ললিতা: ভ্লাদিমির নভোকভ

১১.
১৯৪৭ সালটা আমার জন্য বেশ উল্লেখযোগ্য বছর। কিছু কিছু ঘটনা খুব ভালমতই ডায়রিতে লিখে রেখেছিলাম। ওই দিনগুলোর কথা অবশ্য আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। কারণ ঘটনাগুলো আমাকে দুইবার করে লিখতে হয়েছে। প্রথমবার পেন্সিল দিয়ে ডায়রীতে লিখে রেখেছিলাম। সেখানে ঘষামাজা করে, আরো শুদ্ধ করে তারপর টাইপ রাইটারে কম্পোজ করেছিলাম।

মে এর ৩০ তারিখে ‘এবডমিনাল ফ্লু’ না কী একটা রোগের কারণে রামসডেলের স্কুলগুলোতে গ্রীষ্মকালীন ছুটি দিয়ে দিতে হয়। পাঠকরা ১৯৪৭ এর রামসডেলের ম্যাগাজিন, খবরের কাগজ পড়লে জানতে পারবেন। তার কিছুদিন আগেই আমি মিসেস হেইজের বাড়িটাতে উঠি। যে ডায়রিটাতে তখনকার ঘটনাগুলো লিখেছিলাম তাতে জুনের অধিকাংশ দিনগুলো লেখা আছে। সেগুলো এখানে তুলে দিচ্ছি-
বৃহস্পতিবার। খুব গরম পড়েছিল আজ। বাড়ির পিছনের দিকে ডলরিস খেলছিল। বাথরুমের জানালা থেকে সুবিধামত দেখা যাচ্ছিল বলে আমি ওই জানালা দিয়ে ওকে দেখতে থাকি।

বৃহস্পতিবার। খুব গরম পড়েছিল আজ। বাড়ির পিছনের দিকে ডলরিস খেলছিল। বাথরুমের জানালা থেকে সুবিধামত দেখা যাচ্ছিল বলে আমি ওই জানালা দিয়ে ওকে দেখতে থাকি। গায়ে একটা শার্ট, নীল জিন্স আর কেডস পরে আছে ও। ওর প্রতিটি নড়াচড়াই আমার গভীরে সবচেয়ে সংবেদনশীল কোথাও সূর্যটা রোদে পুড়িয়ে দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে ও আমার পাশে এসে বসল। পাশেই বসে দুই পায়ের নিচের নুড়ি তুলতে লাগল। আর সন্দেশ খাচ্ছিল। উফফ! এইভাবে কেউ খায়? আমি নিস্পলক তাকিয়ে তাকিয়ে ওকে দেখি। ওর ঠোঁট! কী অসাধারণ! সমস্তকিছু যেন মানিয়ে যায় ওর সাথে। সন্দেশ খুবই তৈলাক্ত খাবার। খেলে মেয়েদের মুখে ব্রণ ওঠার সম্ভাবনা থাকে। অতিরিক্ত খেলে মাথার ত্বকে সমস্যা দেখা দেয়। চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা হয়।

কিন্তু নিম্ফেটদের এরকম কিছু হয় না। তারা সারাদিন তেল জাতীয় খাবার খেলেও নিমফেটই থেকে যায়। ডলরিসের কী চমৎকার বাদামী চুল! কোন দোষে মরতে গিয়েছিলাম ম্যাককুর মেয়ের কাছে। কী যেন নাম? জিনি ম্যাককু! ধুর! ডলরিসের সামনে ওই মেয়েকে মনে হবে পোলিও রোগী। আমি কিনা তার জন্য আফসোস করছিলাম? আমি ডলরিসের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকি। যেন আবক্ষ মূর্তি। যখন নুড়ি আর বালি দিয়ে খেলা শেষে হাত ধুতে গেল মনে হল, আহ! এভাবে কজন পারে? আমি প্রাণভরে ওকে দেখতে থাকি। ঝামেলাটা হল মিসেস হেইজ। উঠোনেই ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে ঝুলিসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ ভিক্ষুকের মত। উফফ! মাঝখানে এসে আমার ছবি তোলা শুরু করে দিলেন।

