায়নি নিধি। সুতলীর বলটা দিয়ে খেলেছিল আরো বেশ কিছুক্ষণ। হাঁস-মুরগী-পায়রাগুলির পায়ে খোপে ঢোকার ইতস্তত তাড়া।
সুতলীর বল গড়িয়ে হ্রস্য দৌড় দিয়ে তুলে আনতে আনতে দাদুর বাড়ির সরগরম সন্ধ্যা নামা দেখেছিল।

আজমত চাচা কিষাণদের একে তাকে এটা সেটা নির্দেশ দিচ্ছে। চুলায় রাতের ভাত উঠে গেছে, পাঁচ ছটা হারিকেনের চিমনি ধোয়া মাজা ঝকঝকে, সলতে জ্বলার অপেক্ষায়।
দাদু তখনো চেয়ারে বসে-আবেদার হাঁস মুরগী খোয়াড়ে তোলা দেখছে।

অর্ধেক হাঁস-মুরগী ঘরে উঠলে আবেদা সব ছেড়ে দৌড়ে টিউবওয়েলের কাছে গিয়ে ওয়াক তুলে বমি করছিল।

এদিক সেদিক তাকিয়ে করার কিছু খুঁজে না পেয়ে নিধি ঘরে উঠে এসেছিল। বিছানার ওপর ব্যাগ আর ব্রীফকেস খোলা রেখে বাবা যেন কোথায় গেছে।

আঙ্গুলে ঘেটে ঘেটে দেখে নিধি। ছবিওয়ালা ছোট্ট ডেস্ক ক্যালেণ্ডার (ভাঁজ করে রাখা যায়), চাবির রিং, বড় খাতা, বাঁধাই করা নোটবুক। ল্যামিনেটিং করা সার্টিফিকেট, এগুলো সে আগে দেখেছে।

এ সবকিছুর সঙ্গে একটা রাবার ব্যান্ডে আটকানো কতগুলি খামবন্দী চিঠি। চাকার ছবিঅলা ডাক টিকেটের ওপর ডাকবিভাগের ছাপ্পড় মারা! নিধি তার মায়ের হাতের লেখা চেনে। মা বাবাকে এই কয়মাসে এতগুলি চিঠি লিখেছে! বাবা একটা খামেরও মুখ খোলেনি! মায়ের কত কথা এখানে পড়ে আছে! উত্তেজনায় হাত শির শির করে নিধির।
নিধি শুধু চিঠিগুলি চটজলদি নিয়ে জামার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। তার বইখাতার ব্যাগ দাদীর ঘরে। মা’য়ের হাতের লেখাটা ছুঁয়ে দেখতে হবে। কেন জানি মনে হয় বাবা দেখলে রেগে যাবে।
ঝটপট রাতের খাবার খেয়ে নেয় নিধি।

বাবা দাদুর সঙ্গে বসে আবারো কি সব জরুরী আলোচনা সারছে। বিচ্ছিন্ন জোনাকিদের মত হ্যারিকেন আর কুপিগুলি চৌকোনা উঠান পার হয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছে। আকাশে চাঁদ ওঠেনি, ঘোর অমাবস্যার রাত। অমাবস্যায় দাদীর গিটেবাতের ব্যথা তীব্র হয়, মোমেনার মা রসুন আর তেল গরম করে তার পা মালিশ করতে করতে আবেদার আবারো ওয়াক তোলার আওয়াজে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। দাদী কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে নিরব হয়ে থাকে। মোমেনার মা এখন আর তার কথা শুনতে পাবে না, হয়তো উঠান পেরিয়ে রান্না ঘরে গেছে। নিধি দাদীর পাশে গুটিশুটি শুয়ে পড়ে। চিঠিগুলি সে তার স্কুলব্যাগে রেখে দিয়েছে। তারপরও তার জামার ভেতর কেমন খচমচ করে, মনে হয় চিঠিগুলি সঙ্গেই আছে।

সে রাতে নিধি মাকে স্বপ্নে দেখে- অস্পষ্ট, কানের লতি ঘিরে ঢেউ খেলানো চুলের গোছা, পাশে আধশোয়া, তাকে ঘুম পাড়ানি গান শোনাচ্ছে গুন গুন ক’রে।
পাহারাদারের চাকরী পাওয়ার পর তাদের পাট গুদামের গেটের কাছে টুলে বসে থেকে থেকে মজনু গাইতো গানটা,-‘ তোরে রাং দিলো কি সোনা দিলো পরখ কইরে দেখলি না…গুরু তোরে কি ধন দিলো চিনলি না মনা…’ ভ্যাপ্সা গরমের নিরালা দুপুরগুলিতে তার কন্ঠ লাগসই রকম স্পষ্ট শোনা যেত।

স্বপ্নে নিধি মা’র পুরো মুখ দেখতে পাচ্ছিল না। একপাশ কালো চাদর দিয়ে ঢাকা। তার ইচ্ছা করছিল জামার ভেতর থেকে চিঠির খাম বের ক’রে মাকে দেখায়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও জামার বোতাম খুলতে পারলো না।

 

নাহার মনিকা

উৎকর্ষের দিকে মনযোগী লেখকদের তালিকায় নাহার মনিকা একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য নাম। ঈদসংখ্যা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’-য় কবিতা দিয়ে নাহার মনিকা’র লেখা প্রকাশের শুরু। তারপর দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন দেশের জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকায়। কবিতা, ছোটগল্প এবং উপন্যাস নিয়ে এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ছয়।

উপন্যাস— ‘মন্থকূপ’ (বৈভব প্রকাশন, ২০১৯), ‘বিসর্গ তান’ (বেঙ্গল পাবলিকেশন্স ২০১৬)।

গল্পগ্রন্থ—‘দখলের দৌড়; ( পুথিনিলয় ২০১৯), ‘জাঁকড়’ (দিব্যপ্রকাশ, ২০১৪), এবং ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের (দিব্যপ্রকাশ, ২০১১)। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ চাঁদপুরে আমাদের বর্ষা ছিল’(বাংলামাটি প্রকাশন)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Health Policy, Planning & Financing  এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়েছেন। বর্তমানে ক্যানাডা’র ক্যুবেক প্রদেশে সরকারী স্বাস্থ্যবিভাগে কর্মরত আছেন।

লেখালেখি নাহার মনিকা’র কাছে অপার স্বাধীনতার জগৎ, যেখানে লেখক একমেবাদ্বিতীয়ম।  

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।