ললিতা: ভ্লাদিমির নভোকভ

৫.
আমার যৌবনের দিনগুলোর কথা মনে করলে শীতল একটা অনুভূতি জাগে। নিস্তব্ধ, শান্ত সময়ের মত সেই অনুভূতি। তখন মেয়েদের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল অনেকটা বাস্তববাদী ধরণের, চাঁচাছোলা কথা, যতটুকু যার সাথে মানায় ঠিক ততটুকুই। যখন যতটুকু দূরত্ব রাখা প্রয়োজন ছিল ঠিক ততটুকুই দূরত্ব রেখেছি। কলেজ জীবন কেটেছে লন্ডনে আর প্যারিসে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তখন অনেক পতিতার সাথে আমার মেশা হয়ে উঠত। তাদের অনেকেই আমাকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে। তবে সেটা ছিল স্রেফ শারীরিক সন্তুষ্টি। এরমাঝে কোনো ভালবাসা ছিল না।

পড়াশুনায় বরাবরই মনোযোগী ছিলাম। কিন্তু ফলপ্রসূ না হওয়ায় মনোরোগবিদ্যার উপর ডিগ্রী নেব বলে সিদ্ধান্ত নিই। কিছুদিন যেতে না যেতে সেটাও বিরক্ত লেগে গেল, আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। আগ্রহ হারিয়ে শেষমেশ ইংরেজি সাহিত্যের উপর ঝোঁক চলে এলো। ইংরেজি সাহিত্য তখন বিপদজনক জায়গা। অনেক সম্ভাবনাময় কবিকেই হতাশ হয়ে অন্যপথ বেছে নিতে দেখেছি আমি। হাতে পাইপ, কেতাদুরস্ত পোশাক, কলেজের গম্ভীর শিক্ষক বনে যেতে হয়েছে অনেক কবিকেই। আমার প্যারিস ভাল লাগত, ওখানেই মানিয়ে যাই। ওখানকার অনেক রাশিয়ান বিশেষজ্ঞের সাথে সিনেমা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্যারিসে কিছু অখ্যাত ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ প্রকাশ করি কতগুলো। প্রবন্ধগুলো দুর্বোধ্য ছিল বলে অভিযোগ আছে। মূলত প্রবন্ধের বিষয়গুলোই ছিল জটিল। এত জটিল বিষয় সহজভাবে বললেও অনেকের কাছে দুর্বোধ্য লেগে যাবে তা জানা আমার ছিল। তাই অভিযোগগুলোকে পাত্তা দিইনি। সেই সময় আমার প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন ভাষার বিখ্যাত সব কবি, সাহিত্যিকদের প্রায় সবার লেখাই পড়ে শেষ করে ফেলি। আগের কবিদের লেখনীর ধরণ নিয়ে কিছুদিন গবেষণাও করি। পরীক্ষামূলকভাবে একবার এক পুরনো ধারার অনুকরণে কিছু লেখাও লিখেছিলাম। সেগুলো প্রকাশও হল স্থানীয় এক সাহিত্য ম্যাগাজিনে। কয়েকটা লাইন উদারহরণ হিসেবে দিলে বুঝতে পারবেন-

…ফ্রলেন ফন কপ
একদিন সে যদি চলে যেতে চায়,
হাতের আঙুলগুলো ভুল দরজায়;
যুবতীকে ফেরাবো না আমি, একবারও
পিছু ডাকব না…