শুক্রবার। রোজ নামে একটা কালো মেয়ের সাথে কোথায় যেন যাচ্ছে ও। ওর হাঁটার তালে তালে আমার কেন এরকম উত্তেজনা বাড়ে? এক বালিকার মত করে হাঁটে, দুর্লভ বালিকা। ওকে নিয়ে আমি ভাবতে থাকি। ওর প্রতিটি পদক্ষেপেই যেন আমি ওর আরো গভীরে হারিয়ে যাই। ডলরিষের গলা শুনে জানালার কাছে দাড়াই। দেখলাম রোজের সাথে দাঁড়িয়ে আছে নিচে।
‘আমি গেলাম।’ রোজ বলেই বিদায় নিল।
‘আচ্ছা। বাই!’
হায় ডলরিস! ললিতা আমার।

শনিবার। প্রতিদিন খবরের কাগজ রাখি। অকারণেই রাখা হয়। পড়া হয় না। কিন্তু এর একটা সুবিধা আছে। প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়ার অজুহাতে আমি নিচে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকতে পারি; ডলরিসকে দেখতে পারি। আজকে ও ওর সেই ফুয়ারায় সূর্যস্নান করছে। ফুয়ারাটাকে ও ডাকে ‘পিয়াজ্জা’ বলে। কিন্তু ঝামেলাটা হল ওর মা এবং আরো কিছু মহিলা আশেপাশেই থাকে সব সময়। এইজন্য বেশ লুকিয়ে বাঁচিয়ে দেখতে হয় ওকে। অবশ্য সবাই ভাববে আমি খবরের কাগজই পড়ছি। তবুও আমার এই উন্মাদের মত গোবেচারা প্রেমিক হৃদয়ের ঢিবঢিবটুকুও কেউ যাতে টের না পায়, এতটাই গোপন প্রণয়।

রবিবার। তাপমাত্রা পিছু ছাড়ছে না। এই সপ্তাহে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। সময়টা অবশ্য মন্দ কাটছে না। আমি বারান্দায় বসে আমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। মানে আরকি ওই খবরের কাগজ পড়ছিলাম। নতুন একটা পাইপ কিনেছি। পাইপটা ধরাতেই দেখলাম ললিতা বের হল। আমাকে হতাশ করে দিয়ে পিছন পিছন ওর মা-ও বেরিয়ে এল। দুজনের পরনেই দুই টুকরো করে নতুন গোসলের পোশাক। আমার পাইপটার মতই নতুন। আমার প্রিয়তমা, আমার প্রণয়ী ললিতা আমার পাশে দাড়াল এক মুহূর্ত। মজাচ্ছলে পাইপটা কেড়ে নিতে চাচ্ছিল। ওর গায়ে সেই আশ্চর্য ঘ্রাণ পেলাম। সেই ঘ্রাণ। যেটা সেই রিভেইরাতে পেয়েছিলাম। আমার সেই ললিতার গায়ে। ওর মা ডাকল ওকে। যেন আমার কাছ থেকে ঘ্রাণটা ছিনিয়ে নিতে চায়।

আমার ললিতা। প্রণয়ীর মত উপুর হয়ে শুয়ে আছে। ফুয়ারার পানি এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে ওর সমস্ত শরীর, ওর নরম কাঁধ, পিঠের সর্পিল বাঁক। আর ভেজা জামাটা পিছনের অংশের সাথে লেগে ছিল। দুচোখ ভরে যেন দেখার জন্য সৃষ্ট এক অপরূপ দৃশ্য। আর আমি আমার অন্তরের হাজার হাজার চোখ দিয়ে যেন নিখুঁত পরখ করে যাচ্ছিলাম। আর কেমন নীরবে ললিতা ক্লাস সেভেন পড়ুয়া কিশরীর মতই সবুজ-লাল-নীল, রঙিন কমিক বইটা একমনে পড়ে যাচ্ছিল। আমার শুধু মনে হল ও আমার দেখা সবচেয়ে সেরা নিমফেট। ওর মত আর কে হতে পারে? কেউ না! কেউ না!

