সেলিম জাহান: দেখা হয় নাই হৃদয় খুলিয়া

আস্তে আস্তে ভোর হচ্ছে— ফিকে অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। ঘরের বাইরে রাস্তার ফুটপাতে জোড়া জুতোর শব্দ—কারা বোধহয় কাজে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই অপরিহার্য কাজ। কোভিডের প্রকোপ যুক্তরাজ্যে নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় পথ-ঘাটে মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে এসেছে। এখন তো এমনই হয়, কোভিড সঙ্কটের জন্যে একান্ত প্রয়োজন না হলে কেউ ই ঘরের বাইরে যায় না। সবাই তো ঘরের মধ্যে আবদ্ধ।

বিছানা ছেড়ে ঘরের পর্দা সরাতেই চোখে পড়ে ফুটপাত ধরে দূরে দু’জন মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন। হাতে বাজারের থলে। বুঝতে পারি, অতি সকালে ভীড় বাড়ার আগেই কেনা-কাটা সারতে চান তারা। তাদের পোশাকের সবুজ আভাটুকু পথের বাঁকে মিলিয়ে যায়। মনে হয়, এমন অভিনিবেশ সহকারে বহুকাল হয়তো চোখ মেলে দেখি নি মানুষকে। নীল আকাশে সূর্য ওঠার লাল আভাটুকু ছড়িয়ে পড়ছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশে রঙ বদলের খেলা দেখি। মনে হয়, এক অভিনেতা কোন নাটকের বিভিন্ন চরিত্রের জন্যে পোশাক বদলাচ্ছেন। কতক্ষন যে মগ্ন হয়েছিলাম, মনে নেই। হঠাৎ করে পাশের বাড়ীর বেড়ালটির ঘর ঘরানিতে মগ্নতা ভেঙ্গে যায়। বাহ্, বেড়ালটি চারটি থাবাই তো সাদা – যেন সাদা মোজা পরে আছে। কই, আগে তো চোখে পড়ে নি!

জানালার পাশ থেকে সরে আসতে আসতে মনে হল, হাতে আমার এখন অখন্ড সময় – নিত্যদিনের কাজের তাড়া নেই, উর্ধশ্বাসে ছোটা নেই, আশপাশের সবকিছুকে উপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আমার সময় আছে পথচলতি মানুষকে খুঁটে খুঁটে দেখার, মুগ্ধ চোখে আকাশের দিকে তাকাবার। কতদিন তো পাশের বাড়ীর বেড়ালটিকে দেখেছি, কিন্তু কখনো তো চোখে পড়ে নি যে ওর চার পায়ে সাদা মোজা আছে? এতকাল ধরে দিন কাটিয়েছি, জীবন পার করেছি, কিন্তু অবসর মেলে নি আশে পাশে তাকাবার, শুনবার, অনেকটা সেই ‘দেখা হয় নি চক্ষু মেলিয়ার’ অবস্হা।

খাবার ঘরে আসি। নাস্তা বানাই। কলাটাকে কেটে দু’ভাগ করি। খাদ্য সামগ্রীর ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যবহার করি, যাতে বাজারে যাওয়াকে যদ্দূর সম্ভব কমিয়ে আনা যায়। খেতে বসে নাস্তার প্লেটের দিকে ভালো করে তাকাই। গাঢ় নীল রঙের প্লেটটির ধার ঘেঁসে কি সুন্দর বনের ছবি। আগে দেখেছি তো বলে মনে পড়ে না? কোথায় এক ঘুঘুর ডাকে কান খাড়া হয়ে যায়। আশ্চর্য্য, রাস্তার ওপারের গাছে যে একটা ঘুঘুর বাস এবং সকালে যে সে ডেকে ডেকে যায়, তা তো কখনো কানে আসে নি। হয়তো সে প্রতি ভোরে ডেকেছে, কিন্তু গাড়ীর শব্দে তা আমি শুনি নি। শুনতে শুনতে মনে হোল, কি মায়াময় ঘুঘুর ডাক!