‘বেঞ্জামিন বেইলিকে লেখা জন কিটসের চিঠির লেখনীর ধারা’ শিরোনামে কাগজে তখন আমার একটা লেখা আসে। সেই লেখার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সাহিত্যে তৎকালীন ছয়-সাতজন পণ্ডিত ব্যক্তির ব্যাঙ্গাত্মক মনোভাব আমি এখনো ভুলতে পারিনি। এরপর বেশ জনপ্রিয় এক প্রকাশনা থেকে প্রকাশ করলাম ‘ইংরেজি কবিতার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস‘ এবং সেই সঙ্গে ‘ইংরেজি ভাষাভাষী ছাত্রছাত্রীদের জন্য ফরাসি সাহিত্য পাঠ’। দ্বিতীয় বইটি প্রথম বই প্রকাশের অল্প কিছুদিনের ভেতর প্রকাশ পায়, এবং খুব সাড়া পায় সাহিত্যমনস্কদের কাছে। এই বইটি একাই চল্লিশ দশকের পুরো বাজার দখল করে রেখেছিল। বইটার চাহিদার প্রেক্ষিতে শেষখণ্ডের কাজ শুরু করে দিই। পাণ্ডুলিপি প্রায় গুছিয়ে এনেছিলাম। ছাপাখানায় দেব বলে ভাবছিলাম এমন সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো।

প্যারিসের অউটুলে একটা চাকরি পাই আমি। একদল বুড়োকে ইংরেজি শেখাতে হতো সপ্তাহে দুদিন। একটা বয়েজ স্কুলেও শিক্ষকতা করেছি বছর দুয়েক। প্যারিস শহরটা ছিল আমার হাতের তালুর মত মুখস্ত। ফলে বিভিন্ন পতিতালয় এবং সাইকোথেরাপিস্টদের অফিস, বিভিন্ন এতিমখানায় যাওয়া হতো প্রায়ই। ঘুরে ঘুরে প্রচুর স্টাডি করেছি বিভিন্ন বিষয়ের উপর। সেখানে টুকিটাকি কাজও করেছি। আমার মানসিক অবস্থার উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কোথাও কোনো সদ্যযৌবনা মেয়েকে এড়াতে পারতাম না, তাকিয়ে থাকতাম। ওদের চাহনিকে মনে হতো কামনার আহ্বান, ছলনামাখা দৃষ্টি। মাথার ভেতরে ওই মুখগুলো গভীরভাবে গেঁথে যেত, আর অবসরে সেই মুখগুলো আমার সামনে ভেসে আসতো সুন্দর করে।
এবার ‘নিমফেট’ নিয়ে কথা বলে নিই। যে কথাগুলো বলতে যাচ্ছি এগুলোই এই নোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেয়েরা যখন নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী থাকে, তাদের কাউকে কাউকে দেবীর মত মনে হয়, যেন সাক্ষাৎ জলপরী। কোনো সাধারণ গোছের মেয়ে নয়, অন্য যে কোনো মেয়ের চাইতে আলাদা এরা, ভিন্নরকম। আমি এদের নাম দিয়েছি, ‘তরুণী জলপরী’ বা ‘নিমফেট’। পাঠক, আপনাদের মনে এবার প্রশ্ন জাগতে পারে, নয় থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের ভেতরের সমস্ত মেয়েই কি নিমফেট?
আমি বলব, না! সবাই না।
তবে কি যারা দেখতে সুন্দর শুধু তারা নিমফেট?
না! শুধু সৌন্দর্যকে মানদণ্ড হিসেবে নিতে আমার ঘোর আপত্তি আছে। ছলনাময়ী, চতুর, অধরা, রহস্যময়ী এক ধরণের মেয়ে থাকে যারা যে কোনো সময়, যে কোনো পুরুষের হৃদয়ে খুব সহজে আঁচড়ে যেতে পারে। এরকম ‘নিমফেট’ মেয়ে হতে গেলে দেখতে সুন্দর হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আকর্ষণীয় শরীর, চেহারায় স্বভাবসুলভ ললিতার ছায়া, সব বোঝে নাকি কিছুই বোঝে না- এমন দ্বিধায় ফেলে দিতে জানে এরা। যে নিমফেট নয় সে শত চেষ্টাতেও নিমফেট হতে পারবে না।