আমি শুকনো ঠোঁটে, একমনে খবরের কাগজের আড়ালে চেয়ারে বসে দুলছিলাম আর দেখছিলাম। আর ওকে পাওয়ার অবিরাম ইচ্ছা আমাকে অসহায় করে ফেলছিল। একবার পিঠে চুলকে নিচ্ছিল; আমি যেন এক ধ্যানে ওর যে কোনো স্পন্দন সুবোধ বালকের মত শিখে নিচ্ছিলাম। ঝামেলাটা করল মিসেস হেইজ। মাঝখানে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আমার সাথে আলাপ জুড়ে দিল যে ললিতার দিকে ঠিকমত তাকাতেও পারলাম না। কোন এক জনপ্রিয় লেখক কী এক বই নকল করে ছেপেছে এইসব ফালতু আলাপ শুরু করল। কেমন লাগে!
সোমবার। পুরোটা বিকেল আমি, ডলরিস আর মিসেস হেইজ গ্লাস লেকে গিয়েছিলাম। গোসল করলাম, রোদটা মিষ্টি লাগছিল বলে রোদ পোহালাম। বিকেলটাকে সুন্দর সকালের মত লাগছিল বৃষ্টির কারণে। দেখার মত আবহাওয়া ছিল।

মেয়েদের দেহের লোম সাধারণত একেক জায়গায় একেক বয়সে গজায়। এটা নির্ভর করে পরিবেশ ও জলবায়ুর উপর। এই বয়সটা দশ থেকে সতেরো পর্যন্ত হতে পারে। যেমন নিউ ইয়র্কে ও শিকাগোতে এটা হয় সাধারণত তেরো বছর নয় মাস বয়সের দিকে। হ্যারি এডগার যখন ভার্জিনিয়াকে বিয়ে করল তখন মেয়েটার বয়স চৌদ্দও হয়নি পুরোপুরি। যতদূর মনে পড়ে হ্যারি এডগার ওকে বীজগণিত পড়াত। ওদের হানিমুন হয় পিটার্সবার্গে।

মঙ্গলবার। সারাদিন বৃষ্টি। মিসেস হেইজ শপিং এ গেছেন। জানতাম ললিতা আশেপাশেই আছে। খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলাম মিসেস হেইজের শোবার ঘরে। দেখলাম বাম চোখ খুলে কী যেন করছে। ময়লা ঢুকেছে বোধহয়। যন্ত্রণা হচ্ছে। বললাম, ‘আমি হেল্প করছি দাঁড়াও।’
কাছে গেলাম। মনে হল আমরা দুজন কুসুম গরম পানিতে গোসল করছি। কী এক প্রশান্তি। ওর কাঁধ একহাতে ধরে চোখে ঢোকা ময়লাটা বের করার চেষ্টা করলাম। ও বলল, ‘আরেকটু এইদিকে।’
‘বেশ বুঝতে পারছি। এবার ঠিক আছে?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হয়েছে।’
‘হুম। এখন অন্য চোখটা দেখি!’
ও আমার মজাটা ধরতে পেরে হেসে দিল, ‘এহ! শখ কত। ওইচোখে কিছু যায়নি…’ থেমে গেল। ওর ঠোঁটের খুব কাছে আমার ঠোঁট। কী বুঝল কে জানে! এক মুহূর্ত আমার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। আর আমার শুধু মনে হতোে লাগল চিরকাল ধরে যেন আমি হাওয়ায় উড়ছি।

সেইরাতে অসহ্য লাগছিল। এরকম ভিতরে ভিতরে এত মিষ্টিভাবে আগে কখনো যন্ত্রণা মনে হয়নি। ওর মুখটা ভেসে ভেসে আসছিল চোখের সামনে। কিন্তু নিখুঁতভাবে দেখার আগেই কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। খুব প্রিয় কারো চেহারা বোধহয় এরকমই ঝাপসা দেখায়। তাছাড়া ও যখন আমার কাছে থাকে আমি যেন অন্ধ হয়ে যাই মাতালের মত। কেন যে নিমফেটদের সাথে মেশার অভ্যাস নেই। ললিতার কাছে গেলেই কেমন অস্বস্তি বোধ হয়। আমি প্রাণভরে এই অস্বস্তিটাকেও আপন করে নিই।

বারবার মনে হতো আমি যদি কোনো লেখিকা হতাম, ললিতার বাদামী চুল, খানিকটা খাওয়া টকটকে লাল চকলেটের মত ওর ঠোঁট, ওর আপাদমস্তক আমি শিখে নিতাম আর সুন্দর করে লিখতাম হয়ত। কিন্তু আমি তো আমিই। বুড়ো এক লেখক; বালকসুলভ হাসির পিছনে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক অসুস্থ কামনা। কোনো নারীবাদী লেখকও হতে পারিনি। তাই আমাকে আমার মত করেই বলতে হচ্ছে। হায় খোদা! আমি একটা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি ওর প্রেমে। যা কিছু দেখতে পাই, সমস্ত ইন্দ্রিয় জুড়ে শুধু- ললিতা, আমার ললিতা।