লেখার টেবিলে লিখতে বসি। আস্তে করে গান ছাড়ি। লেখা এগোয় ধীরে ধীরে। চোখ যায় রাস্তার হলুদ রঙ্গের ফুলগাছটির দিকে। অল্প পত্রের শুকনো ডালের গাছটিতে এই শীতেও ফুল! কই। আগে তো চোখে পড়েনি। আস্তে করে গান ছাড়ি। লিখতে লিখতে টের পাই যে, আগে গানটি শুনে গেছি, কিন্তু গানের কথাগুলো অতো ভালো করে শুনি নি। কথা ছাড়িয়ে গানের সঙ্গে সঙ্গত করা প্রতিটি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ পরিস্কার শুনতে পাই।

কিছুক্ষণ বাদে লেখা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াই। একটি শিশুর হাত ধরে মা যাচ্ছেন, দূরত্ব বজায় রেখে একজন যুবা আস্তে আস্তে দৌঁড়ুচ্ছে, আরো কিছুটা দূরে একজন বৃদ্ধ কুকুর হাঁটাতে বেরিয়েছেন। সবার গতি ধীর— কেন তাড়া-হুড়ো নেই। চারদিক দেখতে দেখতে সবাই চলেছেন। শিশুটি আমাকে দেখে হাসে— আমিও তাকে হাসি ফিরিয়ে দেই। যুবাটি আমার দিকে হাত নাড়েন— আমিও হাত নাড়ি। বৃদ্ধটি আমাকে সম্ভাষণ জানান। আমিও তাই করি। বৃদ্ধটি এক লহমার জন্যে দাঁড়ান। আমার হাল-হকিকত জিজ্ঞাসা করেন। বড় ভালো লাগে। এমন অলস দিন বড় যে বিরল— কিন্তু বিরস নয় মোটে।

ধীরে ধীরে দিন পেরোয়— সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে বিকেল। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি আলোচনা-অনুষ্ঠানের কথা আজ। তারজন্যে সাজ-সরঞ্জাম ঠিক করি। অবাক লাগে, হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে চেনা-পরিচিত নানান জনের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছি। পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে তথ্য প্রযুক্তির কারনে। একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস পড়ে। কবে যে আবার এ সব মানুষগুলোর সঙ্গে মুখেমুখ্ দেখা হবে!

বিকেলেপেরিয়ে সন্ধ্যে। আসতে আস্তে আঁধার নামে—মনে পড়ে যায়, ‘যদিও সন্ধ্যা নামিছে মন্দ মন্হরে’। আকাশের দিক তাকিয়ে ভাবি, ‘নামে সন্ধ্যা তন্দ্রালসা, সোনার আঁচল খসা’। রাস্তার বাতি জ্বলে ওঠে। সে বাতির আলোয় পাশের সোনাঝুরিগাছের মতো গাছটি ঝলমলিয়ে ওঠে। কি আশ্চর্য্য, রাস্তার বাতিটি যে পুরোনো গ্যাস বাতির মতো, তা’তো আগে লক্ষ্য করি নি। সোনাঝুরি গাছের ফুলের বাস নাকে এসে লাগে। আহ্, কি মিষ্টি গন্ধ! আগে কি পেয়েছি এ সুবাস? কে জানে।

রাত বাড়ে— ঘুমের প্রস্তুতি নেই। মনে হয়, আমার জীবনের চারপাশে যা আছে, তার বহু কিছুই হয়তো এতকাল চোখ মেলে দেখি নি, কান পেতে শুনি নি, শ্বাস নিয়ে শুঁকি নি। আজ যেন আমার চারপাশটিকে আমি নতুন করে আবিষ্কার করলাম। আমার ইন্দ্রিয়েরা এখন অনেক বেশী সজাগ আর সচেতন।

বিছানায় শুয়ে পাশের লম্বা কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। রাস্তার এপারের বাতিটির আলো তেরছা হয়ে এলায়ে পড়েছে মেঝেতে। ছাদের দিকে তাকাই। একটা টিকটিকি সেখানে। বাহ্, জানতামই না তো যে আমার একজন প্রতিবেশী আছেন। তাকে শুভরাত্রি জানিয়ে চোখ বুঁজি। কাল সকালে এক নতুন প্রভাতে উঠতে হবে যে!

 

সেলিম জাহান

(সেলিম জাহান ভূতপূর্ব পরিচালক মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।)
ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মূখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন।তার আগে তিনি জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন বিভাগের পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘে যেগদানের আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। উপদেষ্টা ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্হাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

ড: জাহান লেখালেখি করছেন গত চার দশক ধরে। আশির দশকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এ সাময়িকীতে নিয়মিত লিখেছেন। রেডিও ও টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জননন্দিত উপস্হাপক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৯১-৯২ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মহাসচিব ছিলেন।ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হের সংখ্যা এত ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্হ: বেলা-অবেলার কথা, স্বল্প কথার গল্প, পরানের অতল গহিণে, শার্সিতে স্বদেশের মুখ, অর্থনীতি-কড়চা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতি, Overcoming Human Poverty, Freedom for Choice, Development and Deprivation.

Facebook Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।