তার চাইতেও কঠিন কাজ, একঝাঁক মেয়ের মাঝে একজন নিমফেটকে খুঁজে বের করা। কোনো স্কুলের বা এতিমখানার একঝাঁক মেয়েদের গ্রুপ ছবি কারো হাতে তুলে দিয়ে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় এদের মধ্যে আলাদা কাউকে বেছে নিতে, আমি নিশ্চিত সে ‘আলাদা’ কাউকেই খুঁজে বের করতে পারবে না, নিমফেট খুঁজে বের করা আরো অনেকদূরের পথ। এজন্য থাকা চাই নিখুঁত শিল্পী মন, এজন্য আপনাকে পরিপূর্ণভাবে একজন শিল্পী হতে হবে, একজন দার্শনিক হতে হবে, একজন পাগল হতে হবে। দেখার দৃষ্টি থাকতে হবে সবার চাইতে আলাদা, যে নিমফেট চিনতে জানে, তার রক্তের ভেতর থাকে তপ্ত বিষের স্রোত, ব্যথার ঝর্নাধারা। একজন নিমফেটকে চিনতে হলে অসংখ্য ব্যথাবাষ্প দিয়ে তৈরি বিশেষ সৃষ্টি হতে হবে আপনাকে, যার প্রতিটি অস্থি-মজ্জায় থাকবে অতীন্দ্রিয় অনুভবের ক্ষমতা। আর তখনই আপনি একজন নিমফেট দেখে চিনতে পারবেন। মেধা, পরিশ্রম আর অভিজ্ঞতা দিয়ে নিমফেট চেনার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। একজন নিমফেট মানে শুধু একজন নিমফেট মেয়েই না, সে আরো গভীর কিছু, আরো বিশাল কোনো রহস্য। তাকে চেনার মাঝে, তাকে পাওয়ার মাঝে স্রষ্টাকে খুঁজে পাবার আনন্দ থাকে। অবর্ণনীয়, অদৃশ্য কোনো চিহ্নের মাধ্যমেই কেবল তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব। অদৃশ্য এক ডানা থাকে তাদের, সেই ডানায় ভর দিয়ে তারা সাধারণের মাঝে মিশে থাকে। মনে হবে দশজন সাধারণ মেয়ের মতই তাদের চলাফেরা। অথচ তারা নিজেরাই জানে না একেকজন কত মূল্যবান, কত বিশাল ক্ষমতার অধিকারী! একজন শিল্পীর চোখ ছাড়া আর কার কাছে ধরা দেবে এরা? শিল্পী ছাড়া অন্য কারো কাছে তারা অপচয়, শুধু অপচয়।
এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমি যাকে এতটা ভালবেসেছি, ভালবাসা বলতে আমি যাকে বুঝি, সেই এনাবেল কখনো আমার কাছে নিমফেট ছিল না। একজন ত্রিশোর্ধ ব্যক্তির পক্ষেই নিমফেটস চেনা সবচেয়ে সহজ। কারণ নিমফেট চিনতে হলে, নিমফেটিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে হলে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। এইজন্য বয়স্ক হতে হয়। আর দুইজনের বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে দশ বছর থাকতে হবে। এনাবেল ও আমি সমবয়সী ছিলাম। সুতরাং ওই বয়সে নিমফেট চেনা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আজ, সেপ্টেম্বর, ১৯৫২ তে এসে, প্রায় ঊনত্রিশ বছর পরে এসে মনে হয়, সেই ছোট্ট এনাবেলকে যদি সামনে পেতাম, সে নিমফেট ছিল কিনা যাচাই করা যেত। সেই ভাল, আমি নিমফেট বৈশিষ্ট্য খুঁজতে যাইনি ওর ভেতরে। এতে বিশুদ্ধতা থেকে গেছে। আমাদের সেই ভালবাসা রয়ে গেছে সবকিছুর উর্দ্ধে। ফুলের কলির মত নিষ্পাপ, অপরিপক্ক, কাঁচা অথচ বিশ্বস্ত ভালবাসা। যে ভালবাসা খুব সহজেই কারো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। আমিও শেষ হয়ে যেতাম, নষ্ট হয়ে যেতাম। প্রচন্ড মানসিক শক্তি দিয়ে আমাকে টিকে থাকতে হয়েছে। প্রতিটি মুহূর্ত নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে সব ক্ষতই সেরে ওঠে, কিন্তু আমার ক্ষতের ভেতরে আজতক বিষটুকু রয়ে গেছে। এই ক্ষতই আমাকে আরো শক্তিশালী করে তোলে।
আস্তে আস্তে আমি নিজের প্রতি বিশ্বাস ফিরে পেতে থাকি। নিজেকে সামাজিক রুটিনের ছকে ফেলে দিই, তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারি। স্বস্তির ব্যাপার বলতে এতটুকুই। সমাজের ভেতরে এসে দেখি আমাদের সমাজ ও সমাজ ব্যবস্থাপনা বিশ্রী অবস্থা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুক্তি কোথায়? যে সমাজ বারো বছর বয়সী মেয়েদের সাথে মিশতে বাঁধা দেয়, বেআইনি বলে ঘোষণা করে, অথচ ষোল বছর বয়সী মেয়েদের সাথে একই বিছানায় শোবার সুযোগ করে দেয় নিজেই।