বুধবার। ‘মাকে বলো, আমরা তিনজন মিলে কালকে যেন আমাদের গ্লাস লেকে যাই।’ আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল ও। বাইরে পার্কিং করা গাড়িটার এক অংশে পড়ে হীরার মত ঝিলিক দিচ্ছিল। কোথায় যেন একটা বাচ্চার স্বর ভেসে এলো, ‘ন্যান্সি! ন্যান-সি…!’
আর ঘরের ভিতরে ‘লিটল কারমেন’ গানটা বেজে চলেছে। ললিতার পছন্দের গান। আমি মজা করে বলতাম, ‘বেচারা কারমেন।’ ও চটে যাওয়া ভঙ্গিতে আমাকে ভ্যাঙ্গাতো।

বৃহস্পতিবার। গতরাতে আমরা তিনজন দোলনায় বসে ছিলাম। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মিসেস হেইজ একটা সিনেমার কাহিনী শোনাচ্ছিল। সিনেমাটা ভদ্রমহিলা এবং লো দুইজন মিলে গত শীতে দেখেছিল। আমি একপাশে বসে ছিলাম। অন্যপাশে ভদ্রমহিলা আর মাঝখানে লো। আদুরে বিড়ালের মত আমার শরীরের সাথে ঘেঁষে ঘেঁষে আসছিল।

ভদ্রমহিলার কাহিনী বলা যখন শেষ হল তখন আমি আমার সেই আর্কটিকের অভিযানের গল্প শোনাই। কীভাবে ছিলাম ওখানে, কী কী দেখেছি। কীভাবে বন্ধুক হাতে মেরুভল্লুকের মোকাবেলা করতে হয়েছে, সব। গল্প বলতে বলতে টের পাচ্ছিলাম লো এর কাঁধ, পিঠ, পা আলতো ছুঁয়ে আছে। অন্ধকারের সুযোগে আমিও বারবার ওর হাত ছুঁয়ে দিচ্ছিলাম। লোর হাতে একটা পুতুল। মিসেস হেইজের বিরক্ত লাগায় পুতুলটা নিয়ে অন্ধকারে ছুঁড়ে দিল। আর আমি আমি বারবার হাসির ছলে লোর চুলের ঘ্রাণ শুঁকে যাচ্ছিলাম। ওর পা আমার দুইপায়ের মাঝখানে, আমার হাত ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। তাতে ওর কোমল পিঠের স্পর্শ আমাকে শিহরিত করছিল।

কিন্তু এসব যে আমার অসুস্থ পাগলামী চিন্তা সেটা বেশ ভাল বুঝতে পারি। যখন ওর মা ওকে বলত, ‘লো, তোমার এখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত।’ শুনতে ভাল লাগত কথাটা। কারণ অবশ্যই আছে।
লো প্রতিবাদ করত, ‘তোমার মাথা খারাপ? এখন ঘুমাতে যাব না।’
‘তারমানে কাল কোনো পিকনিক হচ্ছে না।’ সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা।
‘এই স্বাধীন দেশে তুমি একরকম জোর করছ কিন্তু!’
লো রেগে যেত। রেগে গেলে ওর মুখটা লালচে হয়ে যায়। আর মিসেস হেইজ তার দশ নাম্বার সিগারেটটা ধরিয়ে আমার কাছে লো’র নামে অভিযোগ শোনায়।