অবাক হবার কিছুই নেই, ইউরোপে নিজের অস্তিত্বকে দ্বিগুণভাবে টের পাচ্ছিলাম আমি। সেই সময় অনেক মহিলাদের সাথেই আমার সম্পর্ক হয়ে ওঠে। কিন্তু আমার ভেতরে ছিল অন্য আগুন, অন্যরকম আকাঙ্ক্ষা। ভেতরে ভেতরে নরক যন্ত্রণা পোহাচ্ছিলাম আমি। কোনো নিমফেট মেয়েদের দেখলে আমার ভেতরের অদম্য, অসুস্থ এক কামনার দানব জেগে উঠত। অনেক কষ্টে নিজের সেই ক্ষুধার্ত দানবটিকে শান্ত করিয়ে রাখতাম। আর কোনো উপায়ই ছিল না। ওই বাচ্চা মেয়েদের স্পর্শ করার সাহস করে উঠতে পারিনি কখনো। সমাজের নিয়মের কাছে অহসায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে। আমার দৈহিক চাহিদা মেটানোর জন্য অনেক মহিলাই ছিল, কিন্তু তাদেরকে স্রেফ ‘দৈহিক চাহিদা মেটানোর যন্ত্র’ বলেই মনে হয়েছে। এর বেশি কিছু না। অথচ আমার এই চাহিদা আলাদা কোনো চাহিদা ছিল না। সমাজের দশজন সাধারণ পুরুষের মতই প্রাকৃতিক ছিল। কিন্তু তারা সবাই যেভাবে নিজেদের বয়সী সঙ্গী খুঁজে নিয়ে রুটিনমাফিক দেহের ক্ষুধা মিটিয়ে সুখী থাকে আমি তাদের মত হতে পারিনি। সমাজের অন্য পুরুষেরা যেখানে সমবয়সী মহিলাদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক করে আনন্দ পায়, আমি সেভাবে পাই নি। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু লাভ হয়নি।

আমার চিন্তাধারা, কল্পনাশক্তি ছিল আমার বয়সী অন্য যে কোনো ব্যক্তির চেয়ে প্রখর। এমনকি কোনো মেধাবী লেখকের কল্পনাশক্তির চাইতেও হাজারগুণে শক্তিশালী। বয়সে হিসেবে আমার জীবন কয়েকটা ভাগে বিভক্ত। বিশ থেকে তিরিশ, একত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত শরীরের কাতরতা বুঝতে পারিনি। আমার শরীর আসলে কী চায়, কীভাবে চায় সেটা অতটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। আমার মন আমার দেহের চাহিদাকে খুব স্বাভাবিকভাবে এড়িয়ে গেছে ততদিন। শরীরের কোনো অজুহাতই মেনে নিইনি। ভেবেছিলাম অল্প বয়সী বাচ্চা মেয়েদের প্রতি আমার আকর্ষণ সাময়িক ব্যাপার স্যাপার। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলাম। পৃথিবীতে অসংখ্য পুরুষদের খেয়াল করি, তারা কী সুন্দর নিজের বয়সের সাথে মানানসই সঙ্গী নিয়ে শান্তিতে আছে। অথচ আমি নিমফেট বালিকা ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে বা মহিলাদের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ পাই না। নিজের কাছেই লজ্জায় পড়ে গেলাম। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেলাম। উনিও বিভিন্ন সময়ে অনেক ওষুধই দিলেন। কিন্তু কোনো ওষুধেই কাজ হলো না। ভয় পেয়ে যাই আমি, নিজেকে ভয় পেতে শুরু করি। বুঝতে পারি, কামনা, ইচ্ছা সব ওই বয়সে আটকে গিয়েছে। এনাবেলের স্মৃতি আমাকে বন্দি করে ফেলেছে। শুধু সেই কারণেই আমি নিমফেট মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হই। কিন্তু এর কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি।
এনাবেলের মা, ওদের বাড়ির কাজের মহিলা- কাউকেই আমার পছন্দ ছিল না। আমি চৌদ্দ বছরের বেশি বয়স্ক মেয়েদের পছন্দ করতে না পারার এটিও একটা কারণ হতে পারে। নারীবিদ্বেষী অনেকেই থাকে, তাই বলে এরকম অভিজ্ঞতার কথা কোথাও পাইনি। অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে লাগল। আস্তে আস্তে মেনেই নিলাম আমার আচরণগত সমস্যা রয়েছে, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণে অস্বাভাবিক রুচি রয়েছে। সেই সময় আমি নিজেই নিজের জ্ঞানার্জনের বিষয় হয়ে উঠি। এই ভয়ংকর যৌনরুচির উপর প্রচুর বই ঘাঁটাঘাঁটি করি। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৩৩ সালের দিকে ইংল্যান্ডে আট থেকে চৌদ্দ বছরের মেয়েদের ‘মেয়েশিশু’র পরিবর্তে ‘কিশোরী’ বলা শুরু হয়। (এবং চৌদ্দ থেকে সতেরো বছর বয়স্ক মেয়েদের ‘যুবতী’।) ইউনাইটেড স্টেটসের ম্যাসাচুশেটস অঞ্চলে আট থেকে সতেরো বছর বয়সী সব মেয়েকেই নিরঙ্কুশভাবে শিশু বলা হতো। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম ইতিহাস ঘেঁটে। ইতিহাস কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের অসংখ্য নমুনা পাওয়া যায়। আমি ইতিহাস ঘেঁটে ঘেঁটে আফসোস বাড়াতে থাকি।

একটা সময় এলো, নিজেকে গুছিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এভাবে একা থাকলে আরো অসুস্থ হয়ে যেতে পারি। বরং বিয়ে করে ফেলা উচিত। তাহলে হয়ত সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। আপাদমস্তক একজন ভাল মানুষ হবার চেষ্টা করলাম। একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখি, আমি শিশুদের যথেষ্ট স্নেহ করি। যে কোনো শিশুর প্রতিই আমার অগাধ স্নেহ-মমতা। ওদের মিষ্টি স্বভাব, নিষ্পাপ চাহনি, ওদের আশ্চর্য কোমল মন আমার ভাল লাগে। শিশুদের মন হল পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র জায়গা। আমি সেই বিশুদ্ধ মনের প্রতিচ্ছবিতে ভাল মানুষ হয়ে ওঠার উৎসাহ পাই। কিন্তু যখনই দশ বছরের কোনো মেয়ের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়, আমি শেষ! সেই চোখ, চাহনি, চোখের তারা, জ্বলজ্বলে ঠোঁট সব মিলিয়ে আমাকে এমন বিব্রত করে ফেলে, হৃদ-স্পন্দন বেড়ে যায়। হাজার চেষ্টা করেও নিজের রুচিতে পরিবর্তন আনতে পারি না।