ভদ্রমহিলা বলতে লাগলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকেই এরকম। যখন এক বছর বয়স, কিছুই বুঝত না, তখনও খেলনাগুলো ঝুড়ি থেকে এদিক সেদিক ফেলে দিত। যেন সে জানত তার একজন মা আছে, চাকরানী, সে খেলনাগুলো ঠিকই তুলে ফেলবে। কেমন দুষ্ট ছিল! আজ বারো বছরের একটা মেয়ে হয়েও স্বভাব একটুও বদলায়নি। কথায় কথায় তর্ক করতে চায়, রেগে যায়। পড়াশুনা করতে চায় না। গ্রেড খারাপ হয়েছিল। অবশ্য নতুন স্কুলে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়নি। পিস্কিতে একটু সমস্যা হচ্ছিল।’
বললাম, ‘পিস্কি?’
‘আমার শাশুড়ি থাকতেন ওখানে। তাঁর হোম টাউন ছিল। রামসডেলে এসেছি দুই বছর হল মাত্র।’
‘বেশ।’
‘আচ্ছা মসিয়ে, যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলি?’
‘নিশ্চয়ই।’
‘বর্ষার সময় যদি এখানে থেকে যান তাহলে কি লো’কে একটু হোমওয়ার্কে সাহায্য করবেন? মানে অংক, ফ্রেঞ্চ আর ভূগোলটা একটু দেখিয়ে দিলেই চলবে।’
‘সবই পড়াতে পারব।’
‘তারমানে-‘ ভদ্রমহিলা বেশ খুশি গলায় বলে উঠলেন, ‘আপনি থাকছেন?’
থাকছি মানে? একশবার থাকছি! একটা চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছে হল। ললিতা যেখানে থাকবে আমি সেখান থেকে দূরে কোথায় গিয়ে থাকব? আমি এখানেই থাকছি। মনে মনে উত্তেজিত হলেও স্বাভাবিক গলায় শুধু বলতে হলো, ‘আজ্ঞে, হ্যাঁ!’

শুক্রবার। আচ্ছা আমি যদি একটা খুন করে ফেলি? কেমন হবে? করব কিনা জানি না। এ কারণেই ‘যদি’ বললাম। আমার লো এবং আমার মাঝখানে একমাত্র কাবাবের হাড্ডি হল ওর মা, ওই ভদ্রমহিলা… কীসের ভদ্রমহিলা! অভদ্রমহিলা। মাঝে মাঝে আমি স্বপ্নে দেখি ওই মহিলাকে আমি খুন করতে যাচ্ছি। মানে আমার হাতে একটা বন্দুক। যতবার ট্রিগার চাপি দেখি যে গুলি বন্দুলের মাজল দিয়ে টুপ করে পড়ে যাচ্ছে নিচে। আমার স্বপ্ন অথচ আমার মনমত না। যত্তসব! এখানে আসার পরে ললিতাকে ছাড়া আমি একটা মুহূর্ত অন্যকিছু ভাবতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে আমি বুঝি পাগল হয়ে যাব।

রাতে খাবার টেবিলেও বুড়ো মহিলাটা আমাকে বলল, যদি লো আমাকে বেশি বিরক্ত করে তাহলে যেন আমি কষে চড় মেরে দিই। রাতে আমার লেখার টেবিলে বসেছিলাম। শুনতে পেলাম লো আর তাঁর মা’র মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। মহিলা বারবার বলছে, ‘যদি তুমি তোমার বেয়াদবির জন্য সরি না বলো তাহলে কাল কোনো পিকনিক হচ্ছে না।’
লো বেশ জেদী মেয়ে। সেও সরি বলবে না। ব্যাস! মিসেস হেইজ ধমক দিয়ে ঘর থেকে চলে গেল। জোরে দরজা বন্ধ করার শব্দ পেলাম শুধু। এরমানে কাল আসলেই পিকনিক হচ্ছে না। মজা করা যেত, সব গেল।

শনিবার। কিছুদিন ধরে আমার দরজাটা আধখোলা করে রাখছি। কিন্তু এতদিনে মাত্র আজই ফাঁদটা কাজে দিল। আমি আমার টেবিলে লিখছিলাম। লো আমার ঘরে ঢুকল। একটু ঘুরেফিরে দেখল। সামনের চেয়ারে প্রথমে পা তুলে বসল। তারপর উঠে আমার ডায়রির কাছ এসে দাড়াল। এক পলক আমার লেখাগুলো দেখল। আমি এতটাই ওর দিকে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে খেয়ালই ছিল না। আমি দ্রুত ডায়রিটা বন্ধ করে অন্য একটা ডায়রি সামনে টেনে নিলাম। আগেরটায় ওর সম্পর্কেই লিখছিলাম আমি। লো আমার ডায়রি দেখতে দেখতে আমার কোলের উপর বসে পড়ল। আর আমি যেন কেমন জড় বস্তুর মত নিঃসাড় হয়ে যাচ্ছিলাম। ওর বাদামী চুল, স্পর্শ, ঘ্রাণ সবকিছু যেন কেমন অলৌকিক সময়ের মধ্যে আটকে যাচ্ছিল। ললিতা, আমার ললিতা। আমি চাইলে ওকে চুমু খেতে পারতাম। হয়ত সেও মানা করত না। বরং চোখ দুটো বন্ধ করে হলিউড মুভির মত আমাকেও চুমু খেত। এখনকার আধুনিক মেয়ে সে। মুভি ম্যাগাজিনগুলোও নিয়মিত পড়তে দেখি। নিজেকে বেশ ভাগ্যবান ভাড়াটিয়া মনে হচ্ছিল।