আমি চাইলে যে কোনো ফুলকেই তুলে নিতে পারি, যে কোনো মহিলার সাথেই জড়াতে পারি, এতটুকু আত্মবিশ্বাস আমার ছিল। কিন্তু আমার অপেক্ষা ফুলের জন্য ছিল না। ছিল কুঁড়ির জন্য অদম্য অপেক্ষা, আকাঙ্ক্ষা। দশ বা সাড়ে দশ বছর বয়সের পরে মেয়েদের শরীরের পরিবর্তনের সময় স্তনগুলো অহংকার নিয়ে জেগে উঠতে থাকে- তেমনি ফুটন্ত কোনো কলির জন্য আমার সব অপেক্ষা ছিল। এগারো বছর বয়সের পরে ওদের উরুসন্ধির কেশ জন্মাতে থাকে, অবাধ্য বেড়ে উঠতে থাকে। তখন সেই অপ্সরীকে মৌচাকের মত মনে হয়, আর আমি মধুলোভী দুরন্ত ভ্রমর!
পার্কের বেঞ্চে প্রতিদিন বিকেলবেলা বসে থাকতাম। হাতে একটা বই নিয়ে এমন ভাব করতাম যেন খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি, কালকেই এর উপর থিসিস পেপার জমা দেবার শেষ তারিখ। বিকেলবেলা পার্কে অনেক মানুষ আসত। আমার ভিড়, কোলাহল পছন্দ না। কিন্তু বিকেলবেলার পার্কের ভিড়ও মধুর মনে হত। অনেকগুলো বাচ্চাকাচ্চা, নিমফেট মেয়েরা নিজেদের মত খেলাধুলা করত। আর ওদের বাবা-মা সব যে যার মত আড্ডায় মেতে উঠত। আমি ওই বাবা-মা’দের এড়াতেই বই পড়ার অভিনয় করতাম। পুরোটা বিকেল আমি নিমফেট মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকে ওদের নিয়ে কল্পনায় হারিয়ে যেতাম। প্রতিদিনের মত একবার বিকেলবেলা সুবিধামত জায়গায় ফাঁকা বেঞ্চ পেয়ে বসে পড়ি। কিছুক্ষণ পরেই এক নিমফেট এসে ধপ করে আমার গা ঘেঁষে বসল। পায়ে রোলার স্কেট বাঁধতে বসেছিল। আমার পায়ের সাথে ওর পায়ে ছোঁয়া লাগছিল। কী অসাধারণ সেই স্পর্শ, সেই স্পর্শের অনুভূতি! স্কেট পড়ার জন্য আমার পায়ের উপর একটা হাত রেখে ব্যালেন্স করছিল। মেয়েটা দেখতেও অসম্ভব সুন্দর। ও নিজেই জানত না কত চমৎকারভাবে কারো স্বর্গ হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে সে। ওর শরীরের উষ্ণতা আমার শরীরে মিশে যাচ্ছিল। যেন সূর্যের আলো পেয়ে নরম মোমের মত গলে পড়ে যাচ্ছিলাম আমি। আরেকদিন বাসের ভেতর একটা বাচ্চা মেয়ে, নয়-দশ বছর বয়স হবে, আমার পাশে এসে দাঁড়াল। বাসের ঝাঁকুনিতে মেয়েটার লাল চুল, শরীরের স্পর্শ সবটুকুই আমার ভেতরে শিহরণ ধরিয়ে দিচ্ছিল। ঘটনা দুটো আলাদা আলাদা সময়ে ঘটে, প্রতিবার দেখা যেত পরের সপ্তাহ দুয়েক সেই ঘ্রাণ, সেই দৃশ্য, সেই অনুভূতি, সেই স্পর্শগুলো ভাবনার পুরোটা জুড়ে থেকে যেত। অদ্ভুত সেই ভাল লাগা অনুভূতি!