সুখ বেশিক্ষণ সইল না। নিচে লুইসের আওয়াজ শুনতে পেলাম। মিসেস হেইজকে কী যেন বলছে। সম্ভবত বেসমেন্টে কিছু একটা মরে ছিল। লো দৌড়ে চলে গেল ঘটনা কী দেখতে।

রবিবার। লো ওর মায়ের সাথে হ্যামিলটনের জন্মদিনের পার্টিতে গেল। ও খুব সুন্দর করে সেজেছিল আজ। বাদামী চুলে কালো রঙের পিন, আপাদমস্তক সাদা ফ্রক। পায়রার মত লাগছিল, অসাধারণ!

সোমবার। সকালে খুব বৃষ্টি ছিল। যে পায়জামাটা পরে ছিলাম সেটার গায়ে লাইলাক ডিজাইন করা। আমাকে পিছন থেকে দেখলে মনে হবে বুঝি পুরনো কোনো বাগানের একটা মাকড়শা। চেয়ারে বসলাম। বাইরে বৃষ্টি। লো কোথায়? ঘরে আছে কিনা উঁকি দিয়ে দেখলাম, নেই! চেয়ারে এসে আবার বসলাম। পুরো বাড়ির সবগুলো শব্দ তবু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। বাথরুমে খসখস করে টয়লেট পেপার টানার শব্দ পেলাম কয়েকবার। লো কি বাথরুমে? এখনো ব্রাশ করছে? হতে পারে। একমাত্র এই কাজটাই সে ভাল পারে। বাথরুমের দরজার শব্দ। একটু পরেই মিসেস হেইজের কথার শব্দ পেলাম। ফোনে কার সাথে যেন মসৃণ কন্ঠে কথা বলছে। তাহলে লো কোথায়? ললিতা?

এক মুহূর্ত মনে হল লো বাড়িতে নেই। পুরো বাড়িটা খাঁ খাঁ করছে শূন্যতায়। যেন মরুভূমিতে পানির অভাবে মৃত। কী নিষ্ঠুর সেই শূন্যতাবোধ! এই কথাগুলো যখন ভাবছিলাম তখনই পর্দার ফাঁক গলে লো’কে দেখতে পেলাম। মৃদু হেসে ঘরে প্রবেশ করল। হাতে আমার জন্য সকালের নাস্তা।
‘মাকে বোলো না, আমি তোমার সব বেকন খেয়ে ফেলেছি।’ বলেই যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল। সকালের নাস্তাগুলো বোকাবোকা দৃষ্টিতে আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আছে মনে হচ্ছে।

মঙ্গলবার। আমাদের আজ গ্লাস লেকে পিকনিক করতে যাবার কথা ছিল। বৃষ্টি বাঁধ সাধল। এটা কী ধরণের শত্রুতা? বৃষ্টির আজ আসতেই হলো? অথচ আমার নতুন সাঁতারের পোশাক পরে আয়নায় সামনে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব প্ল্যান করলাম। সব মাটি!
বুধবার। বিকালবেলা মিসেস হেইজ সাজুগুজু করে সামনে এসে বললেন, ‘আমার এক বন্ধুর বন্ধুর জন্য কিছু উপহার কিনব। আপনার রুচি বেশ ভাল। আপনি কি আমার সাথে যাবেন মার্কেটে? চলুন না। পারফিউম কিনব। আপনি পছন্দ করে দেবেন।’
বন্ধুর বন্ধু? অনেক নিকট আত্মীয় মনে হচ্ছে! লো’কে বাড়িতে রেখে আমি কীভাবে মার্কেটে যেতে পারি? তবু কী আর করা! পারফিউমের ব্যবসা আমার। আমাকে তো যেতেই হয়।

ড্রাইভিং সীটে গিয়ে বসলেন তিনি, বললেন, ‘আরে, তাড়াতাড়ি উঠুন!’
আমি বুঝলাম না এত তাড়াহুড়োর কী আছে? আমার বিশাল দেহটা নিয়ে ওই গাড়িতে কোনোরকম হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে পারাটাই বিশাল ব্যাপার। শেষমেশ বিশাল ব্যাপারটা আমি সাধ্য করে ফেললাম। ভদ্রমহিলার পাশের সীটে কোনোমতে বসতে পেরেছি। গাড়ি স্টার্ট দিতেই লো’র আওয়াজ পেলাম। সাজসজ্জার ঘরের জানালা থেকে মুখ বের করে বলছে, ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছো? আমি যাব।’ এরপর মুখ উধাও। দেখা গেল ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসছে। আমার মনটা খুশি হয়ে গেল।

‘বাদ দিন তো। চলুন!’ যেন আমার চিন্তাটার জবাব হিসেবে মিসেস হেইজ বললেন। লো চলে আসায় বেশ বিরক্ত মনে হচ্ছে। হায়রে ড্রাইভার! দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে আসতে চাইলেও লো খামচে আমার পাশের দরজা ধরে ফেলেছে।
মিসেস হেইজ রেগে চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘অসহ্য! এসব কি হচ্ছে লো? লো!’
‘দাঁড়াও দাঁড়াও! উঠে নিই।’ লো আমার পাশের সীটে লাফিয়ে বসে পড়ল। আমাকে হালকা ঠেলে বলল, ‘একটু চাপো না!’
আমি যতটুকু চাপলাম সেটা ঠিক চাপার পর্যায়ে পড়ে না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকালাম। উনিও হালকা আমার দিকে একবার তাকালেন। ভাবটা দেখে মনে হলো উনি আশা করছেন আমি লো’কে বাইরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই। এত রেগে যাবার কী আছে আমি সেটাও জানি না। শুধু রাগী গলায় বললেন, ‘তুমি দিনদিন অসভ্য হয়ে যাচ্ছ কিন্তু! এতটুকু ভদ্রতা জ্ঞান তোমার নেই।’
যাই হোক, আমার চেপে বসার সুযোগটাও কম ছিল। আমার একটা হাতের উপর বসে পড়েছে লো। হাতটা সরাতেও পারছি না। হয়ত সরাতে চাইছিও না। খালি পায়েই দৌড়ে এসেছে মেয়েটা। পায়ের নখগুলো টুকটুকে লাল করে পলিশ করা। ওর শরীর সেঁটে আছে আমার গায়ে। হায় খোদা, এমন পরিস্থিতেও আমি ওকে চুমু না খেয়ে আছি কীভাবে? মিসেস হেইজকে দেখে মনে হচ্ছিল রেগে এখনই বুঝি ঝলসে উঠবেন। উনি রাগলে নাকের ডগা লাল হয়। এখন সেটা জ্বলজ্বল করছে। রাগের মাত্রার উপর নির্ভর করে? কে জানে? আমি জানতেও চাই না। শুধু চাচ্ছিলাম এই পথটা না ফুরোয় যেন। যেন মার্কেটটা কোনোদিনই না আসে। আর এভাবেই গাড়িটা যেন চলতে থাকে। আমার পাশে এভাবে চিরকাল বসে থাকুক আমার ললিতা।
কিন্তু সব চাওয়া পূর্ণ হয় না। মার্কেটটা এসেই গেল। যাহ!

ফেরার সময় আমার কোনো আপত্তিই ছিল না। প্রথমত, মিসেস হেইজের ইচ্ছা অনুযায়ী আমাকে লো’র সাথে পিছনে বসতে হল। দ্বিতীয়ত, আমার পছন্দ করা পারফিউমই তিনি কিনেছেন।
বৃহস্পতিবার। বেশ শিলাবৃষ্টি শুরু হল। কাজ ছিল না। রামসডেল স্কুলের মেয়েদের একটা তালিকা হাতে পেলাম। তালিকাটাকে মনে হচ্ছিল একটা অসাধারণ কবিতার মত-
এঞ্জেল, গ্রেস
অস্টিন, ফ্লয়েড
বিল, জ্যাক
বিল, ম্যারি
বাক, ডেনিয়েল
বায়রন, মার্গারেট
ক্যাম্পবেল, এলিস
কারমাইন, রোজ
চ্যাটফিল্ড, ফিলিস
ক্লার্ক, গর্ডন
কুয়ান, ম্যারিওন
ডানকান, ওয়াল্টার
ফ্যাল্টার, টেড
ফ্যান্টাসিয়া, স্টেলা
ফ্ল্যাশম্যান, ইভরিং
ফক্স, জর্জ
গ্লেভ, ম্যাবেল
গুডেল, ডোনাল্ড
গ্রীন, লুসিন্ডা
হ্যামিল্টন, ম্যারি রোজ
হেজ, ডলরিস
হোনেক, রোজালাইন
নাইট, কেনিথ
ম্যাককু, ভার্জিনিয়া
ম্যাকক্রিস্টাল, ভিভিয়ান
ম্যাকফেইট, ওব্রেয়
মিরান্ডা, অ্যান্থনি
মিরান্ডা, ভিওলা
রোজাটো, এমিল
স্লেঙ্কার, লিনা
স্কট, ডোনাল্ড
শেরিডান, এগ্নিস
ট্যালবোট, এডউইন
ওয়েইন, লুল
উইলিয়ামস, রাফ
ওয়াইন্ডমুলার, লুইস