এগুলোও তো একেকটা প্রেম, তাই না? আমার পক্ষ থেকে এরকম এক তরফা প্রেমের সংখ্যা আঙুল গুণে শেষ করতে পারব না, অসংখ্য। এরকমও হয়েছে জানালার পাশে বসে আছি। রাস্তার ওপাশের বাড়িগুলোর জানালা থেকে আসা কোনো নিমফেটের পোশাক বদলানোর দৃশ্য দেখে তার প্রেমে পড়ে গেছি। ওই পোশাক বদলানোর দৃশ্যগুলো আমার কাছে শৈল্পিক ভাললাগা নিয়ে আসত। খাঁ খাঁ শূন্যতা মেখে থাকা দৃশ্য, তবু পুরোপুরি শূন্য না, গাছ থেকে বৃদ্ধ পাতারা যেভাবে খসে যায়, ঠিক সেভাবে নিমফেট বালিকার শরীর থেকে পোশাক খসে যেতে থাকে, ঝরে যেতে থাকে, নতুন কিছুর প্রতি আহ্বান করে, অসাধারণ সেই শিল্প। এই শিল্পে অনাবিল আনন্দ আমার, স্নিগ্ধ, অলৌকিক সেই আনন্দ। যেন আমার প্রার্থনার ফসল, আমার উপাসনার বর! একজন অসম্ভব মেধাবী শিল্পী তাঁর তুলতুলে তুলিতে নিখুঁত আঁচর কেটে যাচ্ছে, দৃশ্যকে প্রাণ দিয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্য কোনো নগ্নতা নয়, কোনো যৌনতার প্রতি মোহ নয়, এটা নিতান্তই এক অপরূপ শিল্প। প্রিয় পাঠক, এই দৃশ্য যদি শৈল্পিক না হয়ে থাকে, তাহলে আপনিই বলুন শিল্প মানেটা কী?
বাইরে থেকে এসে বলা নেই কওয়া নেই হুট করে টান দিয়ে পোশাক খুলে চেঞ্জ করে নেয়াটাকে শিল্প বলবেন? এরকম বিশ্রী, জঘন্য দৃশ্য আমি কখনোই দেখতে চাই না। এরকম হুটহাট পোশাক খুলে নগ্ন হবার দৃশ্যে উল্টো বিরক্তি আসে। যেন কোনো টাকমাথার ভূড়িওয়ালা মাঝবয়সী লোক প্রচণ্ড গরমের রাতে তার ভূড়ি মেলে দিয়ে শুধু আন্ডারওয়ার পরে জানালার পাশে বিতিকিচ্ছিরিভাবে বসে একমনে খবরের কাগজ পড়ছে। শিল্পহীনভাবে পোশাক পাল্টানোর দৃশ্যের সাথে এর কোনো পার্থক্যই আমি দেখি না।

মাঝে মাঝে এমনও হত বিকেলবেলা পার্কের বেঞ্চে বসে আছি, বাচ্চারা সামনেই খেলছে, আমি একমনে তাকিয়ে আছি। এমন সময় এক মেয়ের মার্বেল বা বল গড়িয়ে আমার বসার বেঞ্চের নিচে চলে গেছে। মেয়েগুলো এখনই আমার শরীর ছুঁয়ে যাবে বেখেয়ালে, তখনই বাঁধা আসত। তখন ঠিক কোনো কর্কশ বৃদ্ধ মহিলা আমার পাশে এসে গা ঘেঁষে বসবে। বসার আর কোনো জায়গা পায়নি! মাঝে মাঝেই এরকম হতো। আমি ভেতরে ভেতরে খুনি হয়ে উঠতাম। শুধু তাই না, আমার সাথে আলাপ পর্যন্ত জুড়ে দিত, আমার মাঝে মধ্যে পেটব্যাথা হয় কিনা, গ্যাস হয় কিনা, হজমে গণ্ডগোল আছে নাকি, বাথরুম ক্লিয়ার হয় কিনা, দিনে কতবার ইত্যাদি ইত্যাদি!

উফ! নিঃশব্দে চেঁচিয়ে উঠি, দোহাই লাগে, আমাকে একা থাকতে দিন! এই পার্কে, প্রিয় এই নিমফেট বাগানে আমাকে একটু একা থাকতে দিন! আমি চিরকাল এখানে এভাবেই বসে বসে নিমফেট মেয়েগুলোর খেলা দেখতে চাই, কাটিয়ে দিতে চাই মাতাল করা এই দর্শক জীবন।

 

রনক জামান

কবি ও অনুবাদক ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১, মানিকগঞ্জে জন্ম।
প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ : অগ্রন্থিত ওহী [তিউড়ি, ২০১৯] এবং
ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [অনুপ্রাণন ২০১৬]

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।