আহ কবিতা! কবিতাই বটে। নামগুলোর মধ্যে ‘হেইজ, ডলরিস’ নামটা খুঁজে পেয়ে কী ভালোই না লাগছিল। মনে হচ্ছিল একদল রাজকন্যাদের মধ্যে নিজস্ব মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার লো। কোন ব্যাপারটা আমাকে এত উদ্বেলিত করছিল বোঝার চেষ্টা করলাম। যেন একটা ক্লাসরুমে একদল মেয়ের মাঝে সকলের মনোযোগী চোখ একজনের দিকে। আমার লো, ললিতা।

শুক্রবার। সবকিছু মিলিয়ে ব্যাপারটা এরকম হয়ে গেল যে মিসেস হেইজ যেন কোনো অদৃশ্য কেউ। আমি ও আমার লো বেশ ক্লোজ হয়ে গেলাম। ওকে যত আজগুবি গল্পই শোনাতাম ও মনোযোগ দিয়ে আমার গল্প শুনত। আমার পাশেই থাকত সারাক্ষণ। যেন আমার বুকের ভিতরে মিশে যাচ্ছে খুব গভীরভাবে। আমিও ধীরে ধীরে আমার অসুস্থ সেই ভয়ংকর কামনায় মগ্ন হয়ে উঠতে লাগলাম।

রাতে খাবার টেবিলে মিসেস হেইজ জানালেন, আগামী সপ্তাহে আবহাওয়া বেশ পরিস্কার হতে পারে। ফলে আমরা লেকে যেতে পারি পিকনিক করতে। দিন ঠিক করা হল, আগামী রবিবার। ঘুমাতে যাবার আগে বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম। কীভাবে আমার ললিতার সাথে আমি ওখানে মনমত সময় কাটাতে পারি। আমি বেশ ধরতে পারছিলাম ললিতার সাথে আমার এই মেশাটা ঠিক মেনে নিতে পারছেন না ভদ্রমহিলা। সুতরাং তাঁকে প্রথমে খুশি করার ব্যাপারটা পরিকল্পনায় আনলাম। কিছুক্ষণ তাঁর সাথে একা সময় কাটিয়ে আমি জঙ্গলে আমার ঘড়িটা কিংবা আমার গানগ্লাস হারিয়ে ফেলেছি। এই অজুহাতে সরে গিয়ে লো’র সাথে সময় কাটাব। ভাবতে ভাবতে রাত তিনটা বেজে গেল। ঘুম নেই। একতা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিলাম। তারপর কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম নিজেও জানি না। অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলাম ওই লেকের পিকনিক নিয়ে। আমি নিশ্চিত এই স্বপ্নটা যদি ড. ব্ল্যাঙ্ক শোয়ার্জম্যানের কাছে বলি, উনি লুফে নেবেন।

যাই হোক, দুর্ভাগ্যবশত আমার স্বপ্নটা আমার অনুকূলে ছিল না। আমার স্বপ্ন যদি আমার মনমতই না হয় এর চাইতে বাজে ব্যাপার আর কী হতে পারে।
শনিবার।

 

রনক জামান

কবি ও অনুবাদক ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১, মানিকগঞ্জে জন্ম। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ : অগ্রন্থিত ওহী [তিউড়ি, ২০১৯] এবং ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা [অনুপ্রাণন ২০১৬]

Facebook Comments
Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।